📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 মুলুকিয়াত, জমহুরিয়াত ও খেলাফত

📄 মুলুকিয়াত, জমহুরিয়াত ও খেলাফত


রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও খেলাফত তিনটি পরিভাষার মধ্যে তিনটি আদর্শের প্রতিফলন রয়েছে। রাজতন্ত্রে রাজার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তাঁর হাতেই থাকে সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি। গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। খেলাফতে আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধানই চূড়ান্ত। আল্লাহ্ই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস।
রাজতন্ত্রে রাজা নিজ বাহুবলে রাজ্য জয় করেন ও নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী রাজ্য শাসন ও পরিচালনা করেন। রাজা সৎ, যোগ্য ও সুশাসক হ'লে রাজ্যে সুখ-শান্তি বিরাজ করে। এমনকি রাজা ইসলামপন্থী হ'লে তাঁর দ্বারা ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা লাভ করাও অসম্ভব কিছু নয়। বিগত দিনে এমনকি বর্তমান বিশ্বেও এর নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এর বিপরীতটা হ'লে বিপরীত হওয়াই স্বাভাবিক। যদিও বর্তমান বিশ্বে কোন রাজাই একক ইচ্ছায় দেশ চালান না। সর্বত্রই রয়েছে একটা নির্বাচিত অথবা মনোনীত মন্ত্রণাপরিষদ। যাই-ই হৌক না কেন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক যেহেতু রাজা বা রাণীরূপে একজন ব্যক্তির হাতে থাকে, সেকারণ এই শাসন ব্যবস্থা আদর্শিক ভাবে ইসলামের সাথে সংঘর্ষশীল।
গণতন্ত্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ট দল দেশ শাসন করে। সংখ্যালঘু দল বা দলগুলি বিরোধী দল হিসাবে গণ্য হয়। তাদের সম্মিলিতভাবে প্রাপ্ত ভোট যদি সংখ্যাগুরু দলের প্রাপ্ত ভোটের চাইতে বেশীও হয়, তথাপি তারা দেশ শাসনের অনুমতি পায় না। ফলে গণতন্ত্রের নামে অধিকাংশ দেশেই চলে সংখ্যালঘুর শাসন। জনগণের নামে সেখানে চলে দলীয় শাসন। একটি দলের কিংবা দলনেতা বা নেত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করা হয়। তাছাড়া প্রতি চার, পাঁচ বা ছয় বছর অন্তর নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে এইসব দেশে অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্বের বিস্তার ঘটে। তাছাড়া নেতৃত্বের জন্য কোনরূপ যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মানদণ্ড নির্ধারিত না থাকায় যেকোন ব্যক্তি নেতৃত্বের লোভী হয়ে যদৃচ্ছ আচরণ করে। যার প্রত্যক্ষ ফলভোগ করে সাধারণ জনগণ। এই সব দেশে সরকারী দল ও বিরোধী দলের লড়াই-সংঘর্ষ, হরতাল, সন্ত্রাস প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মানসিকতা সর্বদা বিরাজ করে। ফলে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিগণ অসম্মানিত হন। যোগ্য ব্যক্তিগণ অবমূল্যায়িত হন। দলীয়করণ প্রকট রূপ ধারণ করে। নির্দলীয় বা অপর দলীয় গুণী ও যোগ্য ব্যক্তির খেদমত থেকে প্রশাসন ও জনগণ বঞ্চিত হয়। ভোটারদের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বক্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের কদর বেশী হওয়ার কারণে প্রচারবিমুখ যোগ্য, গুণী ও আল্লাহভীরু সৎ লোকদের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে খুবই কম দেখা যায়। ফলে সৎ ও আল্লাহভীরু যোগ্য নেতৃত্ব থেকে দেশ বঞ্চিত হয়। সর্বোপরি জনমতের কোন স্থিরতা না থাকায় এবং সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থে বা বুঝের কমবেশীর কারণে ঘন ঘন জনমতের পরিবর্তন হওয়ায় গণতান্ত্রিক সংবিধান কখনোই জনকল্যাণের স্থায়ী কোন বিধান নয়। তাছাড়া গণতন্ত্রে জনগণের অংশীদারিত্বের কথা বলা হ'লেও কেবল ভোটের সময় ব্যতীত অন্য কোন কিছুতে জনমতের কোনরূপ তোয়াক্কা করা হয় না। ফলে অসন্তুষ্ট জনগণ হরতাল, মিটিং-মিছিল, অনশন, গালি-গালাজ, হত্যা, লুণ্ঠন ও ভাঙচুরের পথ বেছে নেয়। এইভাবে গণতন্ত্র অবশেষে ঝগড়াতন্ত্র ও বন্দুকতন্ত্রে পরিণত হয়। যার পরিণাম ফল প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই এখন লোকেরা হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করছে। বর্তমানে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভোটকেন্দ্র দখলের জন্য সশস্ত্র ক্যাডার, চাঁদাবাজ ও ভাড়াটিয়া মস্তানদের কদর বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে ব্যাপক ঘুষ ও কালো টাকার ছড়াছড়ি। ফলে বর্তমান যুগে গণতন্ত্র জনমত প্রতিফলনের বাহন নয়। বরং এটা সন্ত্রাসী ও কালো টাকার মালিকদের নেতৃত্বে বসানোর বাহনে পরিণত হয়েছে মাত্র।
'খেলাফত' হ'ল আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত পথে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাসনব্যবস্থার নাম। এই শাসনব্যবস্থায় আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আল্লাহ্র বিধান চূড়ান্ত ও চিরন্তন। খলীফা বা আমীর ও তাঁর মজলিসে শূরা এবং পূরা প্রশাসনযন্ত্র আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধানের বাস্তবায়নকারী মাত্র।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 খেলাফত হ'তে মুলুকিয়াত (?)

