📄 নির্বাচকের যোগ্যতা ও গুণাবলী
জনগণের মধ্যে সর্বদা দু'টি দল পরিলক্ষিত হয়। একদল নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পন্ন (أَهْلُ الإِمَامَة) এবং একদল অনুসারী ও নেতৃত্ব বাছাইকারী (أَهْلُ الْإِخْتِيَارِ)। নেতৃত্ব বাছাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ, সৎ ও দূরদর্শী নির্বাচক মণ্ডলী অবশ্য প্রয়োজন। কেননা স্বার্থপর, অসৎ ও অদূরদর্শী ব্যক্তি কখনোই সৎ ও যোগ্য নেতা বাছাইয়ের গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারে না। রাষ্ট্রনীতি বিশারদ পণ্ডিত আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দী (মৃঃ ৪৫০ হিঃ) নির্বাচকের জন্য প্রধান তিনটি গুণ বর্ণনা করেছেনঃ (১) ন্যায়নিষ্ঠা (الْعَدَالَة) যেখানে কোনরূপ অন্যায় ও সংকীর্ণতা স্থান পাবেনা (২) জ্ঞান (العِلْمُ) অর্থাৎ সম্ভাব্য নেতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা এই মর্মে যে, তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের শর্তাবলী পূর্ণভাবে মওজুদ রয়েছে (৩) দূরদর্শিতা ও রায় দানের ক্ষমতা (الرَّأَى وَالْحِكْمَةُ) এই মর্মে যে, কে নেতৃত্বের জন্য সর্বাধিক অগ্রগণ্য ও দক্ষতা সম্পন্ন।
নেতৃত্বের জন্য উপরোক্ত তিনটি গুণের সাথে তিনি আরও চারটি গুণ তিনি যোগ করেছেনঃ (১) কান, চোখ ও জিহ্বা ঠিক থাকার মাধ্যমে দৈহিক অনুভূতি পূর্ণ মাত্রায় বহাল থাকা (২) দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকা (৩) বীরত্ব ও সাহসিকতা। যাতে বিরোধী পক্ষের সাথে জিহাদ ও মোকাবিলায় তিনি যোগ্য প্রমাণিত হন (৪) কুরায়শী হওয়া। যদিও এটি সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য নয়। তবে কুরআনের মৌলিক নির্দেশ অনুযায়ী শূরা সদস্যদের প্রত্যেককে তাক্বওয়াশীল হওয়া অপরিহার্য (হুজুরাত ১৩)। কোন অবস্থাতেই তাঁরা দ্বীন ও তাক্বওয়া হাত ছাড়া করতে পারবেন না।
নেতৃত্ব দান ও নেতৃত্ব বাছাই দু'টিই বড় কঠিন বিষয়। ইসলাম এ দু'টিকে সুশৃংখলভাবে সমাজ পরিচালনার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আর এজন্যেই মুসলমানদের তিনজন একস্থানে থাকলেও তাদের মধ্যে একজনকে 'আমীর' নিয়োগ করতে বলা হয়েছে। এমনকি একটি রাত ও একটি সকালও আমীর বিহীন জীবনযাপন করতে নিষেধ করা হয়েছে।
টিকাঃ
২. আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মাদ বাছরী আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলত্বা-নিইয়াহ (বৈরুতঃ দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি) পৃঃ ৬।
৩. আহমাদ হা/৬৬৪৭, ১০/১৩৪ পৃঃ; হাকেম ১/৪৪৩, আবুদাউদ, মিশকাত হা/৩৯১১; ছাহীহাহ হা/১৩২২।
৪. ইবনু আসাকির, ফাতাওয়া ওলামায়ে কেরাম (করাচী) পৃঃ ১০, ৪৩।
📄 আনুগত্যের গুরুত্ব
নেতৃত্বের সাথে ওৎপ্রোতভাবে আনুগত্যের বিষয়টি গুরুত্ব জড়িত। নেতা ফেরেশতা নন। অনেক সময় নেতার অনেক সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হবে কিংবা অপসন্দনীয় হবে। এমনকি কর্মীর চাইতে নেতা নিম্নমানের হবেন।
(১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ ، فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ يُفَارِقُ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَيَمُوتُ إِلَّا مَاتَ مِيْتَةً جَاهِلِيَّةً
