📄 অন্বেষণকারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত
আল্লাহ এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটু স্নেহপূর্ণ শাসন করেছেন। কারণ এ কথা সুস্পষ্ট যে, তাঁর উদ্দেশ্য কখনো এমন ছিলো না যে, এই লোক দুর্বল আর তারা সবল এ জন্যে একে উপেক্ষা করি এবং তাদেরকে গুরুত্ব দেই। বরং তিনি তো এই হিকমত ও কৌশলের কথা চিন্তা করেছেন যে, এ তো নিজের মানুষ, তার সঙ্গে তো পরেও কথা বলা যাবে। আর তারা এখন এসেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বার পুনরায় আসবে কি না, কে জানে! সুতরাং এ সুযোগে তাদেরকে সত্যের বাণী শুনিয়ে দেই। কিন্তু আল্লাহ পাক এতোটুকুও পছন্দ করেননি। বরং বলে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি দ্বীনের অন্বেষা ও পিপাসা নিয়ে এসেছে, সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে অধিক গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে, যে দ্বীনের তলব ও অন্বেষা ছাড়া বসে আছে। তার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যে অন্বেষা নিয়ে এসেছে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।
উক্ত আয়াতসমূহে যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো, তাঁর মাধ্যমে তাঁর সকল উম্মতকে এ বিষয়ের প্রতি তাগিদ করা যে, বাহ্যত কোনো মানুষকে সাধারণ দেখলে প্রকৃতপক্ষেও তাকে সাধারণ মনে করো না। কারণ, তোমার তো জানা নেই যে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কতো? সুতরাং তার সঙ্গে সম্মানের আচরণ করো।
টিকাঃ
৫. তাফসীরে ইবনে কাছীর, খন্ডঃ ৪, পৃঃ ৬০৫-৬০৬১১২
৬. 'আবাসা: ১-১০
📄 জান্নাতী এবং জাহান্নামীদের আলোচনা
আল্লামা নববী রহ. এ অধ্যায়ে প্রথমে যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন তা হলো,
عَنْ حَارِثَةَ بْنِ وَهْبٍ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعْفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍ جَوَاظٌ مُسْتَكْبِرٍ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন, আমি কি তোমাদেরকে বলবো, জান্নাতী কে? এরপর বলেন, জান্নাতী ঐ ব্যক্তি, যে দুর্বল এবং মানুষও তাকে দুর্বল মনে করে। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে কিংবা মর্যাদাগতভাবে দুর্বল। দুনিয়ার মানুষও তাকে দুর্বল এবং নিচু মর্যাদার মনে করে। অথচ এই দুর্বল ব্যক্তিটির মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতো বেশি যে, সে যদি আল্লাহর নামে কোনো কসম করে, তাহলে আল্লাহ তার কসম পূর্ণ করে দেন। অর্থাৎ, সে যদি কসম করে বলে যে, অমুক কাজটি এভাবে হতে হবে, তাহলে আল্লাহ তা'আলাও সে কাজটি সেভাবে করে দেন। কারণ, সে আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দা। তাই মহব্বত করে আল্লাহ তাকে এভাবেই মর্যাদা দেন।
টিকাঃ
৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৩৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০৯২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৩০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২০১৯
📄 আল্লাহওয়ালাদের শান
হাদীস শরীফে এসেছে, একবার দুই মহিলার সাথে ঝগড়া হলো তাতে এক মহিলা অপর মহিলার দাঁত ভেঙ্গে ফেলে। ইসলামী আইনে দাঁতের বদলা দাঁত দিতে হয়। যখন অপরাধী মহিলাকে এই শাস্তির কথা শোনানো হলো, তখন তার অভিভাবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এসে বললো, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আমি কসম করে বলছি, তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালার উপর আপত্তি করা আদৌ তার উদ্দেশ্য ছিলো না (নাউযুবিল্লাহ), হঠকারিতাও তার উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে এ কথা বলেছিলেন যে, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিবেন, যাতে তার দাঁত ভাঙ্গা ছাড়াই তার প্রতিপক্ষ মেনে নেয়। এ জন্যেই এ কথা বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুই বলেননি।
যেখানে ইসলাম দাঁতের পরিবর্তে দাঁত, চোখের পরিবর্তে চোখের 'কিসাস' নেওয়ার বিধান দিয়েছে, সেখানে এ বিধানও দিয়েছে যে, যার দাঁত ভেঙ্গে গেছে, সে যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আর 'কিসাস' বহাল থাকে না। এ ঘটনায় পরে আল্লাহ যা ঘটালেন তা হলো, যে মহিলার দাঁত ভাঙ্গা হয়েছে, তার অন্তরকে ক্ষমা করার প্রতি বিনম্র করে দিলেন ফলে সে বললো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। আমার দাঁতের পরিবর্তে আমি তার দাঁত ভাঙ্গতে চাই না।
এ ঘটনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছু মানুষ আল্লাহর খুব প্রিয়, বাহ্যত তাদের চুল এলোমেলো, দুর্বল, কারো দুয়ারে গেলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়, কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা এতো বেশি যে, আল্লাহর নামে কসম করে কোনো কথা বললে তিনি তা পূর্ণ করে দেন। এ লোকটিও তেমনি একজন লোক। তাই তিনি যখন কসম করে বললেন, তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না, তখন তার কসম এভাবে পূর্ণ করে দিলেন যে, যার দাঁত ভাঙ্গা হয়েছে, তিনি নিজ থেকেই ক্ষমা করে দিলেন।
আলোচ্য হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিকেই ইঙ্গিত করে বলেছেন যে, এমন কিছু লোক আছে, যারা বাহ্যত দুর্বল এবং মানুষও তাদেরকে দুর্বল মনে করে। কিন্তু তাদের তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে তারা আল্লাহর কাছে এতো প্রিয় এবং এতো মর্যদাবান যে, তারা কসম করে কোনো কথা বললে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। এরা হলো জান্নাতী লোক。
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫০৪, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৪৬৭৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৭৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৬৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৮৫৪
📄 কঠিন স্বভাব মারাত্মক ক্ষতিকর
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেবো, জাহান্নামী কে? জাহান্নামী হলো,
كُلُّ عُتُلٍ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرٍ ‘প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যে কঠিন স্বভাবের।’
عُتُلٌ অর্থ হলো, কঠিন স্বভাব ও অমসৃণ মানুষ। যে কথা বললেই আঘাত করে। নরম কথা বলে না। গরম হয়ে এবং রাগ দেখিয়ে কথা বলে। অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলে।
দ্বিতীয় শব্দটি হলো جَواظٌ। অর্থ হলো নাক চড়া লোক। যার কপালে সর্বদা বিরক্তির ভাব থাকে। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে চায় না। দুর্বল শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলতে অপমান বোধ করে এবং সবসময় দাম্ভিকতার সঙ্গে চলে।
তৃতীয় শব্দ হলো مُسْتَكْبِرٌ। অর্থ অহংকারী। যে নিজেকে বড়ো মনে করে এবং অন্যকে ছোট জ্ঞান করে। এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এরা হলো জাহান্নামী।