📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 ক্ষুৎ-পিপাসাগ্রস্ত এ মহান ব্যক্তিগণ

📄 ক্ষুৎ-পিপাসাগ্রস্ত এ মহান ব্যক্তিগণ


একদিন মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো, আমরা আপনার কথা শোনার জন্যে আপনার মজলিসে আসতে প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে, সবসময় আপনার কাছে কিছু অনাহারী ফকির-ফুকারা বসে থাকে, তাদের সঙ্গে গিয়ে বসা তো আমাদের মানায় না। এতে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। আপনি তাদেরকে পৃথক করে দিয়ে আমাদের বিশেষ মজলিসের ব্যবস্থা করুন, তাহলে আমরা আপনার কথা শুনতে আসবো। তাদের এ প্রস্তাবে বাহ্যত কোনো সমস্যা ছিলো না। যদি তাদের জন্যে ভিন্ন মজলিসের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে তারা দ্বীনের কথা শোনার সুযোগ পেতো এবং তাতে হয়তো তাদের সংশোধন হয়ে যেতো। আমরা হলে তাদের কথা মেনেও নিতাম। কিন্তু বিষয়টি ছিলো শরীয়তের মূলনীতি সংক্রান্ত। তাই তৎক্ষণাৎ কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়,
وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدُوةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ 'তাদেরকে আপনি দূরে সরিয়ে দিবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁকে ডাকে।”
এখানে আল্লাহ সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, যদি সত্যের অন্বেষা নিয়ে আসতে চাও তবে তাদের সঙ্গেই বসতে হবে। আর যদি তাদের সঙ্গে বসতে তোমাদের সম্মানে বাধে, তবে মনে রেখো, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। কোনো অবস্থাতেই তাঁর প্রিয় বান্দাদের বাদ দিয়ে তোমাদের জন্যে বিশেষ মজলিসের ব্যবস্থা করা যাবে না।

টিকাঃ
৯. আনআ'ম : ৫২
১০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪৩৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৮

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের অনুসারীগণ গরীবই হয়ে থাকেন

📄 আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের অনুসারীগণ গরীবই হয়ে থাকেন


অন্যান্য নবীগণের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটেছে। ঐ সময়ের কাফেররাও তাদেরকে বলেছিলো,
مَا نَرَيكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَا ذِلْنَا بَادِيَ الرَّأْيِ 'আমরা তো দেখছি তোমার অনুসরণ করছে কেবল তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্যত দৃষ্টিতেই অধম।'
উদ্দেশ্য হলো, আমরা কীভাবে তোমার সঙ্গে আসতে পারি? কারণ, আমরা তো হলাম অনেক বড়ো বুদ্ধিমান, অনেক মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ বলছেন, যে সব লোককে তোমরা অধম বলছো, দুর্বল ও ফকির-মিসকীন বলছো, আল্লাহর নিকট তারা অনেক মর্যাদার অধিকারী। তাই তাদেরকে তুচ্ছ ভেবো না। এটাই হলো ইসলামের নীতির কথা। এখানে এটা সম্ভব নয় যে, শুধু নেতৃত্ব ও প্রাচুর্যের কারণে তোমাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এটা এমন এক নীতি, যাতে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল কোনো মূল্যেই আপোস করেত সম্মত নন। কারণ, মুমিন বান্দাগণ তোমাদের দৃষ্টিমতে দুর্বল হলেও আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে।

টিকাঃ
১১. হুদঃ ২৭

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক অকৃত্রিম বন্ধু হযরত যাহের রাযি.

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক অকৃত্রিম বন্ধু হযরত যাহের রাযি.


