📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 বর্তমান যুগে ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব?

📄 বর্তমান যুগে ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব?


বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হ'ল বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও আইনসভা বা জাতীয় সংসদ। এর মধ্যে বিচার ও শাসন বিভাগের প্রধান পদগুলি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হয়। প্রেসিডেন্ট দেশের প্রধান বিচারপতি মনোনয়ন দেন। অতঃপর তাঁর পরামর্শক্রমে অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দান করেন। প্রধান সেনাপতি ও জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ সমূহে তিনি নিয়োগ দেন। বিদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ ইত্যাদি তাঁর হাতেই রয়েছে। তিনি এসব ব্যাপারে অধঃস্তনদের সাথে পরামর্শ করেন। কিন্তু তাঁকে বাধ্য করার মত কেউ নেই।
বাকী থাকল পার্লামেন্ট বা আইনসভা। এখানে প্রাপ্তবয়ষ্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হন ও তারাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন। অতঃপর তিনি প্রেসিডেন্টের নিকটে শপথ গ্রহণ করেন। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকেই সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাহী ক্ষমতা দান করা হয়েছে। ফলে তাঁর পরামর্শের বাইরে প্রেসিডেন্টের কিছু করার এমনকি বক্তৃতা করারও ক্ষমতা নেই। এটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী প্রেসিডেন্ট-এর পদমর্যাদাকে ক্ষুন্ন করার শামিল।
উপরের চিত্র সামনে রেখে বর্তমান সময়ে নিম্নোক্ত উপায়ে ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারেঃ
দেশের প্রেসিডেন্ট যিনি অবশ্যই বিজ্ঞ মুসলিম ও সামর্থ্যবান পুরুষ হবেন, প্রথমে রাষ্ট্রের এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞ এবং যোগ্য ও মুত্তাক্বী আলেমকে নিজের জন্য পরামর্শদাতা হিসাবে গ্রহণ করবেন। যাঁরা তখন বা পরে কোন প্রশাসনিক পদে থাকবেন না। অতঃপর তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর থেকে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করে নিজের জন্য একটি মজলিসে শূরা বা পার্লামেন্ট নিয়োগ দিবেন। যারা দেশের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দিবেন। তবে তাঁদের পরামর্শ মানতে প্রেসিডেন্ট বাধ্য থাকবেন না। এভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ যিম্মাদার হবেন প্রেসিডেন্ট। অন্যেরা থাকবেন তাঁর পরামর্শদাতা ও সহযোগী।
ইসলামী পরিভাষায় প্রেসিডেন্ট হবেন 'আমীর'। তবে বর্তমান যুগের প্রেসিডেন্টগণের সঙ্গে 'আমীর'-এর পার্থক্য এই যে, 'আমীর' আল্লাহর বিধানের বাইরে কোন বিধান জারি করতে পারেন না এবং অহি-র বিধান জারি করতে কোনরূপ দুর্বলতা প্রদর্শন করবেন না। প্রচলিত 'প্রেসিডেন্ট' পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন ও যেকোন আইন জারি করতে পারেন। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় 'আমীর' স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন না। তিনি সর্বদা আল্লাহ ও মজলিসে শূরার নিকটে এবং জনগণের নিকটে দায়বদ্ধ থাকেন, যা Check and Balance-এর সর্বোত্তম নমুনা হিসাবে কাজ করে।
দেশের বিচার বিভাগ ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিচার করবে এবং তা সর্বদা স্বাধীন থাকবে। 'আমীর' বা যে কোন সরকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সেখানে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। আমীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হ'লে এবং তা ইমারতের অযোগ্যতা প্রমাণ করলে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন ক্রমে 'আমীর' যেকোন সময়ে অপসারিত হবেন। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ইমারত-এর যোগ্য থাকা পর্যন্ত বা মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঐ পদে বহাল থাকবেন।
