📄 তাওরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলীর উল্লেখ
হযরত আতা ইবনে ইয়াসারের আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. বললেন,
وَاللَّهِ إِنَّهُ لَمَوْصُوفٌ فِي التَّوْرَاهِ بِبَعْضٍ صِفَتِهِ فِي الْقُرْآنِ 'আল্লাহর কসম! তাওরাতে তাঁর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত হয়েছে, যা কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে।' এরপর তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলায়াত করলেন,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَاهِدًا وَ مُبَشِّرًا وَ نَذِيرًا 'হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষ্যদানকারী, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করেছি।'
شَاهِدًا 'সাক্ষী'- অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আপনি এ কথার সাক্ষ্য দিবেন যে, এ উম্মতকে আল্লাহর তাওহীদের পয়গাম পৌঁছানো হয়ে ছিলো। তারপর অমুক লোকেরা তা মেনে নিয়েছে, আর অমুক লোকেরা তা মেনে নেয়নি।
مُبَشِّرًا 'সুসংবাদদাতা' - অর্থাৎ, তিনি ঈমানদারদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবেন।
نَذِيرًا 'ভীতিপ্রদর্শনকারী'- অর্থাৎ, গোনাহগার ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের ভীতিপ্রদর্শন করবেন।
হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. উক্ত আয়াত তেলাওয়াতের পর তাওরাতের বক্তব্য পড়ে শোনালেন,
وَحِرْزًا لِلْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মী লোকদের মুক্তিদাতা হয়ে আগমন করবেন। 'উম্মী' শব্দটি বিশেষত আরবদের জন্যে উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কারণ, তাদের মধ্যে লেখা-পড়ার প্রচলন ছিলো না। এ বিষয়টিই তাওরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
এরপর তাওরাতে এসেছে,
أَنْتَ عَبْدِي وَرَسُولَى
আল্লাহ বলছেন, হে নবী মুহাম্মাদ! আপনি আমার বান্দা ও রাসূল।
سَمَّيْتُكَ الْمُتَوَكَّلُ
'আমি আপনার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল' অর্থাৎ, আল্লাহর উপর ভরসাকারী।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো গুণ আলোচিত হয়েছে এভাবে,
لَيْسَ بِفَظٍ وَلَا غَلِيْظٍ 'তিনি শক্ত কথা বলেন না এবং রূঢ় স্বভাবের নন।'
وَلَا سَخَابِ فِي الْأَسْوَاقِ 'এবং তিনি বাজারে শোর-গোলকারীও নন।'
وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ 'তিনি মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা দিবেন না।'
وَلَكِنْ يَعْفُو وَ يَصْفَحُ 'বরং ক্ষমা করে দিবেন এবং ছাড় দিবেন।'
وَلَنْ يَقْبِضَهُ اللَّهُ تَعَالَى حَتَّى يُقِيمَ بِهِ الْمِلَّةَ الْعَوْجَاءَ بِأَنْ يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
টিকাঃ
৭. আহযাব: ৪৫
📄 তাওরাতের হিব্রু ভাষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য
'আর এই বক্র জাতিকে ঠিক না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন না। অর্থাৎ, তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' স্বীকার করার আগে আল্লাহ তাকে মৃত্যু দিবেন না।'
فَيَفْتَحُ بِهَا أَعْيُنَا عُمْيًا وَإِذَا نَا صُفًّا وَقُلُوبًا غُلْفًا
'অতপর আল্লাহ এই কালেমার বদৌলতে অন্ধ চোখসমূহ, বধির কানসমূহ এবং পর্দাবৃত অন্তরসমূহ খুলে দিবেন।'
উপরোক্ত এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের আলোচনা প্রায় হুবহু শব্দে আজো তাওরাতে বিদ্যমান রয়েছে।
প্রত্যেক ভাষার রীতি ও বাক-শৈলী ভিন্ন। মূল তাওরাত ছিলো হিব্রু ভাষায়। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, উর্দু বাকরীতি অনুসারে তার অনুবাদ করলে বলা যায়,
وہ مسلے ہوئے سرکنڈے کو نہ توڑے گا، ٹمٹماتی ہوئی بتی کو نہ بجھائے گا
হিব্রু ভাষারীতি অনুযায়ী এভাবে অনুবাদ করা হয়, 'তিনি মন্দের প্রতিদান মন্দ দিয়ে দিবেন না, বরং ক্ষমা ও ছাড়ের দৃষ্টিতে দেখবেন এবং তাঁর সামনে পাথরের মূর্তিগুলো সব উপুড় হয়ে পড়ে যাবে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা বিজয় করেছিলেন, তখন এ ঘটনা ঘটেছিলো। কাবা ও তার আশপাশে যতো মূর্তি স্থাপিত ছিলো, সব তার সামনে উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিলো। 'বাইবেল সে কুরআন তক' নামে 'ইযহারুল হক'-এর যে অনুবাদ আমি করেছি, তার তৃতীয় খন্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়টি এ জাতীয় সুসংবাদ দ্বারাই পরিপূর্ণ। সেখানে আমি দুই কলাম বানিয়ে প্রথম কলামে বাইবেলের বক্তব্য এবং দ্বিতীয় কলামে কুরআন ও হাদীসের বিবরণ তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্যগুলো কুরআন-হাদীসে এসেছে, সেগুলো বাইবেলেও এসেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বাইবেলের এতো বিকৃতি সত্ত্বেও আজো বাইবেলে তা বিদ্যমান রয়েছে।
