📄 ইসলামের রাজনৈতিক বিজয়ের ধারা
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَّا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا اللَّهُ إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النَّبُوَّةِ فَتَكُوْنُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مَلِكاً عَاضِاً فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُوْنَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُوْنُ مَلِكاً جَبَرِياً فَتَكُوْنُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُوْنَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ ثُمَّ سَكَتَ -
'তোমাদের মধ্যে (১) নবুওয়াত থাকবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করেন। অতঃপর তা উঠিয়ে নেবেন। এরপর (২) নবুওয়াতের তরীকায় খেলাফত কায়েম হবে। আল্লাহ পাক যতদিন ইচ্ছা তা রেখে দেবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর (৩) অত্যাচারী রাজাদের আগমন ঘটবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। তারপর উঠিয়ে নিবেন। অতঃপর (৪) জবর দখলকারী শাসকদের যুগ শুরু হবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। এরপরে (৫) নবুওয়াতের তরীকায় পুনরায় খেলাফত কায়েম হবে। এই পর্যন্ত বলার পর আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) চুপ হ'য়ে গেলেন'।
উপরোক্ত হাদীছের আলোকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বিশ্বব্যাপী এখন নামে ও বেনামে ৪র্থ যামানা অর্থাৎ জবর দখলকারী শাসকদের যামানা চলছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মীয় স্বৈরাচার এবং গণতন্ত্রের নামে দলীয় স্বৈরাচার ও নেতৃত্বের লড়াই এখন ঘরে ঘরে ও অফিসের চার দেওয়ালের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ন্যায়নীতি ও ন্যায়বিচার এখন সন্ত্রাসীদের লালনকারী নেতা-নেত্রী ও শক্তিমানদের একচ্ছত্র অধিকারে। জাহেলী যুগের গোত্রদ্বন্দু এখন নগ্ন রাজনৈতিক দলীয় দ্বন্দ্বে রূপ লাভ করেছে। বিশ্বব্যাপী যালেমদের জয়জয়কার চলছে। মাযলূম মানবতা সর্বত্র ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও গণতন্ত্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানবতা আজ ব্যাকুল হ'য়ে চেয়ে আছে এক সর্বব্যাপী রেনেসাঁর দিকে। পূর্ণাঙ্গ সমাজ বিপ্লবের দিকে, একটি নির্ভেজাল আদর্শ ও তার নির্ভেজাল অনুসারীদের দিকে। সে আদর্শ আর কিছুই নয়। তা হ'ল 'ইসলাম'। প্রচলিত 'পপুলার' ইসলাম নয়, কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক 'পিওর' ইসলাম। সেই ইসলামের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হ'লেই তবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে কাংখিত ইসলামী সমাজ ও কল্যাণময় ইসলামী খেলাফত। আলোচ্য আয়াতে সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য যার ওয়াদা করা হয়েছে।
তবে ইবনু খালদুন (৭৩২-৮০৮হিঃ/১৩৩২-১৪০৫খৃঃ), আবুবকর ইবনুল আরাবী (৪৬৪-৫৪৩হিঃ), মুহেব্বুদ্দীন আল-খাত্ত্বীব (১৩০৩-১৩৮৯হিঃ) প্রমুখদের মতে এই হাদীছ সকলের নিকটে ছহীহ নয়। অধিকন্তু এটি বুখারী, মুসলিমে বর্ণিত ছহীহ হাদীছের বিরোধী। যেখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, পৃথিবীতে ১২ জন ন্যায়পরায়ণ খলীফার আবির্ভাব সম্পর্কে। সেকারণ উক্ত বিদ্বানগণ সহ অন্যান্য বিদ্বানগণের মতে খেলাফতে রাশেদাহর মেয়াদ ৩০ বছরে সীমায়িত নয়। বরং চার খলীফার পরেও যুগে যুগে উন্নত গুণাবলী সম্পন্ন খলীফাদের আগমন ঘটেছে ও ঘটবে। যেমন উমাইয়া খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (৯৯-১০১হিঃ/৭১৭-৭২০খৃঃ), আব্বাসীয় খলীফা হারুনুর রশীদ (১৭০-১৯৩হিঃ/৭৮৬-৮০৯খৃঃ) এবং তাঁদের অনুরূপ অনেক খলীফা এবং সবশেষে ইমাম মাহদী। অতএব উক্ত হাদীছের সঠিক ব্যাখ্যা এই যে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী খলীফাদের নমুনা হ'লেন প্রথম চারজন খলীফা। অতঃপর তাঁদের পরবর্তী খলীফাগণ তুলনামূলক ভাবে কমবেশী হবেন।
টিকাঃ
৬. আবুদাউদ, তিরমিযী, আহমাদ প্রভৃতির বর্ণনায় এই খেলাফতের মেয়াদ স্পষ্টভাবেই চার খলীফার আমলে ত্রিশ বছর বলে উল্লেখিত হয়েছে, যা হাসান (রাঃ)-এর খেলাফত সহ ১১হিঃ হ'তে ৪১ হিঃ সনের মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। আলবানী, সিলসিলা ছাহীহাহ হা/৪৫৯।
৭. আহমাদ, সিলসিলা ছাহীহাহ হা/৫।
৮. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৯৭৪ 'মর্যাদা সমূহ' অধ্যায়; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৫৭৩১।
৯. আবুদাউদ, সনদ হাসান; ছহীহ আবুদাউদ হা/৩৬০৪ 'মাহদী' অধ্যায়; আলবানী-মিশকাত হা/৫৪৫৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত-আফলাতুন হা/৫২২০ 'ফিৎনা সমূহ' অধ্যায় 'কিয়ামতের পূর্ব লক্ষণ সমূহ' অনুচ্ছেদ।
📄 ইসলামী খেলাফতের প্রয়োজনীয়তা
ইসলাম একটি বিশ্বজনীন আদর্শ, যা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ হ'তে বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরিত হয়েছে। যার মধ্যে সকল যুগের সকল মানুষের সত্যিকারের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ইসলাম মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের জন্য সুস্পষ্ট ও স্থায়ী মঙ্গলের পথনির্দেশ দান করেছে। কতগুলি ব্যক্তিগত নীতি-আদর্শ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ইসলাম সীমাবদ্ধ নয়। বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বিধিবিধানসহ তার ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনের সকল মৌলিক বিষয়ে এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি ব্যবহারিক বিষয়েও ইসলাম চিরস্থায়ী হেদায়াত পেশ করেছে। অতএব ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা একারণে যে, যাতে পূর্ণ নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততার মধ্যে ইসলামী বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালন করা সহজ হয় এবং মানব কল্যাণ নিশ্চিত হয়।।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলমান তার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালনে স্বাধীন থাকলেও বৈষয়িক জীবনে অনৈসলামী আইনে শাসিত হয়। সূদ-ঘুষের পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সমাজবাদী অর্থনীতি অনুসরণের ফলে মুমিনের রূযী হারাম রূযীতে পরিণত হয়। অন্যদিকে দেশের আদালতগুলিতে ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা না থাকায় মানবরচিত আইনে মুমিনকে জেল-ফাঁসি বরণ করতে হয়। ফলে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং অবিচার, অশান্তি ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা ব্যাপকতা লাভ করে। এ সকল কারণে একজন মুমিনকে সর্বদা নিজ দেশে ও বিশ্বব্যাপী ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় তৎপর থাকতে হয়। কারণ ইসলামী খেলাফত শুধু