'যখন কেউ তার আমীরের কাছ থেকে অপসন্দনীয় কোন আচরণ দেখবে, তখন সে যেন ছবর করে। কেননা যে ব্যক্তি জামা'আত হ'তে এক বিঘত পরিমাণ পৃথক হয়ে মারা গেল, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল'।
(২) অন্য হাদীছে এসেছে, তোমরা নেতার আদেশ শোন এবং তা পালন কর, যদিও নেতা হাবশী গোলাম হন বা নাক-কান কাটা হন। কিন্তু আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নির্দেশ দেন'।
(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ، وَمَنْ يُطِعِ الأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي، وَإِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةً يُقَاتَلُ مِنْ وَرَاءِهِ وَيُتَّقَى بِهِ، فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللَّهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا، وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ (متفق عليه)-
'যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করল এবং যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল এবং যে ব্যক্তি আমীরের অবাধ্যতা করল, আমার অবাধ্যতা করল। আমীর হ'লেন ঢাল স্বরূপ। যাঁর পিছনে থেকে লড়াই করা হয় ও যাঁর মাধ্যমে নিজেকে বাঁচানো হয়। যদি আমীর আল্লাহ ভীতির নির্দেশ দেন ও ন্যায় বিচার করেন, তাহ'লে এর বিনিময়ে তিনি পুরষ্কারপ্রাপ্ত হবেন। আর যদি বিপরীত কিছু বলেন, তাহ'লে তার গোনাহ তার উপরেই বর্তাবে'।
(৪) আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ خَلَعَ يَدًا مِّنْ طَاعَةٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةٌ (رواه مسلم)-
'আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমীরের প্রতি আনুগত্যের হাত ছিনিয়ে নিল, সে ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে এমন অবস্থায় যে, তার জন্য (ওযর স্বরূপ) কোন দলীল থাকবে না। যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এমন অবস্থায় যে, তার গর্দানে আমীরের প্রতি আনুগত্যের বায়'আত নেই, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল'।
(৫) আবু উমামাহ (রাঃ) বলেন, বিদায় হজ্জের শেষ ভাষণে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, اتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ وَصُومُوا شَهْرَكُمْ وَأَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ وَأَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ
(১) 'তোমাদের প্রভু আল্লাহকে ভয় কর (২) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় কর (৩) রামাযানের ছিয়াম পালন কর (৪) যাকাত আদায় কর (৫) আমীরের আনুগত্য কর, তোমাদের প্রভুর জান্নাতে প্রবেশ কর'। অত্র হাদীছে আমীরের আনুগত্যকে ছালাত, যাকাত, ছিয়াম ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে এবং একে জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতেই আমীরের আনুগত্যের গুরুত্ব অনুধাবন করা যেতে পারে।
উক্ত 'ইমারত' শারঈ ইমারত হ'তে পারে বা রাষ্ট্রীয় ইমারত হ'তে পারে। কিংবা দু'টিই একত্রে হ'তে পারে। সকল পর্যায়ের আমীরের প্রতি বায়'আত ও আনুগত্য করা যরূরী। শারঈ বা সাংগঠনিক আমীর 'হদ' জারি করবেন না বা জিহাদ ঘোষণা করবেন না। কেননা এ দায়িত্ব কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় আমীরের জন্য নির্দিষ্ট। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাক্কী জীবনে শারঈ আমীর ছিলেন। তখন তাঁর প্রতি 'হদ' জারি করার নির্দেশ আসেনি। অতঃপর মাদানী জীবনে রাষ্ট্রীয় আমীর হন। তখন তাঁর উপরে 'হদ' জারি করার ও 'জিহাদ' ঘোষণা করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। কিন্তু উভয় অবস্থায় তাঁর বায়'আত ও আনুগত্য উম্মতের উপরে ফরয ছিল। অতএব সর্বাবস্থায় একজন শারঈ আমীরের অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামী অনুশাসন মোতাবেক জামা'আতী যিন্দেগী যাপন করা মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। ইসলামী রাষ্ট্র থাক বা না থাক, সেটা কোন শর্ত নয়।
আমীর 'কুরায়শী' হওয়াও শর্ত নয়। সেকারণ ইমাম মাওয়ার্দী বলেন, 'উত্তম ব্যক্তি পাওয়া সত্ত্বেও অনুত্তম ব্যক্তিকে আমীর নিয়োগ করা যাবে, যদি তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের শর্তাবলী পাওয়া যায়'। কেননা নির্বাচকদের জন্য উত্তম গুণাবলীর অধিক প্রয়োজন এবং নেতা হওয়ার জন্য অধিক প্রয়োজন হ'ল যোগ্যতার। যদি কোন স্থানে একজনের মধ্যেই গুণাবলী ও যোগ্যতার উভয় শর্ত পাওয়া যায়, তাহ'লে তাঁর নিকটেই নেতৃত্ব রেখে দিতে হবে। অন্যত্র দেওয়া যাবে না। যেমন যোগ্যতা ও গুণাবলী অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত একজন বিচারপতিকে তাঁর বিচারাসন থেকে সরানো যায় না, অনুরূপভাবে সৎ ও যোগ্য নেতাকেও তাঁর নেতৃত্ব থেকে সরানো জায়েয নয়' (ঐ)। ফলে মেয়াদ ভিত্তিক নেতা নির্বাচনের বিষয়টি ইসলামে আবশ্যিক নয়। নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য লটারী করাও জায়েয নয়।
বরং এর জন্য প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী চিন্তাধারার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সেকারণ নেতা আবশ্যক বিবেচনা করলে নির্ধারিত সংখ্যক নির্বাচক মণ্ডলী নিয়োগ করবেন। যেমন হযরত ওমর (রাঃ) মুসলিম উম্মাহ্র নেতা নির্বাচনের জন্য মৃত্যুর পূর্বে আশারায়ে মুবাশশারাহ্ ছয়জনকে বাছাই করে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য। এ দায়িত্ব তিনি সাধারণ জনগণকে দেননি। কারণ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা যেকোন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
টিকাঃ
৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৮ 'ইমারত' অধ্যায়।
৬. বুখারী, মিশকাত হা/৩৬৬৩।
৭. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬১; ঐ, বঙ্গানুবাদ ৭/২২৫-২৬ পৃঃ 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
৮. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭৪; ঐ, বঙ্গানুবাদ ৭/২৩৪ পৃঃ।
৯. ছহীহ তিরমিযী, হা/৫০২ 'ছালাত' অধ্যায়ের সর্বশেষ হাদীছ।
১০. আল-আহকাম পৃঃ ৯।
📄 নেতৃত্ব নির্বাচনের শূরা পদ্ধতি