'আমীর'-এর মৃত্যু হ'লে তাঁর অছিয়ত বা মনোনয়ন মোতাবেক পরবর্তী আমীর নিযুক্ত হবেন। কিংবা তাঁর অথবা পার্লামেন্ট নিয়োজিত একটি ছোট সাব-কমিটি এ দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা প্রয়োজনে সর্বাধুনিক মিডিয়া ব্যবহার করে নিরপেক্ষভাবে জনমত যাচাই করবেন এবং সার্বিক বিবেচনায় সাধ্যপক্ষে যোগ্য 'আমীর' নির্বাচন করবেন। অতঃপর নিযুক্ত আমীরকে সকলে মেনে নিবেন।
নতুন 'আমীর' পুনরায় 'শূরা' গঠন করবেন। তাদের আনুগত্যের বায়'আত নিবেন ও তাদের পরামর্শ মোতাবেক দেশ চালাবেন। মোটকথা বর্তমানের বিচার বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগের সাথে আইনসভা তথা পার্লামেন্ট সদস্য নিয়োগকেও প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হবে। অর্থাৎ 'মজলিসে শূরা' বা জাতীয় সংসদ সদস্যগণ প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হবেন, জনগণের ভোটে নয়। ইসলামী শাসন ও নেতৃত্ব ব্যবস্থায় কেবল 'আমীর' নির্বাচিত হন। অতঃপর তিনি তাঁর শূরা সদস্যদের মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করা কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে একটি ছোট্ট কেবিনেট বা মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।
এর মধ্যে কেউ ডিক্টেটরশিপ-এর গন্ধ পেলে তাকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লালনক্ষেত্র বলে পরিচিত আমেরিকার কেবিনেট ব্যবস্থার দিকে তাকাতে অনুরোধ করব। যেখানকার সদস্যবৃন্দ সকলেই প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হন এবং তারা প্রেসিডেন্ট-এর নিকট দায়ী থাকেন। সেকারণ বলা হয়, 'আমেরিকার কেবিনেট প্রেসিডেন্টের ইচ্ছারই সৃষ্টি'। সেখানকার প্রেসিডেন্ট অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী। অধ্যাপক স্ট্রং বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে কোন শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মত কোন ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি দেখা যায় না'। সামষ্টিক নেতৃত্ব দুর্বল নেতৃত্বেরই শামিল। যা সামাজিক বিশৃংখলার অন্যতম প্রধান কারণ, 'ইসলাম' সর্বদা এককেন্দ্রিক শক্তিশালী নেতৃত্ব কামনা করে, যা সামাজিক শৃংখলা ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত।
ফলাফল ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচনের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, জাতি সর্বদা একদল দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে প্রশাসনের সর্বত্র দেখতে পাবে। ৪, ৫, ৬ বছর অন্তর নেতৃত্ব নির্বাচনের অন্যায় ঝামেলা, অহেতুক অপচয় ও জানমালের ক্ষতি থেকে দেশ বেঁচে যাবে। সামাজিক অনৈক্য ও রাজনৈতিক হানাহানি থেকে জাতি রক্ষা পাবে। একক ও স্থায়ী নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হবে- জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য যা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক সন্ত্রাস থেকে মুক্ত পরিবেশে জাতি একাগ্রচিত্তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারবে। সর্বোপরি বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা দেশীয় রাজনৈতিক দলসমূহকে তাদের এজেন্ট হিসাবে ব্যবহার করতে নিরুৎসাহ হবে। ফলে তাদের এজেন্টদের অপতৎপরতা থেকে জাতি মুক্ত থাকবে।

