📄 খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপায়
ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপায় হ'ল দু'টিঃ দাওয়াত ও জিহাদ। প্রথমোক্তটির মাধ্যমে 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবে। তাদের চিন্তাধারায় বিপ্লব আনতে হবে। কথা, কলম ও সংগঠনের মাধ্যমে ও সেই সাথে যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজ দেশ ও বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াত পেশ করতে হবে। যেন ইসলামী খেলাফতের কল্যাণকারিতা সম্পর্কে মানব জাতির সকল স্তরে স্পষ্ট ধারণা ও মঙ্গল চেতনা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়টির জন্য ব্যাপক বস্তুগত যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রথমে সীসাঢালা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে হবে। এটাই হবে জিহাদের সর্বপ্রধান হাতিয়ার। সমাজের প্রতিটি স্তরে, গ্রামে ও মহল্লায় যখন একদল সচেতন আল্লাহভীরু ও যোগ্য মুজাহিদ তৈরী হয়ে যাবেন এবং স্রেফ আল্লাহকে রাযী-খুশী করার জন্য ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন। তখন সংখ্যায় যত নগণ্যই হৌক না কেন, আল্লাহর সাহায্যে তারাই জয়লাভ করবেন। এভাবে সাংগঠনিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে এমনকি তিনজন মুমিন একস্থানে থাকলেও তাদেরকে একজন আমীরের অধীনে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য হাদীছে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ইমারতের মাধ্যমে সুশৃংখলভাবে দেশব্যাপী দাওয়াত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই ধরনের সাংগঠনিক ও জিহাদী ইমারতের পথ বেয়েই একদিন জাতীয় ভিত্তিক 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। যদিও পূর্ণাঙ্গ 'ইসলামী খেলাফত' কেবলমাত্র ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের পরেই সম্ভব হবে।
সূরায়ে নূর-এর আলোচ্য ৫৫ 'আয়াতে ইস্তিখলাফে' 'ঈমান' ও 'আমলে ছালেহ'-কে 'খেলাফত' প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর নিরংকুশভাবে ও শিরক বিমুক্ত ভাবে আল্লাহ্ ইবাদত করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ জীবনের সকল ক্ষেত্রকে ত্বাগুতের আনুগত্যমুক্ত করে ধর্মীয় ও বৈষয়িক সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ্র আনুগত্যের অধীন করলেই তবে পৃথিবীতে যেমন আল্লাহর রহমতে 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠিত হবে, আখেরাতেও তেমনি আল্লাহ্র নিকটে জান্নাত লাভের যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হবে।
আয়াতের শেষে খেলাফত লাভকে গুরুত্বপূর্ণ নে'মত হিসাবে গণ্য করা হয়েছে এবং যে ব্যক্তি এই নে'মত লাভের পরেও তার না-শুকরী করে, তাকে ফাসেকু বলা হয়েছে। পরের আয়াতে ছালাত কায়েমের মাধ্যমে জাতির নৈতিক শক্তি, যাকাত কায়েমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি এবং সর্বক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আনুগত্যের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি অটুট রাখার মাধ্যমে আল্লাহ্ অনুগ্রহ প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহকে তাই তাদের হারানো খেলাফত পুনরুদ্ধারে সর্বদা সচেষ্ট থাকা যরূরী। নইলে সারা জীবন ইহুদী-খৃষ্টান ও কুফরী শক্তির গোলামী করেই মানবেতর জীবন কাটাতে হবে, যেমন খেলাফতহারা মুসলমানকে এখন কাটাতে হচ্ছে।
টিকাঃ
১৯. আহমাদ, হা/৬৬৪৭; ছহীহ আবুদাউদ হা/২২৭২; নায়ল, 'আকুযিয়াহ ও আহকাম' অধ্যায় ১০/২৪৩ পৃঃ।
📄 সংশয় নিরসন