ইবনু ইসহাক্ব ইমাম যুহরী থেকে এবং যুহরী ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন যে, একদা আমি ওমর ফারুক (রাঃ)-কে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখলাম। এমতাবস্থায় আমাকে তিনি বললেন, আমি বুঝতে পারছি না কাকে আমি খেলাফতের এ গুরু দায়িত্ব অর্পণ করব। আমি একবার দাঁড়াচ্ছি একবার বসছি। তখন আমি তাঁকে বললামঃ আলী সম্পর্কে আপনার আগ্রহ আছে কি? তিনি বললেন, তাঁর যোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু তিনি হাসি-ঠাট্টা মেযাজের মানুষ। তবে তাঁর উপরে খেলাফতের ভার অর্পণ করলে আমি মনে করি যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথে চালাতে সক্ষম হবেন। আমি বললামঃ ওছমান সম্পর্কে আপনার মত কি? তিনি বললেন, যদি আমি এটা করি তাহ'লে ইবনু আবী মু'ঈত্ব লোকদের ঘাড় মটকাবে। লোকেরা তখন তার দিকে না তাকিয়ে ওছমানকেই হত্যা করবে。
আমি বললামঃ ত্বালহা সম্পর্কে আপনার মত কি? তিনি বললেন, তিনি একটু আত্মম্ভরী মেযাজের মানুষ। এটা জানা সত্ত্বেও উম্মতে মুহাম্মাদীর দায়িত্ব তার উপরে চাপানোটা আল্লাহ পসন্দ করবেন না। আমি বললাম যুবায়ের সম্পর্কে আপনার মত কি? তিনি বললেন, উনি একজন বীরপুরুষ। কিন্তু উনি তো মদীনার বাজারে ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তিনি কিভাবে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয়ের দিকে নযর দিবেন? আমি বললাম, সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাছ সম্পর্কে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, উনি দ্রুত রেগে ওঠেন। ওনার বিরুদ্ধে লড়াই হ'তে পারে। বললাম, আব্দুর রহমান বিন 'আওফ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। কতই না সুন্দর মানুষটির কথা তুমি বললে! কিন্তু উনি বড়ই দুর্বল। আল্লাহ্র কসম! হে আব্দুল্লাহ! এই নেতৃত্বের জন্য এমন একজন ব্যক্তি প্রয়োজন, যিনি শক্তিশালী কিন্তু অত্যাচারী নন। যিনি নম্র কিন্তু দুর্বল নন। যিনি হিসেবী কিন্তু কৃপণ নন। যিনি দাতা কিন্তু অপচয়কারী নন'।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর যখন আবু লুলু তাঁকে আহত করল ও ডাক্তারগণ তাঁর জীবন সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং লোকেরা তাঁকে পরবর্তী খলীফা নিয়োগের জন্য বলতে লাগল, তখন তিনি উক্ত ছয়জনকে নিয়ে একটি 'শূরা' গঠন করে দিলেন এবং আলী-এর সঙ্গে যুবায়ের, ওছমানের সঙ্গে আবদুর রহমান বিন 'আওফ এবং ত্বালহার সঙ্গে সা'দ বিন আবী ওয়াক্বক্বাছ (রাঃ)-কে জোড়া বানিয়ে দিলেন। এঁদের মধ্যে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)-কে জুড়ে দিলেন পরামর্শদাতা হিসাবে, নেতৃত্বের হক্বদার হিসাবে নয়।