📄 খেলাফত হ'তে মুলুকিয়াত (?)


হযরত মু'আবিয়া (নবুঅতপূর্ব ৫ম-৬০হিঃ/৬০৫-৬৮১ খৃঃ)-এর হাতে খেলাফত সমর্পণের অর্থ ইসলামী 'খেলাফতে'র সুউচ্চ মিনার থেকে 'মুলুকিয়াত' তথা রাজতন্ত্রের অন্ধকার গলিতে পতন নয়, যেমন অনেকে ধারণা করেন। বরং এটি ছিল খেলাফতের আসনে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন। নইলে রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও আইন-কানুন তাই-ই বহাল ছিল, যা পূর্ববর্তী খলীফাগণের সময়ে ছিল। বরং তাঁর খেলাফতকালে রাষ্ট্রীয় উন্নতি আরও বেশী হয়েছিল।
জানা আবশ্যক যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) রাসূলের প্রিয়তম ছাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশ্বস্ত ছয়জন 'অহি' লেখকের অন্যতম ছিলেন। হযরত ওমরের যুগ থেকে একাদিক্রমে ২০ বছর সিরিয়ার গভর্ণর ছিলেন। পরে খলীফা হিসাবে আরও ২০ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। তাঁর তাক্বওয়া, সততা, আমানতদারী, শাসনদক্ষতা, দূরদর্শিতা নিঃসন্দেহে অনেকের চেয়ে বেশী ছিল। তিনি কখনোই আল্লাহ্ আইনের বাইরে নিজের আইন চালু করেননি। আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বকে বাতিল করে রাজার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি।
অতএব 'আমীরুল মুমেনীন' হিসাবে তিনি পূর্বসুরীদের ন্যায় নিঃসন্দেহে 'খলীফা' ছিলেন। প্রচলিত অর্থে কখনোই 'রাজা' বা 'সম্রাট' ছিলেন না। তবে তাঁর সময়কার খেলাফতের আয়তন পূর্ববর্তী খলীফাগণের তুলনায় বড় ছিল বিধায় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও বেশী ছিল। নবুঅতের বরকত থেকে এ যুগ অনেক দূরে ছিল। যা আবুবকর ও ওমরের যুগ থেকে নিঃসন্দেহে নিম্নতর ছিল। যেমন এক সময় জনৈক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল,
مَا بَالُ الْمُسْلِمِينَ اخْتَلَفُوا عَلَيْكَ وَلَمْ يَخْتَلِفُوا عَلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ ؟
'আপনার সময়ে মুসলমানদের কি হ'ল যে, তারা আপনার বিরুদ্ধে বিরোধ করছে। অথচ আবুবকর ও ওমরের সময় এরূপ করেনি। জবাবে আলী (রাঃ) لِأَنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانَا وَالبَيْنِ عَلَى مِثْلِى وَأَنَا الْيَوْمَ وَال عَلَى مثلك، يُشْشِيْرُ إِلَى وَازِعِ الدِّيْنِ 'এটা এজন্য যে, আবুবকর ও ওমর আমার মত লোকদের উপরে খলীফা ছিলেন। পক্ষান্তরে আমি খলীফা হয়েছি তোমার মত লোকদের উপরে'। ইবনু খালদুন বলেন, এর দ্বারা তিনি তাঁর সময়কার মানুষের মধ্যে দ্বীনী দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেন।
অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইয়াযীদ (২৭-৬৪হিঃ)-কে পরবর্তী খলীফা মনোনয়ন দেওয়াকে গুরুতর অন্যায় বলে গণ্য করেন এবং এখান থেকেই ইসলামে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়েছে বলে মনে করেন। তাঁদের ধারণায় পিতার পরে পুত্রের স্থলাভিষিক্ত হওয়াটাই রাজতন্ত্রের বড় আলামত। অথচ হযরত আলী (রাঃ)-এর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হাসান (রাঃ) যখন খলীফা হলেন, তখন কিন্তু এটাকে কেউ রাজতন্ত্র বলেনি। হাসান (রাঃ) স্বেচ্ছায় খেলাফত ত্যাগ করলে পরে মু'আবিয়া (রাঃ) খলীফা নিযুক্ত হন।
অনুরূপভাবে ইয়াযীদের স্বল্পকালীন (৬০-৬৪হিঃ) খেলাফতের পরে তার পুত্র মু'আবিয়া খলীফা হ'লেও তিনি স্বেচ্ছায় খেলাফত ত্যাগ করলে এবং অন্যকে তার স্থলাভিষিক্ত না করলে মারওয়ান খলীফা হন। যিনি তার রক্ত সম্পর্কীয় ছিলেন না। অথচ আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের দেশগুলিতে আমরা দেখছি জাপান ও বৃটেন যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তাদের সম্রাট ও রাণীকে মহা সম্মান ও মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় খরচে লালন করে যাচ্ছে। গণতন্ত্রী দেশ ভারতে ও বাংলাদেশে পারিবারিক শাসন চলছে বিগত কয়েক যুগ ধরে।
পাকিস্তানে ১৯৬৪-এর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অনভিজ্ঞ ও অশীতিপর বৃদ্ধা মহিলা মিস ফাতিমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড় করিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী দলগুলির সাথে একই কাতারে থেকে তাঁকে ইসলামপন্থী অনেক দলের সমর্থন দানের পিছনে সম্ভবতঃ একটাই যুক্তি ছিল যে, মিস ফাতিমা হ'লেন পাকিস্তানের জনক মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর বোন। অতএব জিন্নাহর বোন হওয়ার সুবাদে মিস ফাতিমাকে সবাই সমর্থন করবে। যদি এটাই যুক্তি হয়, তাহ'লে এটা রাজতন্ত্রী চিন্তাধারা নয় কি?

টিকাঃ
১০. বিস্তারিত দ্রষ্টব্যঃ ইবনুল আরাবী, আল-আওয়াছেম মিনাল ক্বাওয়াছেম (রিয়াযঃ ১৪০৪/১৯৮৪) পৃঃ ২০০, ২০৭-২১০।
১১. দ্রঃ মুকাদ্দামা ইবনু খালদুন (বৈরুতঃ মুওয়াসসাসাতুল আ'লমী, তাবি) ৩০শ অধ্যায়, পৃঃ ২১১।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 আলী (রাঃ)-মু'আবিয়া (রাঃ) দ্বন্দ্বের প্রকৃতি

