📄 কুকুরকে পানি পান করানোর সওয়াব
বুখারী শরীফে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ব্যভিচারিণী মহিলা সারাজীবন ব্যভিচার করে বেড়িয়েছে। একবার কোথাও যাচ্ছিলো। পথে দেখলো একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চেটে পিপাসা নিবারণের চেষ্টা করছে। কাছেই একটি কূপ ছিলো। ঐ মহিলা পায়ের চামড়ার মোজা খুলে তা দিয়ে কূপ থেকে পানি তুললো এবং ঐ কুকুরকে পান করালো। তার এ আমল আল্লাহর এতোই পছন্দ হলো যে, তিনি তার সব গোনাহ ক্ষমা করে দিলেন। কারণ, বান্দা যখন আল্লাহর এক মাখলুকের সঙ্গে মহব্বত ও দয়ার আচরণ করলো, তখন আল্লাহও বান্দার সঙ্গে মহব্বত ও দয়ার আচরণ করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।' তাই আল্লাহর মাখলুকের সঙ্গে দয়ার আচরণ করা উচিৎ, তা কোনো পশুই হোক না কেন।
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩০৭৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪১৬৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১০১৭৮
📄 দয়ার সুউচ্চ স্তর
আল্লাহ তা'আলা হযরত মাওলানা মাসীহুল্লাহ রহ.-কে মাখলুকের প্রতি দয়া করার অত্যাশ্চর্য ও সুউচ্চ মাকাম দান করেছিলেন। কোনো পশুকে প্রহার করা তো দূরের কথা, তার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যেও কখনো তাঁর হাত উঠতো না। চিন্তা করতেন- এটা তা আল্লাহর মাখলুক। এমনকি একবার তাঁর পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, সেখানে মাছি বসে। স্বভাবতই ক্ষত স্থানে মাছি বসলে বেশি কষ্ট হয়। কিন্তু তথাপিও তিনি মাছিগুলো তাড়াতেন না। নিজের কাজে মগ্ন থাকতেন। একজন এসে এ অবস্থা দেখে বললো, হযরত অনুমতি হলে আমি মাছিগুলো তাড়িয়ে দেই। উত্তরে হযরত বললেন, আরে ভাই! মাছিগুলো নিজের কাজ করছে। আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
তাঁর অন্তরে এই চিন্তা ছিলো যে, এ মাছিগুলো তো আল্লাহর মাখলুক। এগুলোকে এখান থেকে তাড়িয়ে কেন পেরেশান করবো? মোটকথা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মহব্বতের দাবি তখনই সত্য বিবেচিত হবে, যখন তাঁর মাখলুকের প্রতিও অন্তরে মহব্বত থাকবে এবং তাদের প্রতি দয়া থাকবে।
📄 একটি মাছির প্রতি দয়া করা
আমি আমার শাইখ হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ.-এর কাছে অনেক বার এ ঘটনা শুনেছি যে, এক বুযুর্গ অনেক বড়ো আলেম, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির ছিলেন। আজীবন দরস-তাদরীস ও রচনা-গ্রন্থনার কাজে ইলমের দরিয়া বইয়ে দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর একজন তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করলো- হযরত আপনার সঙ্গে আল্লাহ কি আচরণ করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর মেহেরবানী তিনি আমাকে দয়া করেছেন। তবে আমার সঙ্গে বড়ো আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। তাহলো, আমার চিন্তায় ছিলো যে, জীবনে আলহামদুলিল্লাহ দ্বীনের অনেক বড়ো বড়ো খেদমত করেছি। দরস-তাদরীস, ওয়ায-নসীহত, রচনা-গ্রন্থনা ও তাবলীগসহ অনেক খেদমত করেছি। হিসাবের সময় হয়তো সে সব খেদমতের উসিলায় আল্লাহ আমার উপর মেহেরবানী করবেন। কিন্তু ঘটনা হলো এই যে, যখন আল্লাহর সম্মুখীন হলাম তখন আল্লাহ বললেন, তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি। তবে কি কারণে ক্ষমা করছি জানো? চিন্তায় আসলো, আমি দ্বীনের যেসব খেদমত আঞ্জাম দিয়েছি হয়তো সেগুলোর বদৌলতে আমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন। কিন্তু আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে অন্য এক কারণে ক্ষমা করছি, তা হলো- একদিন তুমি কিছু লিখছিলে। তখন কাঠের কলম কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে লেখা হতো। তুমি লেখার জন্যে যখন কালিতে কলম চুবিয়ে উঠালে, তখন একটি মাছি এসে কলমের মাথায় বসে কালি চুষতে লাগলো। তুমি তখন থেমে গিয়েছিলে এবং চিন্তা করেছিলে যে, মাছিটা পিপাসার্ত। সে কালি পান করে যাক, তারপর আমি লিখবো। তখন এভাবে তোমার কলম বন্ধ করে রাখাটা আমার মহব্বতে এবং আমার মাখলুকের মহব্বতে ইখলাসের সঙ্গে হয়েছিলো। তোমার অন্তরে তখন অন্য কোনো প্রেরণা ছিলো না। যাও, আজ আমি সেই আমলের বদৌলতে তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
📄 তাসাওউফ ও খেদমতে খালক্ব
আসলে এটা বড়ো স্পর্শকাতর বিষয় যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত মাখলুকের সঙ্গে মহব্বত হবে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সঙ্গে মহব্বতের দাবি সত্য হতে পারে না। তাই মাওলানা রূমী রহ. তাসাওউফ সম্পর্কে বলছেন,
ز تسبیح و سجاده و دلق نیست ، طریقت بجز خدمت خلق نیست 'তাসবীহ, জায়নামায আর তালি দেওয়া পোষাকের নাম তরীকত নয়। তরীকত খেদমতে খালক ছাড়া অন্য কিছু নয়।'
অর্থাৎ, হাতে তাসবীহ, জায়নামায বিছানো, আর তালি দেওয়া দরবেশী পোষাক পরাকে মানুষ তাসাওউফ নামে অভিহিত করেছে। আসলে এগুলোর নাম তাসাওউফ বা তরীকত নয়। তাসাওউফ বা তরীকত মাখলুকের খেদমত বৈ অন্য কিছু নয়। আল্লাহর নির্দেশ হলো, যদি আমার সঙ্গে তোমরা মহব্বতের দাবি করতে চাও তাহলে আমার মাখলুকের সঙ্গে মহব্বত তৈরী করো এবং তাদের খেদমত করো।