টিকাঃ
২৮. ডঃ এমাজউদ্দীন আহমাদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা (ঢাকাঃ ১৯৬৪) পৃঃ ৭১৫।
২৯. ঐ, পৃঃ ৭১০।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলাম

📄 জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলাম


গণতন্ত্রে প্রধানতঃ পাঁচটি লোভনীয় প্রস্তাব রয়েছে। ১- ব্যক্তির বদলে জনগণ ক্ষমতার মালিক হবে। ২- ছোট বড়, ভাল ও মন্দ সকলের সার্বজনীন ভোটাধিকার। ৩- রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সার্বজনীন অধিকার। ৪- সার্বভৌম জাতীয় সংসদ এবং সেখানে অধিকাংশের সমর্থনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ৫- বাক, ব্যক্তি ও সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা।
উপরোক্ত পাঁচটি বিষয় মূলতঃ প্রাচীন যুগের অত্যাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। উক্ত পাঁচটিকে একটি বিষয়ে পরিণত করলে দাঁড়াবে যে, ক্ষমতা একজনের হাতে নয়। বরং সমষ্টির হাতে থাকবে। আরও সংক্ষেপে বলা যায়ঃ 'একক ক্ষমতার অবসান, সামষ্টিক ক্ষমতার উত্থান'-এটাই হ'ল গণতন্ত্রের মূল কথা।
আপাত মধুর উক্ত কথাগুলি কতটুকু বাস্তব সম্মত এবং ইসলামী নেতৃত্বের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব কি-না, এক্ষণে আমরা তা যাচাই করে দেখব।
প্রথম কথা হ'লঃ জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। অথচ বাস্তব কথা হ'ল, কেবলমাত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ ব্যতীত গণতন্ত্রে জনগণের আর কোন অধিকার নেই। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই ছলে-বলে-কৌশলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণকে যুলুম করে, শোষণ করে ও তাদের অধিকার হরণ করে। পক্ষান্তরে ইসলামী ইমারতে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে আল্লাহ্র হাতে। ইমারতকে সেখানে জনগণের পবিত্র আমানত মনে করা হয়। সেকারণ আমীর ও তাঁর পার্লামেন্ট সদস্যগণ আল্লাহ ও জনগণ উভয়ের নিকটে জওয়াবদিহী করতে বাধ্য থাকেন। 'আমীর' হন সর্বোচ্চ যিম্মাদার হিসাবে জাতির সবচেয়ে বড় 'খাদেম'।
দ্বিতীয়তঃ সার্বজনীন ভোটাধিকার। সমাজের অধিকাংশ লোকই অদূরদর্শী ও অসচেতন। সর্বোপরি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে অনভিজ্ঞ। এদের ভোটে সৎ ও যোগ্য নেতা নির্বাচিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইসলাম একারণে নেতৃত্ব নির্বাচনের অধিকার ঢালাওভাবে সবার হাতে ছেড়ে দেয়নি। বরং সমাজের সর্বোচ্চ চিন্তাশীল, মুত্তাক্বী-পরহেযগার ও যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে এ দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে। আর সৎ ও যোগ্য এবং আল্লাহভীরু লোকের হাতেই কেবল জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হ'তে পারে, অন্য কোনভাবে নয়।
তৃতীয়তঃ রাষ্ট্রীয় কোষাগার। গণতন্ত্রে সরকারী দল এই কোষাগার হ'তে যথেচ্ছ ঋণ নিয়ে দেশকে তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত করতে পারে। উক্ত দলের একক চিন্তাধারা অনুযায়ী পুঁজিবাদ বা সমাজবাদ বা যে কোন অর্থনীতি তারা চালু করতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামী খেলাফতে জাতীয় বায়তুল মাল রক্ষণাবেক্ষনের জন্য ইমারতের পক্ষ হ'তে ইসলামী নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। ইসলামী অর্থনীতি ব্যতীত সেখানে অন্য কোন অর্থনীতি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে আল্লাহ্র আইন মোতাবেক মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আল্লাহ্র বান্দাগণ সমভাবে আল্লাহ্ দেওয়া অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে পারে।