মুসলমানের জন্য নয়, বরং খেলাফতের অধীনে বসবাসরত সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে কল্যাণকর। ইসলামকে যেমন কোন একটি দল বা সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট হিসাবে গণ্য করা ঠিক নয়, ইসলামী খেলাফতকেও তেমনি নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের জন্য গণ্য করা ঠিক নয়। বরং আল্লাহর বান্দাদের জন্য আল্লাহ প্রেরিত বিধান সার্বজনীন, যা দলমত নির্বিশেষে সকলের জন্য মঙ্গলময় ও সকলের প্রতি সমানভাবে প্রয়োগ যোগ্য। যেমন আল্লাহ্র সৃষ্ট আলো-বাতাস, মাটি ও পানি সবার জন্য কল্যাণময়।
📄 মুলুকিয়াত, জমহুরিয়াত ও খেলাফত
রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও খেলাফত তিনটি পরিভাষার মধ্যে তিনটি আদর্শের প্রতিফলন রয়েছে। রাজতন্ত্রে রাজার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তাঁর হাতেই থাকে সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি। গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। খেলাফতে আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধানই চূড়ান্ত। আল্লাহ্ই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস।
রাজতন্ত্রে রাজা নিজ বাহুবলে রাজ্য জয় করেন ও নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী রাজ্য শাসন ও পরিচালনা করেন। রাজা সৎ, যোগ্য ও সুশাসক হ'লে রাজ্যে সুখ-শান্তি বিরাজ করে। এমনকি রাজা ইসলামপন্থী হ'লে তাঁর দ্বারা ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা লাভ করাও অসম্ভব কিছু নয়। বিগত দিনে এমনকি বর্তমান বিশ্বেও এর নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এর বিপরীতটা হ'লে বিপরীত হওয়াই স্বাভাবিক। যদিও বর্তমান বিশ্বে কোন রাজাই একক ইচ্ছায় দেশ চালান না। সর্বত্রই রয়েছে একটা নির্বাচিত অথবা মনোনীত মন্ত্রণাপরিষদ। যাই-ই হৌক না কেন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক যেহেতু রাজা বা রাণীরূপে একজন ব্যক্তির হাতে থাকে, সেকারণ এই শাসন ব্যবস্থা আদর্শিক ভাবে ইসলামের সাথে সংঘর্ষশীল।
গণতন্ত্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ট দল দেশ শাসন করে। সংখ্যালঘু দল বা দলগুলি বিরোধী দল হিসাবে গণ্য হয়। তাদের সম্মিলিতভাবে প্রাপ্ত ভোট যদি সংখ্যাগুরু দলের প্রাপ্ত ভোটের চাইতে বেশীও হয়, তথাপি তারা দেশ শাসনের অনুমতি পায় না। ফলে গণতন্ত্রের নামে অধিকাংশ দেশেই চলে সংখ্যালঘুর শাসন। জনগণের নামে সেখানে চলে দলীয় শাসন। একটি দলের কিংবা দলনেতা বা নেত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করা হয়। তাছাড়া প্রতি চার, পাঁচ বা ছয় বছর অন্তর নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে এইসব দেশে অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্বের বিস্তার ঘটে। তাছাড়া নেতৃত্বের জন্য কোনরূপ যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মানদণ্ড নির্ধারিত না থাকায় যেকোন ব্যক্তি নেতৃত্বের লোভী হয়ে যদৃচ্ছ আচরণ করে। যার প্রত্যক্ষ ফলভোগ করে সাধারণ জনগণ। এই সব দেশে সরকারী দল ও বিরোধী দলের লড়াই-সংঘর্ষ, হরতাল, সন্ত্রাস প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মানসিকতা সর্বদা বিরাজ করে। ফলে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিগণ অসম্মানিত হন। যোগ্য ব্যক্তিগণ অবমূল্যায়িত হন। দলীয়করণ প্রকট রূপ ধারণ করে। নির্দলীয় বা অপর