📄 তাওরাতে এখনো কিতাবুল্লাহর আলো বিচ্ছুরিত হয়
তাওরাত যদিও এখন পরিপূর্ণ আগের মতো নেই। অনেকাংশই ইহুদীরা বিকৃত করে ফেলেছে। অনেক সংযোজন বিয়োজন করেছে। কিন্তু তথাপিও অনেক জায়গা থেকে এখনো কিতাবুল্লাহর আলো বিচ্ছুরিত হয়।
তাই এখনো তাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমণের সুসংবাদ এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলীর কথা বিদ্যমান রয়েছে। যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় আরো অনেক সুস্পষ্ট ছিলো। এ জন্যে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
الَّذِينَ آتَيْنَهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ
'ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনভাবে চেনে, যেমন তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চেনে।'
কারণ, তাওরাতে আখেরী নবীর বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিত উল্লিখিত ছিলো। তিনি কেমন গুণাবলীর অধিকারী হবেন, তাঁর অবয়ব কেমন হবে এবং তিনি কোন শহরে ও কোন গোত্রে জন্মগ্রহণ করবেন ইত্যাদি সব উল্লেখ ছিলো। ফলে যারা ঐ সব কিতাবের আলেম ছিলো, তারা স্বচক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে আখেরী নবীর সকল নিদর্শন দেখেও একগুঁয়েমি, গোঁড়ামি ও হঠকারিতার কারণে তাঁকে মেনে নিতো না। হযরত আতা ইবনে ইয়াসার রাযি. বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি.-এর সঙ্গে যখন আমার সাক্ষাত হলো, তখন তাকে বললাম, আপনি তো তাওরাত পড়েছেন। তাওরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আছে, তা আমাদেরকে বলুন।
📄 বাইবেল বনাম কুরআন
এ সব কিতাব এতো পরিবর্তন করা সত্ত্বেও সেগুলোর কোনো কোনো অংশ এমন মনে হয়, যেন হুবহু কুরআনের অনুবাদ। তাদের প্রসিদ্ধ কিতাব বাইবেল, যাকে 'কিতাবে মুকাদ্দাস'ও বলা হয়। ইহুদী ও খৃষ্টান উভয়েই এ কিতাব মানে। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সুসংবাদ আজও বিদ্যমান আছে। এই মুহূর্তে তাওরাতের একটি বাক্য আমার মনে পড়লো। বাক্যটি হলো,
(অনুবাদ) 'যিনি 'ফারান' থেকে উদিত হবেন। 'সালাহে'র অধিবাসীরা গীত গাইবে। 'কায়দার'-এর জনপদগুলো প্রশংসা করবে।'
'ফারান' ঐ পাহাড়ের নাম, যাতে হেরা গুহা অবস্থিত। 'সালাহ' ঐ পাহাড়ের নাম, যার একাংশ 'সানিয়্যাতুল ওয়াদা'। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের সময় মদীনার শিশুরা যেখানে দাঁড়িয়ে এই গীত গেয়ে স্বাগত জানিয়েছিলো,
طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوَدَاعِ
'সানিয়্যাতুল ওয়াদা' থেকে আমাদের উপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে।
আর 'কায়দার' হলো, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ছেলের নাম। তাঁর বংশধারা আরবের বিভিন্ন জনপদ আবাদ করেছে। সে দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশে যখন শেষ নবীর আগমন ঘটবে, তখন কায়দারের জনপদগুলো তার প্রশংসা করবে।
টিকাঃ
৫. বাকারাহ: ১৪৬
৬. আররিয়াজুন নাদরাহ ফি মানাকিবিল আশারা, খন্ডঃ ১, পৃঃ ৫৬, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, খন্ড। ২, পৃঃ ৩৬৩, হাদীস নং ৭৫৩, আসীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে কাসীরকৃত, খন্ডঃ ২, পৃঃ ২৬৯
📄 তাওরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলীর উল্লেখ
হযরত আতা ইবনে ইয়াসারের আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. বললেন,
وَاللَّهِ إِنَّهُ لَمَوْصُوفٌ فِي التَّوْرَاهِ بِبَعْضٍ صِفَتِهِ فِي الْقُرْآنِ 'আল্লাহর কসম! তাওরাতে তাঁর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত হয়েছে, যা কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে।' এরপর তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলায়াত করলেন,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَاهِدًا وَ مُبَشِّرًا وَ نَذِيرًا 'হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষ্যদানকারী, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করেছি।'