📄 উক্ত হাদীস দ্বারা ইমাম বোখারী রহ.-এর উদ্দেশ্য
যে উদ্দেশ্যে ইমাম বোখারী রহ. তাঁর কিতাবে উক্ত হাদীসটি এনেছেন তা হলো, পূর্বেকার আসমানী কিতাবসমূহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, সেগুলো উল্লেখ করা। বিশেষ করে সে সব ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে কোনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্বপূর্ণ, তার বিবরণ দেওয়া।
সে বৈশিষ্ট্য হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্ত কথা বলেন না, তিনি রূঢ় স্বভাবের নন এবং তিনি মন্দের প্রতিকার মন্দ দিয়ে করেন না।
এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি সুন্নাত। যদিও কুরআনে কারীমে অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে, কেউ তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তার সম পরিমাণ প্রতিশোধ তুমিও নিতে পারো। কেউ যদি তোমাকে একটা থাপ্পড় দেয়, তাহলে তুমিও সমপরিমাণ থাপ্পড় দিতে পারো। কিন্তু তার চেয়ে বেশি দিতে পারবে না। তবে প্রতিশোধ গ্রহণের অনুমতি ভিন্ন বিষয়, আর সুন্নাত ভিন্ন বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুরো জীবনে কারো থেকে কখনো নিজের জন্যে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
📄 মন্দের প্রতি-উত্তরে সদাচরণ
এটিও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক বড়ো একটা সুন্নাত। আজকাল আমরা সুন্নাতকে কিছু বাহ্যিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছি। যেমন মেসওয়াক করা, দাড়ি রাখা এবং বাহ্যিক বেশ-ভূষা সুন্নাত মোতাবেক করাকেই সুন্নাত মনে করি। এগুলো সুন্নাত ঠিক আছে এবং যে এগুলো অস্বীকার করবে, সে সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ। তবে সুন্নাত শুধু এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, লেনদেন ও আচার-আচরণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে কর্মপদ্ধতি রয়েছে, সেগুলোও সুন্নাতের অনেক বড়ো একটি অংশ এবং যে পরিমাণ গুরুত্বের সঙ্গে অন্যান্য সুন্নাতের উপর আমল করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে এসব সুন্নাতের উপর আমল করা উচিৎ। মন্দের প্রতি-উত্তর মন্দ দ্বারা দেবো না, বরং মন্দের প্রতি-উত্তর সুন্নাত মোতাবেক সদাচরণ দ্বারা দেবো। এবার আমরা আমাদের জীবনের পাতায় একটু চোখ বুলিয়ে দেখতে পারি যে, আমরা এই সুন্নাতের উপর কতোটুকু আমল করছি। আমার সাথে কেউ অসদাচরণ করলে তার প্রতিশোধ স্পৃহা আমার অন্তরে কীভাবে জমতে থাকে এবং তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে কী পরিমাণ চেষ্টা করি। চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের বর্তমান সমাজের অধঃপতনের বড়ো একটা কারণ হলো, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সুন্নাতটি ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চিন্তা করি যে, যখন আমার সাথে খারাপ করেছে, আমিও তার সাথে খারাপ করবো। যে আমাকে গালি দিবে, আমিও তাকে গালি দেবো। সে আমার বিয়েতে যেমন উপহার দিয়েছে, আমিও তাকে তেমন উপহারই দেবো। সে যদি আমার বিয়েতে কোনো উপহার না দিয়ে থাকে, তাহলে আমিও তাকে দেবো না। এমন করার অর্থই হলো, এগুলো প্রতিদান দেওয়ার জন্যে করা হয়। আর যে শুধু প্রতিদান দেয়, সে কখনো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী হয় না। হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَا فِي وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا انْقَطَعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا 'আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ঐ ব্যক্তি নয়, যে ব্যক্তি প্রতিদান দেয়, বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ঐ ব্যক্তি, যার সঙ্গে আত্মীয়তা ছিন্ন করলে এবং আত্মীয়ের হক আদায় না করলে তবুও সে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে না, বরং তাদের সঙ্গে সদাচরণ করে।'
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৩২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৩১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৪৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬২৩৮