📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি ও ইসলাম
পূর্বে বর্ণিত চারটি নির্বাচন পদ্ধতির চতুর্থটি অর্থাৎ আধুনিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সৎ ও যোগ্য নেতা নির্বাচিত হওয়া এবং তার মাধ্যমে ইসলামী বিধান কায়েম হওয়া সম্ভব কি-না এবং ইসলামে এ পদ্ধতির অনুমোদন আছে কি-না এক্ষণে আমরা তা খতিয়ে দেখব।
ইসলামপন্থী দলগুলো সাধারণভাবে এই সুধারণা পোষণ করে থাকে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যতীত যেহেতু ইসলামী বিধান পূর্ণভাবে কায়েম হওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার বাছাই করা সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়া হবে। অতঃপর তারা নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে এসে ইসলামী বিধি-বিধান জারি করার ব্যবস্থা করবেন। চিন্তাটি বড়ই সাধু। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্করুণ। কেননা শুধু ইসলাম কেন কোন আদর্শভিত্তিক জীবন ব্যবস্থাই প্রচলিত প্রথায় জনগণের সার্বজনীন ভোটাভুটির মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। বরং এটাই বাস্তব কথা যে, নবীগণ পৃথিবীর সেরা মানুষ হ'লেও তাঁরা কখনোই স্ব স্ব যুগের অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পাননি। তাই আজও অধিকাংশ মানুষের সমর্থনে সৎ ও যোগ্য লোকের নেতা নির্বাচিত হওয়া কষ্টকল্পনা বৈ কিছুই নয়।
যদি মনে করা হয় যে, নির্বাচক ও নির্বাচন প্রার্থী উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলী নির্ধারণ করে দিলে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই হয়ে আসবে। যেমন উভয়ে চোর, গুণ্ডা, সন্ত্রাসী, দাগী আসামী, ঋণখেলাপী, চোরাচালানী, ঘুষখোর ও বেঈমান হবে না। বরং উভয়কেই সৎ ও যোগ্য, ঈমানদার, আমানতদার ও মুত্তাক্বী হ'তে হবে ইত্যাদি। তবুও সঠিক নেতৃত্ব আসবেনা। কারণ সবাই নিজেকে নেতা হবার যোগ্য মনে করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অধিকার রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। আর এই ধারণা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক যুগে নেতৃত্বের মেয়াদ প্রথা। যাতে প্রতি ৪/৫ বছর অন্তর নতুন নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ আসে। আর ঐ সুযোগ পাওয়ার জন্য সকলের মধ্যেই সৃষ্টি হয় নেতৃত্ব পাওয়ার লোভ, যা তাকে পাগল করে ফেলে পরবর্তী নেতা হবার জন্য। আর এর জন্য হেন অপরাধ নেই যা সে প্রকাশ্যে বা গোপনে করে না।
📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যক্তিগত কুফল
(১) সে দু'হাতে নিজের বা দলের টাকা খরচ করে (২) সে নিজের গুণগান করে ও প্রতিপক্ষের চরিত্র হননে ব্যস্ত হয়ে পড়ে (৩) সে সমাজ ও সরকারের দুষ্টমতি লোকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যাতে সমাজের অধিকাংশ দুনিয়াদার, অদূরদর্শী ও হুজুগে লোকদের ভোট লাভ করতে পারে (৪) ভোটের সংখ্যাধিক্য হারজিতের মানদণ্ড হওয়ার কারণে সে যেকোন মূল্যে একটি ভোট হ'লেও তা বৃদ্ধির চেষ্টা করে ও যেকোন অপকৌশল ও নোংরা পন্থা অবলম্বন করে বা করতে বাধ্য হয় (৫) নেতা হওয়ার অধিকার তারও আছে, এটা প্রকাশ করার জন্য সে প্রথমে মনোনয়ন প্রার্থী হয় ও যথারীতি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। অতঃপর নিজে বা দলীয় কর্মীগণ সর্বত্র মিটিং-মিছিল করে, পোষ্টার-বিজ্ঞাপন বিতরণ করে। বাড়ী বাড়ী গিয়ে দো'আ চাওয়ার নামে ভোট ভিক্ষা করে। এইভাবে নিজের বা দলের হাযার হাযার টাকা সে পানির মত খরচ করে। যার অধিকাংশই অপচয় ছাড়া কিছু নয়। যদি সে ভোটে হেরে যায়। তাহ'লে সব হারায়। আর যদি জিতে যায়, তাহ'লে তার প্রথম লক্ষ্য হয় ব্যয়কৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের পথ বের করা। এর জন্য যেকোন অপকৌশলের আশ্রয় নিতে সে পরোয়া করে না। এগুলি হ'ল প্রচলিত নির্বাচন প্রথার ব্যক্তিগত কুফল। এক্ষণে এর সামাজিক কুফল আমরা অবলোকন করব।-
📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সামাজিক কুফল
(১) যেহেতু নিজের বা দলীয় তহবিল ব্যতীত প্রচলিত নির্বাচনী যুদ্ধে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু জাতীয় সংসদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিপতিদের আধিপত্য কায়েম হয়। ফলে গরীবদের ভোট নিয়ে ধনীরাই সংসদ দখল করে। এবং সমাজের সর্বত্র তারা অর্থনৈতিক শোষণ পাকাপোক্ত করার সুযোগ লাভ করে। ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জনগণের সঞ্চিত অর্থ দেশের মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ের নামে তারা যেমন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তেমনি ঋণখেলাপী হ'য়ে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকরভাবে কিছুই করার থাকে না। কেননা এদের কাছ থেকে মোটা অংকের তহবিল নিয়েই রাজনৈতিক দল সমূহ পরিচালিত হয়। তাই কি সরকারী দল কি বিরোধী দল সবাই এদের বিরুদ্ধে চুপটি মেরে থাকে। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের হাতে দেশের সকল সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছিল। আর বাংলাদেশ আমলে তা এখন ১৫৬ জনের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে এবং যার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ফলে দেশের অর্থনীতি দিন দিন পঙ্গু হ'তে চলেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কিছু সংখ্যক দলনেতা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল। অন্যদিকে হাযার হাযার বনু আদম না খেয়ে মরেছিল। আজও দেশ তেমনি অবস্থার শিকার হ'তে চলেছে। অথচ দেশে বিগত ৩৩ বছর যাবত গণতন্ত্রের জয়জয়কার চলছে এবং জাতীয় সরকার থেকে উপযেলা ও গ্রাম সরকার পর্যন্ত ভোটাভুটির মাধ্যমে সর্বত্র নেতা নির্বাচিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কিন্তু দেশ ও সমাজ ক্রমে রসাতলে যাচ্ছে।
(২) নির্বাচনী প্রথায় একাধিক ভোটপ্রার্থী থাকায় পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব ও রেষারেষি সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের পরেও এই অবস্থা বর্তমান থাকে। যা সমাজে হিংসা-হানাহানি, এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত সৃষ্টি করে। অনেকের বিবি তালাকের ঘটনাও ঘটে। এভাবে সমাজের সর্বনিম্ন ইউনিট পারিবারিক ব্যবস্থা পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়ে (৩) বর্তমান নির্বাচনী প্রথায় সরকারী ও বিরোধী দল থাকায় তাদের মধ্যে দলীয় বিদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী হয়। যার প্রতিক্রিয়া সমাজের সর্বত্র দেখা দেয়। ফলে সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। শান্তি ও অগ্রগতি ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয় (৪) বহুদলীয় নির্বাচন প্রথায় অনেকগুলি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এমতাবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তি বা দলকে অন্য দল আন্তরিকভাবে সমর্থন করে না। ফলে সর্বদা পরষ্পরে শত্রুতার পরিবেশ বজায় থাকে। যা সামাজিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে (৫) দলীয় নির্বাচন প্রথা দলীয় 'আছাবিয়াত' বা অহংবোধ সৃষ্টি করে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে সরকারী দল ভাল কাজ করলেও বিরোধী দল চোখ বুঁজে থাকে বা তার অপব্যাখ্যা