📄 ইয়াযীদকে স্থলাভিষিক্ত করার কারণ
অতঃপর মু'আবিয়া (রাঃ) কেন স্বীয় পুত্র ইয়াযীদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলেন, তার প্রধানতম কারণ ছিল ইসলামী খেলাফতকে টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাঁচানো। দ্বিতীয়তঃ ইয়াযীদের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রাঃ) ব্যতীত সকল ছাহাবীর একমত হওয়া। তৃতীয়তঃ ঐ সময় সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী বনু উমাইয়াগণ ইয়াযীদ ব্যতীত অন্য কারু ব্যাপারে রাযী না হওয়া।
অধিকন্তু ইয়াযীদকে স্থলভিষিক্ত করার ব্যাপারে হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-এর নিজের পক্ষ থেকে কোন প্রস্তাব ছিল না। বরং তৎকালীন সময়কার টাল-মাটাল রাজনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় ছাহাবীগণের পক্ষ থেকেই প্রস্তাব এসেছিল। যাদের মুখপাত্র হিসাবে এটি পেশ করেছিলেন, খ্যাতনামা ছাহাবী হযরত মুগীরাহ বিন শো'বা (রাঃ)। নইলে হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) ওমর ফারুকের অনুকরণে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে একটি প্যানেল করে দিতে চেয়েছিলেন। যাদের মধ্য থেকে একজনকে লোকেরা খলীফা হিসাবে বেছে নিবে। তারা হলেনঃ (১) সাঈদ ইবনুল 'আছ (২) আবদুল্লাহ বিন 'আমের (৩) হযরত হুসায়েন (৪) মারওয়ান (৫) আবদুল্লাহ বিন ওমর (৬) আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের। কিন্তু নাযুক রাজনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় প্রবীণ ছাহাবী হযরত মুগীরাহ বিন শো'বা (রাঃ) তাঁকে ইয়াযীদের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। প্রথমে ইতস্ততঃ করলেও পরে তিনি এতে একমত হন। ইয়াযীদের নিঃসন্দেহে যোগ্যতা ছিল। নইলে উম্মতের সেরা ব্যক্তিবর্গ তাঁকে খলীফা হিসাবে প্রস্তাবও করতেন না বা মেনেও নিতেন না। আর বাপের স্থলে যোগ্য ছেলে নেতা হওয়ায় শরী'আতে কোন বাধাও ছিল না। যাহাবী বলেন, আমরা ইয়াযীদকে গালিও দেব না, ভালো, বাসবো না। খলীফাদের মধ্যে তাঁর চাইতে নিম্নস্তরের অনেকে ছিলেন'। মূলতঃ শী'আদের একদেশদর্শী লেখনী দ্বারা প্রভাবিত হয়েই বহু ঐতিহাসিক ইয়াযীদকে কদর্যভাবে চিত্রিত করেছেন, যা প্রকৃত অবস্থা হ'তে অনেক দূরে। ইয়াযীদকে স্থলাভিষিক্ত করার ব্যাপারে মু'আবিয়া (রাঃ)-এর কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না। তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল স্রেফ উম্মতে মুহাম্মাদীর সার্বিক কল্যাণ বিবেচনায় ও তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার বিবেচনায়। ইয়ায়ীদের নাম ঘোষণার পরে মু'আবিয়া (রাঃ) জনসমক্ষে যে ভাষণ দেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি সবকিছু জানো। হে আল্লাহ! যদি আমি তাকে এজন্য স্থলাভিষিক্ত করে থাকি যে, সে যথার্থভাবেই এর যোগ্য, তাহ'লে তুমি তাকে পূর্ণ সফলতা দান কর। আর যদি এর মধ্যে আমার পুত্র স্নেহের আতিশয্য কার্যকর থাকে, তাহ'লে তুমি তোমার সাহায্যের হাত গুটিয়ে নাও। তুমি তাকে সফল হতে দিয়ো না'। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছিলেন যে, 'হে আল্লাহ! যদি ইয়াযীদকে তার যোগ্যতা ও গুণাবলীর কারণে আমি স্থলাভিষিক্ত করে থাকি, তাহ'লে তুমি তাকে সেই স্থানে পৌঁছে দাও, যার আমি আশা করি এবং তাকে সাহায্য কর। আর যদি এর পিছনে আমার পুত্রস্নেহ একান্ত কারণ হয়ে থাকে, তাহ'লে খলীফা হওয়ার পূর্বেই তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নাও'।