📄 আলী (রাঃ)-মু'আবিয়া (রাঃ) দ্বন্দ্বের প্রকৃতি


ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব কখনোই খেলাফত দখলের দ্বন্দ্ব ছিল না। বরং তা ছিল হযরত ওছমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবীতে সৃষ্ট দু'টি দলের ইজতিহাদী দ্বন্দ্ব। একদল চেয়েছিলেন সর্বাগ্রে ওছমানের রক্তের বদলা নেওয়া হৌক এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানকারী ছাহাবীগণ ইত্যবসরে রাজধানীতে সমবেত হয়ে খলীফা নির্বাচন করুন। হযরত জ্বালহা, যোবায়ের, সা'দ, সাঈদ প্রমুখ আশারায়ে মুবাশারাত্র চারজন সহ মু'আবিয়া, আয়েশা, আমর ইবনুল আছ, আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের প্রমুখ ছাহাবীগণ এই দলে ছিলেন। অন্যদলের দাবী ছিল সর্বাগ্রে খলীফা নির্বাচন হৌক। আপোষে বিরোধের এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিল বাহ্যিকভাবে নও মুসলিম ইহুদী-খৃষ্টান কুচক্রীরা। ফলে সংঘটিত হয় উটের যুদ্ধ, ছিফফীনের যুদ্ধ প্রভৃতি। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় ব্যাপক।
শী'আ ও খারেজীদের বিপরীতমুখী দুই চরমপন্থী আক্বীদার বাইরে আহলেসুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মধ্যপন্থী আক্বীদা হ'ল এই যে, ছাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকের বিষয়ে আমাদের এই সুধারণা পোষণ করতে হবে যে, তাঁরা কখনোই দুনিয়া লোভী ছিলেন না। তারা কখনোই ক্ষমতার মোহে পারষ্পরিক সংঘাতে লিপ্ত হননি। তাঁরা স্ব স্ব ইজতিহাদ বা রায় মোতাবেক কাজ করেছেন। যাতে ভুল ও শুদ্ধ দু'টিই হবার অবকাশ ছিল।

টিকাঃ
১২. ইবনু খালদুন, মুক্বাদ্দামা ২৮শ অধ্যায়, পৃঃ ২০৫।

📘 ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন 📄 ইয়াযীদকে স্থলাভিষিক্ত করার কারণ

