📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সামাজিক কুফল

📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সামাজিক কুফল


(১) যেহেতু নিজের বা দলীয় তহবিল ব্যতীত প্রচলিত নির্বাচনী যুদ্ধে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু জাতীয় সংসদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিপতিদের আধিপত্য কায়েম হয়। ফলে গরীবদের ভোট নিয়ে ধনীরাই সংসদ দখল করে। এবং সমাজের সর্বত্র তারা অর্থনৈতিক শোষণ পাকাপোক্ত করার সুযোগ লাভ করে। ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জনগণের সঞ্চিত অর্থ দেশের মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ের নামে তারা যেমন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তেমনি ঋণখেলাপী হ'য়ে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকরভাবে কিছুই করার থাকে না। কেননা এদের কাছ থেকে মোটা অংকের তহবিল নিয়েই রাজনৈতিক দল সমূহ পরিচালিত হয়। তাই কি সরকারী দল কি বিরোধী দল সবাই এদের বিরুদ্ধে চুপটি মেরে থাকে। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের হাতে দেশের সকল সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছিল। আর বাংলাদেশ আমলে তা এখন ১৫৬ জনের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে এবং যার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ফলে দেশের অর্থনীতি দিন দিন পঙ্গু হ'তে চলেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কিছু সংখ্যক দলনেতা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল। অন্যদিকে হাযার হাযার বনু আদম না খেয়ে মরেছিল। আজও দেশ তেমনি অবস্থার শিকার হ'তে চলেছে। অথচ দেশে বিগত ৩৩ বছর যাবত গণতন্ত্রের জয়জয়কার চলছে এবং জাতীয় সরকার থেকে উপযেলা ও গ্রাম সরকার পর্যন্ত ভোটাভুটির মাধ্যমে সর্বত্র নেতা নির্বাচিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কিন্তু দেশ ও সমাজ ক্রমে রসাতলে যাচ্ছে।
(২) নির্বাচনী প্রথায় একাধিক ভোটপ্রার্থী থাকায় পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব ও রেষারেষি সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের পরেও এই অবস্থা বর্তমান থাকে। যা সমাজে হিংসা-হানাহানি, এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত সৃষ্টি করে। অনেকের বিবি তালাকের ঘটনাও ঘটে। এভাবে সমাজের সর্বনিম্ন ইউনিট পারিবারিক ব্যবস্থা পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়ে (৩) বর্তমান নির্বাচনী প্রথায় সরকারী ও বিরোধী দল থাকায় তাদের মধ্যে দলীয় বিদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী হয়। যার প্রতিক্রিয়া সমাজের সর্বত্র দেখা দেয়। ফলে সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। শান্তি ও অগ্রগতি ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয় (৪) বহুদলীয় নির্বাচন প্রথায় অনেকগুলি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এমতাবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তি বা দলকে অন্য দল আন্তরিকভাবে সমর্থন করে না। ফলে সর্বদা পরষ্পরে শত্রুতার পরিবেশ বজায় থাকে। যা সামাজিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে (৫) দলীয় নির্বাচন প্রথা দলীয় 'আছাবিয়াত' বা অহংবোধ সৃষ্টি করে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে সরকারী দল ভাল কাজ করলেও বিরোধী দল চোখ বুঁজে থাকে বা তার অপব্যাখ্যা করে (৬) প্রচলিত প্রথায় জাতীয় সংসদ সদস্যদেরকে স্ব স্ব এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। নির্বাচিত হওয়ার অহংকারে তিনি সর্বদা স্ফীত থাকেন। তিনি অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত হ'লেও দলনেতা বা সংসদ নেতা তাকে সরাতে পারেন না। ফলে পূর্ণ মেয়াদকাল অবধি জাতিকে এইসব এমপি নামধারী লোকদের বোঝা বইতে হয়। এলাকার প্রশাসনে ও জননিরাপত্তা বিধানে এদের আইনতঃ কোন ভূমিকা না থাকলেও জনপ্রতিনিধি হবার দোহাই দিয়ে এরা সর্বদা প্রশাসনের উপরে তাদের অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সুষ্ঠু প্রশাসন অনেকসময় বিঘ্নিত হয় (৭) এই প্রথায় নেতা নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও সুস্থিরভাবে কাজ করতে পারেন না। কেননা তাকে সর্বদা বিরোধী দলের তোপের মুখে থাকতে হয়। যা তার বা তার দলের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত করে। অন্যদিকে নিজ দলের স্বার্থশিকারী, দুর্নীতিবাজ নেতা ও সন্ত্রাসীদের কাছে দলনেতাকে কার্যতঃ যিম্মী হয়ে থাকতে হয়। ফলে সমাজে তার ব্যাপক মন্দ প্রভাব পড়ে (৮) এই ব্যবস্থায় সৎ-অসৎ, গুণী-নির্গুণ, নারী-পুরুষ সকলের ভোটের মূল্য সমান হওয়ায় 'হবু ও গবুর রাজ্যে তেল ও ঘিয়ের মূল্য সমান' হওয়ার ন্যায় সমাজে ছোট-বড় কোন ভেদাভেদ থাকে না। মানীর মান থাকে না। সৎ, যোগ্য ও গুণীজনের কদর থাকে না। তথাকথিত সাম্যের নামে মানুষের সমাজ পশুর সমাজে পরিণত হয় (৯) এই ব্যবস্থায় মুসলিম-অমুসলিম সকল নাগরিক অংশগ্রহণ করে থাকে ও যাকে খুশী তাকে নেতৃত্বে বসায়। অথচ মুসলিমগণ কেবলমাত্র ইসলামী বিধান মানতে বাধ্য। যা একজন ইসলামী নেতার মাধ্যমেই কেবল বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ফলে এই নির্বাচন ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার খৃষ্টানী চক্রান্ত বৈ কিছুই নয়।
সবশেষে বলা চলে যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বের সর্বত্র সামাজিক অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হ'ল প্রচলিত এই নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা। কেন্দ্রে ও স্থানীয় সংস্থা সমূহের সর্বত্র এই নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সর্বত্র নেতৃত্বের লড়াই, পারষ্পরিক হিংসা-হানাহানি এবং সামাজিক অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 শূরার গুরুত্ব ও পরিধি

📄 শূরার গুরুত্ব ও পরিধি


সাংগঠনিক ইমারত হৌক বা রাষ্ট্রীয় ইমারত হৌক শূরার গুরুত্ব সবসময় বেশী। 'আমীর' তাঁর সাংগঠনিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সর্বদা মজলিসে শূরা-র পরামর্শ নিবেন এটাই আল্লাহর হুকুম এবং এটাই হ'ল বৈষয়িক বিষয়সমূহে ইসলামের বুনিয়াদী মূলনীতি। যেমন-
(১) আল্লাহ বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ، وَلَوْ كُنْتَ فَظَّا غَلَيْظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ، فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ، إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ - রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহ'লে তারা আপনার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আপনার কর্মকাণ্ডে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তখন আল্লাহ্র উপরে ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার উপরে ভরসাকারীদের ভালবাসেন (আলে-ইমরান ১৫৯)।
(২) মুমিনের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ 'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, ছালাত কায়েম করে, পারষ্পরিক পরামর্শ মতে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করে' (শূরা ৩৮)।
