📄 একাদশ শতকে ক্রুসেড সংঘটিত হওয়ার কারণসমূহ
ক. ধর্মীয় কারণ
ফিলিস্তিন ইসা (আ.)-এর জন্মস্থান। ফলে খ্রিষ্টানদের জন্য তা পবিত্র ও বরকতময় একটি স্থান। তাদের জন্য এটি ছিল পর্যটনের স্থান। উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে ফিলিস্তিন ভূমি ও বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। তখন থেকেই খ্রিষ্টানরা তা পুনর্দখল করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।
খ. অমুসলিম দর্শনার্থীদের কটু আচরণ
যেহেতু মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—তিন ধর্মের লোকদের জন্যই এ স্থানটি পবিত্র, তাই অমুসলিমরা যখন বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শনের উদ্দেশ্যে এখানে আসত, তখন মুসলমান প্রশাসন তাদের সুযোগ করে দিত। অমুসলিমদের গির্জা ও খানকাগুলো তাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। প্রশাসন তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইসলামি খিলাফতের দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলার যুগে এসব পর্যটক স্বাধীনতার এ সুযোগকে নিয়ে অপচেষ্টা চালায়। তাদের উদ্দেশ্যমূলক আচরণের কারণে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ছোটখাট দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কিন্তু এই ফিতনাকারীরা দেশে ফিরে মুসলমানদের দুর্ব্যবহারের বানোয়াট কাহিনী প্রচার করে ইউরোপবাসীকে উসকে দিতে শুরু করে।
গ. ইসা (আ.)-কে নিয়ে গুজব রটনা
এ সময় গোটা ইউরোপে একটি সংবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসা (আ.) আবার নেমে এসে খ্রিষ্টানদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। কিন্তু তাঁর অবতরণ হবে তখন, যখন জেরুজালেমের পবিত্র শহর মুসলমানদের হাত থেকে স্বাধীন করা হবে। ৯৫৪ এই সংবাদ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উত্তেজনা অত্যন্ত বাড়িয়ে দেয় এবং ক্রুসেড যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।
ঘ. পোপদের কুপ্রচারণা
খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে যে, যদি কোনো চোর, দুষ্কৃতি ও পাপীও বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শন করে আসে, তাহলে পরকালে সে জান্নাতের উপযুক্ত হয়ে যাবে। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বড় বড় দুষ্কৃতিকারীও পর্যটক হিসাবে বাইতুল মুকাদ্দাস আসতে শুরু করে। এরা শহরে প্রবেশের সময় নাচ-গান ও শোরগোল করত এবং প্রকাশ্যে শরাব পান করত। তাদের এসব অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও অশোভনীয় আচরণের কারণে তাদের প্রতি কিছু নৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ঙ. পোপের লিপ্সা
খ্রিষ্টানজাতি তখন দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একভাগের সম্পর্ক ছিল পশ্চিম ইউরোপের গির্জার সাথে। তাদের কেন্দ্র ছিল রোম। আর দ্বিতীয় ভাগের সম্পর্ক ছিল কনস্টান্টিনোপল বা বর্তমানের ইস্তাম্বুলের সাথে। পশ্চিম ইউরোপের পোপের কামনা ছিল, পূর্ব ইউরোপের গির্জার কর্তৃত্বও যদি পাওয়া যেত, তাহলে পুরো বিশ্বের খ্রিষ্টান জাতির আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব তার হাতে চলে আসত। সে অনুসারে সে ঘোষণা করল, সারা দুনিয়ার খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।
চ. রাজনৈতিক কারণ
বাইজেন্টাইন শাসক মাইকেল ডোকাস ১০৯০ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর কাছে তুর্কিদের অগ্রগতির কথা বলে সাহায্য চায়। সারা খ্রিষ্টান বিশ্ব তার আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দেয়। নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের গির্জার মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায় এবং উভয় গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধে অংশ নেয়।
ছ. সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ
ইউরোপের সরকারব্যবস্থায় সামন্তপ্রথা ছিল মৌলিক বিষয়। অভাবী ও দরিদ্র লোকেরা বিভিন্ন ধরনের বিধি-নিষেধের জালে আবদ্ধ ছিল। সামন্ত প্রভুরা দরিদ্র জনসাধারণের রক্ত চুষে নিত। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামন্তপ্রথার অনিষ্টতা ও কুপ্রভাব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অর্থের সমস্ত উৎস মহাজন ও যাজকদের আয়ত্তে ছিল। ইতালির বাসিন্দারা চাইছিল ফিলিস্তিন ও সিরিয়া দখল করে আগের মতো নিজেদের ব্যবসায়িক উন্নতি সাধন করতে।
জ. তাৎক্ষণিক কারণ
তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পোপ দ্বিতীয় আরবানের ধর্মযুদ্ধের ফতোয়া। ফ্রান্সের পিটার বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শনে গিয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্ব দেখে মনে প্রবল আঘাত পায়। ইউরোপে ফিরে গিয়ে সে খ্রিষ্টানদের দুরবস্থার মিথ্যাকাহিনী বর্ণনা করল এবং এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সে গোটা ইউরোপ সফর করল। পোপ পশ্চিমা গির্জার আধ্যাত্মিক নেতা হিসাবে একটি সম্মেলন ডাকল এবং সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।
টিকাঃ
৯৫৪. মূলত, ইসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি এসে দাজ্জালকে খতম করবেন। আর তার এ আগমন খ্রিষ্টানদের জন্য নয়; বরং মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্যের কারণ হবে। এ সংক্রান্ত অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
📄 ক্রুসেড যুদ্ধসমূহ
ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের কর্তৃত্ব বহাল করার জন্য ইউরোপের খ্রিষ্টানরা যে সকল যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল, ইতিহাসে সেগুলোই ক্রুসেড যুদ্ধ নামে পরিচিত। নিজেদের দীর্ঘ যুদ্ধের ধারা শেষ হয় এবং খ্রিষ্টানরা ধ্বংস ও পরাজয় ছাড়া আর কিছু অর্জন করতে না পারায় তাদের যুদ্ধের উন্মাদনা থিতিয়ে যায়। একপর্যায়ে ধারাবাহিক ক্রুসেড যুদ্ধসমূহের অবসান ঘটে।
📄 চরম উপনিবেশকৃত উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহ
মিশর: ১৮৮২ থেকে এটি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল এবং ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
সুদান: ১৮৯৯ থেকে ব্রিটিশদের অধীনে ছিল এবং ১৯৫৬-এর পর স্বাধীনতা লাভ করে।
তিউনিসিয়া: ১৮৮১ থেকে ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল এবং ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
আলজেরিয়া: ১৮৩০ সালে ফ্রান্সের বশীকরণ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
মরক্কো: ১৯১২ সালে ফ্রান্সের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয় এবং ১৯৫৬ সালে স্বাধীন হয়।
লিবিয়া: ১৯১১ থেকে ইটালীয় উপনিবেশ ছিল এবং ১৯৫১ সালে এখানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
📄 সাধারণ উপনিবেশকৃত দেশসমূহ
এ সকল দেশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত উসমানি খিলাফতের অধীনে ছিল। সাইকস-পিকটের চুক্তিটি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। যেমন: সিরিয়া (১৯৪৬ সালে স্বাধীন), ইরাক (১৯৩২ সালের পর নামমাত্র স্বাধীন), জর্দান (১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত), ফিলিস্তিন (১৯৪৮-১৯৬৭ সালে ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত) এবং লেবানন (১৯৪৩ সালে উপনিবেশমুক্ত)।