📄 ইয়াযীদকে স্থলাভিষিক্ত করার কারণ


অতঃপর মু'আবিয়া (রাঃ) কেন স্বীয় পুত্র ইয়াযীদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলেন, তার প্রধানতম কারণ ছিল ইসলামী খেলাফতকে টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাঁচানো। দ্বিতীয়তঃ ইয়াযীদের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রাঃ) ব্যতীত সকল ছাহাবীর একমত হওয়া। তৃতীয়তঃ ঐ সময় সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী বনু উমাইয়াগণ ইয়াযীদ ব্যতীত অন্য কারু ব্যাপারে রাযী না হওয়া।
অধিকন্তু ইয়াযীদকে স্থলভিষিক্ত করার ব্যাপারে হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-এর নিজের পক্ষ থেকে কোন প্রস্তাব ছিল না। বরং তৎকালীন সময়কার টাল-মাটাল রাজনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় ছাহাবীগণের পক্ষ থেকেই প্রস্তাব এসেছিল। যাদের মুখপাত্র হিসাবে এটি পেশ করেছিলেন, খ্যাতনামা ছাহাবী হযরত মুগীরাহ বিন শো'বা (রাঃ)। নইলে হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) ওমর ফারুকের অনুকরণে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে একটি প্যানেল করে দিতে চেয়েছিলেন। যাদের মধ্য থেকে একজনকে লোকেরা খলীফা হিসাবে বেছে নিবে। তারা হলেনঃ (১) সাঈদ ইবনুল 'আছ (২) আবদুল্লাহ বিন 'আমের (৩) হযরত হুসায়েন (৪) মারওয়ান (৫) আবদুল্লাহ বিন ওমর (৬) আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের। কিন্তু নাযুক রাজনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় প্রবীণ ছাহাবী হযরত মুগীরাহ বিন শো'বা (রাঃ) তাঁকে ইয়াযীদের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। প্রথমে ইতস্ততঃ করলেও পরে তিনি এতে একমত হন। ইয়াযীদের নিঃসন্দেহে যোগ্যতা ছিল। নইলে উম্মতের সেরা ব্যক্তিবর্গ তাঁকে খলীফা হিসাবে প্রস্তাবও করতেন না বা মেনেও নিতেন না। আর বাপের স্থলে যোগ্য ছেলে নেতা হওয়ায় শরী'আতে কোন বাধাও ছিল না। যাহাবী বলেন, আমরা ইয়াযীদকে গালিও দেব না, ভালো, বাসবো না। খলীফাদের মধ্যে তাঁর চাইতে নিম্নস্তরের অনেকে ছিলেন'। মূলতঃ শী'আদের একদেশদর্শী লেখনী দ্বারা প্রভাবিত হয়েই বহু ঐতিহাসিক ইয়াযীদকে কদর্যভাবে চিত্রিত করেছেন, যা প্রকৃত অবস্থা হ'তে অনেক দূরে। ইয়াযীদকে স্থলাভিষিক্ত করার ব্যাপারে মু'আবিয়া (রাঃ)-এর কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না। তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল স্রেফ উম্মতে মুহাম্মাদীর সার্বিক কল্যাণ বিবেচনায় ও তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার বিবেচনায়। ইয়ায়ীদের নাম ঘোষণার পরে মু'আবিয়া (রাঃ) জনসমক্ষে যে ভাষণ দেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি সবকিছু জানো। হে আল্লাহ! যদি আমি তাকে এজন্য স্থলাভিষিক্ত করে থাকি যে, সে যথার্থভাবেই এর যোগ্য, তাহ'লে তুমি তাকে পূর্ণ সফলতা দান কর। আর যদি এর মধ্যে আমার পুত্র স্নেহের আতিশয্য কার্যকর থাকে, তাহ'লে তুমি তোমার সাহায্যের হাত গুটিয়ে নাও। তুমি তাকে সফল হতে দিয়ো না'। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছিলেন যে, 'হে আল্লাহ! যদি ইয়াযীদকে তার যোগ্যতা ও গুণাবলীর কারণে আমি স্থলাভিষিক্ত করে থাকি, তাহ'লে তুমি তাকে সেই স্থানে পৌঁছে দাও, যার আমি আশা করি এবং তাকে সাহায্য কর। আর যদি এর পিছনে আমার পুত্রস্নেহ একান্ত কারণ হয়ে থাকে, তাহ'লে খলীফা হওয়ার পূর্বেই তাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নাও'।
অতএব উম্মতের বুযর্গ ছাহাবীগণের প্রতি সুধারণা রেখেই আমাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত। বিশেষ করে মু'আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খাছ দো'আ রয়েছে, اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًا وَاهْدِ به 'হে আল্লাহ! তুমি তাকে সঠিক পথ প্রদর্শনকারী ও সঠিক পথের অনুসারী কর এবং তার মাধ্যমে লোকদের সঠিক পথ প্রদর্শন কর'। অতএব তখনকার পরিস্থিতিতে সার্বিক বিবেচনায় তিনি যে ইয়াযীদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন, তা সঠিক কাজই করেছিলেন বলে আমাদের ধারণা রাখতে হবে。

টিকাঃ
১৩. ইবনু খালদুন, মুক্বাদ্দামা ৩০শ অধ্যায়, পৃঃ ২১০-২১১।
১৪. আল-বিদায়াহ-এর বরাতে 'খেলাফত ও মুলুকিয়াতঃ একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যালোচনা' পৃঃ ৪০৩।
১৫. সিয়ার, (বৈরুতঃ মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ ৩য় সংস্করণ ১৪০৫/১৯৮৫) ৪/৩৬ পৃঃ।
১৬. আল-বিদায়াহ-এর বরাতে 'খেলাফত ও মুলুকিয়াতঃ একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যালোচনা' পৃঃ ۴১৫।
১৭. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ২/২৬৭-এর বরাতে পূর্বোক্ত পৃঃ ৪১৫
১৮. তিরমিযী, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৬২৩৫; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৫৯৮৪ 'সমষ্টিগত ভাবে ফযীলতের বর্ণনা' অনুচ্ছেদ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px