(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বৈষয়িক ব্যাপার সমূহে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিতেন। যেমন মদীনায় হিজরত করার পরে লোকদের যখন দেখলেন যে, তারা পুং খেজুর গাছের কেশর মাদী খেজুর গাছের কেশরে লাগাচ্ছে, তখন তিনি এটাকে অপসন্দ করলেন। তখন লোকেরা এটা পরিত্যাগ করল। ফলে খেজুরের ফলন কমে গেল। তখন লোকেরা রাসূলের নিকটে গেলে বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ أَمْرِ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ رَأَبِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَر - (তোমাদের মত) একজন মানুষ। আমি যখন দ্বীনী বিষয়ে তোমাদের কোন নির্দেশ দেই, তখন তা তোমরা গ্রহণ কর। আর যখন (বৈষয়িক ব্যাপারে) আমার নিজের মত অনুযায়ী কোন নির্দেশ দেই, তখন আমি একজন মানুষ মাত্র' (অতএব তাতে আমার ভুল হ'তে পারে)।
(৪) হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) ২৩ হিজরী সনে জীবনের শেষ হজ্জ পালন করার সময় মিনায় অবস্থানকালে লোকদের কিছু মন্তব্য তাঁর কানে আসে এই মর্মে যে, ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যু হ'লে আমরা অমুকের হাতে খলীফা হিসাবে বায়'আত করব। কেননা আবুবকর (রাঃ) সামান্য কয়েকজন লোকের বায়'আতের মাধ্যমে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। একথা শুনে তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। অতঃপর মদীনায় ফিরে এসে জুম'আর খুৎবায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে বিবাহিত যেনাকার নারী-পুরুষদের রজমের বিষয়ে বলেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পরে খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে ইতিপূর্বে শোনা কথার مَنْ بَايَعَ رَجُلًا مِّنْ غَيْرِ مَشْوَرَةٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ فَلا يُبَايِعُ هُوَ وَلَا الَّذِي بَايَعَهُ تَغَرَّةً أَنْ يُقْتَلاَ পরামর্শ ব্যতিরেকে কাউকে খলীফা হিসাবে বায়'আত করল, তার বায়'আত সিদ্ধ হবে না। সে এবং তার হাতে বায়'আতকারী উভয়ে নিজেদেরকে কতলের শিকার বানিয়ে নিল'।
ইবনু হাজার বলেন, এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে, খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে তড়িঘড়ি না করার জন্য। কেননা আবুবকর (রাঃ)-এর মত সর্বগুণাবলী সম্পন্ন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব পাওয়া সর্বযুগে সম্ভব নয়'।
উপরের দলীলসমূহ দ্বারা জাতীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য ব্যাপক ভিত্তিক মতামত গ্রহণের ও সর্বস্তরে জনমত যাচাইয়ের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) নিজেও বিভিন্ন জাতীয় সমস্যায় ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপক পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমীর নির্বাচনের জন্য শুধুমাত্র শূরা সদস্যদের রায়ই যথেষ্ট, না আম জনসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন আছে। এর জবাব হ'ল এই যে, শূরা সদস্যগণকে অবশ্যই আম জনগণের সমর্থন যাচাই করতে হবে। যেমন ওছমান (রাঃ)-এর বেলায় করা হয়েছিল। জনসমর্থনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই শূরা সদস্যগণ আমীর নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিবেন। যদি দু'জন সমান যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে একজনের প্রতি জনসমর্থন বেশী হয় তাহ'লে শূরা সদস্যগণ তাঁকেই 'আমীর' ঘোষণা করবেন। তবে সর্বাবস্থায় 'আমীর' নির্বাচনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক হ'লেন শূরা সদস্যগণ। ওমর ফারুক (রাঃ)-এর নিজস্ব আমলই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এমনিভাবে যেসব বিষয়ে শরী'আতের স্পষ্ট বিধান মওজুদ রয়েছে, সেগুলি বাদে কোন ইজতিহাদী বিষয়ে যখন শূরার পরামর্শ গ্রহণ করা হবে, তখন আমীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিবেন। যেমন খন্দকের যুদ্ধের সময় গাত্বফান গোত্রের সাথে সন্ধির বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কেবলমাত্র দু'জন সা'দ অর্থাৎ আউস নেতা সা'দ বিন মু'আয ও খাযরাজ নেতা সা'দ বিন 'ওবাদাহ (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করেন ও পরে নিজের মত পরিবর্তন করেন। জাতির সামগ্রিক স্বার্থের বিষয়ে তিনি সবার নিকট থেকে পরামর্শ নিতেন। যেমন বদর, ওহোদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময়ে তিনি সবার নিকট থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। বিশেষ করে আনছারদের নিকট থেকে, যারা তাঁকে সাহায্য করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে হিজরতের পূর্বে হজ্জের মৌসুমে মক্কায় তাঁর হাতে বায়'আত করেছিলেন। ওহোদের যুদ্ধে তিনি নিজের রায় বাদ দিয়ে যুবকদের ও অধিকাংশ মদীনাবাসীর রায় অনুযায়ী মদীনার বাইরে এসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। এতদ্ব্যতীত সাধারণভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) 'শায়খান' অর্থাৎ হযরত আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর পরামর্শ নিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দিতেন। এমনকি তিনি তাদেরকে বলতেন لَوِ اجْتَمَعْتُمَا فِي رَأَى مَا خَالَفْتُكُمَا 'যদি তোমরা দু'জন কোন বিষয়ে একমত হও, তাহ'লে আমি তোমাদের বিরোধিতা করব না'।
জনমত যাচাইয়ের অর্থ এটা নয় যে, 'আম' জনগণ সবাই শূরা সদস্য এবং তাদের সকলের সমর্থন, অনুমতি ও ঐক্যমত ব্যতীত 'আমীর' নির্বাচন বা যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, যেমনটি ধারণা করেছেন আধুনিক যুগের কোন কোন ইসলামী চিন্তাবিদ। নিঃসন্দেহে সর্বদা শূরার গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমন হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত গ্রহণের অনুরোধ করা হ'লে তিনি প্রত্যাখ্যান করে لَيْسَ هَذَا لَكُمْ إِنَّمَا هُوَ لِأَهْلِ بَدْرٍ وَ أَهْلِ السُّورَى فَمَنْ رَضِيَ بِهِ أَهْلُ السُّورَى وَ أَهْلُ بَدْرٍ فَهُوَ الْخَلِيفَةُ فَتَجْتَمِعُ وَ تَنْظُرُ فِي هَذَا الْأَمْرِ 'এটা তোমাদের এখতিয়ার নয়। বরং এটি বদরী ছাহাবা ও শূরা সদস্যদের দায়িত্ব। তাঁরা একত্রে বসে যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই খলীফা হবেন'। তবে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব অনুযায়ী 'আমীর' শূরা সদস্যগণের এবং প্রয়োজনে সকল স্তরের জনগণের মতামত ও সমর্থন যাচাই করবেন ও সেমতে সিদ্ধান্ত নিবেন। এভাবে পরামর্শ গ্রহণ শেষে আমীরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ 'তুমি লোকদের পরামর্শ নাও। অতঃপর যখন স্থির প্রতিজ্ঞ হবে, তখন আল্লাহ্র উপরে ভরসা কর' (আলে ইমরান ১৫৯)।

টিকাঃ
২২. মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৪০, কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়িয়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
২৩. বুখারী ২/১০০৯ পৃঃ।
২৪. ফাৎহুলবারী হা/৬৮৩০-এর ব্যাখ্যা 'হুদুদ' অধ্যায় ৩১ নং অনুচ্ছেদ, ১২/১৫৫ পৃঃ।
২৫. আহমাদ ৪/২২৭; আশ-শূরা পৃঃ ৪।
২৬. أهل السُّورَى هُمْ عُمُوْمُ النَّاسِ إِذَا كَانَ الْأَمْرُ سَيَتَعَلَّقُ بِعُمُوْمِهِمْ كَاخْتِيَارِ الْخَلِيفَةِ . وَإِعْلَانِ الْحَرْبِ وَالْحَاكِمِ দ্রঃ আশ-শূরা পৃঃ ১০১।
২৭. আশ-শূরা পৃঃ ১০৩।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 বর্তমান যুগে ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব?

📄 বর্তমান যুগে ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থা কিভাবে সম্ভব?


বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হ'ল বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও আইনসভা বা জাতীয় সংসদ। এর মধ্যে বিচার ও শাসন বিভাগের প্রধান পদগুলি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হয়। প্রেসিডেন্ট দেশের প্রধান বিচারপতি মনোনয়ন দেন। অতঃপর তাঁর পরামর্শক্রমে অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দান করেন। প্রধান সেনাপতি ও জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ সমূহে তিনি নিয়োগ দেন। বিদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ ইত্যাদি তাঁর হাতেই রয়েছে। তিনি এসব ব্যাপারে অধঃস্তনদের সাথে পরামর্শ করেন। কিন্তু তাঁকে বাধ্য করার মত কেউ নেই।
বাকী থাকল পার্লামেন্ট বা আইনসভা। এখানে প্রাপ্তবয়ষ্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হন ও তারাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন। অতঃপর তিনি প্রেসিডেন্টের নিকটে শপথ গ্রহণ করেন। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকেই সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাহী ক্ষমতা দান করা হয়েছে। ফলে তাঁর পরামর্শের বাইরে প্রেসিডেন্টের কিছু করার এমনকি বক্তৃতা করারও ক্ষমতা নেই। এটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী প্রেসিডেন্ট-এর পদমর্যাদাকে ক্ষুন্ন করার শামিল।
উপরের চিত্র সামনে রেখে বর্তমান সময়ে নিম্নোক্ত উপায়ে ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারেঃ
দেশের প্রেসিডেন্ট যিনি অবশ্যই বিজ্ঞ মুসলিম ও সামর্থ্যবান পুরুষ হবেন, প্রথমে রাষ্ট্রের এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞ এবং যোগ্য ও মুত্তাক্বী আলেমকে নিজের জন্য পরামর্শদাতা হিসাবে গ্রহণ করবেন। যাঁরা তখন বা পরে কোন প্রশাসনিক পদে থাকবেন না। অতঃপর তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর থেকে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করে নিজের জন্য একটি মজলিসে শূরা বা পার্লামেন্ট নিয়োগ দিবেন। যারা দেশের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দিবেন। তবে তাঁদের পরামর্শ মানতে প্রেসিডেন্ট বাধ্য থাকবেন না। এভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ যিম্মাদার হবেন প্রেসিডেন্ট। অন্যেরা থাকবেন তাঁর পরামর্শদাতা ও সহযোগী।
ইসলামী পরিভাষায় প্রেসিডেন্ট হবেন 'আমীর'। তবে বর্তমান যুগের প্রেসিডেন্টগণের সঙ্গে 'আমীর'-এর পার্থক্য এই যে, 'আমীর' আল্লাহর বিধানের বাইরে কোন বিধান জারি করতে পারেন না এবং অহি-র বিধান জারি করতে কোনরূপ দুর্বলতা প্রদর্শন করবেন না। প্রচলিত 'প্রেসিডেন্ট' পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন ও যেকোন আইন জারি করতে পারেন। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থায় 'আমীর' স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন না। তিনি সর্বদা আল্লাহ ও মজলিসে শূরার নিকটে এবং জনগণের নিকটে দায়বদ্ধ থাকেন, যা Check and Balance-এর সর্বোত্তম নমুনা হিসাবে কাজ করে।
দেশের বিচার বিভাগ ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিচার করবে এবং তা সর্বদা স্বাধীন থাকবে। 'আমীর' বা যে কোন সরকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সেখানে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। আমীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হ'লে এবং তা ইমারতের অযোগ্যতা প্রমাণ করলে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন ক্রমে 'আমীর' যেকোন সময়ে অপসারিত হবেন। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ইমারত-এর যোগ্য থাকা পর্যন্ত বা মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঐ পদে বহাল থাকবেন।
