📄 নেতৃত্ব নির্বাচনের পন্থাসমূহ
নেতৃত্ব বাছাই বা নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য এযাবৎ চারটি পন্থা দেখা গেছে। যথা- অছিয়ত বা নামকরণ ভিত্তিক, পরামর্শভিত্তিক, রাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক।
প্রথমোক্ত পন্থায় পূর্বতন নেতা স্বীয় পসন্দমত পরবর্তী নেতার নাম বলে যান, যা ১. কলে মেনে নেন।
দ্বিতীয় পন্থায় পূর্বতন নেতা যোগ্য ব্যক্তিদের সাথে নিজে পরামর্শ করেন ও সে ভিত্তিতে একজনকে নেতা নির্বাচন করে দেন অথবা একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে দেন, যারা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের নিকট থেকে মতামত গ্রহণ করেন ও সে ভিত্তিতে উক্ত কমিটি পরবর্তীতে নেতা নির্বাচন করেন।
তৃতীয় পন্থায় রাজা স্বীয় সন্তানদের মধ্যে যাকে যোগ্য মনে করেন, তাকে পরবর্তী 'রাজা' হিসাবে ঘোষণা করেন, যা অন্যেরা মেনে নেন।
চতুর্থ পন্থায় পূর্বতন নেতার কোন ভূমিকা থাকে না। বরং প্রাপ্ত বয়স্ক প্রজাসাধারণের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তে একটি দল বা কখনো কখনো একজন নেতা নির্বাচিত হ'য়ে থাকেন। তবে বহুদলীয় গণতন্ত্রে সরাসরি নেতা নির্বাচিত হন না। বরং দলের মনোনীত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ নির্বাচিত হন এবং তারাই দলনেতাকে দেশের নেতা নির্বাচিত করেন, যদি দলনেতা নিজে নির্বাচিত হ'তে পারেন। শেষোক্ত পন্থায় অনেকগুলি দল নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর পরাজিত দল সমূহের প্রাপ্ত সম্মিলিত সমর্থন যদি বিজয়ী দলের চাইতে বেশীও হয়, তথাপি অন্য দলসমূহের প্রাপ্ত পৃথক পৃথক সমর্থনের তুলনায় বিজয়ী সংখ্যালঘু দলটির নেতাই দেশের নেতা হ'য়ে থাকেন। বর্তমান পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এই নিয়মে নেতৃত্ব নির্বাচন চলছে। শুধু দেশের নেতাই নন বরং স্থানীয় সংস্থা সমূহে এমনকি মসজিদ-মাদরাসার কমিটি গঠনেও এই নিয়ম চালু হয়েছে। শোষোক্ত পন্থায় নেতা নির্বাচনের মূল দায়িত্ব থাকে সাধারণ জনগণের হাতে। ফলে জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে সুযোগ মত কাজে লাগানোই থাকে দলনেতাদের প্রধান কাজ।
📄 নেতৃত্বের গুরুত্ব
সমাজ পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব একটি অপরিহার্য বিষয়। মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নে'মত সমূহের মধ্যে অন্যতম সেরা নে'মত হ'ল নেতৃত্বের যোগ্যতা। এই যোগ্যতা ও গুণ সীমিত সংখ্যক লোকের মধ্যেই আল্লাহ দিয়ে থাকেন। বাকীরা তাদের অনুসরণ করেন। তবে নবী ব্যতিত অন্য নেতাদেরকে আল্লাহ পাক সরাসরি নিয়োগ করেন না। বরং বান্দাদেরকেই নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতা বাছাইয়ের জন্য। যদিও নেতা আল্লাহ প্রদত্ত তার নিজস্ব গুণ ও যোগ্যতা বলেই অন্যদের থেকে স্পষ্ট হ'য়ে যান। তবুও নেতৃত্ব যেহেতু চেয়ে নেওয়ার বিষয় নয়, সেহেতু অন্যদেরকেই নেতৃত্ব বাছাই করে তাকে তা অর্পণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে তার পিছনে একটি জামা'আত কায়েম হবে। এই জামা'আত তার নেতার পিছনে আনুগত্যশীল ও ঐক্যবদ্ধ থাকবে। যে জামা'আত তার নেতার প্রতি যত বেশী শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত, সে জামা'আত তত বেশী শক্তিশালী ও সংহত। ইসলামী জামা'আতের স্তম্ভ হ'ল তিনটিঃ আমীর, মা'মূর ও ইত্বা'আত অর্থাৎ আদেশদাতা, আদেশ মান্যকারী ও আনুগত্যশীলতা। এ তিনটি স্তম্ভের কোন একটি না থাকলে জামা'আত ধ্বংস হয় এবং সাথে সাথে জামা'আতী শক্তি ও মর্যাদা বিলুপ্ত হয়।
নেতৃত্বের গুরুত্ব গাড়ীর ড্রাইভারের মত বা বিমানের ক্যাপ্টেনের মত। যাকে একই সঙ্গে যেমন যোগ্য ও সদা-সতর্ক থাকতে হয়, তেমনি সর্বতোভাবে যিম্মাদার হ'তে হয়। যে সমাজে যত যোগ্য নেতার সমাবেশ ঘটবে, সে সমাজ তত দ্রুত অগ্রগতি লাভ করবে। নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্ব ইসলামে সবচাইতে বেশী। সেকারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল খলীফা নির্বাচন। আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ) মৃত্যুর সময় এটাকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ওমর ফারুক (রাঃ) যখমে কাতর অবস্থায় এটাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি কোন হেলা-খেলার বস্তু নয় যে, যার তার হাতে এ দায়িত্ব ন্যস্ত করা যায়।
📄 নেতৃত্ব নির্বাচন ফরয না সুন্নত?
ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব নির্বাচন 'ফরয'। তবে 'ফরযে আয়েন' নয়, বরং 'ফরযে কেফায়াহ'। উম্মতের দায়িত্বশীল কিছু গুণী ব্যক্তি যখন পূর্বতন নেতার পরে সৎ ও যোগ্য কাউকে নেতা হিসাবে গ্রহণ করে নেন, তখন সকলের পক্ষ থেকে উক্ত ফরয আদায় হ'য়ে যায় এবং সকলকে তা মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়। এটা 'ফরযে আয়েন' নয় যে, উম্মতের প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারী-পুরুষ সবাইকে এ ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করতেই হবে।
📄 নির্বাচক কারা হবেন?
নেতৃত্ব নির্বাচনের মত ফরয হক আদায়ের কঠিন যিম্মাদারী ইসলাম গুণী-নির্গুণ, সৎ-অসৎ, যোগ্য-অযোগ্য নির্বিশেষে সকলের উপরে ন্যস্ত করেনি। বরং এই দায়িত্বের প্রধান হকদার ও যিম্মাদার হ'লেন পূর্বতন নেতা। যিনি এযাবত নেতৃত্বের বোঝা বহন করে আসছেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে উম্মতের কল্যাণ চিন্তা করে তিনি যাকে মনস্থ করবেন, তিনিই নেতা হবেন। যেমন হযরত আবুবকর (রাঃ) ওমর (রাঃ)-কে করে গিয়েছিলেন এবং রাসূলে করীম (ছাঃ) হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর ব্যাপারে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন ও পরবর্তীতে ওমর ফারুক (রাঃ)-এর বায়'আতের মাধ্যমে যা কার্যকর হয়।
অমনিভাবে হযরত আব্বাস (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে বায়'আত করে নিলে বাকী সকলে তাঁর প্রতি আনুগত্যের বায়'আত নেন।
যদি পূর্বতন নেতা কোন একক ব্যক্তিকে সর্বতোভাবে যোগ্য মনে না করেন, তবে তিনি সকলের মধ্যে যোগ্যতর একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিবেন। যারা অনধিক তিনদিনের মধ্যে বা যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে একজনকে আবশ্যিকভাবে নেতা হিসাবে গ্রহণ করবেন ও পরে জনগণের সমর্থন নিবেন। এ পদ্ধতি হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) গ্রহণ করেছিলেন।
যদি উম্মতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কোন একজন বা একাধিক ব্যক্তি পূর্বতন নেতার সৎ ও যোগ্য পুত্রকে নেতা হিসাবে গ্রহণ করেন, তবে সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে। যেমন হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদতের পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান (রাঃ) মাত্র একজন ব্যক্তি হযরত কায়েস বিন সা'দ (রাঃ)-এর বায়'আতের মাধ্যমে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সকলে তা মেনে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-এর অনুকূলে স্বেচ্ছায় খেলাফত ত্যাগ করলে মু'আবিয়া (রাঃ) খলীফা নিযুক্ত হন।
এক্ষণে যদি পূর্বতন নেতা কাউকে অছিয়ত বা মনোনয়ন না দিয়ে যান। কিংবা কোন প্যানেল না দিয়ে যান, সে অবস্থায় তার সময়ের মজলিসে শূরার সদস্যগণ একত্রে পরামর্শের মাধ্যম পরবর্তী খলীফা বা আমীর নির্বাচন করবেন। শূরা সদস্যগণকে জাতির পক্ষ থেকে যেকোন মূল্যে এ গুরুদায়িত্ব পালন করতেই হবে। কারণ তাঁরাই হ'লেন মূল নির্বাচক। ঝামেলার অজুহাতে অন্যের হাতে ছেড়ে দিলে ফিৎনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। যা আল্লাহ্র কাম্য নয়।
টিকাঃ
১. ওমর (রাঃ) সহ ঐ সময় সেখানে মাত্র পাঁচজন ছাহাবী উপস্থিত ছিলেন। ওমর (রাঃ)-এর পরপরই বাকী চারজন বায়'আত করেন। অতঃপর মদীনাবাসীগণ বায়'আত করেন। উক্ত চারজন হ'লেন, আবু ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ, উসায়েদ বিন হুযায়ের, বিশ্ব বিন সা'দ ও আবু হুযায়ফার গোলাম সালেম। আল-আহকাম, পৃঃ ৭।