জনৈক বেদুঈন গ্রাম থেকে কখনো কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন। তাঁর নাম ছিলো যাহের রাযি.। তিনি দেখতে শ্রীহীন এক গ্রাম্য মানুষ ছিলেন এবং সম্পদেও ছিলেন অনেক দুর্বল। মানুষের দৃষ্টিতেও তার বিশেষ কোনো মর্যাদা ছিলো না। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন যাহের রাযি. বাজারে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা খুব স্বাভাবিক যে, এমন একজন সাধারণ মানুষ যখন বাজারে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন কে তার প্রতি খেয়াল করে! গায়ের পোশাকও পুরাতন। এ অবস্থায় কেউই তার দিকে খেয়াল করার কথা নয়, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাজার দিয়ে যাচ্ছিছিলেন, তখন তিনি অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে পেছনের দিক থেকে হযরত যাহির রাযি.-এর কাছে এলেন। একবন্ধু আরেক বন্ধুর সঙ্গে যেভাবে হাসি-তামাশা করে ঠিক সেভাবে পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে তার চোখ দুটো ধরে ফেললেন। আর যাহির রাযি. নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা শুরু করলেন। এর পর ফেরিওয়ালা যেভাবে তার পণ্য বিক্রির জন্যে ক্রেতা আহবান করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেভাবে বলতে লাগলেন-
مَنْ يَشْتَرِي هَذَا الْعَبْدَ مِنِي
'গোলামটি কে খরিদ করবে?'
এ পর্যন্ত যাহের রাযি. বুঝতে পারেননি যে, কে তাকে ধরেছেন। এ জন্যে এতোক্ষণ নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আওয়াজ শোনামাত্র যখন চিনে ফেললেন, তখন ছাড়াবার পরিবর্তে নিজের শরীর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে দিলেন। আর বললেন, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আপনি যদি আমাকে গোলাম হিসেবে বিক্রি করতে চান, তবে তো খুব কম মূল্য পাবেন। কারণ, আমি তো অতি সাধারণ মানুষ। যারা আমাকে কিনবে, তারা বেশি দাম দিবে না। তাঁর এ কথার উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতো চমৎকার বলেছেন। সুবাহানাল্লাহ! তিনি বলেছেন,
لَكِنْ عِنْدَ اللَّهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ
হে যাহের! মানুষ তোমাকে মূল্য দিক আর না দিক, আল্লাহর নিকট কিন্তু তুমি কম মূল্যের নও। আল্লাহর নিকট তোমার মূল্য অনেক। দেখুন! বাজারে নিশ্চয়ই অনেক বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী ছিলো। অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির সমাগম ছিলো। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে বাদ দিয়ে হযরত যাহের রাযি.-কে খুশি করার জন্যে এবং তাঁকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্যে তাঁর কাছেই চলে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গে এমন বন্ধুসূলভ আচরণ করলেন, যা একান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু অপর বন্ধুর সঙ্গে করে থাকে।
এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবন দু'আ করেছেন,
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا وَاحْشُرْ فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ

টিকাঃ
১২. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২১৮৭, শামায়েলে তিরমিযী, পৃঃ ১৬

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ > 📄 চাকরকেও সম্মান করুন

📄 চাকরকেও সম্মান করুন


'হে আল্লাহ আমাকে মিসকীন বানিয়ে জীবিত রাখুন, মিসকীন হিসাবে মৃত্যু দিন এবং মিসকীনদের সাথে আমার হাশর করুন।'
আজকাল মানুষের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। এখন দুনিয়ায় যারা প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী এবং বড়ো পদ ও টাকা-পয়সার অধিকারী, তাদের সম্মানও আছে এবং তাদের প্রতি মনোনিবেশ আছে। আর যারা দুনিয়ার হিসাবে দুর্বল, অর্থ-সম্পদ কম, অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও মনোনিবেশ কিছুই নেই। বরং তাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়। মনে রাখবেন! দ্বীনের সঙ্গে এমন চিন্তা-চেতনার কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক সময় আমরা মুখে যদিও বলি যে,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَكُمْ
'যে যতো বেশি মুত্তাকী, সে আল্লাহর কাছে ততো বেশি সম্মানী।'
কিন্তু বাস্তবে তাদের সঙ্গে সেরকম আচরণ আমরা করি না। আপনার ঘরে যে চাকর কাজ করে, আপনার কাছে যে ফকীর আসে, তার সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন? আপনার কথায় তাদের দিল ঠান্ডা হয়, না ব্যথিত হয়? এ হাদীসের উপর বাস্তবেই কি আমল করেন? মনে রাখবেন! তাদের সঙ্গে তাচ্ছিল্যের আচরণ করা খুবই মারাত্মক ব্যাপার। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

টিকাঃ
১৩. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২২৭৫, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৮
১৪. হুজরাত : ১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00