দলীয় গুণী ও যোগ্য ব্যক্তির খেদমত থেকে প্রশাসন ও জনগণ বঞ্চিত হয়। ভোটারদের উপর প্রভাব বিস্তারকারী বক্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের কদর বেশী হওয়ার কারণে প্রচারবিমুখ যোগ্য, গুণী ও আল্লাহভীরু সৎ লোকদের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে খুবই কম দেখা যায়। ফলে সৎ ও আল্লাহভীরু যোগ্য নেতৃত্ব থেকে দেশ বঞ্চিত হয়। সর্বোপরি জনমতের কোন স্থিরতা না থাকায় এবং সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থে বা বুঝের কমবেশীর কারণে ঘন ঘন জনমতের পরিবর্তন হওয়ায় গণতান্ত্রিক সংবিধান কখনোই জনকল্যাণের স্থায়ী কোন বিধান নয়। তাছাড়া গণতন্ত্রে জনগণের অংশীদারিত্বের কথা বলা হ'লেও কেবল ভোটের সময় ব্যতীত অন্য কোন কিছুতে জনমতের কোনরূপ তোয়াক্কা করা হয় না। ফলে অসন্তুষ্ট জনগণ হরতাল, মিটিং-মিছিল, অনশন, গালি-গালাজ, হত্যা, লুণ্ঠন ও ভাঙচুরের পথ বেছে নেয়। এইভাবে গণতন্ত্র অবশেষে ঝগড়াতন্ত্র ও বন্দুকতন্ত্রে পরিণত হয়। যার পরিণাম ফল প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই এখন লোকেরা হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করছে। বর্তমানে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভোটকেন্দ্র দখলের জন্য সশস্ত্র ক্যাডার, চাঁদাবাজ ও ভাড়াটিয়া মস্তানদের কদর বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে ব্যাপক ঘুষ ও কালো টাকার ছড়াছড়ি। ফলে বর্তমান যুগে গণতন্ত্র জনমত প্রতিফলনের বাহন নয়। বরং এটা সন্ত্রাসী ও কালো টাকার মালিকদের নেতৃত্বে বসানোর বাহনে পরিণত হয়েছে মাত্র।
'খেলাফত' হ'ল আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য আল্লাহ নির্ধারিত পথে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাসনব্যবস্থার নাম। এই শাসনব্যবস্থায় আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আল্লাহ্র বিধান চূড়ান্ত ও চিরন্তন। খলীফা বা আমীর ও তাঁর মজলিসে শূরা এবং পূরা প্রশাসনযন্ত্র আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধানের বাস্তবায়নকারী মাত্র।
📄 খেলাফত হ'তে মুলুকিয়াত (?)
হযরত মু'আবিয়া (নবুঅতপূর্ব ৫ম-৬০হিঃ/৬০৫-৬৮১ খৃঃ)-এর হাতে খেলাফত সমর্পণের অর্থ ইসলামী 'খেলাফতে'র সুউচ্চ মিনার থেকে 'মুলুকিয়াত' তথা রাজতন্ত্রের অন্ধকার গলিতে পতন নয়, যেমন অনেকে ধারণা করেন। বরং এটি ছিল খেলাফতের আসনে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন। নইলে রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও আইন-কানুন তাই-ই বহাল ছিল, যা পূর্ববর্তী খলীফাগণের সময়ে ছিল। বরং তাঁর খেলাফতকালে রাষ্ট্রীয় উন্নতি আরও বেশী হয়েছিল।
জানা আবশ্যক যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) রাসূলের প্রিয়তম ছাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশ্বস্ত ছয়জন 'অহি' লেখকের অন্যতম ছিলেন। হযরত ওমরের যুগ থেকে একাদিক্রমে ২০ বছর সিরিয়ার গভর্ণর ছিলেন। পরে খলীফা হিসাবে আরও ২০ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। তাঁর তাক্বওয়া, সততা, আমানতদারী, শাসনদক্ষতা, দূরদর্শিতা নিঃসন্দেহে অনেকের চেয়ে বেশী ছিল। তিনি কখনোই আল্লাহ্ আইনের বাইরে নিজের আইন চালু করেননি। আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বকে বাতিল করে রাজার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি।
