📄 একটি হাদীসের জন্য দেড় হাজার কিলোমিটার সফর
বুখারী শরীফে একটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব নিকটতম আনসারী সাহাবী হযরত জাবের রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর একদিন বসা ছিলেন। এমন সময় তিনি জানতে পারলেন যে, তাহাজ্জুদ নামায সম্পর্কে এমন একটি হাদীস আছে, যা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি শুনিনি। অন্য এক সাহাবী তা সরাসরি শুনেছেন। যিনি এখন শামের দামেস্ক শহরে অবস্থান করছেন। তিনি ভাবলেন, এ হাদীসটি আমি ঐ সাহাবী থেকে সরাসরি না শুনে কেন বসে থাকবো? হাদীসটি তো সরাসরি ঐ সাহাবী থেকে শোনা দরকার, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিয়ে শুনেছেন। মানুষকে জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই অমুক সাহাবী এখন কোথায় আছেন? তারা বললেন, শামের দামেস্ক শহরে আছেন। জাবের রাযি. তয় মদীনার বাসিন্দা। সেখান থেকে দামেস্কের দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। আমি নিজেও সে রাস্তা সফর করেছি। যা সম্পূর্ণ তরু-লতাহীন মরু প্রান্তর। টিলা, গাছপালা বা পানির কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। হযরত জাবের রাযি. তৎক্ষণাৎ উট তলব করে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং দো হাজার কিলো মিটার পথ অতিক্রম করে দামেস্কে পৌছলেন। সেই সাহাবী বাড়ি খুঁজে বের করলেন এবং দরজায় পৌছে করাঘাত করলেন। দরজা খুলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- কী উদ্দেশ্যে আগমন হয়েছে?
হযরত জাবের রাযি. বললেন, আমি শুনেছি, তাহাজ্জুদের ফযীলত সম্পর্কে আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি একটি হাদীস শুনেছেন। সেই হাদীসটি আমি আপনার জবানে শোনার জন্যে এখানে এসেছি।
তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি মদীনা মুনাওয়ারা থেকে শুধু এর জন্যেই এসেছেন?
তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, শুধু এ উদ্দেশ্যেই আমি এসেছি।
সাহাবী বললেন, ঐ হাদীস আমি পরে শোনাবো। প্রথমে অন্য একটি হাদীস শুনুন, যা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি। তারপর তিনি এই আলোচ্য হাদীসটি শোনালেন, যে ব্যক্তি দ্বীনের ইলম শেখার জন্যে কোনো পথ অতিক্রম করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। এই হাদীস শোনানোর পর তাহাজ্জুদের ফযীলত বিষয়ক হাদীসটি শোনালেন। হাদীস শোনানোর পর তিনি বললেন, আপনি এক সময় ভিতরে বসুন এবং খাবার খেয়ে নিন।
জাবের রাযি. বললেন, না আমি খাবার খাবো না। কারণ, আমি চাচ্ছি আমার এ সফরটি কেবল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সংগ্রহের জন্যেই হোক। তাতে অণু পরিমাণও যেন অন্য কিছুর অনুপ্রবেশ না ঘটে। তাই আমি আর কোনো কাজই করতে চাচ্ছি না। হাদীস পেয়ে গেছি, আমার সফরের লক্ষ্য অর্জন হয়ে গিয়েছে। আমি মদীনা মনুওয়ারায় ফিরে যাচ্ছি। আসসালামু 'আলাইকুম।
টিকাঃ
১৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৪৬৪, ইমাম বুখারী রহ. উক্ত ঘটনাটি অধ্যায়-শিরোনামে উল্লেখ করেছেন।
📄 দ্বীনি মজলিসে যেতে ইলম শেখার নিয়ত করবে
দেখুন! একটি হাদীসের জন্যে কতো দীর্ঘ সফর করেছেন। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। সাহাবায়ে কেরام, তাবেঈন, তাবয়ে তাবেঈনের জীবনী খুলে দেখুন তাঁদের একেক জন দ্বীনি ইলম শেখার জন্যে এবং হাদীস সংগ্রহ করার জন্যে কতো দীর্ঘ পথ সফর করেছেন। আজ হাদীসের এই সংগ্রহ আমাদের সামনে ভাজা রুটির মতো প্রস্তুত হয়ে পরিবেশিত আছে। অথচ এর পিছনে আল্লাহর ঐ সকল বান্দা কতো জান-মাল কোরবানী করে, কতো শ্রম দিয়ে আমাদের পর্যন্ত তা পৌছানোর ব্যবস্থা করেছেন। এ কাজ যদি আমাদের মতো লোকদের দায়িত্বে পড়তো, তাহলে দ্বীনের ইলম বিলুপ্ত হয়ে যেতো। আল্লাহর বড়ো মেহেরবানী যে, এ কাজের জন্যে তিনি তাঁদের মতো এক জামাআত তৈরী করেছেন, যারা