অতএব উম্মতের বুযর্গ ছাহাবীগণের প্রতি সুধারণা রেখেই আমাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত। বিশেষ করে মু'আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খাছ দো'আ রয়েছে, اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًا وَاهْدِ به 'হে আল্লাহ! তুমি তাকে সঠিক পথ প্রদর্শনকারী ও সঠিক পথের অনুসারী কর এবং তার মাধ্যমে লোকদের সঠিক পথ প্রদর্শন কর'। অতএব তখনকার পরিস্থিতিতে সার্বিক বিবেচনায় তিনি যে ইয়াযীদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন, তা সঠিক কাজই করেছিলেন বলে আমাদের ধারণা রাখতে হবে。
টিকাঃ
১৩. ইবনু খালদুন, মুক্বাদ্দামা ৩০শ অধ্যায়, পৃঃ ২১০-২১১।
১৪. আল-বিদায়াহ-এর বরাতে 'খেলাফত ও মুলুকিয়াতঃ একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যালোচনা' পৃঃ ৪০৩।
১৫. সিয়ার, (বৈরুতঃ মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ ৩য় সংস্করণ ১৪০৫/১৯৮৫) ৪/৩৬ পৃঃ।
১৬. আল-বিদায়াহ-এর বরাতে 'খেলাফত ও মুলুকিয়াতঃ একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যালোচনা' পৃঃ ۴১৫।
১৭. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ২/২৬৭-এর বরাতে পূর্বোক্ত পৃঃ ৪১৫
১৮. তিরমিযী, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৬২৩৫; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৫৯৮৪ 'সমষ্টিগত ভাবে ফযীলতের বর্ণনা' অনুচ্ছেদ।
📄 রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও খেলাফতের মধ্যকার পার্থক্য
(১) রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র দু'টিই মানবরচিত মতবাদ। পক্ষান্তরে 'খেলাফত' আল্লাহ্র অনুমোদিত শাসন ব্যবস্থার নাম。
(২) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে এক বা একাধিক মানুষের হাতেই থাকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকানা। পক্ষান্তরে খেলাফতে আল্লাহই সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক এবং বান্দা মালিকের প্রতিনিধি মাত্র。
(৩) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে মানব রচিত বিধান অনুযায়ী দেশ শাসিত হয়। পক্ষান্তরে খেলাফতে আল্লাহ প্রেরিত বিধান অনুযায়ী দেশ শাসিত হয়。
(৪) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে মানুষ মানুষের গোলামী করে। পক্ষান্তরে খেলাফতে মানুষ কেবল আল্লাহ্র গোলামী করে。
(৫) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে মানুষের রচিত আইন সদা পরিবর্তনশীল। পক্ষান্তরে খেলাফতে অনুসৃত আল্লাহ্র আইন অপরিবর্তনীয়。
(৬) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে হালাল-হারামের মালিক জনগণ। পক্ষান্তরে খেলাফতে উক্ত মালিকানা স্রেফ আল্লাহর হাতে。
(৭) রাজতন্ত্রে 'রাজা' এবং গণতন্ত্রে 'দলনেতা' সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী। পক্ষান্তরে খলীফা বা আমীরের ক্ষমতা আল্লাহ্র আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত。
(৮) রাজতন্ত্রে রাজার নাবালক এমনকি অযোগ্য পুত্র-কন্যাগণ রাজা হ'তে পারে। অনুরূপভাবে গণতন্ত্রে দলীয় প্রভাবে অযোগ্য, অসৎ ও অদক্ষ লোক নেতা নির্বাচিত হ'তে পারে। কিন্তু ইসলামী খেলাফতে সৎ ও যোগ্য নির্বাচক মণ্ডলীর মাধ্যমে শরী'আত নির্ধারিত শর্তাদি পূরণ সাপেক্ষে সৎ ও আল্লাহভীরু যোগ্য ব্যক্তিই কেবল খলীফা বা আমীর নির্বাচিত হ'তে পারেন এবং শূরা সদস্য মনোনীত হ'তে পারেন。