شَاهِدًا 'সাক্ষী'- অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আপনি এ কথার সাক্ষ্য দিবেন যে, এ উম্মতকে আল্লাহর তাওহীদের পয়গাম পৌঁছানো হয়ে ছিলো। তারপর অমুক লোকেরা তা মেনে নিয়েছে, আর অমুক লোকেরা তা মেনে নেয়নি।
مُبَشِّرًا 'সুসংবাদদাতা' - অর্থাৎ, তিনি ঈমানদারদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবেন।
نَذِيرًا 'ভীতিপ্রদর্শনকারী'- অর্থাৎ, গোনাহগার ও কাফেরদেরকে জাহান্নামের ভীতিপ্রদর্শন করবেন।
হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. উক্ত আয়াত তেলাওয়াতের পর তাওরাতের বক্তব্য পড়ে শোনালেন,
وَحِرْزًا لِلْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মী লোকদের মুক্তিদাতা হয়ে আগমন করবেন। 'উম্মী' শব্দটি বিশেষত আরবদের জন্যে উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কারণ, তাদের মধ্যে লেখা-পড়ার প্রচলন ছিলো না। এ বিষয়টিই তাওরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
এরপর তাওরাতে এসেছে,
أَنْتَ عَبْدِي وَرَسُولَى
আল্লাহ বলছেন, হে নবী মুহাম্মাদ! আপনি আমার বান্দা ও রাসূল।
سَمَّيْتُكَ الْمُتَوَكَّلُ
'আমি আপনার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল' অর্থাৎ, আল্লাহর উপর ভরসাকারী।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো গুণ আলোচিত হয়েছে এভাবে,
لَيْسَ بِفَظٍ وَلَا غَلِيْظٍ 'তিনি শক্ত কথা বলেন না এবং রূঢ় স্বভাবের নন।'
وَلَا سَخَابِ فِي الْأَسْوَاقِ 'এবং তিনি বাজারে শোর-গোলকারীও নন।'
وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَةَ بِالسَّيِّئَةِ 'তিনি মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা দিবেন না।'
وَلَكِنْ يَعْفُو وَ يَصْفَحُ 'বরং ক্ষমা করে দিবেন এবং ছাড় দিবেন।'
وَلَنْ يَقْبِضَهُ اللَّهُ تَعَالَى حَتَّى يُقِيمَ بِهِ الْمِلَّةَ الْعَوْجَاءَ بِأَنْ يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
টিকাঃ
৭. আহযাব: ৪৫
📄 তাওরাতের হিব্রু ভাষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য
'আর এই বক্র জাতিকে ঠিক না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন না। অর্থাৎ, তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' স্বীকার করার আগে আল্লাহ তাকে মৃত্যু দিবেন না।'
فَيَفْتَحُ بِهَا أَعْيُنَا عُمْيًا وَإِذَا نَا صُفًّا وَقُلُوبًا غُلْفًا
'অতপর আল্লাহ এই কালেমার বদৌলতে অন্ধ চোখসমূহ, বধির কানসমূহ এবং পর্দাবৃত অন্তরসমূহ খুলে দিবেন।'
উপরোক্ত এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের আলোচনা প্রায় হুবহু শব্দে আজো তাওরাতে বিদ্যমান রয়েছে।
প্রত্যেক ভাষার রীতি ও বাক-শৈলী ভিন্ন। মূল তাওরাত ছিলো হিব্রু ভাষায়। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, উর্দু বাকরীতি অনুসারে তার অনুবাদ করলে বলা যায়,
وہ مسلے ہوئے سرکنڈے کو نہ توڑے گا، ٹمٹماتی ہوئی بتی کو نہ بجھائے گا
হিব্রু ভাষারীতি অনুযায়ী এভাবে অনুবাদ করা হয়, 'তিনি মন্দের প্রতিদান মন্দ দিয়ে দিবেন না, বরং ক্ষমা ও ছাড়ের দৃষ্টিতে দেখবেন এবং তাঁর সামনে পাথরের মূর্তিগুলো সব উপুড় হয়ে পড়ে যাবে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা বিজয় করেছিলেন, তখন এ ঘটনা ঘটেছিলো। কাবা ও তার আশপাশে যতো মূর্তি স্থাপিত ছিলো, সব তার সামনে উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিলো। 'বাইবেল সে কুরআন তক' নামে 'ইযহারুল হক'-এর যে অনুবাদ আমি করেছি, তার তৃতীয় খন্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়টি এ জাতীয় সুসংবাদ দ্বারাই পরিপূর্ণ। সেখানে আমি দুই কলাম বানিয়ে প্রথম কলামে বাইবেলের বক্তব্য এবং দ্বিতীয় কলামে কুরআন ও হাদীসের বিবরণ তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্যগুলো কুরআন-হাদীসে এসেছে, সেগুলো বাইবেলেও এসেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বাইবেলের এতো বিকৃতি সত্ত্বেও আজো বাইবেলে তা বিদ্যমান রয়েছে।