📄 নবী এই সুন্নাতের উপর কাফেরদের আপত্তি
এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন একটি সুন্নাত, যার উপর কাফেররা প্রশ্ন তুলেছিলো। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُوْلِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ 'কাফেররা বলে, এ কেমন রাসূল যে খাবারও খায়, আবার বাজারেও যায়।'
কাফেররা মনে করতো বাজারে যাওয়া পয়গাম্বরী পদমর্যাদার পরিপন্থী। এরকম মনে করার কারণ ছিলো, তারা তাদের রাজা-বাদশা ও নেতাদেরকে এমনই দেখেছে। তারা যখন নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়, তখন তারা সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের মতো তারা বাজারে যায় না। যদি কখনো যেতো তাহলে সম্পূর্ণ শাহী শান-শওকত ও রাজকীয় ভাবমূর্তি নিয়ে যেতো। তাই তারা মনে করতো নবুওয়াতের পদমর্যাদা তো শাহী মর্যাদার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ। সুতরাং তিনি তো সাধারণের মতো বাজারে যেতে পারেন না।
কিন্তু কুরআনে কারীম এই ভ্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ, পয়গাম্বর তো আসেন তোমাদেরকে শিখানোর জন্যে এবং তোমাদের সংশোধনের জন্যে। সুতরাং দুনিয়ার কাজকর্মেও তারা মানুষের সঙ্গে মিলে- মিশে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন যে, কোন কাজের আদব কি? শর্ত কি? কোন কাজ কীভাবে করতে হয়? সাধারণ মানুষ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন না। অতএব পয়গাম্বরদের জন্যে সবার সঙ্গে মিলে বাজারে যাতায়াত করা কোনো দোষের বিষয় নয়, বরং এটা তাদের দায়িত্ব।
হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রহ. বলতেন, যে ব্যক্তি অনুসরণীয় হওয়ার পর সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকে এবং এটাকে নিজের শান মনে করে, সে মূলত এ বিষয়ের কিছুই বোঝে না।
হযরত আরো বলতেন, এ অবস্থায়ও একজন সাধারণ মানুষের মতোই থাকো। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থাকতেন।
টিকাঃ
২. আল ফুরকান : ৭
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপূর্ব বন্ধুভাবাপন্নতা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মদীনার বাজার 'মানাকা'য় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। (মদীনার এ বাজারটি এখন মসজিদে হারামের সম্প্রসারিত অংশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। একসময় আমিও এ বাজার দেখেছি) বেদুঈন সাহাবী হযরত যাহের রাযি. গ্রাম থেকে পণ্য এনে এই বাজারে বিক্রি করতেন। তিনি ছিলেন গরীব। দেখতে কালো। একজন সাধারণ সাহাবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পিছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরে বললেন,
مَنْ يَشْتَرِي هَذَا الْعَبْدَ مِنِّي
'কে আছে, যে আমার নিকট থেকে এই গোলামটি ক্রয় করবে?'
এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে রসিকতা করলেন। হযরত যাহের রাযি. যখন কণ্ঠ চিনে ফেললেন, তখন তার খুশি অন্ত রইলো না। তিনি বলেন, তখন আমি আমার পিঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর মোবারকের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই গোলাম বিক্রি করলে তো আপনি মূল্য একেবারেই কম পাবেন। কারণ, আমি খুব সাধারণ একজন কালো মানুষ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, যাহের তুমি আল্লাহর কাছে কম দামী নও।
এ ঘটনা থেকে অনুমান করুন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাশরীফ নিয়ে যাচ্ছেন। আবার সেখানে একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে রসিকতা করছেন। কোনো দর্শক কি অনুমান করতে পারবে যে, তিনি এতো মহান একজন 'উলুল আযম' নবী! যাঁর সামনে হযরত জিবরাঈল আমীনেরও পাখা জ্বলে যায়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
টিকাঃ
৩. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২১৮৭, শামায়েলে তিরমিযী, পৃঃ ১৬
📄 পাকিস্তানের মুফতীয়ে আযম তো নয়, যেন একজন সাধারণ পথিক
আমার শাইখ হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ. (আল্লাহ তাঁর মর্যাদা সুউচ্চ করুন) বলেন, একবার আমি আমার চেম্বারে বসে আছি (হযরতের চেম্বার তখন প্রিন্স রোডে ছিলো এবং আমাদের বাসাও তখন প্রিন্স রোডের কাছেই ছিলো) এমন সময় দেখলাম, পাকিস্তানের মুফতীয়ে আযম হযরত মুফতী শফী রহ. একটি পাতিল নিয়ে খুব সাধারণ মানুষের মতো ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি তো এ দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম যে, সারাবিশ্ব যার তাকওয়া, পরহেযগারী ও গুণগরিমায় মুখরিত, তিনি এভাবে একজন সাধারণ মানুষের মতো পাতিল হাতে নিয়ে হাঁটছেন? তখন সাথীদেরকে বললাম, দেখুন তো! তাঁকে দেখে কারো পক্ষে বোঝার উপায় আছে কি, তিনি পাকিস্তানের মুফতীয়ে আযম?