অতঃপর ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যুর পরে আবদুর রহমান বিন 'আওফ বাকী পাঁচজনকে ডেকে বললেন, আপনারা নেতৃত্বকে তিনজনের মধ্যে সীমিত করে দিন। তখন যুবায়ের স্বীয় নেতৃত্বকে আলীর উপরে, ত্বালহা ওছমানের উপরে এবং সা'দ আবদুর রহমান বিন 'আওফের উপরে ন্যস্ত করলেন। এক্ষণে বিষয়টি তিনজনের মধ্যে সীমিত হ'য়ে গেল। তখন আবদুর রহমান বিন 'আওফ, হযরত আলী ও ওছমান (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, আপনাদের দু'জনের মধ্যে যিনি নেতৃত্ব থেকে দূরে সরে যাবেন, আমরা এটা তাঁর উপরেই ন্যস্ত করব। আল্লাহ তার উপরে সাক্ষী থাকবেন। এতে কেউ কোন জবাব দিলেন না। তখন আবদুর রহমান বিন 'আওফ (রাঃ) বললেন, আপনারা কি নেতৃত্ব আমার উপরে ন্যস্ত করতে চান? অথচ এটা থেকে আমি নিজেকে বের করে নিয়েছি। আল্লাহ আমার উপরে সাক্ষী আছেন। তবে আপনারা কি নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি আমার উপরে ছেড়ে দিতে চান? আল্লাহ্র কসম আমি আপনাদের উভয়ের মধ্যে উত্তম ব্যক্তিকে বাছাই করতে কার্পণ্য করব না। তখন তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ (এতে আমরা রাযী)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আপনারা চাইলে আমি আপনাদের মধ্যে একজনকে নির্বাচন করতে পারি। তখন তাঁরা তাঁকে এখতিয়ার দেন। এক বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমি বাদে আপনি কাকে খেলাফতের যোগ্য মনে করেন? তিনি বলেন, ওছমানকে। পৃথকভাবে একই প্রশ্নে ওছমান (রাঃ) সমর্থন করেন আলীকে'। এর ফলে নেতৃত্ব দু'জনের মধ্যে সীমিত হ'য়ে গেল। অতঃপর আবদুর রহমান বিন 'আওফ (রাঃ) বের হ'লেন লোকদের মতামত যাচাইয়ের জন্য। নির্ধারিত তিনদিন তিন রাতের মধ্যে তিনি দিবারাত্রি পরিশ্রম করে ব্যাপকভাবে জনমত যাচাই করেন। মুক্বীম-মুসাফির, দলবদ্ধ লোকজন বা একাকী এমনকি বিদ্যালয়ের ছাত্র ও পর্দার অন্তরালে মা-বোনদের কাছ থেকেও মতামত শ্রবণ করেন। কিন্তু কেবলমাত্র 'আম্মার ও মিকুদাদ (রাঃ) ব্যতীত সকলের নিকট থেকেই তিনি ওছমান (রাঃ)-এর পক্ষে সমর্থন পান। এভাবে তিনি যাকে পরামর্শের যোগ্য মনে করেন তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেন এবং বাকী সময়টা ছালাত, দো'আ ও ইস্তেখারার মধ্যে অতিবাহিত করেন। তিন রাত তিনি খুব কমই ঘুমিয়েছেন'।
খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে ওমর ফারুক (রাঃ) কয়েকটি নিয়ম করে গিয়েছিলেন। যেমন- (১) তিনদিন তিন রাতের মেয়াদ বেঁধে দিয়েছিলেন (২) স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহকে (স্রেফ রায় দেওয়ার জন্য, খেলাফত গ্রহণের জন্য নয়) উক্ত শূরার সাথে যুক্ত করে দেন। 'যদি তিন তিন সমভাগ হয়ে যায়, সে অবস্থায় আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)-এর রায় চূড়ান্ত হিসাবে বিবেচিত হবে'।
(৩) মিকুদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ)-কে এই হুকুম দিয়ে যান যে, এই ছয়জন ব্যক্তি যতক্ষণ না একজনকে খলীফা নির্বাচন করবেন, ততক্ষণ তুমি কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিবে না। সেমতে হযরত মিকদাদ ও আবু তালহা আনছারী (রাঃ) পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনদিনের জন্য ছুহায়েব (রাঃ)-কে মসজিদে নববীর ইমাম নিয়োগ করেন এবং নিজে ৫০ জনের একটি দল নিয়ে মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রাঃ) বা কারু মতে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর গৃহের দরওয়াযায় পাহারা দিতে থাকেন। যাতে কেউ ভিতরে প্রবেশ করতে না পারেন আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) ব্যতীত। কেননা ঐ গৃহে তখন শূরার সদস্যগণ নেতৃত্ব নির্বাচনের আলোচনায় লিপ্ত ছিলেন।
