📄 সময়ের দাবি পূরণ করা
হযরত বলেন, বস্তুত এখানে আফসোস বা কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা এখানে রোগীর সেবাই তার জন্যে ইবাদত হবে। বরং এতোদিন যে যিকির-আযকার করতো, তার চেয়েও উত্তম হবে।
হযরত বলেন, দ্বীন মূলত সময়ের দাবি অনুযায়ী আমল করার নাম। দেখতে হবে এ মুহূর্তে তোমার কাছে দ্বীনের দাবি কি? এ মুহূর্তের দাবি হল যিকির-আযকার আপাতত বন্ধ রেখে রোগীর সেবা করা। এমন মনে করা না যে, এ সময় আমি যে যিকির-আযকার করতাম, এখন তো তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আল্লাহ তোমাকে বঞ্চিত করবেন না। কারণ, তুমি দ্বীনের অন্য একটি দাবি পূরণের জন্যেই মূলত এ কাজ ছেড়ে দিয়েছো।
📄 রমাযানের সমূহ বরকত অর্জনের উপায়
একবার হযরত বলেন, কেউ যদি রমাযান মাসে অসুস্থ হয় কিংবা সফর বের হয় এবং এ কারণে রোযা রাখতে না পারে। তাহলে তার ব্যাপার শরীয়তের বিধান হলো, সে এ রোযাগুলো পরে কাযা করে নিবে এবং যেহেতু শরীয়তসম্মত ওযরের কারণে রোযা ভেঙ্গেছে, এ জন্যে পরবর্তীতে দিনগুলোতে সে ঐ রোযা কাযা করবে, তাতেই তার রমাযান মাস ফিরে আসবে। অর্থাৎ, রমাযান মাসে যেমন বরকত-রহমত ছিলো, এখন ঐ দিনগুলোই তার জন্যে সে রকম রহমত ও বরকতপূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ, শরীয়তসম্মত ওযরবশত রমাযানের রোযা ভাঙ্গার কারণে সে রমাযানের বরকত থেকে মাহরুম থাকবে, এটা আল্লাহর রহমতের সঙ্গে কিছুতেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সুতরাং কেউ শরীয়তসম্মত ওযরের কারণে তার কোনো নফল আমল ছেড়ে দিলে বা বিলম্বিত করলে সেখানেও ইনশাআল্লাহ ঐ আমলের সব নূর ও বরকতের অধিকারী হবে। কারণ, সময়ের দাবি পূরণ করাই দ্বীন। আপনি এরূপ বলবেন না যে, এখন আমার যিকিরের সময় বা তিলাওয়াতের সময়, অতএব কেউ অসুস্থ হোক বা মারা যাক তাতে আমার কি? এমন মনোভাব পোষণ করা কখনো দ্বীন হতে পারে না।
📄 যেখানে সেখানে পীড়াপীড়ি করবেন না
সুতরাং কারো সঙ্গে তার স্বভাব, রুচি ও তার সার্বিক অবস্থার প্রতি বিবেচনা করে আচরণ করবেন। কারো সঙ্গে কোনো কাজ করতে আগে দেখবেন, আমার এ কাজ তার জন্যে কষ্টের কারণ হবে না তো। এ দিকে লক্ষ করে তার সঙ্গে আচরণ করবেন। এটা ইসলাহে মু'আশারা তথা সমাজ-সংস্কারের অনেক বড়ো একটা মৌলিক শিক্ষা। আজকাল মানুষ এর প্রতি লক্ষ করে না। একজনের জন্যে যে কাজটা অনেক বড়ো কষ্টের, এখন যদি আপনি সে কাজের জন্যে বার বার পীড়াপীড়ি করতে থাকেন, তাহলে হয়তো দেখা যাবে, সে পীড়াপীড়ির কারণে বাধ্য হয়ে আপনার কথা মেনে নিলো। কিন্তু এতে আপনি তার উপর যে বোঝাটা চাপিয়ে দিলেন এবং তাকে যে কষ্ট দিলেন, এ কারণে (আল্লাহ মাফ করুন) হয়তো বা আপনি গোনাহগার হয়ে যেতে পারেন।
📄 সুপারিশের একটি নীতি
আজকাল সুপারিশ করানোর রেওয়াজ খুব প্রচলিত। যেন কারো সঙ্গে সর্ম্পকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো, সে অবশ্যই আমার জন্যে সুপারিশ করবে। এ জন্যে সবাই সুপারিশ বিষয়ক কুরআনে কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতটিও খুব মনে রাখে-
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةٌ يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِنْهَا
'যে ব্যক্তি কোনো নেক সুপারিশ করবে, আল্লাহ ঐ কাজের সওয়াবের একটি অংশ তাকেও দান করবেন।"
এ কথা ঠিক যে, ভালো কাজে সুপারিশ করার অনেক ফযীলত আছে। কিন্তু মানুষ এ কথা ভুলে যায় যে, সুপারিশ তখনই ফযীলতের কাজ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা যার কাছে সুপারিশ করা হয় তার কষ্টের কারণ না হয়। আপনি যদি একজনকে খুশি করার জন্যে যার কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে? অবস্থার প্রতি লক্ষ না রেখে এমনভাবে সুপারিশ করেন যে, সে আপন সুপারিশের কারণে বিপদে পড়ে যায়। একদিকে আপনার সুপারিশ রক্ষা করতে গেলে তার নীতি বিসর্জন দিতে হয়, অপরদিকে আপনার সুপারিশ উপেক্ষাও করতে পারছে না এই চিন্তায় যে, এতো বড়ো মানুষ সুপারিশ করেছেন এখন সুপারিশ না রাখলেও তো তিনি কষ্ট পাবেন। তাহলে এ তো আর সুপারিশ থাকলো না, বরং চাপ প্রয়োগ করা হলো। এ ধরনের সুপারিশে কখনো ঐ ফযীলত পাওয়া যাবে না।
হযরত থানভী রহ.-এর সব সময়ের অভ্যাস ছিলো, তিনি যখনই কারো কাছে সুপারিশ করতেন, সঙ্গে অবশ্যই এ কথা লিখে দিতেন যে, 'যদি আপনার নীতি ও সঙ্গতি পরিপন্থী না হয়, তাহলে তার এ কাজটি করে দিন। কখনো এ কথাও বৃদ্ধি করতেন 'যদি আপনার জন্যে এ কাজ অসঙ্গত মনে করে না করেন, তাহলে আমি সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করবো না।' এ কথাগুলো এজন্যে লিখতেন, যাতে সুপারিশ তার জন্যে বোঝা বা চাপের কারণ না হয়। এটাই হলো সুপারিশের নীতি।
একবার এক লোক আমার সঙ্গে তার সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বললে, ও ভাই আমি আপনাকে একটা কাজের কথা বলতে চাচ্ছি। আমি বললাম, কী কি কাজের কথা বলতে চান? সে বললো, না এভাবে বলবো না। আগে ওয়াদা করুন যে, আপনি এ কাজ করে দিবেন। আমি বললাম, কি কাজ। যদি না জানি, তাহলে আমি কীভাবে ওয়াদা করি যে, একাজ করে দিবো। আবার বললো, না আগে ওয়াদা করুন কাজটি করে দিবেন। আমি বললাম যদি কাজটি আমার সামর্থের বাইরে হয় তাহলে আমি কীভাবে করে দিবো। বলতে লাগলো- আপনার সে কাজের সামর্থ আছে, আপনি ওয়াদা করুন। আমি বললাম, আগে বলুন না কাজটা কি? তার একই কথা যতোক্ষণ কাজটি করে দেওয়ার ওয়াদা না করবেন, ততোক্ষণ আমি বলবো না কি কাজ। আমি তাকে হাজারো বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, আগে ঐ কাজের বিবরণ দিন, তারপর ওয়াদা করবো। না জেনে কীভাবে ওয়াদা করি। অবশেষে সে বলতে লাগলো- যদি ওয়াদা না করেন, তাহলে আপনি আমাদের সম্পর্ক ঠিক রাখলেন না। এখন আপনিই বলুন, এটা কোন ধরনের সুপারিশ হলো? এটা তো একজনের উপর চাপ সৃষ্টি করা হলো যে, যতোক্ষণ কাজ করে দেওয়ার ওয়াদা না করবেন, ততোক্ষণ কি কাজ করে দিতে হবে তাও বলবো না। আজকাল সুপারিশ করা কারো সঙ্গে সম্পর্কের এমনই অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে গিয়েছে। অথচ এটা ইসলামী মুআশারাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ, অন্যায়ভাবে একজনকে মানসিক চাপ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ফেলা গোনাহের কাজ।
টিকাঃ
৫. নিসা : ৮৫