📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সুন্নাতের উপর আমল করা জরুরী
সহজ সহজ সুন্নাতের উপর আমল করার নাম সুন্নাতের পাবন্দী নয়। সুন্নাতের পাবন্দ হওয়ার জন্যে প্রত্যেক সুন্নাতের উপর আমল করার ফিকির করা উচিৎ। মানুষ যতো অধিক পরিমাণে সুন্নাতের নিকটবর্তী হবে, সমাজ ততো অধিক পরিমাণে ফেত্না-ফাসাদ থেকে মুক্ত হবে। চিন্তা করে এবং পরীক্ষা করে দেখুন! যতো ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে, সব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে দূরে থাকারই অবশ্যম্ভাবী ফল।
وَلَكِنْ يَعْفُوْ وَ يَصْفَحُ 'বরং তিনি ক্ষমা করে দেন এবং ছাড় দেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ তো ছিলো, যে যাই বলুক না কেন তিনি কোনো জবাব দিতেন না। আল্লাহর ওলীগণও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর পন্থা অনুসরণ করতেন। কামনা করি, আল্লাহ আমাদেরকেও এর কিছু অংশ দান করুন। আমীন।
এ কথাগুলো এ জন্যে আরয করছি যে, আমরা সকলে মূলত একই নৌকার আরোহী। এখন আমাদের নিজেদেরও জানা নেই যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কোথা থেকে কোথায় গন্তব্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখানে বসার উদ্দেশ্য হলো, কিছু সময়ের জন্যে হলেও সুন্নাতের কথা স্মরণ হবে। এতে আশা করি অন্তরে সুন্নাতের উপর আমল করার প্রেরণা তৈরী হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার উপর আমল করার তাওফীক দান করবেন। সকল সুন্নাতের উপর আমল করার অভ্যাস গড়ন। এ জন্যে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। মনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের গন্তব্যে উপনীত হতে হলে এ তিক্ত ঢোক গিলতেই হবে।
📄 আল্লাহর নিকট প্রিয়তম ঢোক
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ যতো ঢোক গেলে তার মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো ক্রোধের ঢোক, যার দ্বারা বান্দা তার রাগ হজম করে।
অর্থাৎ, মানুষের যখন রাগ উঠে এবং রাগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্যের ক্ষতি করে ফেলার আশঙ্কা করে, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সেই রাগ হজম করে নেওয়া এবং রাগের চাহিদা অনুসারে কাজ না করা আল্লাহর নিকট অনেক প্রিয় কাজ। এমন লোকদের প্রশংসায় কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ 'আর যারা ক্রোধ হজম করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।
টিকাঃ
৯. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৮৬০
১০. আল ইমরান: ১৩৪
📄 আল্লাহর নিকট ধৈর্যশীলদের প্রতিদান
অর্থাৎ, তাদের যখন ক্রোধ জাগে এবং প্রতিশোধ স্পৃহা জ্বলে ওঠে- যদিও সীমার ভিতর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি শরীয়ত দিয়েছে- কিন্তু তখন তারা ভাবে, প্রতিশোধ নিলে কী লাভ হবে? মনে করো, তোমাকে কেউ একটা থাপ্পড় মারলো। তুমি যদি তার প্রতিশোধে একটা থাপ্পড় মেরে দাও, তাতে তোমার কী লাভ হবে? পক্ষান্তরে তুমি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাকে ক্ষমা করে দাও, তাহলে তার কতো বড়ো প্রতিদান পাবে!
উপরোক্ত আমলের ফল হবে এই,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّبِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ 'নিঃসন্দেহে ধৈর্যশীলদেরকে আল্লাহ বেহিসাব প্রতিদান দিবেন।'
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দিতে অভ্যস্ত, তার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, সে আমার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছে, আমি তো তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার আরো বেশি অধিকার রাখি। এই বলে আল্লাহ এমন ব্যক্তির গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।
টিকাঃ
১১. যুমার: ১০
📄 ক্ষমা ও ধৈর্যের একটি আদর্শ ঘটনা
হযরত মুআবিয়া রাযি.-এর জামানায় দুই ব্যক্তির পরস্পরে ঝগড়া লাগলো। তাতে একজনের দাঁত ভেঙ্গে গেলো। যার দাঁত ভেঙ্গে গেলো, সে অপরজনকে হযরত মুআবিয়া রাযি.-এর কাছে ধরে নিয়ে এলো। এসে বললো, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত চাই। আপনি আমার দাঁতের 'কিসাস' দিয়ে দিন।
হযরত মুআবিয়া রাযি. বললেন, ঠিক আছে, তোমার 'কিসাস' নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু এতে তোমার কী লাভ হবে? তোমার দাঁত তো ভেঙ্গেই গিয়েছে। এখন তার দাঁত ভেঙ্গে তোমার কী লাভ হবে? তার চেয়ে বরং সমঝোতা করে তার কাছ থেকে দাঁতের 'দিয়্যাত' নিয়ে নাও। সে বললো, না আমি দাঁতের বদলে দাঁত চাই। হযরত মুআবিয়া রাযি. তাকে আবার বোঝালেন, কিন্তু সে তা মানলো না। অবশেষে তিনি বললেন, ঠিক আছে, চলো তার দাঁত ভেঙ্গে দিচ্ছি।
রাস্তায় হযরত আবুদ দারদা রাযি. বসা ছিলেন। তিনি ছিলেন অনেক বড়ো মাপের সাহাবী। তিনি বললেন, দেখো ভাই! 'কিসাস' তো নিতে যাচ্ছো, তবে একটি কথা শুনে যাও। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কেউ যদি কাউকে কষ্ট দেয় এবং সে তাকে ক্ষমা করে দেয় তাহলে এই ক্ষমাকারীকে আল্লাহ তখন ক্ষমা করে দিবেন, যখন সে (পরকালে) ক্ষমার প্রতি সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী হবে। ইতিপূর্বে লোকটি দাঁতের বিনিময়ে পয়সা নিতেও সম্মত ছিলো না, কিন্তু সে এ কথা শুনে হযরত আবুদ দারদা রাযি.-কে জিজ্ঞাসা করলো,
أَأَنْتَ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'আপনি কি নিজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কথা শুনেছেন?'
তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আমি নিজে শুনেছি এবং আমার এই কানগুলো শুনেছে। তখন সে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এ কথা বলে থাকেন তাহলে আমি কোনো বিনিময় ছাড়াই তাকে ক্ষমা করে দিলাম。
টিকাঃ
১২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩১৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৬৮৩