📄 লাইলির ঘর-বাড়ির সঙ্গে মজনুর ভালোবাসা
যখন কারো সঙ্গে ভালোবাসা হয়, তখন তার সবকিছুর সঙ্গে ভালোবাসা হয়। তাই লাইলির প্রেমে মজনু বলেছে,
أَمْرُ عَلَى الدِّيَارِ دِيَارِ لَيْلَى اقَبِلُ ذَا الْجِدَارَ وَ ذَا الْجِدَارًا
‘আমি যখন লাইলির বাড়ি অতিক্রম করি, তখন তার এই দেয়ালে ঐ দেয়ালে চুমু খাই।’
কারণ হলো,
وَمَا حُبُّ الدِّيَارِ شَغَفْنَ قَلْبِي وَلَكِنْ حُبُّ مَنْ سَكَنَ الدِّيَارًا
‘ঐ দেয়ালগুলোর সঙ্গে তো আমার প্রেম-ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই, সেগুলোকে আমি কেন ভালোবাসবো! কিন্তু দেয়ালগুলো যেহেতু আমার প্রেমাস্পদের বাসস্থানের, তাই সেগুলোকেও আমি ভালোবাসি এবং ওখান দিয়ে অতিক্রমকালে সেগুলোকে চুমু খেতে থাকি।’
মজনু যদি লাইলির প্রেমের কারণে তার বাড়ির ইট-পাথরের দেয়ালের প্রেমে আসক্ত হতে পারে, তাহলে আল্লাহর প্রেমিকের অন্তরে তাঁর প্রেম থাকবে অথচ তাঁর মাখলুক ও বান্দার প্রতি ভালোবাসা থাকবে না, তাদের প্রতি দয়া হবে না- এটা কী করে সম্ভব!
টিকাঃ
৬. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৪৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪২৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬২০৬
৭. রওযাতুল মুহিব্বীন ও নুযহাতুল মুশতাকীন, পৃঃ ২৬৪
📄 আল্লাহর মহব্বত কি তাহলে লাইলির মহব্বত অপেক্ষা কম?
মছনবী শরীফে আল্লামা রূমী রহ. লিখেছেন- মজনু তো লাইলির কারণে তার শহরের কুকুরকেও ভালোবাসতো। কারণ, তা প্রেমাস্পদের শহরের কুকুর। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
عشق مولیٰ کے کم از لیلیٰ بوده گوئے گشتن بہر او اولیٰ بود
আরে! মাওলার প্রেম তো দেখি লাইলির প্রেম থেকেও কমে গিয়েছে। যখন এক নশ্বর বস্তুর সঙ্গে এমন মহব্বত হতে পারে, যার ফলে তার কুকুরের সঙ্গেও মহব্বত হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা- যিনি 'মালিকুল মুলক' সকল প্রিয়ের প্রিয়- তাঁর মহব্বতের দাবি তো হলো, তাঁর সকল মাখলুকের সঙ্গেও মহব্বত হবে, তা পশুই হোক না কেন। কারণ, তা আল্লাহর মাখলুক। এ জন্যেই শরীয়ত পশুরও অধিকার নিশ্চিত করেছে। তোমরা তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করবে। তাদের সঙ্গে যেন কোনো প্রকার সীমালঙ্ঘন করবে না।
📄 কুকুরকে পানি পান করানোর সওয়াব
বুখারী শরীফে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ব্যভিচারিণী মহিলা সারাজীবন ব্যভিচার করে বেড়িয়েছে। একবার কোথাও যাচ্ছিলো। পথে দেখলো একটি কুকুর পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চেটে পিপাসা নিবারণের চেষ্টা করছে। কাছেই একটি কূপ ছিলো। ঐ মহিলা পায়ের চামড়ার মোজা খুলে তা দিয়ে কূপ থেকে পানি তুললো এবং ঐ কুকুরকে পান করালো। তার এ আমল আল্লাহর এতোই পছন্দ হলো যে, তিনি তার সব গোনাহ ক্ষমা করে দিলেন। কারণ, বান্দা যখন আল্লাহর এক মাখলুকের সঙ্গে মহব্বত ও দয়ার আচরণ করলো, তখন আল্লাহও বান্দার সঙ্গে মহব্বত ও দয়ার আচরণ করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।' তাই আল্লাহর মাখলুকের সঙ্গে দয়ার আচরণ করা উচিৎ, তা কোনো পশুই হোক না কেন।
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩০৭৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪১৬৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১০১৭৮
📄 দয়ার সুউচ্চ স্তর
আল্লাহ তা'আলা হযরত মাওলানা মাসীহুল্লাহ রহ.-কে মাখলুকের প্রতি দয়া করার অত্যাশ্চর্য ও সুউচ্চ মাকাম দান করেছিলেন। কোনো পশুকে প্রহার করা তো দূরের কথা, তার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যেও কখনো তাঁর হাত উঠতো না। চিন্তা করতেন- এটা তা আল্লাহর মাখলুক। এমনকি একবার তাঁর পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, সেখানে মাছি বসে। স্বভাবতই ক্ষত স্থানে মাছি বসলে বেশি কষ্ট হয়। কিন্তু তথাপিও তিনি মাছিগুলো তাড়াতেন না। নিজের কাজে মগ্ন থাকতেন। একজন এসে এ অবস্থা দেখে বললো, হযরত অনুমতি হলে আমি মাছিগুলো তাড়িয়ে দেই। উত্তরে হযরত বললেন, আরে ভাই! মাছিগুলো নিজের কাজ করছে। আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
তাঁর অন্তরে এই চিন্তা ছিলো যে, এ মাছিগুলো তো আল্লাহর মাখলুক। এগুলোকে এখান থেকে তাড়িয়ে কেন পেরেশান করবো? মোটকথা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মহব্বতের দাবি তখনই সত্য বিবেচিত হবে, যখন তাঁর মাখলুকের প্রতিও অন্তরে মহব্বত থাকবে এবং তাদের প্রতি দয়া থাকবে।