(৯) রাজা কারুর নিকটে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নন। অন্যদিকে দলীয় প্রধানমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জাতীয় সংসদে জওয়াবদিহীতার নামে নিজ দলের এম,পি-দের হাততালি কুড়ান এবং বিরোধী দলের বাক্যবাণে আরও স্বেচ্ছাচারী ও প্রতিশোধকামী হয়ে ওঠেন। পক্ষান্তরে খলীফা বা আমীর আল্লাহভীরু শূরা সদস্যদের নিকটে পরামর্শ আহ্বান করেন এবং তাঁরাও ইসলামী আদব রক্ষা করে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁকে 'হক' পরামর্শ দিয়ে থাকেন。
(১০) রাজতন্ত্রে ও গণতন্ত্রে ব্যক্তি ইচ্ছা বা দলীয় ইচ্ছাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। পক্ষান্তরে খেলাফতে আল্লাহর ইচ্ছাই প্রধান বিষয়। এমনকি কুরআন বা ছহীহ হাদীছের দলীল থাকলে 'আমীর' শূরা সদস্যদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করতে পারেন। যেমন আবুবকর ছিদ্দীকু (রাঃ) উসামা বিন যায়েদকে জিহাদে প্রেরণের সময় এবং যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সময় করেছিলেন。
(১১) রাজতন্ত্রে রাজাগণ আমৃত্যু এবং গণতন্ত্রে দলনেতা বা এম,পি-গণ মেয়াদ পূর্তি পর্যন্ত নিজেদের শত অযোগ্যতা সত্ত্বেও তাদের স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু খেলাফত ব্যবস্থায় খলীফা ও কর্মকর্তাগণের কার্যকালের মেয়াদ তাদের স্ব স্ব তাক্বওয়া ও যোগ্যতা থাকা পর্যন্ত সীমায়িত。
(১২) রাজতন্ত্রে রাজাদেশই চূড়ান্ত। পক্ষান্তরে গণতন্ত্রে 'অধিকাংশের রায়ই চূড়ান্ত'। ফলে হকপন্থী একক ব্যক্তি বা সংখ্যালঘুর রায় সঠিক হ'লেও তা অনেক সময় বিবেচনায় আনা হয় না। পক্ষান্তরে ইসলামে অহি-র বিধানই চূড়ান্ত। সেকারণ এখানে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু সবারই ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষিত হয়。
(১৩) রাজতন্ত্রে রাজা হওয়ার চেষ্টা চলে এবং গণতন্ত্রে ক্ষমতা দখলের জন্য রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। পক্ষান্তরে 'খেলাফত' ব্যবস্থায় পদ ও ক্ষমতা দখলের আকাংখা ও প্রচেষ্টা দু'টিই নিষিদ্ধ।
📄 খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপায়
ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপায় হ'ল দু'টিঃ দাওয়াত ও জিহাদ। প্রথমোক্তটির মাধ্যমে 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবে। তাদের চিন্তাধারায় বিপ্লব আনতে হবে। কথা, কলম ও সংগঠনের মাধ্যমে ও সেই সাথে যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজ দেশ ও বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াত পেশ করতে হবে। যেন ইসলামী খেলাফতের কল্যাণকারিতা সম্পর্কে মানব জাতির সকল স্তরে স্পষ্ট ধারণা ও মঙ্গল চেতনা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়টির জন্য ব্যাপক বস্তুগত যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রথমে সীসাঢালা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে হবে। এটাই হবে জিহাদের সর্বপ্রধান হাতিয়ার। সমাজের প্রতিটি স্তরে, গ্রামে ও মহল্লায় যখন একদল সচেতন আল্লাহভীরু ও যোগ্য মুজাহিদ তৈরী হয়ে যাবেন এবং স্রেফ আল্লাহকে রাযী-খুশী করার জন্য ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন। তখন