📄 আল্লাহওয়ালাদের শান
হাদীস শরীফে এসেছে, একবার দুই মহিলার সাথে ঝগড়া হলো তাতে এক মহিলা অপর মহিলার দাঁত ভেঙ্গে ফেলে। ইসলামী আইনে দাঁতের বদলা দাঁত দিতে হয়। যখন অপরাধী মহিলাকে এই শাস্তির কথা শোনানো হলো, তখন তার অভিভাবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এসে বললো, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আমি কসম করে বলছি, তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালার উপর আপত্তি করা আদৌ তার উদ্দেশ্য ছিলো না (নাউযুবিল্লাহ), হঠকারিতাও তার উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে এ কথা বলেছিলেন যে, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিবেন, যাতে তার দাঁত ভাঙ্গা ছাড়াই তার প্রতিপক্ষ মেনে নেয়। এ জন্যেই এ কথা বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুই বলেননি।
যেখানে ইসলাম দাঁতের পরিবর্তে দাঁত, চোখের পরিবর্তে চোখের 'কিসাস' নেওয়ার বিধান দিয়েছে, সেখানে এ বিধানও দিয়েছে যে, যার দাঁত ভেঙ্গে গেছে, সে যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আর 'কিসাস' বহাল থাকে না। এ ঘটনায় পরে আল্লাহ যা ঘটালেন তা হলো, যে মহিলার দাঁত ভাঙ্গা হয়েছে, তার অন্তরকে ক্ষমা করার প্রতি বিনম্র করে দিলেন ফলে সে বললো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমার দাঁতের পরিবর্তে আমি তার দাঁত ভাঙ্গতে চাই না।
এ ঘটনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছু মানুষ আল্লাহর খুব প্রিয়, বাহ্যত তাদের চুল এলোমেলো, দুর্বল, কারো দুয়ারে গেলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা এতো বেশি যে, আল্লাহর নামে কসম করে কোনো কথা বললে তিনি তা পূর্ণ করে দেন। এ লোকটিও তেমনি একজন লোক। তাই তিনি যখন কসম করে বললেন, তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না, তখন তার কসম এভাবে পূর্ণ করে দিলেন যে, যার দাঁত ভাঙ্গা হয়েছে, তিনি নিজ থেকেই ক্ষমা করে দিলেন।
আলোচ্য হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিকেই ইঙ্গিত করে বলেছেন যে, এমন কিছু লোক আছে, যারা বাহ্যত দুর্বল এবং মানুষও তাদেরকে দুর্বল মনে করে। কিন্তু তাদের তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে তারা আল্লাহর কাছে এতো প্রিয় এবং এতো মর্যদাবান যে, তারা কসম করে কোনো কথা বললে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। এরা হলো জান্নাতী লোক。
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫০৪, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৪৬৭৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৭৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৬৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৮৫৪
📄 কঠিন স্বভাব মারাত্মক ক্ষতিকর
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেবো, জাহান্নামী কে? জাহান্নামী হলো,
كُلُّ عُتُلٍ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرٍ ‘প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যে কঠিন স্বভাবের।’
عُتُلٌ অর্থ হলো, কঠিন স্বভাব ও অমসৃণ মানুষ। যে কথা বললেই আঘাত করে। নরম কথা বলে না। গরম হয়ে এবং রাগ দেখিয়ে কথা বলে। অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলে।
দ্বিতীয় শব্দটি হলো جَواظٌ। অর্থ হলো নাক চড়া লোক। যার কপালে সর্বদা বিরক্তির ভাব থাকে। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে চায় না। দুর্বল শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলতে অপমান বোধ করে এবং সবসময় দাম্ভিকতার সঙ্গে চলে।
তৃতীয় শব্দ হলো مُسْتَكْبِرٌ। অর্থ অহংকারী। যে নিজেকে বড়ো মনে করে এবং অন্যকে ছোট জ্ঞান করে। এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এরা হলো জাহান্নামী।
📄 তাদের মর্যাদা অনেক
এ হাদীসে বলা হয়েছে, সমাজের সাধারণ, দুর্বল ও গরীব শ্রেণির মানুষদেরকে তুচ্ছ মনে করো না। কারণ, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা অনেক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যারা ঈমান এনেছিলেন, তাদের মধ্যে সব ধরনের লোক ছিলো। তাদের অধিকাংশ মানুষই সম্পদের দিক থেকে বড়ো ছিলেন না। গরীব-ধনী সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে এক সঙ্গে বসতেন। যেখানে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, হযরত উসমান গণীর মতো ধনী সাহাবী বসতেন, সেখানে হযরত বেলাল হাবশী, হযরত সুহাইব রুমী ও হযরত সালমান ফারসীর মতো এমন সকল সাহাবীও বসতেন, যারা দিনের পর দিন না খেয়েও জীবন যাপন করেছেন।
📄 ক্ষুৎ-পিপাসাগ্রস্ত এ মহান ব্যক্তিগণ
একদিন মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো, আমরা আপনার কথা শোনার জন্যে আপনার মজলিসে আসতে প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যা হলো এই যে, সবসময় আপনার কাছে কিছু অনাহারী ফকির-ফুকারা বসে থাকে, তাদের সঙ্গে গিয়ে বসা তো আমাদের মানায় না। এতে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। আপনি তাদেরকে পৃথক করে দিয়ে আমাদের বিশেষ মজলিসের ব্যবস্থা করুন, তাহলে আমরা আপনার কথা শুনতে আসবো। তাদের এ প্রস্তাবে বাহ্যত কোনো সমস্যা ছিলো না। যদি তাদের জন্যে ভিন্ন মজলিসের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে তারা দ্বীনের কথা শোনার সুযোগ পেতো এবং তাতে হয়তো তাদের সংশোধন হয়ে যেতো। আমরা হলে তাদের কথা মেনেও নিতাম। কিন্তু বিষয়টি ছিলো শরীয়তের মূলনীতি সংক্রান্ত। তাই তৎক্ষণাৎ কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়,
وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدُوةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ 'তাদেরকে আপনি দূরে সরিয়ে দিবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁকে ডাকে।”
এখানে আল্লাহ সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, যদি সত্যের অন্বেষা নিয়ে আসতে চাও তবে তাদের সঙ্গেই বসতে হবে। আর যদি তাদের সঙ্গে বসতে তোমাদের সম্মানে বাধে, তবে মনে রেখো, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। কোনো অবস্থাতেই তাঁর প্রিয় বান্দাদের বাদ দিয়ে তোমাদের জন্যে বিশেষ মজলিসের ব্যবস্থা করা যাবে না।
টিকাঃ
৯. আনআ'ম : ৫২
১০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪৩৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৮