📄 হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহ.-এর ঘটনা
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহ. দজলা নদীর তীরে পায়চারি করছিলেন। তাঁর কাছ দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছিলো। ঐ নৌকায় বখাটে ধরনের কিছু যুবক গান-বাজনা করছিলো। আর এ জাতীয় আড্ডার পাশ দিয়ে যখন কোনো মোল্লা মানুষ অতিক্রম করে তখন তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করাও তাদের আড্ডা-আনন্দের একটা যুগসই অংশ হিসাবে গণ্য হয়। তাই তারাও হযরতকে দেখে কিছু বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা বললো। হযরতের সঙ্গে আরেকজন লোক ছিলেন। তিনি এ অবস্থা দেখে বললেন, হযরত আপনি ওদের উপর বদ দু'আ করুন। কারণ, এরা এতোই বেয়াদব যে, একে তো নিজেরা পাপাচারে লিপ্ত, অপরদিকে আল্লাহওয়ালাদেরকে বিদ্রূপ করে। হযরত সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে দু'আ করলেন- 'হে আল্লাহ আপনি যেভাবে এই যুবকদেরকে এ দুনিয়ায় আনন্দ দান করেছেন, তাদের আমলকে এমন করে দিন, যেন আখেরাতেও তাদের এমন আনন্দ নসীব হয়।' দেখুন! তিনি ঐ যুবকদেরকে ঘৃণা করেননি। তিনি ভেবেছেন, তারা তো আমার আল্লাহরই মাখলুক।
📄 উম্মতের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মমতা
যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ 'রাহমাতুল্লিল আলামীন' তথা বিশ্ববাসির জন্যে রহমত বানিয়ে পাঠিয়েছেন, তাঁর উপর যখন কাফেরদের পক্ষ থেকে পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিলো, পা মোবারক রক্তে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিলো, ঠিক তখনো তাঁর যবানে উচ্চারিত হচ্ছিলো,
رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
হে আল্লাহ! আমার এ জাতিকে ক্ষমা করুন, কারণ তারা জানে না, আমাকে তারা চিনে না, তারা অজ্ঞ। অজ্ঞতার বসে তারা এমন করছে। আল্লাহ তাদের তুমি হেদায়েত দান করো।
একথা তাঁর যবানে এজন্যেই উচ্চারিত হচ্ছিলো যে, কাফেরদের পাপ কাজের প্রতি তো তাঁর ঘৃণা ছিলো, কিন্তু তাদের সত্তার প্রতি কোনো ঘৃণা ছিলো না। কারণ, তারা আল্লাহর মাখলুক। আর যারা আমার আল্লাহর মাখলুক, তাদের তো আমি ভালোবাসি।
টিকাঃ
১০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৪৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪০১৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৪২৯
📄 গোনাহগারকে ঘৃণা করো না
একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, পাপ ও অন্যায়কে ঘৃণা না করাও গোনাহ। এজন্যে গোনাহকে অবশ্যই ঘৃণা করতে হবে এবং খারাপ মনে করতে হবে। তবে যে লোক গোনাহে লিপ্ত, তার সত্তাকে ঘৃণা বা অবজ্ঞা করা যাবে না। বরং তার প্রতি দয়া পরবশ হতে হবে। যেমন কেউ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্যে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারের কাজ তার উপর রেগে যাওয়া নয় যে, তুমি কেন অসুস্থ হলে? বরং তখন ডাক্তার তার প্রতি মমতাশীল হয় যে, আহা! বেচারা এমন অসুস্থ হয়ে গেলো! তার চিকিৎসা করে এবং আল্লাহর কাছে দু'আ করে যে, হে আল্লাহ! তাকে সুস্থ করে দাও। এমনিভাবে গোনাহগার ফাসেক ফাজেরদের সঙ্গেও একই আচরণ করতে হবে যে, তাদের পাপ কাজের প্রতি তো ঘৃণা থাকবে, কিন্তু তাদের সত্তার সঙ্গে কোনো রকম ঘৃণা বা অবজ্ঞা থাকবে না। বরং এই হিসেবে তাদের সঙ্গে মহব্বতের সম্পর্ক থাকতে হবে যে, এরা তো আমার আল্লাহর মাখলুক এবং তাদের জন্যে দু'আ করতে হবে, আল্লাহ যেন তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।
📄 এক ব্যবসায়ীর ক্ষমার ঘটনা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এক ব্যক্তিকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হয়। 'উপস্থিত করা হয়' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে। তবে ভবিষ্যতের অনেক বিষয় নমুনা হিসেবে আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাকে যখন আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হলো, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বললেন, তার আমলনামা দেখো, সে কী কী আমল করেছে? ফেরেশতারা দেখলো, তার আমলনামা প্রায় নেকীশূন্য। না নামায আছে, না রোযা আছে, না আছে অন্য কোনো ইবাদত। দিনরাত তার কাজ ছিলো শুধু ব্যবসা। আল্লাহ সকল বান্দার সব কিছু জানেন, কিন্তু অন্যদের সামনে বিষয়টি প্রকাশ করার জন্যে ফেরেশতাদের বললেন, দেখো তো! তার আমলনামায় অন্য কোনো আমল আছে কি না? তখন ফেরেশতারা বললো, হ্যাঁ, তার একটি নেক আমল আছে। তা হলো, গোলামদেরকে যখন সামানাপত্র দিয়ে ব্যবসার জন্যে পাঠাতো, তখন তাগিদ দিতো যে, কোনো ক্রেতাকে অভাবগ্রস্থ দেখলে তার সঙ্গে সদয় আচরণ করবে। বাকী বিক্রি করে থাকলে পাওনা আদায়ে তার সঙ্গে কঠোরতা করবে না। প্রয়োজনে ক্ষমা করে দিবে। আজীবন সে অভাবীদের সঙ্গে এমন করেছে। হয় সুযোগ দিয়েছে, না হয় ক্ষমা করে দিয়েছে। তখন আল্লাহ বললেন, যাও! সে যখন আমার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দিতো, তাই আমি তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার আরো বেশি হকদার। তোমরা তাকে জান্নাতে পাঠিয়ে দাও। মোটকথা, বান্দার সাথে ক্ষমার আচরণ করা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২১৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯২১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১২২৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৪৬৪