'আমীর'-এর মৃত্যু হ'লে তাঁর অছিয়ত বা মনোনয়ন মোতাবেক পরবর্তী আমীর নিযুক্ত হবেন। কিংবা তাঁর অথবা পার্লামেন্ট নিয়োজিত একটি ছোট সাব-কমিটি এ দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা প্রয়োজনে সর্বাধুনিক মিডিয়া ব্যবহার করে নিরপেক্ষভাবে জনমত যাচাই করবেন এবং সার্বিক বিবেচনায় সাধ্যপক্ষে যোগ্য 'আমীর' নির্বাচন করবেন। অতঃপর নিযুক্ত আমীরকে সকলে মেনে নিবেন।
নতুন 'আমীর' পুনরায় 'শূরা' গঠন করবেন। তাদের আনুগত্যের বায়'আত নিবেন ও তাদের পরামর্শ মোতাবেক দেশ চালাবেন। মোটকথা বর্তমানের বিচার বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগের সাথে আইনসভা তথা পার্লামেন্ট সদস্য নিয়োগকেও প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হবে। অর্থাৎ 'মজলিসে শূরা' বা জাতীয় সংসদ সদস্যগণ প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হবেন, জনগণের ভোটে নয়। ইসলামী শাসন ও নেতৃত্ব ব্যবস্থায় কেবল 'আমীর' নির্বাচিত হন। অতঃপর তিনি তাঁর শূরা সদস্যদের মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করা কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে একটি ছোট্ট কেবিনেট বা মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।
এর মধ্যে কেউ ডিক্টেটরশিপ-এর গন্ধ পেলে তাকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লালনক্ষেত্র বলে পরিচিত আমেরিকার কেবিনেট ব্যবস্থার দিকে তাকাতে অনুরোধ করব। যেখানকার সদস্যবৃন্দ সকলেই প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হন এবং তারা প্রেসিডেন্ট-এর নিকট দায়ী থাকেন। সেকারণ বলা হয়, 'আমেরিকার কেবিনেট প্রেসিডেন্টের ইচ্ছারই সৃষ্টি'। সেখানকার প্রেসিডেন্ট অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী। অধ্যাপক স্ট্রং বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে কোন শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মত কোন ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি দেখা যায় না'। সামষ্টিক নেতৃত্ব দুর্বল নেতৃত্বেরই শামিল। যা সামাজিক বিশৃংখলার অন্যতম প্রধান কারণ, 'ইসলাম' সর্বদা এককেন্দ্রিক শক্তিশালী নেতৃত্ব কামনা করে, যা সামাজিক শৃংখলা ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত।
ফলাফল ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচনের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, জাতি সর্বদা একদল দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে প্রশাসনের সর্বত্র দেখতে পাবে। ৪, ৫, ৬ বছর অন্তর নেতৃত্ব নির্বাচনের অন্যায় ঝামেলা, অহেতুক অপচয় ও জানমালের ক্ষতি থেকে দেশ বেঁচে যাবে। সামাজিক অনৈক্য ও রাজনৈতিক হানাহানি থেকে জাতি রক্ষা পাবে। একক ও স্থায়ী নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হবে- জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য যা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক সন্ত্রাস থেকে মুক্ত পরিবেশে জাতি একাগ্রচিত্তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারবে। সর্বোপরি বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা দেশীয় রাজনৈতিক দলসমূহকে তাদের এজেন্ট হিসাবে ব্যবহার করতে নিরুৎসাহ হবে। ফলে তাদের এজেন্টদের অপতৎপরতা থেকে জাতি মুক্ত থাকবে।

