📄 ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতিঃ তুলনা মূলক আলোচনা
প্রচলিত চারটি নির্বাচন পদ্ধতির প্রথম দু'টির সাথে ইসলামের সম্পর্ক স্বাভাবিক। তৃতীয়টিতে যদি বাদশাহ কোন দ্বীনদার যোগ্য ব্যক্তিকে পরবর্তী বাদশাহ নিয়োগ করেন, তাহ'লে ইসলাম তাকে সমর্থন দেয়। যেমন হযরত আবুবকর (রাঃ) করেছিলেন হযরত ওমর (রাঃ)-কে এবং ওমর (রাঃ)-এর মনোনীত শূরার মাধ্যমে হযরত ওছমান (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হন। যেমন উমাইয়া খলীফা সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক (৯৬-৯৯হিঃ/৭১৫-৭১৭খৃঃ) স্বীয় ভাতিজা ওমর বিন আবদুল আযীয (রাঃ)-কে খলীফা মনোনীত করেছিলেন। হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আঃ) পিতার পরে পুত্র উভয়ে পৃথিবীর বাদশাহ ছিলেন। যদি নেতৃত্ব নিয়ে আপোষে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে সে অবস্থায় উম্মতের কোন সেরা ব্যক্তি একজনকে নেতা হিসাবে নির্বাচন করলে তাকেই সকলে মেনে নিবেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচা আব্বাস (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে প্রথমে খেলাফতের বায়'আত করেন। তখন সকলেই তা মেনে নেন।
উল্লেখ্য যে, রাসূলের মৃত্যুর সময় আরব উপদ্বীপে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের কাছাকাছি এবং ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় ইসলামী খেলাফতের আয়তন ছিল ১,২০,০০০ (এক লক্ষ বিশ হাযার) বর্গমাইল। অথচ নেতৃত্ব নির্বাচন হয়েছিল কেবলমাত্র মদীনার দারুল খেলাফতে উপস্থিত সেরা মনীষী বৃন্দের মাধ্যমে। অন্যদের এতে কোন ভূমিকা ছিল না।
মোট কথা যোগ্য নেতা নির্বাচনের জন্য যোগ্য নির্বাচক প্রয়োজন। যেটা উপরে বর্ণিত তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে সম্ভব। পূর্বতন নেতা যেকোন একটি গ্রহণ করতে পারেন। ইবনে হাযম আন্দালুসী (মৃঃ ৪৫৬হিঃ) বলেন, প্রথমোক্ত পন্থাই আমাদের নিকটে সবচেয়ে উত্তম। কেননা এর ফলে উম্মতের ঐক্য ও সমাজের শৃংখলা বজায় থাকে। অন্য পন্থাগুলিতে উম্মতের মধ্যে অনৈক্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় এবং নেতৃত্বের লোভ বাপকভাবে মাথা চাড়া দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে'।
টিকাঃ
১৯. বাক্বারাহ ২৫১, ছোয়াদ ৩৫।
২০. খেলাফত পৃঃ ৯২, ৮৬।
২১. কিতাবুল ফাছল ফিল মিলাল (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ ২য় সংস্করণ ১৪২০ হিঃ/১৯৯৯ খৃঃ) ৩/৯৭ পৃঃ।
📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি ও ইসলাম
পূর্বে বর্ণিত চারটি নির্বাচন পদ্ধতির চতুর্থটি অর্থাৎ আধুনিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সৎ ও যোগ্য নেতা নির্বাচিত হওয়া এবং তার মাধ্যমে ইসলামী বিধান কায়েম হওয়া সম্ভব কি-না এবং ইসলামে এ পদ্ধতির অনুমোদন আছে কি-না এক্ষণে আমরা তা খতিয়ে দেখব।
ইসলামপন্থী দলগুলো সাধারণভাবে এই সুধারণা পোষণ করে থাকে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যতীত যেহেতু ইসলামী বিধান পূর্ণভাবে কায়েম হওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার বাছাই করা সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরকে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়া হবে। অতঃপর তারা নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে এসে ইসলামী বিধি-বিধান জারি করার ব্যবস্থা করবেন। চিন্তাটি বড়ই সাধু। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্করুণ। কেননা শুধু ইসলাম কেন কোন আদর্শভিত্তিক জীবন ব্যবস্থাই প্রচলিত প্রথায় জনগণের সার্বজনীন ভোটাভুটির মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। বরং এটাই বাস্তব কথা যে, নবীগণ পৃথিবীর সেরা মানুষ হ'লেও তাঁরা কখনোই স্ব স্ব যুগের অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পাননি। তাই আজও অধিকাংশ মানুষের সমর্থনে সৎ ও যোগ্য লোকের নেতা নির্বাচিত হওয়া কষ্টকল্পনা বৈ কিছুই নয়।
