📄 হযরত উসমান রাযি.-এর রুচির প্রতি লক্ষ করা
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে অবস্থান করছিলেন, তাঁর পরিধানের লুঙ্গি কিছুটা উপরে উঠানো ছিলো কোনো বর্ণনা মতে হাঁটু পর্যন্ত খোলা ছিলো। সম্ভবত এটা তখনকার ঘটনা যখন হাঁটু সতর হিসেবে বিধিত হয়নি। অবশ্য কোনো বর্ণনায় এসেছে, আবৃত ছিলো। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি দরজায় করাঘাত করলো। জানা গেলো তিনি হযরত আবু বকর রাযি.। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলে তিনি ভিতরে প্রবেশ করে পাশে বসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে পা খোলা অবস্থায় ছিলো সেভাবেই থাকলে কিছুক্ষণ পর আবার অন্য কেউ দরজায় আওয়াজ দিলো, জানা গেলো, তিনি হযরত ওমর ফারুক রাযি.। তাঁকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং তিনিও এসে পাশে বসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববৎ পা খোলা অবস্থায় বসে থাকলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন করলেন না। একটু পর আবার কেউ দরজায় করাঘাত করলো। জিজ্ঞাসা করলেন কে? উত্তরে জানা গেলো, তিনি হযরত উসমান গণী রাযি.। সঙ্গে সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লুঙ্গি টেনে পাগুলো সুন্দরভাবে ঢেকে নিলেন। এরপর বললেন, তাকে আসতে বলো। অতএব তিনিও এসে বসলেন।
এ দৃশ্য দেখে একজন জিজ্ঞাসা করলো- ইয়া রাসূলাল্লাহ! যখন হযরত সিদ্দীকে আকবর রাযি. তাশরীফ আনলেন, তখন আপনি লুঙ্গি ঠিক করলেন না, যখন হযরত ওমর ফারূক রাযি. আসলেন, তখনও একই অবস্থা থাকলেন, কিন্তু যখন উসমান গণী রাযি. তাশরীফ আনলেন, তখন আপনি অবস্থার পরিবর্তন ঘটালেন এবং লুঙ্গি টেনে পা ঢেকে নিলেন, এর কারণ কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন,
আমি এমন ব্যক্তিকে কেন লজ্জা করবো না, যাকে ফেরেশতারাও লজ্জা করে?
টিকাঃ
২. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪১৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৪৮৪
📄 লজ্জা হযরত উসমান রাযি.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য
লজ্জা হযরত উসমান রাযি.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো। আল্লাহ তাঁকে এ বিষয়ে অনেক উঁচু মর্যাদা দান করেছিলেন। তাঁর উপাধি ছিলো كَامِلُ الْحَيَاءِ وَالْإِيْمَانِ অর্থাৎ, ঈমান ও লজ্জায় পরিপূর্ণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সাহাবীর স্বভাব সম্পর্কে অবগত ছিলেন। হযরত উসমান রাযি.-এর ব্যাপারে তিনি জানতেন যে, তিনি অত্যন্ত লজ্জাশীল। তাই যদিও হাঁটু পর্যন্ত খোলা রাখা নাজায়েয নয়, যার কারণে হযরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হযরত ওমর ফারুকের আগমনের পরও পা খোলা রেখেই বসে ছিলেন, কিন্তু যখন উসমান রাযি. আসলেন, তখন ভাবলেন তাঁর স্বভাবে যেহেতু লজ্জাবোধ বেশি, সুতরাং তাঁর সামনে এভাবে বসে থাকলে স্বভাবজাত লজ্জাবোধের কারণে তাঁর কষ্ট হতে পারে। এ জন্যে তিনি ভিতরে প্রবেশ করার আগেই লুঙ্গি টেনে পুরা পা ঢেকে নিলেন।
যে সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামান্য ইশারায় জান কুরবান করার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন, তাদের স্বভাব ও রুচির প্রতিও তিনি এ পরিমাণ খেয়াল রাখতেন। মনে করুন, উসমান রাযি.-এর আগমনেও যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ অবস্থায়ই থাকতেন, তাতে এমন কি হয়ে যেতো? কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদরেকে এই শিক্ষা দিয়ে গেলেন যে, তোমাদের সঙ্গীদের স্বভাব ও রুচি অনুপাতে তাদের সঙ্গে আচরণ করবে।
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর স্বভাবের প্রতি লক্ষ রাখা
একবার হযরত ওমর ফারুক রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ওমর! আমি একটি আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে জান্নাত দেখলাম এবং সেখানে দেখলাম একটি দৃষ্টি নন্দন অট্টালিকা। জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কার? আমাকে বলা হলো, এটা ওমরের জন্যে তৈরী করা হয়েছে। অট্টালিকাটি আমার এতোই ভালো লাগলো যে, আমার মন চাইলো ভিতরে গিয়ে দেখি ওমরের মহলটি কেমন? কিন্তু পরক্ষণেই তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা মনে পড়লো যে, আল্লাহ তোমার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ খুব বেশি দান করেছেন। সুতরাং তোমার পূর্বে এ মহলে প্রবেশ করা এবং তা দেখা তোমার আত্মমর্যাদাবোধের পরিপন্থী হবে। জন্যে আমি আর সেই মহলে প্রবেশ করিনি। এ কথা শুনে হযরত ওমর রা. কেঁদে ফেললেন এবং বলে উঠলেন,
أَوَ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغَارُ 'ইয়া রাসূলাল্লা! আপনার প্রতিও কি আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাবো?'