করে (৬) প্রচলিত প্রথায় জাতীয় সংসদ সদস্যদেরকে স্ব স্ব এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। নির্বাচিত হওয়ার অহংকারে তিনি সর্বদা স্ফীত থাকেন। তিনি অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত হ'লেও দলনেতা বা সংসদ নেতা তাকে সরাতে পারেন না। ফলে পূর্ণ মেয়াদকাল অবধি জাতিকে এইসব এমপি নামধারী লোকদের বোঝা বইতে হয়। এলাকার প্রশাসনে ও জননিরাপত্তা বিধানে এদের আইনতঃ কোন ভূমিকা না থাকলেও জনপ্রতিনিধি হবার দোহাই দিয়ে এরা সর্বদা প্রশাসনের উপরে তাদের অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সুষ্ঠু প্রশাসন অনেকসময় বিঘ্নিত হয় (৭) এই প্রথায় নেতা নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও সুস্থিরভাবে কাজ করতে পারেন না। কেননা তাকে সর্বদা বিরোধী দলের তোপের মুখে থাকতে হয়। যা তার বা তার দলের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত করে। অন্যদিকে নিজ দলের স্বার্থশিকারী, দুর্নীতিবাজ নেতা ও সন্ত্রাসীদের কাছে দলনেতাকে কার্যতঃ যিম্মী হয়ে থাকতে হয়। ফলে সমাজে তার ব্যাপক মন্দ প্রভাব পড়ে (৮) এই ব্যবস্থায় সৎ-অসৎ, গুণী-নির্গুণ, নারী-পুরুষ সকলের ভোটের মূল্য সমান হওয়ায় 'হবু ও গবুর রাজ্যে তেল ও ঘিয়ের মূল্য সমান' হওয়ার ন্যায় সমাজে ছোট-বড় কোন ভেদাভেদ থাকে না। মানীর মান থাকে না। সৎ, যোগ্য ও গুণীজনের কদর থাকে না। তথাকথিত সাম্যের নামে মানুষের সমাজ পশুর সমাজে পরিণত হয় (৯) এই ব্যবস্থায় মুসলিম-অমুসলিম সকল নাগরিক অংশগ্রহণ করে থাকে ও যাকে খুশী তাকে নেতৃত্বে বসায়। অথচ মুসলিমগণ কেবলমাত্র ইসলামী বিধান মানতে বাধ্য। যা একজন ইসলামী নেতার মাধ্যমেই কেবল বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ফলে এই নির্বাচন ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার খৃষ্টানী চক্রান্ত বৈ কিছুই নয়।
সবশেষে বলা চলে যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বের সর্বত্র সামাজিক অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হ'ল প্রচলিত এই নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা। কেন্দ্রে ও স্থানীয় সংস্থা সমূহের সর্বত্র এই নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সর্বত্র নেতৃত্বের লড়াই, পারষ্পরিক হিংসা-হানাহানি এবং সামাজিক অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে।
📄 শূরার গুরুত্ব ও পরিধি
সাংগঠনিক ইমারত হৌক বা রাষ্ট্রীয় ইমারত হৌক শূরার গুরুত্ব সবসময় বেশী। 'আমীর' তাঁর সাংগঠনিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সর্বদা মজলিসে শূরা-র পরামর্শ নিবেন এটাই আল্লাহর হুকুম এবং এটাই হ'ল বৈষয়িক বিষয়সমূহে ইসলামের বুনিয়াদী মূলনীতি। যেমন-
(১) আল্লাহ বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ، وَلَوْ كُنْتَ فَظَّا غَلَيْظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ، فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ، إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ - রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহ'লে তারা আপনার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আপনার কর্মকাণ্ডে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তখন আল্লাহ্র উপরে ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার উপরে ভরসাকারীদের ভালবাসেন (আলে-ইমরান ১৫৯)।
(২) মুমিনের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ 'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, ছালাত কায়েম করে, পারষ্পরিক পরামর্শ মতে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় করে' (শূরা ৩৮)।