ভবিষ্যত-প্রজন্মের জন্যে দ্বীনকে হেফাজত করেছেন। তাঁর বড়ো মেহেরবানী যে, এই দ্বীন সংরক্ষিত আছে। কিতাবাকারে মুদ্রিত হয়েছে। সবযুগে দ্বীনের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবজায়গায় বিদ্যমান রয়েছে। এখন আপনাদের কাজ হলো, শুধু তাদের কাছে গিয়ে প্রস্তুত বিষয়গুলো শিখে নেওয়া এবং মাসালাসমূহ জেনে নেওয়া। শেষ কথা হলো, উক্ত হাদীসে ইলম অন্বেষণকারীর জন্যে অনেক বড়ো সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা এখানে একত্রিত হই, আমাদের উদ্দেশ্যও এই দ্বীন শেখা এবং দ্বীনের ইলম অন্বেষণ করা। সুতরাং ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ই আমরা যেন এ হাদীসটি স্মরণ করি এবং ইলম অন্বেষণ করার নিয়ত করে বের হই। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এ হাদীসের সুসংবাদ লাভের সৌভাগ্য দান করুন। আমীন।
📄 যারা আল্লাহর ঘরে একত্র হয় তাদের জন্য মহা সুসংবাদ
আলোচ্য হাদীসের পরবর্তী বাক্যে আরেকটি সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কোনো জামাআত যখন আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করার জন্যে বা শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়ার জন্যে আল্লাহর কোনো ঘর তথা মসজিদে একত্রিত হয়ে বসে যায়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের উপর 'সাকীনা' বর্ষিত হতে থাকে এবং আল্লাহর রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে নেয়। রহমতের ফেরেশতাগণ তাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। অর্থাৎ, আল্লাহর রহমত তাদের অভিমুখী হয়। আর রহমতের ফেরেশতা ঐ বান্দাদের জন্যে দু'আ করতে থাকে। তাদের জন্যে মাগফিরাত ও আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে। আল্লাহ! এরা আপনার দ্বীনের জন্যে একত্রিত হয়েছে, দয়া করে তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। তাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিন। তাদেরকে দ্বীনদার হওয়ার তাওফীক দান করুন।
📄 তোমরা আল্লাহর যিকির করো, আল্লাহ্ তোমাদেরকে স্মরণ করবেন
আলোচ্য হাদীসের পরবর্তী বাক্যটি হলো-
وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِيمَنْ عِنْدَهُ
অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের মজলিসে ঐ যিকিরকারীদের আলোচনা করেন যে, আমার বান্দারা নিজেদের সব কাজ ছেড়ে দিয়ে শুধু আমার জন্যে, আমার যিকির করার জন্যে, আমার দ্বীনের কথা শোনার জন্যে একত্রিত হয়েছে। ফেরেশতাদের সঙ্গে বান্দাদেরকে নিয়ে আল্লাহর এভাবে আলোচনা করা কোনো সাধারণ কথা নয়! অনেক বড়ো ব্যাপার! কবি বলেন,
ذکر میر امجھ سے بہتر ہے کہ اس محفل میں ہے
'আমার স্মরণ তো আমার চেয়েও উত্তম। কারণ, আমাকে তো সেই মাহফিলে (আল্লাহর মজলিসে) স্মরণ করা হচ্ছে।'
এটা যেমন তেমন কোনো বিষয় নয় যে, প্রকৃত প্রেমাস্পদ আমাকে স্মরণ করবেন! এটা তো আমাদের কাজ ছিলো যে, আমরা তাঁকে স্মরণ করবো। আমাদের প্রতি নির্দেশ হচ্ছে,
فَاذْكُرُونِي 'তোমরা আমাকে স্মরণ করো।' কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রতিদানের কথাও বলে দিয়েছেন,
اذْكُرْكُمْ অর্থাৎ, তোমরা আমাকে স্মরণ করলে আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো। আমরা তাঁকে স্মরণ করলে বা না করলে তাঁর কি আসে যায়! আমাদের যিকিরের কী-ই বা মূল্য আছে? আমাদের যিকিরে তো তাঁর বড়োত্ব ও মহত্ত্ব এক কণা পরিমাণও বৃদ্ধি পায় না। আর যদি আমরা তাঁর যিকির ছেড়ে দেই- বরং পুরো দুনিয়াও তাঁর যিকির ছেড়ে দেয়- তাতেও তো তাঁর বড়োত্বে ও মহত্ত্বে যারা পরিমাণও ঘাটতি হবে না। আমাদের দৃষ্টান্ত তো হলো, সামান্য একটা খড়কুটার মতো। একটা খড়কুটা আল্লাহর যিকির করলে তাতে এমন কি হয়ে গেলো! কিন্তু আল্লাহ বান্দার স্মরণ বা আলোচনা করবেন এটা নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ কথা নয়। পরম সৌভাগ্যের কথাই বটে।