📄 বিনয়ের সঙ্গে মসজিদে নববী থেকে মসজিদে কোবায় গমন
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্ধুসুলভ সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববী থেতে পায়ে হেঁটে হযরত ইতবান ইবনে মালেক রাযি.-এর বাড়িতে গেলেন। যার অবস্থান প্রায় তিন মাইল দূরে মসজিদে কোবার নিকটে। তাঁর ঘরে গিয়ে তিনবার আওয়াজ দিলেন। সম্ভবত তিনি এমন কোনো অবস্থায় ছিলেন যে, ডাকে সাড়া দিতে পারেননি। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের নির্দেশ-وَ إِنْ قِيْلَ تَكُمُ ارْجِعُوا فَأَرْجِعُوا هُوَ أَزْلَى تَكُمْ ‘যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও তাহলে তোমরা ফিরে যাও।’-এর উপর আমল করে মসজিদে নববীতে ফিরে গেলেন এবং বিন্দুমাত্র অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না। নিজের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের হক আদায় করার জন্যে বন্ধুর বাড়িতে এসেছেন। সাক্ষাত হয়নি তো স্বাভাবিকভাবেই ফিরে গিয়েছেন। কিছুই মনে করেননি। পরে যখন হযরত ইতবান ইবনে মালেক তাঁর আগমন এবং তাকে না পেয়ে ফিরে যাওয়ার কথা জানতে পারলেন তিনি দৌড়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন এবং নিজেকে উৎসর্গ করে ক্ষমা চান।
হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ. বলতেন, আল্লাহকে তোমরা কীভাবে ভালোবাসবে? তাঁকে কখনো দেখোনি, বোঝোনি, এমনকি কখনো তাঁকে কল্পনাও করতে পারোনি।
আল্লাহ বলেন, আমার সঙ্গে যদি তোমার ভালোবাসা থাকে, তবে আমার মাখলুককে ভালোবাসো। আমার মাখলুকের সঙ্গে সদাচরণ করো। তাহলে তোমাদরে জীবনে আমার ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হবে। এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এ জন্যেই ইমাম বুখারী রহ. স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যার শিরোনাম হলো بَابُ الْإِنْبِسَاطِ إِلَى النَّاسِ। অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে এমনভাবে মিলেমিশে থাকা যে, আমি তাদেরই একজন। নিজের অবস্থানগত কোনো বৈশিষ্ট্য তৈরী না করাই হলো এ অধ্যায়ের উদ্দেশ্য। এতে তিনি হযরত আতা ইবনে ইয়াসার রহ.-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন, যাতে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন।
টিকাঃ
৪. নূর: ২৮
📄 হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিখ্যাত সাহাবী। তিনি ঐ সকল সাহাবীর একজন, যাঁরা অধিক ইবাদতগুজার হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। অনেক বড়ো আবেদ, যাহেদ ও বুযুর্গ ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদীসও বর্ণনা করেছেন।
তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল শরীফের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এ কিতাবগুলো আপন অবস্থায় বহাল ছিলো না, বরং ইহুদী-নাসারারা এগুলো বিকৃত করেছিলো। কিন্তু তথাপিও সেগুলোর বাস্তবতা ও বিকৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং ইহুদী-নাসারাদের মাঝে দাওয়াতের কাজ করার উদ্দেশ্য সেগুলো পড়ার অনুমতি রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. তাওরাতের কিছু অংশ ইহুদীদের কাছে পড়েছিলেন।
📄 তাওরাতে এখনো কিতাবুল্লাহর আলো বিচ্ছুরিত হয়
তাওরাত যদিও এখন পরিপূর্ণ আগের মতো নেই। অনেকাংশই ইহুদীরা বিকৃত করে ফেলেছে। অনেক সংযোজন বিয়োজন করেছে। কিন্তু তথাপিও অনেক জায়গা থেকে এখনো কিতাবুল্লাহর আলো বিচ্ছুরিত হয়।
তাই এখনো তাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমণের সুসংবাদ এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলীর কথা বিদ্যমান রয়েছে। যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় আরো অনেক সুস্পষ্ট ছিলো। এ জন্যে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
الَّذِينَ آتَيْنَهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُوْنَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ
'ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনভাবে চেনে, যেমন তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চেনে।'
কারণ, তাওরাতে আখেরী নবীর বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিত উল্লিখিত ছিলো। তিনি কেমন গুণাবলীর অধিকারী হবেন, তাঁর অবয়ব কেমন হবে এবং তিনি কোন শহরে ও কোন গোত্রে জন্মগ্রহণ করবেন ইত্যাদি সব উল্লেখ ছিলো। ফলে যারা ঐ সব কিতাবের আলেম ছিলো, তারা স্বচক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে আখেরী নবীর সকল নিদর্শন দেখেও একগুঁয়েমি, গোঁড়ামি ও হঠকারিতার কারণে তাঁকে মেনে নিতো না। হযরত আতা ইবনে ইয়াসার রাযি. বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি.-এর সঙ্গে যখন আমার সাক্ষাত হলো, তখন তাকে বললাম, আপনি তো তাওরাত পড়েছেন। তাওরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আছে, তা আমাদেরকে বলুন।
📄 বাইবেল বনাম কুরআন
এ সব কিতাব এতো পরিবর্তন করা সত্ত্বেও সেগুলোর কোনো কোনো অংশ এমন মনে হয়, যেন হুবহু কুরআনের অনুবাদ। তাদের প্রসিদ্ধ কিতাব বাইবেল, যাকে 'কিতাবে মুকাদ্দাস'ও বলা হয়। ইহুদী ও খৃষ্টান উভয়েই এ কিতাব মানে। তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সুসংবাদ আজও বিদ্যমান আছে। এই মুহূর্তে তাওরাতের একটি বাক্য আমার মনে পড়লো। বাক্যটি হলো,
(অনুবাদ) 'যিনি 'ফারান' থেকে উদিত হবেন। 'সালাহে'র অধিবাসীরা গীত গাইবে। 'কায়দার'-এর জনপদগুলো প্রশংসা করবে।'
'ফারান' ঐ পাহাড়ের নাম, যাতে হেরা গুহা অবস্থিত। 'সালাহ' ঐ পাহাড়ের নাম, যার একাংশ 'সানিয়্যাতুল ওয়াদা'। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের সময় মদীনার শিশুরা যেখানে দাঁড়িয়ে এই গীত গেয়ে স্বাগত জানিয়েছিলো,
طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوَدَاعِ
'সানিয়্যাতুল ওয়াদা' থেকে আমাদের উপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে।
আর 'কায়দার' হলো, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ছেলের নাম। তাঁর বংশধারা আরবের বিভিন্ন জনপদ আবাদ করেছে। সে দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশে যখন শেষ নবীর আগমন ঘটবে, তখন কায়দারের জনপদগুলো তার প্রশংসা করবে।
টিকাঃ
৫. বাকারাহ: ১৪৬
৬. আররিয়াজুন নাদরাহ ফি মানাকিবিল আশারা, খন্ডঃ ১, পৃঃ ৫৬, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, খন্ড। ২, পৃঃ ৩৬৩, হাদীস নং ৭৫৩, আসীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে কাসীরকৃত, খন্ডঃ ২, পৃঃ ২৬৯