তিনদিন পরে ফজরের সময় যখন আবদুর রহমান বিন 'আওফ (রাঃ) মসজিদে নববীতে এলেন খলীফার নাম ঘোষণা করার জন্য, তার পূর্বে তিনি দু'জনের নিকট থেকে ওয়াদা নেন যে, যার হাতেই বায়'আত করা হবে, তিনি আল্লাহ্ কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত-এর উপরে আমল করবেন এবং তিনি যার হাতেই বায়'আত করবেন, অন্যজন তার আনুগত্য করবেন।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি প্রথমে যুবায়ের ও সা'দকে ডেকে এনে পরামর্শ করেন। অতঃপর আলীকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে বলেন, আমি যদি আপনাকে খলীফা নির্বাচন করি, তাহ'লে আপনি ন্যায় বিচার করবেন এবং যদি ওছমানকে নির্বাচন করি, তাহ'লে আপনি তাঁর আনুগত্য করবেন। এরপর ওছমান (রাঃ)-এর কাছ থেকেও তিনি পৃথকভাবে অনুরূপ ওয়াদা নেন।
এরপর তিনি মসজিদে নববীতে উভয়কে সাথে নিয়ে আসেন ও রাসূলের মিম্বরের উপরে দাঁড়িয়ে (হাম্দ ও ছানা শেষে সংক্ষিপ্ত ভাষণের পরে) ওছমান (রাঃ)-এর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে তিনবার বলেন, اَللَّهُمَّ اسْمَعْ وَاشْهَدْ ، اَللَّهُمَّ اسْمَعْ وَاشْهَدْ ، اَللَّهُمَّ اسْمَعْ وَاشْهَدْ اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ خَلَعَتْ مَافِي رَقْبَتِي مِنْ ذَلِكَ فِي رَقْبَةِ عُثْمَانَ 'হে আল্লাহ! শোন ও সাক্ষী থাকো (তিনবার)। হে আল্লাহ! আমার স্কন্ধে যে বোঝা ছিল, তা আমি ওছমানের স্কন্ধে সমর্পণ করলাম'। অতঃপর তিনি মিম্বরের সর্বোচ্চ স্তরে বসেন ও ওছমানকে ২য় স্তরে বসান। অতঃপর প্রথমে হযরত আলী (রাঃ) বায়'আত করেন। এরপর উপস্থিত মদীনাবাসী মুহাজির, আনছার, সেনাপতিবৃন্দ ও জনগণ দলে দলে বায়'আত করতে থাকেন'। খলীফা হওয়ার পরে ওছমান (রাঃ) আছরের জামা'আতে ইমামতি করেন। অতঃপর জনসমক্ষে প্রথম ভাষণ দেন।
সার-সংক্ষেপ
উপরোক্ত ঘটনার সার-সংক্ষেপ ও শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ নিম্নরূপঃ (১) নেতৃত্ব নির্বাচন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (২) নেতৃত্ব যেকোন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না (৩) নির্বাচকদের আবেগমুক্ত ও নিরপেক্ষ এবং নেতার চাইতেও জ্ঞানী হওয়া আবশ্যক (৪) নির্বাচক এমনকি এক ব্যক্তিও হ'তে পারেন (৫) নির্বাচনের জন্য আবশ্যক বোধে সকল পর্যায়ের লোকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে (৬) নির্বাচকের রায়ই চূড়ান্ত হিসাবে বিবেচিত হবে (৭) অন্য সবাইকে তা মেনে নিতে হবে (৮) শূরা সদস্যদের সংখ্যা স্বল্প ও সীমিত হবে (৯) নির্বাচক ও নির্বাচিত উভয়ে শূরার অন্তর্ভুক্ত হবেন (১০) নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া যাবে না (১১) ইচ্ছার বিরুদ্ধে হ'লেও ঘোষিত নেতৃত্বকে মেনে নিতে হবে ও প্রথমেই শূরা সদস্যদেরকে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের বায়'আত নিতে হবে (১২) শূরা সদস্যদের 'বায়'আতে খাছ' গ্রহণ করতে হবে। শেষোক্ত 'বায়'আতে 'আম' প্রথমোক্ত বায়'আতকে সমর্থন করবে মাত্র। কেননা নেতৃত্ব বাছাইয়ে অন্যদের সরাসরি কোন ভূমিকা নেই।
