📄 সুপারিশের একটি নীতি
আজকাল সুপারিশ করানোর রেওয়াজ খুব প্রচলিত। যেন কারো সঙ্গে সর্ম্পকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো, সে অবশ্যই আমার জন্যে সুপারিশ করবে। এ জন্যে সবাই সুপারিশ বিষয়ক কুরআনে কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতটিও খুব মনে রাখে-
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةٌ يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِنْهَا
'যে ব্যক্তি কোনো নেক সুপারিশ করবে, আল্লাহ ঐ কাজের সওয়াবের একটি অংশ তাকেও দান করবেন।"
এ কথা ঠিক যে, ভালো কাজে সুপারিশ করার অনেক ফযীলত আছে। কিন্তু মানুষ এ কথা ভুলে যায় যে, সুপারিশ তখনই ফযীলতের কাজ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা যার কাছে সুপারিশ করা হয় তার কষ্টের কারণ না হয়। আপনি যদি একজনকে খুশি করার জন্যে যার কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে? অবস্থার প্রতি লক্ষ না রেখে এমনভাবে সুপারিশ করেন যে, সে আপন সুপারিশের কারণে বিপদে পড়ে যায়। একদিকে আপনার সুপারিশ রক্ষা করতে গেলে তার নীতি বিসর্জন দিতে হয়, অপরদিকে আপনার সুপারিশ উপেক্ষাও করতে পারছে না এই চিন্তায় যে, এতো বড়ো মানুষ সুপারিশ করেছেন এখন সুপারিশ না রাখলেও তো তিনি কষ্ট পাবেন। তাহলে এ তো আর সুপারিশ থাকলো না, বরং চাপ প্রয়োগ করা হলো। এ ধরনের সুপারিশে কখনো ঐ ফযীলত পাওয়া যাবে না।
হযরত থানভী রহ.-এর সব সময়ের অভ্যাস ছিলো, তিনি যখনই কারো কাছে সুপারিশ করতেন, সঙ্গে অবশ্যই এ কথা লিখে দিতেন যে, 'যদি আপনার নীতি ও সঙ্গতি পরিপন্থী না হয়, তাহলে তার এ কাজটি করে দিন। কখনো এ কথাও বৃদ্ধি করতেন 'যদি আপনার জন্যে এ কাজ অসঙ্গত মনে করে না করেন, তাহলে আমি সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করবো না।' এ কথাগুলো এজন্যে লিখতেন, যাতে সুপারিশ তার জন্যে বোঝা বা চাপের কারণ না হয়। এটাই হলো সুপারিশের নীতি।
একবার এক লোক আমার সঙ্গে তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বললে, ও ভাই আমি আপনাকে একটা কাজের কথা বলতে চাচ্ছি। আমি বললাম, কী কি কাজের কথা বলতে চান? সে বললো, না এভাবে বলবো না। আগে ওয়াদা করুন যে, আপনি এ কাজ করে দিবেন। আমি বললাম, কি কাজ। যদি না জানি, তাহলে আমি কীভাবে ওয়াদা করি যে, একাজ করে দিবো। আবার বললো, না আগে ওয়াদা করুন কাজটি করে দিবেন। আমি বললাম যদি কাজটি আমার সামর্থের বাইরে হয় তাহলে আমি কীভাবে করে দিবো। বলতে লাগলো- আপনার সে কাজের সামর্থ আছে, আপনি ওয়াদা করুন। আমি বললাম, আগে বলুন না কাজটা কি? তার একই কথা যতোক্ষণ কাজটি করে দেওয়ার ওয়াদা না করবেন, ততোক্ষণ আমি বলবো না কি কাজ। আমি তাকে হাজারো বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, আগে ঐ কাজের বিবরণ দিন, তারপর ওয়াদা করবো। না জেনে কীভাবে ওয়াদা করি। অবশেষে সে বলতে লাগলো- যদি ওয়াদা না করেন, তাহলে আপনি আমাদের সম্পর্ক ঠিক রাখলেন না। এখন আপনিই বলুন, এটা কোন ধরনের সুপারিশ হলো? এটা তো একজনের উপর চাপ সৃষ্টি করা হলো যে, যতোক্ষণ কাজ করে দেওয়ার ওয়াদা না করবেন, ততোক্ষণ কি কাজ করে দিতে হবে তাও বলবো না। আজকাল সুপারিশ করা কারো সঙ্গে সম্পর্কের এমনই অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে গিয়েছে। অথচ এটা ইসলামী মুআশারাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ, অন্যায়ভাবে একজনকে মানসিক চাপ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলা গোনাহের কাজ।
