📄 কে আল্লাহর প্রিয়তম?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আল্লাহর যে সুসম্পর্ক রয়েছে, তা কার জানা নেই? মুসলমান বলতেই জানে, আল্লাহর নিকট সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে প্রিয়তম ব্যক্তি হলেন হযরত রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বিশ্বজগতের আর কিছুই তাঁর চেয়ে অধিক প্রিয় হতে পারে না। তাই তো পুরো কুরআনে কারীম তাঁর সানা-সিফাত বর্ণনা ও গুণকীর্তনে পরিপূর্ণ। ইরশাদ হচ্ছে,
إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا . 'হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সর্তককারীরূপে। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।
টিকাঃ
৩. কাহাফ: ২৮
৪. আহযাব: ৪৫-৪৬
📄 স্নেহপূর্ণ শাসন
আল্লাহ যখন তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করেন, তখন এভাবে যেন শব্দের বারী বর্ষণ করেন।
কিন্তু পুরো কুরআনের দুই-তিন জায়গায় আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্নেহপূর্ণ শাসনের সুরে বলেছেন, আপনার অমুক কাজটি আমার পছন্দ হয়নি। তন্মধ্যে একটি হলো 'সূরা আবাসা'য়। ঘটনা ছিলো- একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোক আসলো। তিনি ভাবলেন, এরা যেহেতু সমাজের প্রভাবশালী এবং অনুসৃত লোক, সুতরাং এদের সংশোধন হয়ে গেলে হয়তো সমাজের অন্য লোকের হেদায়েতের পথ খুলে যাবে। এ জন্যে তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার বিষয়টি অধিক গুরত্বপূর্ণ বিবেচনা করলেন এবং তাদের প্রতি একটু বেশি মনোনিবেশ করলেন। এ অবস্থায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাযি. আসলেন। তিনি ছিলেন একজন অন্ধ সাহাবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মসজিদে নববীর মুয়াযযিন নিযুক্ত করে ছিলেন। তিনি এসে তাঁকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, তিনি তো নিজের মানুষ। সবসময়ই তার সঙ্গে সাক্ষাত হয়, কথা হয়, এখন যদি তার সঙ্গে কথা না বলি, কোনো অসুবিধা নেই। পরেও তার মাসআলা বলে দেওয়া যাবে। এই ভেবে তাকে বললেন, তুমি একটু অপেক্ষা করো। এরপর তিনি মুশরিক নেতাদের সঙ্গে এ উদ্দেশ্যে দাওয়াতের কথায় লিপ্ত হলেন যে, তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তাদের সম্প্রদায়ের অন্য সবলোকের ঈমানের রাস্তা খুলে যাবে। ঘটনা ছিলো এতোটুকুই। কিন্তু এতোটুকুর উপরই আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আয়াত নাযিল করলেন,
عَبَسَ وَتَوَلَّى : أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নাম পুরুষরূপে সম্বোধন করে বললেন, 'সে ভ্রুকুঞ্চিত করলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো। কারণ, তার কাছে একজন অন্ধ ব্যক্তি এলো।" (যেন তার এ কাজটি আল্লাহর পছন্দ হয়নি।)
وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى : أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى :
'তুমি কি জানো? হয়তো সেই অন্ধ লোকটি পরিশুদ্ধ হতো, অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশ তার উপকারে আসতো।'
أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى : فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى :
পক্ষান্তরে যে উপেক্ষা করে (এবং দ্বীনের অন্বেষা নিয়ে আপনার নিকট আসেনি, বরং সত্য দ্বীনের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করে) তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছো!
وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى :
'অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না বলে তোমার কোনো দায়িত্ব নেই।' (যখন তার নিজের মধ্যে সত্যের অন্বেষা নেই, বরং সম্পূর্ণ বেপরোয়া। তো এ বিষয়ে তোমার উপর কোনো দায় বর্তাবে না।)
وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى : وَهُوَ يَخْشَى فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَّى :
'অপর দিকে যে লোকটি তোমার কাছে ছুটে আসলো এবং সে অন্তরে আল্লাহর ভয় লালন করে, তাকে তুমি উপেক্ষা করলে।
📄 অন্বেষণকারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত
আল্লাহ এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটু স্নেহপূর্ণ শাসন করেছেন। কারণ এ কথা সুস্পষ্ট যে, তাঁর উদ্দেশ্য কখনো এমন ছিলো না যে, এই লোক দুর্বল আর তারা সবল এ জন্যে একে উপেক্ষা করি এবং তাদেরকে গুরুত্ব দেই। বরং তিনি তো এই হিকমত ও কৌশলের কথা চিন্তা করেছেন যে, এ তো নিজের মানুষ, তার সঙ্গে তো পরেও কথা বলা যাবে। আর তারা এখন এসেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বার পুনরায় আসবে কি না, কে জানে! সুতরাং এ সুযোগে তাদেরকে সত্যের বাণী শুনিয়ে দেই। কিন্তু আল্লাহ পাক এতোটুকুও পছন্দ করেননি। বরং বলে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি দ্বীনের অন্বেষা ও পিপাসা নিয়ে এসেছে, সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে অধিক গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে, যে দ্বীনের তলব ও অন্বেষা ছাড়া বসে আছে। তার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যে অন্বেষা নিয়ে এসেছে তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।
উক্ত আয়াতসমূহে যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো, তাঁর মাধ্যমে তাঁর সকল উম্মতকে এ বিষয়ের প্রতি তাগিদ করা যে, বাহ্যত কোনো মানুষকে সাধারণ দেখলে প্রকৃতপক্ষেও তাকে সাধারণ মনে করো না। কারণ, তোমার তো জানা নেই যে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কতো? সুতরাং তার সঙ্গে সম্মানের আচরণ করো।
টিকাঃ
৫. তাফসীরে ইবনে কাছীর, খন্ডঃ ৪, পৃঃ ৬০৫-৬০৬১১২
৬. 'আবাসা: ১-১০
📄 জান্নাতী এবং জাহান্নামীদের আলোচনা
আল্লামা নববী রহ. এ অধ্যায়ে প্রথমে যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন তা হলো,
عَنْ حَارِثَةَ بْنِ وَهْبٍ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعْفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍ جَوَاظٌ مُسْتَكْبِرٍ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন, আমি কি তোমাদেরকে বলবো, জান্নাতী কে? এরপর বলেন, জান্নাতী ঐ ব্যক্তি, যে দুর্বল এবং মানুষও তাকে দুর্বল মনে করে। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে কিংবা মর্যাদাগতভাবে দুর্বল। দুনিয়ার মানুষও তাকে দুর্বল এবং নিচু মর্যাদার মনে করে। অথচ এই দুর্বল ব্যক্তিটির মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতো বেশি যে, সে যদি আল্লাহর নামে কোনো কসম করে, তাহলে আল্লাহ তার কসম পূর্ণ করে দেন। অর্থাৎ, সে যদি কসম করে বলে যে, অমুক কাজটি এভাবে হতে হবে, তাহলে আল্লাহ তা'আলাও সে কাজটি সেভাবে করে দেন। কারণ, সে আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দা। তাই মহব্বত করে আল্লাহ তাকে এভাবেই মর্যাদা দেন।
টিকাঃ
৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৩৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০৯২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৩০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২০১৯