টিকাঃ
২৮. ডঃ এমাজউদ্দীন আহমাদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা (ঢাকাঃ ১৯৬৪) পৃঃ ৭১৫।
২৯. ঐ, পৃঃ ৭১০।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলাম

📄 জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলাম


গণতন্ত্রে প্রধানতঃ পাঁচটি লোভনীয় প্রস্তাব রয়েছে। ১- ব্যক্তির বদলে জনগণ ক্ষমতার মালিক হবে। ২- ছোট বড়, ভাল ও মন্দ সকলের সার্বজনীন ভোটাধিকার। ৩- রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সার্বজনীন অধিকার। ৪- সার্বভৌম জাতীয় সংসদ এবং সেখানে অধিকাংশের সমর্থনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ৫- বাক, ব্যক্তি ও সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা।
উপরোক্ত পাঁচটি বিষয় মূলতঃ প্রাচীন যুগের অত্যাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। উক্ত পাঁচটিকে একটি বিষয়ে পরিণত করলে দাঁড়াবে যে, ক্ষমতা একজনের হাতে নয়। বরং সমষ্টির হাতে থাকবে। আরও সংক্ষেপে বলা যায়ঃ 'একক ক্ষমতার অবসান, সামষ্টিক ক্ষমতার উত্থান'-এটাই হ'ল গণতন্ত্রের মূল কথা।
আপাত মধুর উক্ত কথাগুলি কতটুকু বাস্তব সম্মত এবং ইসলামী নেতৃত্বের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব কি-না, এক্ষণে আমরা তা যাচাই করে দেখব।
প্রথম কথা হ'লঃ জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। অথচ বাস্তব কথা হ'ল, কেবলমাত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ ব্যতীত গণতন্ত্রে জনগণের আর কোন অধিকার নেই। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই ছলে-বলে-কৌশলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণকে যুলুম করে, শোষণ করে ও তাদের অধিকার হরণ করে। পক্ষান্তরে ইসলামী ইমারতে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে আল্লাহ্র হাতে। ইমারতকে সেখানে জনগণের পবিত্র আমানত মনে করা হয়। সেকারণ আমীর ও তাঁর পার্লামেন্ট সদস্যগণ আল্লাহ ও জনগণ উভয়ের নিকটে জওয়াবদিহী করতে বাধ্য থাকেন। 'আমীর' হন সর্বোচ্চ যিম্মাদার হিসাবে জাতির সবচেয়ে বড় 'খাদেম'।
দ্বিতীয়তঃ সার্বজনীন ভোটাধিকার। সমাজের অধিকাংশ লোকই অদূরদর্শী ও অসচেতন। সর্বোপরি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে অনভিজ্ঞ। এদের ভোটে সৎ ও যোগ্য নেতা নির্বাচিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইসলাম একারণে নেতৃত্ব নির্বাচনের অধিকার ঢালাওভাবে সবার হাতে ছেড়ে দেয়নি। বরং সমাজের সর্বোচ্চ চিন্তাশীল, মুত্তাক্বী-পরহেযগার ও যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে এ দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে। আর সৎ ও যোগ্য এবং আল্লাহভীরু লোকের হাতেই কেবল জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হ'তে পারে, অন্য কোনভাবে নয়।
তৃতীয়তঃ রাষ্ট্রীয় কোষাগার। গণতন্ত্রে সরকারী দল এই কোষাগার হ'তে যথেচ্ছ ঋণ নিয়ে দেশকে তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত করতে পারে। উক্ত দলের একক চিন্তাধারা অনুযায়ী পুঁজিবাদ বা সমাজবাদ বা যে কোন অর্থনীতি তারা চালু করতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামী খেলাফতে জাতীয় বায়তুল মাল রক্ষণাবেক্ষনের জন্য ইমারতের পক্ষ হ'তে ইসলামী নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। ইসলামী অর্থনীতি ব্যতীত সেখানে অন্য কোন অর্থনীতি প্রবেশ করতে পারে না। ফলে আল্লাহ্র আইন মোতাবেক মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আল্লাহ্র বান্দাগণ সমভাবে আল্লাহ্ দেওয়া অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে পারে।
চতুর্থতঃ জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব। কথাটি মধুর শুনালেও মূলতঃ সেখানে সরকারী দলের বা অধিকাংশদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে সংখ্যালঘুদের বক্তব্য সঠিক ও ন্যায্য হ'লেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। পক্ষান্তরে ইসলামী পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব থাকে আল্লাহ্র হাতে। আল্লাহ্র পক্ষ হ'তে আমীর তা প্রয়োগ করেন মাত্র। সেখানে সরকারী ও বিরোধী দলের কোন অস্তিত্ব থাকেনা। ফলে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু বা একাকী, যার বক্তব্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুকূলে হবে, তার বক্তব্য গৃহীত হবে। এতে কেবল সংখ্যাগুরু নয়, বরং সকল নাগরিকের অধিকার অক্ষুন্ন থাকে।
পঞ্চমতঃ বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রে এগুলি দলতন্ত্রের কাছে পরাভূত হয়। এমনকি দলের লাঠিবাজদের হুমকিতে বিচারবিভাগ পর্যন্ত শংকিত থাকে। বাক, ব্যক্তি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে ইসলামী নীতিমালা অত্যন্ত স্পষ্ট। এসবের বিগত দৃষ্টান্তসমূহ কিংবদন্তীর মত মানব জাতির সোনালী ঐতিহ্য হিসাবে ইতিহাসে রক্ষিত আছে। তবে স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা এবং আল্লাহ ও রাসূলের আদর্শ বিরোধী কোন কথা ও কাজের বল্লাহীনতা ইসলামী শাসন বিভাগ কখনোই কাউকে দিতে পারে না। কারণ তা হবে মানবতা ক্ষুন্নকারী ও সমাজে পশুত্ব বিস্তারে উৎসাহ দানকারী এবং নিঃসন্দেহে তা হবে সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা বিনষ্টকারী।
অতএব বলা চলে যে, রাজতন্ত্রের উপরে ক্ষুব্ধ হ'য়ে গণতন্ত্র এনে রাজতন্ত্রের ভাল বিষয়গুলি যেমন দক্ষতা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদিকে বাদ দিয়ে যেভাবে জন অধিকারকে বিনষ্ট করা হয়েছে। অন্যদিকে তেমনি জগাখিচুড়ী গণতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে দলতন্ত্রের চোরাবালিতে গণ অধিকার বিলুপ্ত হয়েছে।
ইসলাম রাজতন্ত্রের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি গুণাবলীকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের অধীন করে রাষ্ট্রপ্রধান বা আমীরকে স্বেচ্ছাচারিতা হ'তে বিরত রেখেছে। সাথে সাথে তাকে জনগণের খাদেম হিসাবে সর্বোচ্চ যিম্মাদারের গুরুদায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হ'লেও রাজার ন্যায় 'আমীর' স্বেচ্ছাচারী হ'তে পারেন না। একদিকে আল্লাহ অন্যদিকে মজলিসে শূরার সদস্যদের নিকটে তিনি সর্বদা দায়বদ্ধ থাকেন। সর্বোপরি স্বাধীন ইসলামী আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের দুয়ার যেকোন নাগরিকের জন্য সর্বদা খোলা থাকে। তাই ইসলামী নেতৃত্ব ব্যবস্থায় আল্লাহ্র বিধান প্রতিষ্ঠা ও তদনুযায়ী দেশ ও সমাজ পরিচালনাই বড় কথা। কোন তন্ত্র-মন্ত্র বড় কথা নয়।
৭ম শতাব্দীর প্রথম সিকি হ'তে বিংশ শতাব্দীর প্রথম সিকি পর্যন্ত স্থায়ী বিশ্ব ইসলামী খেলাফতের সুদীর্ঘ প্রায় ১৩০০ বছরের সময়কালে এবং বর্তমান শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ইমারতের অধীনে শাসিত জনগণ বিশ্বের অন্যান্য যেকোন দেশের জনগণের তুলনায় নিঃসন্দেহে মানবিক মূল্যবোধের স্বাধীনতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ভোগ করছে, যা এযুগে সমাজতন্ত্রী ও গণতন্ত্রীদের জন্য ঈর্ষণীয় বিষয় বৈ-কি!

ফন্ট সাইজ
15px
17px