আত্মমর্যাদাবোধ তো রয়েছে অন্যের সাথে। আপনি আমার মহলে আম আগে প্রবেশ করবেন, এটা তো গর্বের বিষয়।
এখান থেকে আপনি অনুমান করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতো সূক্ষ্ম ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের স্বভাব ও রুচির প্রতি লক্ষ রাখতে বিষয়টি এমন নয় যে, আমি ইমাম আর সে আমার মুক্তাদী, বা আমি কিংবা উস্তাদ আর সে আমার মুরীদ বা ছাত্র। সুতরাং সব অধিকারই আমার, তার কোনো অধিকার নেই। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একেক সাহাবীর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতিও খেয়াল রেখে আমাদের সাম সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদেরও অধিকার রয়েছে।
📄 উম্মাহাতুল মুমিনীনের স্বভাবের প্রতি লক্ষ রাখা
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করার ই করলেন। আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বললেন, ইয়া রাসূলার আমারও আপনার সঙ্গে ইতিকাফে বসতে ইচ্ছা হচ্ছে। এমনিতে নারীদের জন্যে মসজিদে ইতিকাফ করা ঠিক নয়। নারীরা ইতিকাফ করা চাইলে ঘরেই করবে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবস্থান এ দিক থে ভিন্ন ছিলো যে, তাঁর ঘরের দরজা মসজিদের ভিতরের দিকেই খোলা হয়ে সুতরাং ঘরের দরজার সামনেই যদি মসজিদে তাঁর ইতিকাফের জায়গা ক হয়, আর তার সাথেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইতিকাফে জায়গা করা হয় তাহলে এতে পর্দার কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রয়োজনে ঘরে চলে যাবেন, আবার প্রয়োজন সেরে ইতিকাফের জায়গা ফিরে আসবেন। এ জন্যে তাঁর মসজিদে ইতিকাফ করাতে কোনো সমস ছিলো না। বিধায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনুমতি দা করেন।
কিন্তু রমাযানের ২০ তারিখে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের বাইরে গেলেন, তখন ফিরে এসে দেখেন, মসজিদের বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলো তাঁবু টানিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন- এসব তাঁবু কাদের। লোকেরা বললো, এগুলো উম্মুল মুমিনীনদের তাঁবু। আয়েশা রাযি. যখন মসজিদে ইতিকাফ করার অনুমতি পেয়ে গেলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য বিবিগণও চিন্তা করলেন যে, আমরাও এ সৌভাগ্য অর্জন করি। তাই তাঁরাও মসজিদে নিজ নিজ তাঁবু টানিয়ে নিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, আয়েশার বিষয়টি তো ছিলো ভিন্ন। তার ঘর মসজিদের সঙ্গে। তার জন্যে তো পর্দা রক্ষা করেও মসজিদে ইতিকাফ করা সম্ভব। কিন্তু অন্যদের ঘর দূরে। তারা মসজিদে ইতিকাফ করলে বার বার ঘরে যাতায়াতে পর্দার লঙ্ঘন হবে। এভাবে তো নারীদের ইতিকাফ করা ঠিক নয়। তাই তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
الْبِرُّ يُرِدْنَ؟
'তারা কি বস্তুত কোনো নেক কাজের ইচ্ছা করছে?' উদ্দেশ্য ছিলো নারীদের এভাবে মসজিদে ইতিকাফ করা কোনো নেক কাজ নয়।
টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং ১০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮১১৫