📄 মাওলানা রফীউদ্দীন রহ.-এর ঘটনা
হযরত মাওলানা রফীউদ্দিন রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন। অত্যাশ্চর্য বুযুর্গ ছিলেন। দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম মানে সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী। তিনি একটি গাভী পালন করতেন। একবার তিনি গাভী নিয়ে আসছেন। পথিমধ্যে মাদরাসার কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি গাভী নিয়েই মাদরাসায় চলে আসেন। গাভীটি মাদরাসার মাঠে গাছের সঙ্গে বেঁধে তিনি দপ্তরে যান। এমতাবস্থায় দেওবন্দের এক লোক মাদরাসায় এসে খুব হৈ-চৈ শুরু করে দেয়। এ গাভী কার? এখানে গাভী বেঁধেছে কে? লোকেরা বললো, এটা মুহতামিম ছাহেবের গাভী। এরপর সে বলতে লাগলো- ও! মাদরাসা মুহতামিম ছাহেবের কসাইখানা হয়েছে বুঝি! মাদরাসাকে উনি এমনভাবে খাওয়া আরম্ভ করেছেন যে, এখন এটাকে গোয়াল ঘর বানিয়েছেন! তার হৈ-চৈ শুনে সেখানে মানুষের জটলা হয়ে গেলো এবং বিভিন্ন অপবাদ শুরু হয়ে গেলো। হযরত দপ্তরে কাজ করছেন। আওয়াজ শুনে বের হলেন যে, কি ঘটনা? লোকেরা বললো, হযরত মাদরাসায় গাভী বাঁধার কারণে এ লোক খুব অসন্তুষ্ট হয়েছে। হযরত বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। এ মাদরাসা আল্লাহর। এখানে আমার গাভী বাঁধা ঠিক হয়নি। কারণ, গাভী আমার ব্যক্তিগত জিনিস, আর মাঠটি হলো মাদরাসার। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি এই ভুলের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আর আমার মন চাচ্ছে এই ভুলের কাফফারা হিসেবে আপনি গাভীটি নিয়ে যান। এ আল্লাহর বান্দাও এমন ছিলো যে, সে গাভী নিয়ে রওয়ানা দিলো। দেখুন! যেখানে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাধারণ মানুষ সবার সামনে এভাবে উচ্চ-বাচ্য করলো, সেখানে তাকে কিছু তো বলা হলো না। উল্টো গাভীটিও তাকে দিয়ে দেওয়া হলো। এটাই হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। لَا يَدْفَعُ السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ 'মন্দকে মন্দ দ্বারা প্রতিহত না করা'র উপর আমল।
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সুন্নাতের উপর আমল করা জরুরী
সহজ সহজ সুন্নাতের উপর আমল করার নাম সুন্নাতের পাবন্দী নয়। সুন্নাতের পাবন্দ হওয়ার জন্যে প্রত্যেক সুন্নাতের উপর আমল করার ফিকির করা উচিৎ। মানুষ যতো অধিক পরিমাণে সুন্নাতের নিকটবর্তী হবে, সমাজ ততো অধিক পরিমাণে ফেত্না-ফাসাদ থেকে মুক্ত হবে। চিন্তা করে এবং পরীক্ষা করে দেখুন! যতো ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে, সব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে দূরে থাকারই অবশ্যম্ভাবী ফল।
وَلَكِنْ يَعْفُوْ وَ يَصْفَحُ 'বরং তিনি ক্ষমা করে দেন এবং ছাড় দেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ তো ছিলো, যে যাই বলুক না কেন তিনি কোনো জবাব দিতেন না। আল্লাহর ওলীগণও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর পন্থা অনুসরণ করতেন। কামনা করি, আল্লাহ আমাদেরকেও এর কিছু অংশ দান করুন। আমীন।
এ কথাগুলো এ জন্যে আরয করছি যে, আমরা সকলে মূলত একই নৌকার আরোহী। এখন আমাদের নিজেদেরও জানা নেই যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কোথা থেকে কোথায় গন্তব্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখানে বসার উদ্দেশ্য হলো, কিছু সময়ের জন্যে হলেও সুন্নাতের কথা স্মরণ হবে। এতে আশা করি অন্তরে সুন্নাতের উপর আমল করার প্রেরণা তৈরী হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার উপর আমল করার তাওফীক দান করবেন। সকল সুন্নাতের উপর আমল করার অভ্যাস গড়ন। এ জন্যে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। মনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের গন্তব্যে উপনীত হতে হলে এ তিক্ত ঢোক গিলতেই হবে।
📄 আল্লাহর নিকট প্রিয়তম ঢোক
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ যতো ঢোক গেলে তার মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো ক্রোধের ঢোক, যার দ্বারা বান্দা তার রাগ হজম করে।
অর্থাৎ, মানুষের যখন রাগ উঠে এবং রাগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্যের ক্ষতি করে ফেলার আশঙ্কা করে, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সেই রাগ হজম করে নেওয়া এবং রাগের চাহিদা অনুসারে কাজ না করা আল্লাহর নিকট অনেক প্রিয় কাজ। এমন লোকদের প্রশংসায় কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ 'আর যারা ক্রোধ হজম করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।
টিকাঃ
৯. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৮৬০
১০. আল ইমরান: ১৩৪
📄 আল্লাহর নিকট ধৈর্যশীলদের প্রতিদান
অর্থাৎ, তাদের যখন ক্রোধ জাগে এবং প্রতিশোধ স্পৃহা জ্বলে ওঠে- যদিও সীমার ভিতর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি শরীয়ত দিয়েছে- কিন্তু তখন তারা ভাবে, প্রতিশোধ নিলে কী লাভ হবে? মনে করো, তোমাকে কেউ একটা থাপ্পড় মারলো। তুমি যদি তার প্রতিশোধে একটা থাপ্পড় মেরে দাও, তাতে তোমার কী লাভ হবে? পক্ষান্তরে তুমি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাকে ক্ষমা করে দাও, তাহলে তার কতো বড়ো প্রতিদান পাবে!
উপরোক্ত আমলের ফল হবে এই,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّبِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ 'নিঃসন্দেহে ধৈর্যশীলদেরকে আল্লাহ বেহিসাব প্রতিদান দিবেন।'
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দিতে অভ্যস্ত, তার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, সে আমার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছে, আমি তো তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার আরো বেশি অধিকার রাখি। এই বলে আল্লাহ এমন ব্যক্তির গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।
টিকাঃ
১১. যুমার: ১০