(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বৈষয়িক ব্যাপার সমূহে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিতেন। যেমন মদীনায় হিজরত করার পরে লোকদের যখন দেখলেন যে, তারা পুং খেজুর গাছের কেশর মাদী খেজুর গাছের কেশরে লাগাচ্ছে, তখন তিনি এটাকে অপসন্দ করলেন। তখন লোকেরা এটা পরিত্যাগ করল। ফলে খেজুরের ফলন কমে গেল। তখন লোকেরা রাসূলের নিকটে গেলে বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ أَمْرِ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ رَأَبِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَر - (তোমাদের মত) একজন মানুষ। আমি যখন দ্বীনী বিষয়ে তোমাদের কোন নির্দেশ দেই, তখন তা তোমরা গ্রহণ কর। আর যখন (বৈষয়িক ব্যাপারে) আমার নিজের মত অনুযায়ী কোন নির্দেশ দেই, তখন আমি একজন মানুষ মাত্র' (অতএব তাতে আমার ভুল হ'তে পারে)।
(৪) হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) ২৩ হিজরী সনে জীবনের শেষ হজ্জ পালন করার সময় মিনায় অবস্থানকালে লোকদের কিছু মন্তব্য তাঁর কানে আসে এই মর্মে যে, ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যু হ'লে আমরা অমুকের হাতে খলীফা হিসাবে বায়'আত করব। কেননা আবুবকর (রাঃ) সামান্য কয়েকজন লোকের বায়'আতের মাধ্যমে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। একথা শুনে তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। অতঃপর মদীনায় ফিরে এসে জুম'আর খুৎবায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে বিবাহিত যেনাকার নারী-পুরুষদের রজমের বিষয়ে বলেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পরে খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে ইতিপূর্বে শোনা কথার مَنْ بَايَعَ رَجُلًا مِّنْ غَيْرِ مَشْوَرَةٍ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ فَلا يُبَايِعُ هُوَ وَلَا الَّذِي بَايَعَهُ تَغَرَّةً أَنْ يُقْتَلاَ পরামর্শ ব্যতিরেকে কাউকে খলীফা হিসাবে বায়'আত করল, তার বায়'আত সিদ্ধ হবে না। সে এবং তার হাতে বায়'আতকারী উভয়ে নিজেদেরকে কতলের শিকার বানিয়ে নিল'।
ইবনু হাজার বলেন, এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে, খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে তড়িঘড়ি না করার জন্য। কেননা আবুবকর (রাঃ)-এর মত সর্বগুণাবলী সম্পন্ন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব পাওয়া সর্বযুগে সম্ভব নয়'।
উপরের দলীলসমূহ দ্বারা জাতীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য ব্যাপক ভিত্তিক মতামত গ্রহণের ও সর্বস্তরে জনমত যাচাইয়ের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) নিজেও বিভিন্ন জাতীয় সমস্যায় ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপক পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমীর নির্বাচনের জন্য শুধুমাত্র শূরা সদস্যদের রায়ই যথেষ্ট, না আম জনসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন আছে। এর জবাব হ'ল এই যে, শূরা সদস্যগণকে অবশ্যই আম জনগণের সমর্থন যাচাই করতে হবে। যেমন ওছমান (রাঃ)-এর বেলায় করা হয়েছিল। জনসমর্থনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই শূরা সদস্যগণ আমীর নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিবেন। যদি দু'জন সমান যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে একজনের প্রতি জনসমর্থন বেশী হয় তাহ'লে শূরা সদস্যগণ তাঁকেই 'আমীর' ঘোষণা করবেন। তবে সর্বাবস্থায় 'আমীর' নির্বাচনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক হ'লেন শূরা সদস্যগণ। ওমর ফারুক (রাঃ)-এর নিজস্ব আমলই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এমনিভাবে যেসব বিষয়ে শরী'আতের স্পষ্ট বিধান মওজুদ রয়েছে, সেগুলি বাদে কোন ইজতিহাদী বিষয়ে যখন শূরার পরামর্শ গ্রহণ করা হবে, তখন আমীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিবেন। যেমন খন্দকের যুদ্ধের সময় গাত্বফান গোত্রের সাথে সন্ধির বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কেবলমাত্র দু'জন সা'দ অর্থাৎ আউস নেতা সা'দ বিন মু'আয ও খাযরাজ নেতা সা'দ বিন 'ওবাদাহ (রাঃ)-এর সাথে পরামর্শ করেন ও পরে নিজের মত পরিবর্তন করেন। জাতির সামগ্রিক স্বার্থের বিষয়ে তিনি সবার নিকট থেকে পরামর্শ নিতেন। যেমন বদর, ওহোদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময়ে তিনি সবার নিকট থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। বিশেষ করে আনছারদের নিকট থেকে, যারা তাঁকে সাহায্য করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে হিজরতের পূর্বে হজ্জের মৌসুমে মক্কায় তাঁর হাতে বায়'আত করেছিলেন। ওহোদের যুদ্ধে তিনি নিজের রায় বাদ দিয়ে যুবকদের ও অধিকাংশ মদীনাবাসীর রায় অনুযায়ী মদীনার বাইরে এসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। এতদ্ব্যতীত সাধারণভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) 'শায়খান' অর্থাৎ হযরত আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর পরামর্শ নিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দিতেন। এমনকি তিনি তাদেরকে বলতেন لَوِ اجْتَمَعْتُمَا فِي رَأَى مَا خَالَفْتُكُمَا 'যদি তোমরা দু'জন কোন বিষয়ে একমত হও, তাহ'লে আমি তোমাদের বিরোধিতা করব না'।
জনমত যাচাইয়ের অর্থ এটা নয় যে, 'আম' জনগণ সবাই শূরা সদস্য এবং তাদের সকলের সমর্থন, অনুমতি ও ঐক্যমত ব্যতীত 'আমীর' নির্বাচন বা যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, যেমনটি ধারণা করেছেন আধুনিক যুগের কোন কোন ইসলামী চিন্তাবিদ। নিঃসন্দেহে সর্বদা শূরার গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমন হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত গ্রহণের অনুরোধ করা হ'লে তিনি প্রত্যাখ্যান করে لَيْسَ هَذَا لَكُمْ إِنَّمَا هُوَ لِأَهْلِ بَدْرٍ وَ أَهْلِ السُّورَى فَمَنْ رَضِيَ بِهِ أَهْلُ السُّورَى وَ أَهْلُ بَدْرٍ فَهُوَ الْخَلِيفَةُ فَتَجْتَمِعُ وَ تَنْظُرُ فِي هَذَا الْأَمْرِ 'এটা তোমাদের এখতিয়ার নয়। বরং এটি বদরী ছাহাবা ও শূরা সদস্যদের দায়িত্ব। তাঁরা একত্রে বসে যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই খলীফা হবেন'। তবে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব অনুযায়ী 'আমীর' শূরা সদস্যগণের এবং প্রয়োজনে সকল স্তরের জনগণের মতামত ও সমর্থন যাচাই করবেন ও সেমতে সিদ্ধান্ত নিবেন। এভাবে পরামর্শ গ্রহণ শেষে আমীরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ 'তুমি লোকদের পরামর্শ নাও। অতঃপর যখন স্থির প্রতিজ্ঞ হবে, তখন আল্লাহ্র উপরে ভরসা কর' (আলে ইমরান ১৫৯)।
টিকাঃ
২২. মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৪০, কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়িয়ে ধরা' অনুচ্ছেদ।
২৩. বুখারী ২/১০০৯ পৃঃ।
২৪. ফাৎহুলবারী হা/৬৮৩০-এর ব্যাখ্যা 'হুদুদ' অধ্যায় ৩১ নং অনুচ্ছেদ, ১২/১৫৫ পৃঃ।
২৫. আহমাদ ৪/২২৭; আশ-শূরা পৃঃ ৪।
২৬. أهل السُّورَى هُمْ عُمُوْمُ النَّاسِ إِذَا كَانَ الْأَمْرُ سَيَتَعَلَّقُ بِعُمُوْمِهِمْ كَاخْتِيَارِ الْخَلِيفَةِ . وَإِعْلَانِ الْحَرْبِ وَالْحَاكِمِ দ্রঃ আশ-শূরা পৃঃ ১০১।
২৭. আশ-শূরা পৃঃ ১০৩।