অতএব 'আমীরুল মুমেনীন' হিসাবে তিনি পূর্বসুরীদের ন্যায় নিঃসন্দেহে 'খলীফা' ছিলেন। প্রচলিত অর্থে কখনোই 'রাজা' বা 'সম্রাট' ছিলেন না। তবে তাঁর সময়কার খেলাফতের আয়তন পূর্ববর্তী খলীফাগণের তুলনায় বড় ছিল বিধায় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও বেশী ছিল। নবুঅতের বরকত থেকে এ যুগ অনেক দূরে ছিল। যা আবুবকর ও ওমরের যুগ থেকে নিঃসন্দেহে নিম্নতর ছিল। যেমন এক সময় জনৈক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল,
مَا بَالُ الْمُسْلِمِينَ اخْتَلَفُوا عَلَيْكَ وَلَمْ يَخْتَلِفُوا عَلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ ؟
'আপনার সময়ে মুসলমানদের কি হ'ল যে, তারা আপনার বিরুদ্ধে বিরোধ করছে। অথচ আবুবকর ও ওমরের সময় এরূপ করেনি। জবাবে আলী (রাঃ) لِأَنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانَا وَالبَيْنِ عَلَى مِثْلِى وَأَنَا الْيَوْمَ وَال عَلَى مثلك، يُشْشِيْرُ إِلَى وَازِعِ الدِّيْنِ 'এটা এজন্য যে, আবুবকর ও ওমর আমার মত লোকদের উপরে খলীফা ছিলেন। পক্ষান্তরে আমি খলীফা হয়েছি তোমার মত লোকদের উপরে'। ইবনু খালদুন বলেন, এর দ্বারা তিনি তাঁর সময়কার মানুষের মধ্যে দ্বীনী দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেন।
অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইয়াযীদ (২৭-৬৪হিঃ)-কে পরবর্তী খলীফা মনোনয়ন দেওয়াকে গুরুতর অন্যায় বলে গণ্য করেন এবং এখান থেকেই ইসলামে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়েছে বলে মনে করেন। তাঁদের ধারণায় পিতার পরে পুত্রের স্থলাভিষিক্ত হওয়াটাই রাজতন্ত্রের বড় আলামত। অথচ হযরত আলী (রাঃ)-এর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হাসান (রাঃ) যখন খলীফা হলেন, তখন কিন্তু এটাকে কেউ রাজতন্ত্র বলেনি। হাসান (রাঃ) স্বেচ্ছায় খেলাফত ত্যাগ করলে পরে মু'আবিয়া (রাঃ) খলীফা নিযুক্ত হন।
অনুরূপভাবে ইয়াযীদের স্বল্পকালীন (৬০-৬৪হিঃ) খেলাফতের পরে তার পুত্র মু'আবিয়া খলীফা হ'লেও তিনি স্বেচ্ছায় খেলাফত ত্যাগ করলে এবং অন্যকে তার স্থলাভিষিক্ত না করলে মারওয়ান খলীফা হন। যিনি তার রক্ত সম্পর্কীয় ছিলেন না। অথচ আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের দেশগুলিতে আমরা দেখছি জাপান ও বৃটেন যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তাদের সম্রাট ও রাণীকে মহা সম্মান ও মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় খরচে লালন করে যাচ্ছে। গণতন্ত্রী দেশ ভারতে ও বাংলাদেশে পারিবারিক শাসন চলছে বিগত কয়েক যুগ ধরে।
পাকিস্তানে ১৯৬৪-এর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অনভিজ্ঞ ও অশীতিপর বৃদ্ধা মহিলা মিস ফাতিমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড় করিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী দলগুলির সাথে একই কাতারে থেকে তাঁকে ইসলামপন্থী অনেক দলের সমর্থন দানের পিছনে সম্ভবতঃ একটাই যুক্তি ছিল যে, মিস ফাতিমা হ'লেন পাকিস্তানের জনক মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর বোন। অতএব জিন্নাহর বোন হওয়ার সুবাদে মিস ফাতিমাকে সবাই সমর্থন করবে। যদি এটাই যুক্তি হয়, তাহ'লে এটা রাজতন্ত্রী চিন্তাধারা নয় কি?
টিকাঃ
১০. বিস্তারিত দ্রষ্টব্যঃ ইবনুল আরাবী, আল-আওয়াছেম মিনাল ক্বাওয়াছেম (রিয়াযঃ ১৪০৪/১৯৮৪) পৃঃ ২০০, ২০৭-২১০।
১১. দ্রঃ মুকাদ্দামা ইবনু খালদুন (বৈরুতঃ মুওয়াসসাসাতুল আ'লমী, তাবি) ৩০শ অধ্যায়, পৃঃ ২১১।