যদি মনে করা হয় যে, নির্বাচক ও নির্বাচন প্রার্থী উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলী নির্ধারণ করে দিলে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই হয়ে আসবে। যেমন উভয়ে চোর, গুণ্ডা, সন্ত্রাসী, দাগী আসামী, ঋণখেলাপী, চোরাচালানী, ঘুষখোর ও বেঈমান হবে না। বরং উভয়কেই সৎ ও যোগ্য, ঈমানদার, আমানতদার ও মুত্তাক্বী হ'তে হবে ইত্যাদি। তবুও সঠিক নেতৃত্ব আসবেনা। কারণ সবাই নিজেকে নেতা হবার যোগ্য মনে করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অধিকার রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। আর এই ধারণা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক যুগে নেতৃত্বের মেয়াদ প্রথা। যাতে প্রতি ৪/৫ বছর অন্তর নতুন নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ আসে। আর ঐ সুযোগ পাওয়ার জন্য সকলের মধ্যেই সৃষ্টি হয় নেতৃত্ব পাওয়ার লোভ, যা তাকে পাগল করে ফেলে পরবর্তী নেতা হবার জন্য। আর এর জন্য হেন অপরাধ নেই যা সে প্রকাশ্যে বা গোপনে করে না।
📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যক্তিগত কুফল
(১) সে দু'হাতে নিজের বা দলের টাকা খরচ করে (২) সে নিজের গুণগান করে ও প্রতিপক্ষের চরিত্র হননে ব্যস্ত হয়ে পড়ে (৩) সে সমাজ ও সরকারের দুষ্টমতি লোকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যাতে সমাজের অধিকাংশ দুনিয়াদার, অদূরদর্শী ও হুজুগে লোকদের ভোট লাভ করতে পারে (৪) ভোটের সংখ্যাধিক্য হারজিতের মানদণ্ড হওয়ার কারণে সে যেকোন মূল্যে একটি ভোট হ'লেও তা বৃদ্ধির চেষ্টা করে ও যেকোন অপকৌশল ও নোংরা পন্থা অবলম্বন করে বা করতে বাধ্য হয় (৫) নেতা হওয়ার অধিকার তারও আছে, এটা প্রকাশ করার জন্য সে প্রথমে মনোনয়ন প্রার্থী হয় ও যথারীতি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। অতঃপর নিজে বা দলীয় কর্মীগণ সর্বত্র মিটিং-মিছিল করে, পোষ্টার-বিজ্ঞাপন বিতরণ করে। বাড়ী বাড়ী গিয়ে দো'আ চাওয়ার নামে ভোট ভিক্ষা করে। এইভাবে নিজের বা দলের হাযার হাযার টাকা সে পানির মত খরচ করে। যার অধিকাংশই অপচয় ছাড়া কিছু নয়। যদি সে ভোটে হেরে যায়। তাহ'লে সব হারায়। আর যদি জিতে যায়, তাহ'লে তার প্রথম লক্ষ্য হয় ব্যয়কৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের পথ বের করা। এর জন্য যেকোন অপকৌশলের আশ্রয় নিতে সে পরোয়া করে না। এগুলি হ'ল প্রচলিত নির্বাচন প্রথার ব্যক্তিগত কুফল। এক্ষণে এর সামাজিক কুফল আমরা অবলোকন করব।-
📄 গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সামাজিক কুফল
(১) যেহেতু নিজের বা দলীয় তহবিল ব্যতীত প্রচলিত নির্বাচনী যুদ্ধে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু জাতীয় সংসদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিপতিদের আধিপত্য কায়েম হয়। ফলে গরীবদের ভোট নিয়ে ধনীরাই সংসদ দখল করে। এবং সমাজের সর্বত্র তারা অর্থনৈতিক শোষণ পাকাপোক্ত করার সুযোগ লাভ করে। ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জনগণের সঞ্চিত অর্থ দেশের মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ের নামে তারা যেমন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তেমনি ঋণখেলাপী হ'য়ে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকরভাবে কিছুই করার থাকে না। কেননা এদের কাছ থেকে মোটা অংকের তহবিল নিয়েই রাজনৈতিক দল সমূহ পরিচালিত হয়। তাই কি সরকারী দল কি বিরোধী দল সবাই এদের বিরুদ্ধে চুপটি মেরে থাকে। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের হাতে দেশের সকল সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছিল। আর বাংলাদেশ আমলে তা এখন ১৫৬ জনের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে এবং যার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ফলে দেশের অর্থনীতি দিন দিন পঙ্গু হ'তে চলেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কিছু সংখ্যক দলনেতা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল। অন্যদিকে হাযার হাযার বনু আদম না খেয়ে মরেছিল। আজও দেশ তেমনি অবস্থার শিকার হ'তে চলেছে। অথচ দেশে বিগত ৩৩ বছর যাবত গণতন্ত্রের জয়জয়কার চলছে এবং জাতীয় সরকার থেকে উপযেলা ও গ্রাম সরকার পর্যন্ত ভোটাভুটির মাধ্যমে সর্বত্র নেতা নির্বাচিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কিন্তু দেশ ও সমাজ ক্রমে রসাতলে যাচ্ছে।