চতুর্থতঃ জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব। কথাটি মধুর শুনালেও মূলতঃ সেখানে সরকারী দলের বা অধিকাংশদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে সংখ্যালঘুদের বক্তব্য সঠিক ও ন্যায্য হ'লেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। পক্ষান্তরে ইসলামী পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব থাকে আল্লাহ্র হাতে। আল্লাহ্র পক্ষ হ'তে আমীর তা প্রয়োগ করেন মাত্র। সেখানে সরকারী ও বিরোধী দলের কোন অস্তিত্ব থাকেনা। ফলে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু বা একাকী, যার বক্তব্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুকূলে হবে, তার বক্তব্য গৃহীত হবে। এতে কেবল সংখ্যাগুরু নয়, বরং সকল নাগরিকের অধিকার অক্ষুন্ন থাকে।
পঞ্চমতঃ বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রে এগুলি দলতন্ত্রের কাছে পরাভূত হয়। এমনকি দলের লাঠিবাজদের হুমকিতে বিচারবিভাগ পর্যন্ত শংকিত থাকে। বাক, ব্যক্তি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা অত্যন্ত স্পষ্ট। এসবের বিগত দৃষ্টান্তসমূহ কিংবদন্তীর মত মানব জাতির সোনালী ঐতিহ্য হিসাবে ইতিহাসে রক্ষিত আছে। তবে স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা এবং আল্লাহ ও রাসূলের আদর্শ বিরোধী কোন কথা ও কাজের বল্লাহীনতা ইসলামী শাসন বিভাগ কখনোই কাউকে দিতে পারে না। কারণ তা হবে মানবতা ক্ষুন্নকারী ও সমাজে পশুত্ব বিস্তারে উৎসাহ দানকারী এবং নিঃসন্দেহে তা হবে সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা বিনষ্টকারী।
অতএব বলা চলে যে, রাজতন্ত্রের উপরে ক্ষুব্ধ হ'য়ে গণতন্ত্র এনে রাজতন্ত্রের ভাল বিষয়গুলি যেমন দক্ষতা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদিকে বাদ দিয়ে যেভাবে জন অধিকারকে বিনষ্ট করা হয়েছে। অন্যদিকে তেমনি জগাখিচুড়ী গণতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে দলতন্ত্রের চোরাবালিতে গণ অধিকার বিলুপ্ত হয়েছে।
ইসলাম রাজতন্ত্রের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি গুণাবলীকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের অধীন করে রাষ্ট্রপ্রধান বা আমীরকে স্বেচ্ছাচারিতা হ'তে বিরত রেখেছে। সাথে সাথে তাকে জনগণের খাদেম হিসাবে সর্বোচ্চ যিম্মাদারের গুরুদায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হ'লেও রাজার ন্যায় 'আমীর' স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন না। একদিকে আল্লাহ অন্যদিকে মজলিসে শূরার সদস্যদের নিকটে তিনি সর্বদা দায়বদ্ধ থাকেন। সর্বোপরি স্বাধীন ইসলামী আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের দুয়ার যেকোন নাগরিকের জন্য সর্বদা খোলা থাকে। তাই ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থায় আল্লাহ্র বিধান প্রতিষ্ঠা ও তদনুযায়ী দেশ ও সমাজ পরিচালনাই বড় কথা। কোন তন্ত্র-মন্ত্র বড় কথা নয়।
৭ম শতাব্দীর প্রথম সিকি হ'তে বিংশ শতাব্দীর প্রথম সিকি পর্যন্ত স্থায়ী বিশ্ব ইসলামী খেলাফতের সুদীর্ঘ প্রায় ১৩০০ বছরের সময়কালে এবং বর্তমান শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ইমারতের অধীনে শাসিত জনগণ বিশ্বের অন্যান্য যেকোন দেশের জনগণের তুলনায় নিঃসন্দেহে মানবিক মূল্যবোধের স্বাধীনতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ভোগ করছে, যা এযুগে সমাজতন্ত্রী ও গণতন্ত্রীদের জন্য ঈর্ষণীয় বিষয় বৈ-কি!