এরপর হযরত ডা. আরেফী রহ. বললেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন যাকে তাঁর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নসিব করেন, তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের মাঝে এমনভাবে মিশিয়ে রাখেন, যা দেখে কখনো বোঝা যায় না যে, তিনি কোন স্তরের মানুষ।
আর এটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। নিজের বিশেষ শান বজায় রাখার জন্যে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা তাঁর সুন্নাতের পরিপন্থী।
📄 বিনয়ের সঙ্গে মসজিদে নববী থেকে মসজিদে কোবায় গমন
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্ধুসুলভ সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববী থেতে পায়ে হেঁটে হযরত ইতবান ইবনে মালেক রাযি.-এর বাড়িতে গেলেন। যার অবস্থান প্রায় তিন মাইল দূরে মসজিদে কোবার নিকটে। তাঁর ঘরে গিয়ে তিনবার আওয়াজ দিলেন। সম্ভবত তিনি এমন কোনো অবস্থায় ছিলেন যে, ডাকে সাড়া দিতে পারেননি। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের নির্দেশ-وَ إِنْ قِيْلَ تَكُمُ ارْجِعُوا فَأَرْجِعُوا هُوَ أَزْلَى تَكُمْ ‘যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও তাহলে তোমরা ফিরে যাও।’-এর উপর আমল করে মসজিদে নববীতে ফিরে গেলেন এবং বিন্দুমাত্র অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না। নিজের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের হক আদায় করার জন্যে বন্ধুর বাড়িতে এসেছেন। সাক্ষাত হয়নি তো স্বাভাবিকভাবেই ফিরে গিয়েছেন। কিছুই মনে করেননি। পরে যখন হযরত ইতবান ইবনে মালেক তাঁর আগমন এবং তাকে না পেয়ে ফিরে যাওয়ার কথা জানতে পারলেন তিনি দৌড়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন এবং নিজেকে উৎসর্গ করে ক্ষমা চান।
হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ. বলতেন, আল্লাহকে তোমরা কীভাবে ভালোবাসবে? তাঁকে কখনো দেখোনি, বোঝোনি, এমনকি কখনো তাঁকে কল্পনাও করতে পারোনি।
আল্লাহ বলেন, আমার সঙ্গে যদি তোমার ভালোবাসা থাকে, তবে আমার মাখলুককে ভালোবাসো। আমার মাখলুকের সঙ্গে সদাচরণ করো। তাহলে তোমাদরে জীবনে আমার ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হবে। এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এ জন্যেই ইমাম বুখারী রহ. স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যার শিরোনাম হলো بَابُ الْإِنْبِسَاطِ إِلَى النَّاسِ। অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে এমনভাবে মিলেমিশে থাকা যে, আমি তাদেরই একজন। নিজের অবস্থানগত কোনো বৈশিষ্ট্য তৈরী না করাই হলো এ অধ্যায়ের উদ্দেশ্য। এতে তিনি হযরত আতা ইবনে ইয়াসার রহ.-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন, যাতে তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন।
টিকাঃ
৪. নূর: ২৮