টিকাঃ
৫. নিসা : ৮৫
📄 পারস্পরিক সম্পর্ক রেওয়াজে পরিণত হয়ে গিয়েছে
আজকাল পারস্পরিক সম্পর্ক ও মহব্বতটা রেওয়াজ সর্বস্ব হয়ে গিয়েছে। সে রেওয়াজ পালন করা হলে তবেই যেন মহব্বতের হক আদায় করা হলো, অন্যথায় নয়। ধরুন, কারো সঙ্গে একজনের সম্পর্ক হলো, সে তাকে দাওয়াত করলো। সে তার মাথায় চড়াও হয়ে দাওয়াতে যাওয়ার জন্যে বলবে। দাওয়াতে তাকে যেতেই হবে। এ জন্যে তাকে কতো কষ্ট ও কতো প্রতিকুলতার মোকাবেলা করতে হবে, তা বুঝতেই চাইবে না। তার একমাত্র চিন্তা হলো, আমার দাওয়াতে যদি না আসে তাহলে সে আমার মহব্বতের হক আদায় করলো না।
📄 হযরত মুফতী ছাহেব রহ.-এর দাওয়াত
আমাদের নিকট অতীতের এক বুযুর্গ ছিলেন হযরত ইদরীস কান্ধলভী রহ. (আল্লাহ তাঁর মর্যাদা আরো সুউচ্চ করুন)। এই বুযুর্গ আমার আব্বাজান হযরত মুফতী শফী রহ.-এর একান্ত বাল্যবন্ধু ছিলেন। একবার তিনি লাহোর থেকে করাচী তাশরীফ আনলেন এবং আব্বাজানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে দারুল উলূমে আসলেন। এমন সময় আসলেন, যখন খাবারের সময় না। তাঁর আগমনে আব্বাজান অনেক খুশি হলেন এবং সম্মানের সঙ্গে সংবর্ধনা জানালেন। যখন তিনি বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন আব্বাজান বললেন, ভাই ইদরীস ছাহেব! আমার দিলের তামান্না ছিলো আপনি আমাদের সঙ্গে এক বেলা খাবার খাবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনার অবস্থান এখান থেকে অনেক দূরে। আপনার হাতে সময় একেবারেই কম। এখন যদি আমি আপনাকে পীড়াপীড়ি করি যে, আপনি আমাদের সঙ্গে এক বেলা খাবার খেয়ে যান, তাহলে আমি মনে করি এটা 'দাওয়াত' হবে না, বরং 'আদাওয়াত' (দুশমনি) হবে। কারণ, আপনার হাতে সময় অনেক কম। আর আরেকবার আসতে চাইলে তাতেও আপনার চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় হবে। এয়ে আপনার অনেক কষ্ট হবে। এ জন্যে আমার মন চাইলেও আপনাকে দাওয়াত করছি না। কিন্তু দাওয়াত ছাড়াও মন মানছে না। তাই আপনাকে দাওয়াত করলে আমার যে পয়সা খরচ হতো সেই সামান্য পরিমাণ পয়সা আপনি আমার পক্ষ থেকে হাদিয়া হিসাবে কবুল করুন। হযরত মাওলানা ইদরীস রহ. পয়সাগুলো আব্বাজানের কাছ থেকে গ্রহণ করে মাথার উপর রেখে বললেন, এটা আমার জন্যে অনেক বড়ো নেয়ামত। বস্তুত আমারও দিলো তামান্না ছিলো আপনার সঙ্গে এক বেলা খাবার খাবো। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে কোনো অবকাশ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখন আপনি আমার জন্যে পাস খুলে দিলেন।
এখানে দেখুন আব্বাজান যদি তাঁকে বলতেন, আপনাকে এক বোতল খাবার আমার সঙ্গে অবশ্যই খেতে হবে। এরপর তিনি বলতেন, ভাই আমার তো সময় নেই। প্রতি উত্তরে আব্বাজান বলতেন, না ভাই বন্ধুত্বের দাবি হলে অবশ্যই আপনাকে আমার দাওয়াত রাখতে হবে। তাহলে তিনি যে জরুরী কাজে এতো দীর্ঘ সফর করে এসেছেন সে কাজ বাদ দিয়ে হয়তো পাঁচ-সাত ঘণ্টা সময় কুরবানী করতেন। কিন্তু এটা আর তখন 'দাওয়াত' থাকতো না 'আদাওয়াত' হয়ে যেতো।