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


শুরুতে বর্ণিত তিনটি আয়াতের মধ্যে প্রথম আয়াতের নির্দেশ হ'লঃ আমানতকে যথাযোগ্য স্থানে সমর্পণ কর। যোগ্য নেতার নিকটে দায়িত্ব অর্পণের নিয়ম পদ্ধতি আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবন চরিত থেকে পেশ করেছি। দ্বিতীয় আয়াতে আমীরের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র ও সংগঠনে 'আমীর' (হুকুমদাতা) ও 'মামূর' (আদেশ পালনকারী)। এ দু'টি স্তর ব্যতীত মধ্যবর্তী কোন স্তর নেই। আমীরের অধীনে সকল মামূরের অধিকার সমান। সমাজের সর্বত্র এইরূপ আনুগত্যের আবহ সৃষ্টি হ'লে সেখানে পারষ্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পারষ্পরিক হিংসা, অহংকার ও হানাহানি থেকে সমাজ মুক্ত থাকে। এতে সামাজিক ঐক্য ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। আনুগত্যহীন সংগঠন বা আনুগত্যহীন 'ইমারত' আল্লাহ্র কাম্য নয়। এ কারণে হাদীছে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল এবং যে ব্যক্তি আমীরের অবাধ্যতা করল, সে আমার অবাধ্যতা করল'।
তাই আমীরের আনুগত্যে অনেক সময় দুনিয়া হারালেও আখেরাত লাভ অবশ্যম্ভাবী। ইসলামী সংগঠন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আনুগত্যের এই নিঃস্বার্থ ও পরকালীন প্রেরণার বাস্তব প্রতিফলন রয়েছে। যা অন্য কোন সংগঠনে পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয় আয়াতে বিবাদীয় বিষয় সমূহকে ত্বাগুতের কাছে নিয়ে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা মুমিন জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবল আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর বিধানের বাস্তবায়ন থাকবে, শয়তানের প্রবেশাধিকার থাকবে না। আয়াতের শেষাংশে 'শয়তান' বলতে মানবরূপী শয়তানকে বুঝানো হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এরা বিশিষ্ট স্থান দখল করে থাকে। এদের ভিতর ও বাহির এক নয়। দ্বীনদার মুমিনদেরকে এদের থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। যদিও দুনিয়াদারেরা সর্বদা এদের দিকেই যেতে চাইবে।
সরল-সিধা সাধারণ মানুষকে প্রতারণায় ভুলিয়ে এই ধরনের লোকেরাই আজকের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিগণ নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকেন। কেউ ভোটাভুটিতে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাজিত হন। এছাড়াও অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও প্রশাসনে অধিকাংশ স্বার্থপর শয়তানী নেতৃত্বের হাতে এঁরা চোখ বুজে মার খান। তাই বর্তমান কালের এই নোংরা নির্বাচন ব্যবস্থার অভিশাপে বিপর্যস্ত সমাজকে বাঁচাতে হ'লে অবিলম্বে ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থা কায়েম করা আশু যরূরী।

টিকাঃ
৩০. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬১ 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 ইসলামে নেতৃত্ব নির্বাচনঃ এক নজরে

📄 ইসলামে নেতৃত্ব নির্বাচনঃ এক নজরে


রাষ্ট্রের একজন নির্বাচিত 'আমীর' বা প্রেসিডেন্ট থাকবেন। তাঁর একটি মনোনীত 'মজলিসে শূরা' বা জাতীয় সংসদ থাকবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুণী ব্যক্তিদের নিকট থেকেও তিনি পরামর্শ গ্রহণ করবেন। এম,পি নির্বাচনের প্রচলিত প্রথা থাকবে না। দল ও প্রার্থীভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা থাকবে না। সরকারী ও বিরোধী দল বলে কিছুই থাকবে না। প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি মনোনয়ন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য এবং প্রতিভা বিকাশের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সংগঠন সমূহ থাকবে। জনকল্যাণমূলক বিভিন্নমুখী তৎপরতার মাধ্যমে সৃষ্টির সেবা করা, প্রশাসনকে দিক নির্দেশনা দান এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ হবে সকল সংগঠনের মূল লক্ষ্য।
মনে রাখতে হবে যে, প্রকৃত সত্য ও কল্যাণ ইসলামেই নিহিত রয়েছে। তাছাড়া পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন হ'লেও মানব চরিত্রের কোন পরিবর্তন নেই। অতএব মানবরচিত বিভিন্ন মতবাদ যা কুরআন ও সুন্নাহ্ ঐশী বিধানের সাথে সংঘর্ষশীল, তা যতই আপাতমধুর হৌক না কেন, আখেরাতে বিশ্বাসী কোন মুমিন তা কখনোই মেনে নিতে পারে না। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন- আমীন!
আমরা চাই এমন একটি ইসলামী সমাজ, যেখানে থাকবেনা প্রগতির নামে কোন বিজাতীয় মতবাদ; থাকবেনা ইসলামের নামে কোনরূপ মাযহাবী সংকীর্ণতাবাদ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px