টিকাঃ
১১. আল-আহকাম পৃঃ ১৩।
১২. বুখারী ১/৫২৪ 'মানাক্কির' অধ্যায়, 'ওহমানের বায়'আত' অনুচ্ছেদ।
১৩. বুখারী ১/৫২৫; আবদুর রহমান কীলানী, খেলাফত ও জামহুরিয়াত (লাহোর, মাজলিসুত তাহক্বীকিল ইসলামী, ২য় সংস্করণ ১৯৮৫) পৃঃ ৬৫-৬৬।
১৪. বুখারী ২/১০৭০ 'আহকাম' অধ্যায়, 'কিভাবে লোকেরা আমীরের বায়'আত নেবে' অনুচ্ছেদ।
১৫. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৭/১৫১; খিলাফত পৃঃ ৬৭-৬৮।
১৬. আবদুর রহমান আবদুল খালেক, আশ-শূরা ফী যিল্লি নিযা-মিল হুকমিল ইসলামী (কুয়েতঃ দার সালাফিইয়াহ ২য় সংস্করণ ১৪০৮/১৯৮৮) পৃঃ ১১৪।
১৭. আল-বিদায়াহ ৭/১৫২, খিলাফত পৃঃ ৬৯।
১৮. বুখারী ২/১০৭০; আল-বিদায়াহ ৭/১৫২, খিলাফত পৃঃ ৬৪-৬৫।
📄 ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতিঃ তুলনা মূলক আলোচনা
প্রচলিত চারটি নির্বাচন পদ্ধতির প্রথম দু'টির সাথে ইসলামের সম্পর্ক স্বাভাবিক। তৃতীয়টিতে যদি বাদশাহ কোন দ্বীনদার যোগ্য ব্যক্তিকে পরবর্তী বাদশাহ নিয়োগ করেন, তাহ'লে ইসলাম তাকে সমর্থন দেয়। যেমন হযরত আবুবকর (রাঃ) করেছিলেন হযরত ওমর (রাঃ)-কে এবং ওমর (রাঃ)-এর মনোনীত শূরার মাধ্যমে হযরত ওছমান (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হন। যেমন উমাইয়া খলীফা সুলায়মান বিন আব্দুল মালিক (৯৬-৯৯হিঃ/৭১৫-৭১৭খৃঃ) স্বীয় ভাতিজা ওমর বিন আবদুল আযীয (রাঃ)-কে খলীফা মনোনীত করেছিলেন। হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আঃ) পিতার পরে পুত্র উভয়ে পৃথিবীর বাদশাহ ছিলেন। যদি নেতৃত্ব নিয়ে আপোষে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে সে অবস্থায় উম্মতের কোন সেরা ব্যক্তি একজনকে নেতা হিসাবে নির্বাচন করলে তাকেই সকলে মেনে নিবেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চাচা আব্বাস (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে প্রথমে খেলাফতের বায়'আত করেন। তখন সকলেই তা মেনে নেন।
উল্লেখ্য যে, রাসূলের মৃত্যুর সময় আরব উপদ্বীপে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের কাছাকাছি এবং ওমর (রাঃ)-এর মৃত্যুর সময় ইসলামী খেলাফতের আয়তন ছিল ১,২০,০০০ (এক লক্ষ বিশ হাযার) বর্গমাইল। অথচ নেতৃত্ব নির্বাচন হয়েছিল কেবলমাত্র মদীনার দারুল খেলাফতে উপস্থিত সেরা মনীষী বৃন্দের মাধ্যমে। অন্যদের এতে কোন ভূমিকা ছিল না।
মোট কথা যোগ্য নেতা নির্বাচনের জন্য যোগ্য নির্বাচক প্রয়োজন। যেটা উপরে বর্ণিত তিনটি পদ্ধতির মাধ্যমে সম্ভব। পূর্বতন নেতা যেকোন একটি গ্রহণ করতে পারেন। ইবনে হাযম আন্দালুসী (মৃঃ ৪৫৬হিঃ) বলেন, প্রথমোক্ত পন্থাই আমাদের নিকটে সবচেয়ে উত্তম। কেননা এর ফলে উম্মতের ঐক্য ও সমাজের শৃংখলা বজায় থাকে। অন্য পন্থাগুলিতে উম্মতের মধ্যে অনৈক্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় এবং নেতৃত্বের লোভ বাপকভাবে মাথা চাড়া দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে'।
টিকাঃ
১৯. বাক্বারাহ ২৫১, ছোয়াদ ৩৫।
২০. খেলাফত পৃঃ ৯২, ৮৬।
২১. কিতাবুল ফাছল ফিল মিলাল (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ ২য় সংস্করণ ১৪২০ হিঃ/১৯৯৯ খৃঃ) ৩/৯৭ পৃঃ।