📄 মহব্বতের লোককে আরাম পৌঁছানোই বস্তুত মহব্বতের দাবি
বর্তমান যুগের এই রসম-রেওয়াজ শুধু যে আমাদের সমাজের ক্ষতি করছে তাই নয়, বরং তা দ্বীনি আদব-আখলাক থেকেও আমাদেরকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হযরত থানভী রহ. কতোই না সুন্দর বলেছেন, 'মাহবুবকে আরাম পৌছানোর নাম হলো মহব্বত।'
যদি তাঁর কথাটি আল্লাহ আমাদের অন্তরে বসিয়ে দেন, তাহলে আমাদের সব কাজ ঠিক হয়ে যাবে।
যাকে তুমি মহব্বত করো তাকে আরাম পৌঁছাবার চিন্তা করো। নিজের মন মতো করার নাম মহব্বত নয়। মহব্বতকারী যদি অজ্ঞ ও বেউকুফ হয় তাহলে তার মহব্বতের কারণে মাহবুব কষ্ট পায়। কিন্তু আমার হযরতের নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর নীতি হলো, মহব্বতের কারণে কষ্ট পাওয়ার কোনোই অর্থ নেই। যদি তুমি কাউকে সত্যিকার অর্থেই মহব্বত করো তাহলে তুমি তার আরামের চিন্তা করো। কোনোভাবেই তাকে কষ্ট দিও না। প্রয়োজনে নিজের যে কোনো চাহিদা ও প্রেরণাকে বিসর্জন দিয়ে হলেও মাহবুবের আরামের ব্যবস্থা করো।
এ সব ঐ হাদীসের ব্যাখ্যা, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَالِقُوا النَّاسَ بِأَخْلَاقِهِمْ
অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে তার স্বভাব ও রুচি অনুযায়ী আচরণ করো। যার সঙ্গে তুমি আচরণ করবে, প্রথমে চিন্তা করবে যে, এ আচরণ তার কষ্টের কারণ হবে কি না? এটা তার স্বভাব ও রুচির পরিপন্থী হবে কি না? তবে আমার অভিজ্ঞতা হলো, এ বিষয়গুলো বুযুর্গদের সান্নিধ্য ছাড়া অর্জিত হয় না। হযরত থানভী রহ.-এর খানকায় তো এমনভাবে মানুষের তারবিয়াত করা হতো যে, প্রত্যেকের একেকটি আমলের প্রতি খেয়াল করে করে তাকে শিক্ষা দেওয়া হতো যে, মানুষের সঙ্গে কোনো আচরণ করতে গিয়ে কীভাবে তার স্বভাব, রুচি ও অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখতে হয়?
এটা ছিলো আদাবুল মুআশারাত সম্পর্কিত শেষ হাদীস। এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবগুলো নীতি বলে দিয়েছেন যে, আমার কারণে অন্য কেউ যেন সামান্যতম কষ্টও না পায়, এ বিষয়ের প্রতি খুব লক্ষ রাখতে হবে।
জিগার মুরাদাবাদী নামে একজন কবি ছিলেন। তিনি হযরত থানভী রহ.-এর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তার একটি কবিতা আছে, যা সমস্ত আদাবুল মুআশারাতের খোলাসা। এটাকে লক্ষ্য বানিয়ে যদি আমল করতে পারি, তাহলে সব এসে যাবে। কবিতাটি হলো-
اس نفع و ضرر کے دنیا میں یہ ہم نے لیا ہے درس جنوں
اپنا تو زیاں منظور سہی، اوروں کا زیاں منظور نہیں
'সুখ-দুঃখের এ দুনিয়ায় প্রেমের এ শিক্ষা আমি লাভ করেছি যে, নিজের ক্ষতি তো মেনে নিতে পারি, কিন্তু অন্যের কষ্ট সইতে পারি না।'
অর্থাৎ, দুনিয়া কখনো মন মতো হয় না। সুতরাং আমার মন ও চাহিদার বিরুদ্ধে কিছু হলে বা আমার কষ্টের ও ত্যাগের কোনো বিষয় সামনে এলে তা আমি মেনে নিতে পারি, কিন্তু আমার কারণে অন্যের কষ্ট হবে, বা অন্যের জান-মালের কোনো ক্ষতি হবে, তা আমি হতে দিতে পারি না। পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের এটাই শিক্ষা এবং আদাবুল মুআশারাতের এটাই সারকথা। আল্লাহ আমাকে, আপনাকে ও সকলকে এর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