'জিহাদ' বলতে অনেকে কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ বুঝাতে চান। অথচ হাদীছে জান, মাল ও যবান দ্বারা জিহাদ করতে বলা হয়েছে। প্রথম যুগে ইসলামকে সমূলে উৎখাত করার জন্য যখনই কুফরী শক্তি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখনই ইসলামের ইতিহাসে বদর, ওহোদ, খন্দকের জিহাদী ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। নইলে ২৩ বছরের নবুঅতী জীবনের প্রথম ১৪ বছর স্রেফ দাওয়াতের মধ্যেই কেটেছে। আজও যদি কুফরী শক্তি অস্ত্র নিয়ে ইসলামী দেশের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর উপরে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ 'ফরযে আয়েন' হবে। যেভাবে কাশ্মীর, ফিলিস্তীন, আফগানিস্তান, ইরাক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কুফরী শক্তিকে মুকাবিলা করা হচ্ছে। কিন্তু শান্ত অবস্থায় দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতা চালানো, বিদ্রোহ করা বা বিদ্রোহের উষ্কানী দেওয়া, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। বরং সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যতক্ষণ তারা ছালাত কায়েম করে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلَا مَنْ وُلَّى عَلَيْهِ وَآلِ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِّنْ مَّعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهُ مَا يَأْتِي مِنْ مَّعْصِيَةِ اللهِ، وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِّنْ طَاعَةٍ- সাবধান! তোমাদের শাসকের কোন গোনাহের কাজ দেখলে ঐ কাজটিকে অপসন্দ কর। কিন্তু তার থেকে অবশ্যই আনুগত্যের হাত ছিনিয়ে নিয়ো না'। أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوا اللَّهَ حَقَّكُمْ ، 'তাদের পাওনা তাদের দাও এবং তোমাদের পাওনা আল্লাহ্র নিকটে চাও'। তবে যদি সরকার ইসলাম বিরোধী আইন মানতে চাপ সৃষ্টি করে, তখন তা মানা যাবে না। কোন মুসলমান যখন অমুসলিম দেশে বসবাস করবে, তখন সে দেশের সরকারের কাছ থেকে নিজেদের ধর্মীয় অধিকার আদায়ের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে চেষ্টা করবে। না পারলে ছবর করবে ও আল্লাহ্র নিকটে এর বদলা কামনা করবে।
পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে বাস করেও কোন মুসলিম সরকার যদি ইসলামী বিধান মোতাবেক দেশ শাসন না করে, তবে উক্ত সরকারকে যেমন সৎ পরামর্শ দিতে হবে ও নছীহত করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করে তুলতে হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হেদায়াত নিম্নরূপঃ
عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَكُونُ عَلَيْكُمْ أَمْرَاءُ تَعْرِفُوْنَ وَ تُنْكِرُونَ، فَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَ لَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَ تَابَعَ قَالُوا : أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ ؟ قَالَ : لَا مَا صَلَّوْا، لَا مَا صَلَّوْا -
'তোমাদের মধ্যে অনেক আমীর হবে, যাদের কোন কাজ তোমরা ভাল মনে করবে, কোন কাজ মন্দ মনে করবে। এক্ষণে যে ব্যক্তি ঐ মন্দ কাজের প্রতিবাদ করবে, সে মুক্তি পাবে। যে ব্যক্তি ঐ কাজকে অপসন্দ করবে, সেও নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ মন্দ কাজে সন্তুষ্ট থাকবে ও তার অনুসারী হবে। ছাহাবীগণ বললেন, আমরা কি তখন ঐ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, না। যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে। না, যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে'। এ সময় শাসকদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর নিকটে খাছ দো'আ করার নির্দেশ হাদীছে এসেছে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেও পথভ্রষ্ট দাউস গোত্রের ও তাদের নেতার হেদায়াতের জন্য দো'আ করেছিলেন।
টিকাঃ
২০. আবুদাউদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩৮২১।
২১. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭০ 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
২২. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭২।
২৩. শারহুস সুন্নাহ, মিশকাত হা/৩৬৯৬।
২৪. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭১, 'নেতৃত্ব ও পদ মর্যাদা' অধ্যায়; ঐ, বঙ্গানুবাদ ৭/২৩৩ পৃঃ।
২৫. বুখারী ২/৬৩০ পৃঃ।