📄 প্রথম ক্রুসেড
১০৯৭ থেকে ১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত প্রথম ক্রুসেডে একে একে চারটি বিশাল বাহিনী বাইতুল মুকাদ্দাস জয়ের সংকল্প নিয়ে রওয়ানা হয়।
প্রথম বাহিনী : পাদরি পিটারের অধীনে ১৩ লাখ খ্রিষ্টানের এক বিশাল বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। তারা যখন ইসলামি এলাকায় প্রবেশ করে, তখন সেলজুকি শাসক কালাজ আরসালান এ বাহিনীটিকে নাজেহাল করে ছাড়ে। এ অভিযান ব্যর্থ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় বাহিনী: এ বাহিনী জার্মান পাদরি গাউসফেলের নেতৃত্বে যাত্রা আরম্ভ করে। তারা যখন হাঙ্গেরি অতিক্রম করছিল, তখন তাদের অনাচারে হাঙ্গেরির লোকেরা তাদের সেখান থেকে বের করে দেয়।
তৃতীয় বাহিনী: ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ডের স্বেচ্ছাসেবকদের এই বাহিনী হাঙ্গেরি অতিক্রম করার সময় সেখানকার বাসিন্দাদের হাতে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
চতুর্থ বাহিনী: সবচেয়ে সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিল দশ লাখ সৈন্যের চতুর্থ বাহিনীটি। ১০৯৭ সালে ফ্রান্সের গডফ্রের নেতৃত্বে এটি যাত্রা শুরু করে। এ বাহিনী এশিয়া মাইনরের দিকে রওয়ানা হয় এবং প্রসিদ্ধ কুনিয়া শহর অবরোধ করে। বিজয়ী খ্রিষ্টানরা অগ্রসর হতে হতে ইন্তাকিয়া পৌঁছে যায়। নয় মাস পর ইন্তাকিয়াও তাদের দখলে চলে যায়। প্রায় এক লাখ মুসলমান নিহত হয়।
বাইতুল মুকাদ্দাস পতন: ১৫ জুন ১০৯৯ সালে খ্রিষ্টান উন্মাদরা খুব সহজেই বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নেয়। মুসলমানদের ওপর চালানো হয় গণহত্যা ও লুটপাট। গডফ্রেকে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক বানানো হয় এবং বিজিত এলাকাগুলো খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। মুসলমানদের পরাজয়ের বড় কারণ ছিল নিজেদের অনৈক্য।
📄 দ্বিতীয় ক্রুসেড
ইমাদুদ্দিন জিনকির ইনতিকালের পর ১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তার যোগ্যপুত্র নুরুদ্দিন জিনকি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ক্রুসেডারদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তিনি মুসলমানদের মধ্যে জিহাদের নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করেন এবং খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে প্রচুর এলাকা ছিনিয়ে নেন। তার নেতৃত্বে রাওহা শহরটি পুনরায় মুসলমানদের দখলে চলে আসে। ক্রুসেডারদের পরাজয়ের খবর শুনে পোপ তৃতীয় কনরাড ও ফ্রান্সের শাসক সপ্তম লুইয়ের নেতৃত্বে নয় লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী পুনরায় রওয়ানা হয়। সপ্তম লুইয়ের বাহিনীর একটি বড় অংশ সেলজুকিদের হাতে ধ্বংস হয়। দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিষ্টানরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।
মিসরে নুরুদ্দিন জিনকির দখল প্রতিষ্ঠা: মিশরের ফাতিমি খলিফা ফাইজ বিল্লাহর দুর্বলতার সুযোগে নুরুদ্দিন জিনকি নিজ ভাই আসাদুদ্দিন শিরকোহকে অভিযানে নিযুক্ত করেন। ১১২৭ খ্রিষ্টাব্দে শিরকোহ মিসরের অধিকাংশ এলাকা আয়ত্ত করে নেন। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এসব অভিযানে শিরকোহের সহযোগী ছিলেন। শিরকোহের পর সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং খলিফা তাকে আল মালিকুন নাসির উপাধি দেন।
হিত্তিন যুদ্ধ: ১১৮৬ খ্রিষ্টাব্দে রিজনাল্ড মদিনা মুনাওয়ারায় হামলার উদ্দেশ্যে হিজাজে অভিযান চালালে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তাকে ধাওয়া করে হিত্তিন গিয়ে ধরেন। ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে হিত্তিনে সংঘটিত ভয়াবহ যুদ্ধে ত্রিশ হাজার খ্রিষ্টান সৈন্য নিহত হয় এবং সমপরিমাণ বন্দী হয়।
বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়: হিত্তিনে জয় লাভের পর সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। এক সপ্তাহ যুদ্ধের পর খ্রিষ্টানরা আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ ৯১ বছর পর বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরায় মুসলমানদের আয়ত্তে আসে। সুলতান খ্রিষ্টানদের ওপর কোনো অত্যাচার করেননি, বরং মুক্তির জন্য মামুলি অর্থ নির্ধারণ করেন এবং যারা অপারগ ছিল তাদের এমনিতেই মুক্তি দেন।
📄 তৃতীয় ক্রুসেড
১১৮৯ থেকে ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত এ যুদ্ধে জার্মান সম্রাট ফ্রেডারিক বারব্রোসা, ফ্রান্সের ফিলিপ অগাস্টাস ও ইংল্যান্ডের রিচার্ড অংশ নেয়। খ্রিষ্টান বাহিনী আক্কা বন্দর অবরোধ করে। যেহেতু অন্য কোনো ইসলামি রাষ্ট্র থেকে সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে সহায়তা করা হলো না, তাই শহরবাসীরা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে শহরটি খ্রিষ্টানদের হাতে ছেড়ে দেয়। রিচার্ড বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের হত্যা করে। পরবর্তীতে বাইতুল মুকাদ্দাস জয়ের আশা দেখতে না পেয়ে ক্রুসেডাররা সন্ধি করে। শর্ত ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের হাতে থাকবে এবং আসকালান স্বাধীন থাকবে।
📄 চতুর্থ ক্রুসেড
১২০১ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী এ ক্রুসেড মূলত সাজানো হয়েছিল মিশরে হামলা চালিয়ে জেরুজালেম জয় করার উদ্দেশ্যে। আইয়ুবি সুলতান আল-মালিকুল আদিলের হাতে খ্রিস্টানরা পরাজয় বরণ করে এবং ইয়াফা শহর মুসলমানদের আয়ত্তে চলে আসে। পরিবর্তে ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুণ্ঠন ও ধ্বংস সাধন করে।