সংখ্যায় যত নগণ্যই হৌক না কেন, আল্লাহর সাহায্যে তারাই জয়লাভ করবেন। এভাবে সাংগঠনিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে এমনকি তিনজন মুমিন একস্থানে থাকলেও তাদেরকে একজন আমীরের অধীনে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য হাদীছে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ইমারতের মাধ্যমে সুশৃংখলভাবে দেশব্যাপী দাওয়াত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই ধরনের সাংগঠনিক ও জিহাদী ইমারতের পথ বেয়েই একদিন জাতীয় ভিত্তিক 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। যদিও পূর্ণাঙ্গ 'ইসলামী খেলাফত' কেবলমাত্র ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের পরেই সম্ভব হবে।
সূরায়ে নূর-এর আলোচ্য ৫৫ 'আয়াতে ইস্তিখলাফে' 'ঈমান' ও 'আমলে ছালেহ'-কে 'খেলাফত' প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর নিরংকুশভাবে ও শিরক বিমুক্ত ভাবে আল্লাহ্ ইবাদত করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ জীবনের সকল ক্ষেত্রকে ত্বাগুতের আনুগত্যমুক্ত করে ধর্মীয় ও বৈষয়িক সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ্র আনুগত্যের অধীন করলেই তবে পৃথিবীতে যেমন আল্লাহর রহমতে 'খেলাফত' প্রতিষ্ঠিত হবে, আখেরাতেও তেমনি আল্লাহ্র নিকটে জান্নাত লাভের যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হবে।
আয়াতের শেষে খেলাফত লাভকে গুরুত্বপূর্ণ নে'মত হিসাবে গণ্য করা হয়েছে এবং যে ব্যক্তি এই নে'মত লাভের পরেও তার না-শুকরী করে, তাকে ফাসেকু বলা হয়েছে। পরের আয়াতে ছালাত কায়েমের মাধ্যমে জাতির নৈতিক শক্তি, যাকাত কায়েমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি এবং সর্বক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আনুগত্যের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি অটুট রাখার মাধ্যমে আল্লাহ্ অনুগ্রহ প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহকে তাই তাদের হারানো খেলাফত পুনরুদ্ধারে সর্বদা সচেষ্ট থাকা যরূরী। নইলে সারা জীবন ইহুদী-খৃষ্টান ও কুফরী শক্তির গোলামী করেই মানবেতর জীবন কাটাতে হবে, যেমন খেলাফতহারা মুসলমানকে এখন কাটাতে হচ্ছে।
টিকাঃ
১৯. আহমাদ, হা/৬৬৪৭; ছহীহ আবুদাউদ হা/২২৭২; নায়ল, 'আকুযিয়াহ ও আহকাম' অধ্যায় ১০/২৪৩ পৃঃ।
📄 সংশয় নিরসন
'জিহাদ' বলতে অনেকে কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ বুঝাতে চান। অথচ হাদীছে জান, মাল ও যবান দ্বারা জিহাদ করতে বলা হয়েছে। প্রথম যুগে ইসলামকে সমূলে উৎখাত করার জন্য যখনই কুফরী শক্তি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখনই ইসলামের ইতিহাসে বদর, ওহোদ, খন্দকের জিহাদী ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। নইলে ২৩ বছরের নবুঅতী জীবনের প্রথম ১৪ বছর স্রেফ দাওয়াতের মধ্যেই কেটেছে। আজও যদি কুফরী শক্তি অস্ত্র নিয়ে ইসলামী দেশের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর উপরে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ 'ফরযে আয়েন' হবে। যেভাবে কাশ্মীর, ফিলিস্তীন, আফগানিস্তান, ইরাক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কুফরী শক্তিকে মুকাবিলা করা হচ্ছে। কিন্তু শান্ত অবস্থায় দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতা চালানো, বিদ্রোহ করা বা বিদ্রোহের উষ্কানী দেওয়া, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। বরং সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যতক্ষণ তারা ছালাত কায়েম করে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلَا مَنْ وُلَّى عَلَيْهِ وَآلِ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِّنْ مَّعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهُ مَا يَأْتِي مِنْ مَّعْصِيَةِ اللهِ، وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِّنْ طَاعَةٍ- সাবধান! তোমাদের শাসকের কোন গোনাহের কাজ দেখলে ঐ কাজটিকে অপসন্দ কর। কিন্তু তার থেকে অবশ্যই আনুগত্যের হাত ছিনিয়ে নিয়ো না'। أَدُّوا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوا اللَّهَ حَقَّكُمْ ، 'তাদের পাওনা তাদের দাও এবং তোমাদের পাওনা আল্লাহ্র নিকটে চাও'। তবে যদি সরকার ইসলাম বিরোধী আইন মানতে চাপ সৃষ্টি করে, তখন তা মানা যাবে না। কোন মুসলমান যখন অমুসলিম দেশে বসবাস করবে, তখন সে দেশের সরকারের কাছ থেকে নিজেদের ধর্মীয় অধিকার আদায়ের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে চেষ্টা করবে। না পারলে ছবর করবে ও আল্লাহ্র নিকটে এর বদলা কামনা করবে।
পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে বাস করেও কোন মুসলিম সরকার যদি ইসলামী বিধান মোতাবেক দেশ শাসন না করে, তবে উক্ত সরকারকে যেমন সৎ পরামর্শ দিতে হবে ও নছীহত করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করে তুলতে হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হেদায়াত নিম্নরূপঃ
عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَكُونُ عَلَيْكُمْ أَمْرَاءُ تَعْرِفُوْنَ وَ تُنْكِرُونَ، فَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَ لَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَ تَابَعَ قَالُوا : أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ ؟ قَالَ : لَا مَا صَلَّوْا، لَا مَا صَلَّوْا -
'তোমাদের মধ্যে অনেক আমীর হবে, যাদের কোন কাজ তোমরা ভাল মনে করবে, কোন কাজ মন্দ মনে করবে। এক্ষণে যে ব্যক্তি ঐ মন্দ কাজের প্রতিবাদ করবে, সে মুক্তি পাবে। যে ব্যক্তি ঐ কাজকে অপসন্দ করবে, সেও নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ মন্দ কাজে সন্তুষ্ট থাকবে ও তার অনুসারী হবে। ছাহাবীগণ বললেন, আমরা কি তখন ঐ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, না। যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে। না, যতক্ষণ তারা ছালাত আদায় করে'। এ সময় শাসকদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর নিকটে খাছ দো'আ করার নির্দেশ হাদীছে এসেছে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেও পথভ্রষ্ট দাউস গোত্রের ও তাদের নেতার হেদায়াতের জন্য দো'আ করেছিলেন।
টিকাঃ
২০. আবুদাউদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩৮২১।
২১. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭০ 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
২২. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৭২।
২৩. শারহুস সুন্নাহ, মিশকাত হা/৩৬৯৬।
২৪. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৭১, 'নেতৃত্ব ও পদ মর্যাদা' অধ্যায়; ঐ, বঙ্গানুবাদ ৭/২৩৩ পৃঃ।
২৫. বুখারী ২/৬৩০ পৃঃ।