(২) নির্বাচনী প্রথায় একাধিক ভোটপ্রার্থী থাকায় পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব ও রেষারেষি সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের পরেও এই অবস্থা বর্তমান থাকে। যা সমাজে হিংসা-হানাহানি, এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত সৃষ্টি করে। অনেকের বিবি তালাকের ঘটনাও ঘটে। এভাবে সমাজের সর্বনিম্ন ইউনিট পারিবারিক ব্যবস্থা পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়ে (৩) বর্তমান নির্বাচনী প্রথায় সরকারী ও বিরোধী দল থাকায় তাদের মধ্যে দলীয় বিদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী হয়। যার প্রতিক্রিয়া সমাজের সর্বত্র দেখা দেয়। ফলে সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। শান্তি ও অগ্রগতি ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয় (৪) বহুদলীয় নির্বাচন প্রথায় অনেকগুলি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এমতাবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তি বা দলকে অন্য দল আন্তরিকভাবে সমর্থন করে না। ফলে সর্বদা পরষ্পরে শত্রুতার পরিবেশ বজায় থাকে। যা সামাজিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে (৫) দলীয় নির্বাচন প্রথা দলীয় 'আছাবিয়াত' বা অহংবোধ সৃষ্টি করে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে সরকারী দল ভাল কাজ করলেও বিরোধী দল চোখ বুঁজে থাকে বা তার অপব্যাখ্যা করে (৬) প্রচলিত প্রথায় জাতীয় সংসদ সদস্যদেরকে স্ব স্ব এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। নির্বাচিত হওয়ার অহংকারে তিনি সর্বদা স্ফীত থাকেন। তিনি অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত হ'লেও দলনেতা বা সংসদ নেতা তাকে সরাতে পারেন না। ফলে পূর্ণ মেয়াদকাল অবধি জাতিকে এইসব এমপি নামধারী লোকদের বোঝা বইতে হয়। এলাকার প্রশাসনে ও জননিরাপত্তা বিধানে এদের আইনতঃ কোন ভূমিকা না থাকলেও জনপ্রতিনিধি হবার দোহাই দিয়ে এরা সর্বদা প্রশাসনের উপরে তাদের অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সুষ্ঠু প্রশাসন অনেকসময় বিঘ্নিত হয় (৭) এই প্রথায় নেতা নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও সুস্থিরভাবে কাজ করতে পারেন না। কেননা তাকে সর্বদা বিরোধী দলের তোপের মুখে থাকতে হয়। যা তার বা তার দলের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত করে। অন্যদিকে নিজ দলের স্বার্থশিকারী, দুর্নীতিবাজ নেতা ও সন্ত্রাসীদের কাছে দলনেতাকে কার্যতঃ যিম্মী হয়ে থাকতে হয়। ফলে সমাজে তার ব্যাপক মন্দ প্রভাব পড়ে (৮) এই ব্যবস্থায় সৎ-অসৎ, গুণী-নির্গুণ, নারী-পুরুষ সকলের ভোটের মূল্য সমান হওয়ায় 'হবু ও গবুর রাজ্যে তেল ও ঘিয়ের মূল্য সমান' হওয়ার ন্যায় সমাজে ছোট-বড় কোন ভেদাভেদ থাকে না। মানীর মান থাকে না। সৎ, যোগ্য ও গুণীজনের কদর থাকে না। তথাকথিত সাম্যের নামে মানুষের সমাজ পশুর সমাজে পরিণত হয় (৯) এই ব্যবস্থায় মুসলিম-অমুসলিম সকল নাগরিক অংশগ্রহণ করে থাকে ও যাকে খুশী তাকে নেতৃত্বে বসায়। অথচ মুসলিমগণ কেবলমাত্র ইসলামী বিধান মানতে বাধ্য। যা একজন ইসলামী নেতার মাধ্যমেই কেবল বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ফলে এই নির্বাচন ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার খৃষ্টানী চক্রান্ত বৈ কিছুই নয়।
সবশেষে বলা চলে যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বের সর্বত্র সামাজিক অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হ'ল প্রচলিত এই নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা। কেন্দ্রে ও স্থানীয় সংস্থা সমূহের সর্বত্র এই নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সর্বত্র নেতৃত্বের লড়াই, পারষ্পরিক হিংসা-হানাহানি এবং সামাজিক অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে।