📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ 📄 মন্দের প্রতি-উত্তরে সদাচরণ

📄 মন্দের প্রতি-উত্তরে সদাচরণ


এটিও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক বড়ো একটা সুন্নাত। আজকাল আমরা সুন্নাতকে কিছু বাহ্যিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছি। যেমন মেসওয়াক করা, দাড়ি রাখা এবং বাহ্যিক বেশ-ভূষা সুন্নাত মোতাবেক করাকেই সুন্নাত মনে করি। এগুলো সুন্নাত ঠিক আছে এবং যে এগুলো অস্বীকার করবে, সে সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ। তবে সুন্নাত শুধু এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, লেনদেন ও আচার-আচরণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে কর্মপদ্ধতি রয়েছে, সেগুলোও সুন্নাতের অনেক বড়ো একটি অংশ এবং যে পরিমাণ গুরুত্বের সঙ্গে অন্যান্য সুন্নাতের উপর আমল করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে এসব সুন্নাতের উপর আমল করা উচিৎ। মন্দের প্রতি-উত্তর মন্দ দ্বারা দেবো না, বরং মন্দের প্রতি-উত্তর সুন্নাত মোতাবেক সদাচরণ দ্বারা দেবো। এবার আমরা আমাদের জীবনের পাতায় একটু চোখ বুলিয়ে দেখতে পারি যে, আমরা এই সুন্নাতের উপর কতোটুকু আমল করছি। আমার সাথে কেউ অসদাচরণ করলে তার প্রতিশোধ স্পৃহা আমার অন্তরে কীভাবে জমতে থাকে এবং তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে কী পরিমাণ চেষ্টা করি। চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের বর্তমান সমাজের অধঃপতনের বড়ো একটা কারণ হলো, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সুন্নাতটি ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চিন্তা করি যে, যখন আমার সাথে খারাপ করেছে, আমিও তার সাথে খারাপ করবো। যে আমাকে গালি দিবে, আমিও তাকে গালি দেবো। সে আমার বিয়েতে যেমন উপহার দিয়েছে, আমিও তাকে তেমন উপহারই দেবো। সে যদি আমার বিয়েতে কোনো উপহার না দিয়ে থাকে, তাহলে আমিও তাকে দেবো না। এমন করার অর্থই হলো, এগুলো প্রতিদান দেওয়ার জন্যে করা হয়। আর যে শুধু প্রতিদান দেয়, সে কখনো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী হয় না। হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَا فِي وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا انْقَطَعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا 'আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ঐ ব্যক্তি নয়, যে ব্যক্তি প্রতিদান দেয়, বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ঐ ব্যক্তি, যার সঙ্গে আত্মীয়তা ছিন্ন করলে এবং আত্মীয়ের হক আদায় না করলে তবুও সে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে না, বরং তাদের সঙ্গে সদাচরণ করে।'

টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৩২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৩১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৪৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬২৩৮

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ 📄 হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ.-এর অত্যাশ্চর্য ঘটনা

📄 হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ.-এর অত্যাশ্চর্য ঘটনা


একদিন হযরত আরেফী রহ. তাঁর ভক্ত-মুরীদদের সঙ্গে ঘরে বসে ছিলেন। হঠাৎ হযরতের এক আত্মীয় এসে উপস্থিত হলেন। তার দাড়ি-মোচ সব মুণ্ডানো। দরজায় এসেই সে গালি-গালাজ শুরু করে দিলো। নিতান্তই বেয়াদবের মতো গাল-মন্দের যতো শব্দ তার জানা ছিলো, একাধারে সব বলতে থাকলো। এদিকে তার প্রত্যেক কথার জবাবে হযরত বলে যাচ্ছিলেন, ভাই আমাদের ভুল হয়ে গিয়েছে, আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। সামনে এ ভুলের ক্ষতিপূরণ করে দেবো। তোমার পায়ে ধরি, তুমি ক্ষমা করে দাও। অবশেষে হযরতের বিনয়ী আচরণে তার এই অগ্নিশর্মা রাগ ঠান্ডা হলো।
পরে বললেন, আল্লাহর এ বান্দার কাছে কোনো ভুল তথ্য পৌঁছে ছিলো। এ কারণেই সে এভাবে রাগ হয়েছে। আমি ইচ্ছা করলে তার জবাব দিতে পারতাম এবং তার গাল-মন্দেরও প্রতিশোধ নিতে পারতাম। কিন্তু আমি তাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করেছি। কারণ, যতো হোক সে আমার আত্মীয়। আত্মীয়ের অনেক অধিকার আছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা অনেক সহজ। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত শিক্ষা হলো, আত্মীয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আর এটাই হলো,
لَا يَدْفَعُ السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ
মন্দের প্রতিউত্তর মন্দ দ্বারা না দেওয়া, বরং আদর-সোহাগ এবং মহব্বত ও কল্যাণকামনা দ্বারা দেওয়া।

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ 📄 মাওলানা রফীউদ্দীন রহ.-এর ঘটনা

📄 মাওলানা রফীউদ্দীন রহ.-এর ঘটনা


হযরত মাওলানা রফীউদ্দিন রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন। অত্যাশ্চর্য বুযুর্গ ছিলেন। দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম মানে সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী। তিনি একটি গাভী পালন করতেন। একবার তিনি গাভী নিয়ে আসছেন। পথিমধ্যে মাদরাসার কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি গাভী নিয়েই মাদরাসায় চলে আসেন। গাভীটি মাদরাসার মাঠে গাছের সঙ্গে বেঁধে তিনি দপ্তরে যান। এমতাবস্থায় দেওবন্দের এক লোক মাদরাসায় এসে খুব হৈ-চৈ শুরু করে দেয়। এ গাভী কার? এখানে গাভী বেঁধেছে কে? লোকেরা বললো, এটা মুহতামিম ছাহেবের গাভী। এরপর সে বলতে লাগলো- ও! মাদরাসা মুহতামিম ছাহেবের কসাইখানা হয়েছে বুঝি! মাদরাসাকে উনি এমনভাবে খাওয়া আরম্ভ করেছেন যে, এখন এটাকে গোয়াল ঘর বানিয়েছেন! তার হৈ-চৈ শুনে সেখানে মানুষের জটলা হয়ে গেলো এবং বিভিন্ন অপবাদ শুরু হয়ে গেলো। হযরত দপ্তরে কাজ করছেন। আওয়াজ শুনে বের হলেন যে, কি ঘটনা? লোকেরা বললো, হযরত মাদরাসায় গাভী বাঁধার কারণে এ লোক খুব অসন্তুষ্ট হয়েছে। হযরত বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। এ মাদরাসা আল্লাহর। এখানে আমার গাভী বাঁধা ঠিক হয়নি। কারণ, গাভী আমার ব্যক্তিগত জিনিস, আর মাঠটি হলো মাদরাসার। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি এই ভুলের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আর আমার মন চাচ্ছে এই ভুলের কাফফারা হিসেবে আপনি গাভীটি নিয়ে যান। এ আল্লাহর বান্দাও এমন ছিলো যে, সে গাভী নিয়ে রওয়ানা দিলো। দেখুন! যেখানে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাধারণ মানুষ সবার সামনে এভাবে উচ্চ-বাচ্য করলো, সেখানে তাকে কিছু তো বলা হলো না। উল্টো গাভীটিও তাকে দিয়ে দেওয়া হলো। এটাই হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। لَا يَدْفَعُ السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ 'মন্দকে মন্দ দ্বারা প্রতিহত না করা'র উপর আমল।

📘 ইসলামী মু'আশারাত পরস্পরের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার সুন্দর ও সুখী সমাজ 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সুন্নাতের উপর আমল করা জরুরী

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সুন্নাতের উপর আমল করা জরুরী


সহজ সহজ সুন্নাতের উপর আমল করার নাম সুন্নাতের পাবন্দী নয়। সুন্নাতের পাবন্দ হওয়ার জন্যে প্রত্যেক সুন্নাতের উপর আমল করার ফিকির করা উচিৎ। মানুষ যতো অধিক পরিমাণে সুন্নাতের নিকটবর্তী হবে, সমাজ ততো অধিক পরিমাণে ফেত্না-ফাসাদ থেকে মুক্ত হবে। চিন্তা করে এবং পরীক্ষা করে দেখুন! যতো ফেৎনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়েছে, সব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে দূরে থাকারই অবশ্যম্ভাবী ফল।
وَلَكِنْ يَعْفُوْ وَ يَصْفَحُ 'বরং তিনি ক্ষমা করে দেন এবং ছাড় দেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ তো ছিলো, যে যাই বলুক না কেন তিনি কোনো জবাব দিতেন না। আল্লাহর ওলীগণও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর পন্থা অনুসরণ করতেন। কামনা করি, আল্লাহ আমাদেরকেও এর কিছু অংশ দান করুন। আমীন।
এ কথাগুলো এ জন্যে আরয করছি যে, আমরা সকলে মূলত একই নৌকার আরোহী। এখন আমাদের নিজেদেরও জানা নেই যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কোথা থেকে কোথায় গন্তব্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখানে বসার উদ্দেশ্য হলো, কিছু সময়ের জন্যে হলেও সুন্নাতের কথা স্মরণ হবে। এতে আশা করি অন্তরে সুন্নাতের উপর আমল করার প্রেরণা তৈরী হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার উপর আমল করার তাওফীক দান করবেন। সকল সুন্নাতের উপর আমল করার অভ্যাস গড়ন। এ জন্যে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। মনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের গন্তব্যে উপনীত হতে হলে এ তিক্ত ঢোক গিলতেই হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية