📄 ক্রুসেড নামে নামকরণের কারণ
ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা পোপের নির্দেশে বুকে ক্রুসচিহ্ন নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং ক্রুসকেই যুদ্ধের পতাকা হিসাবে ব্যবহার করেছিল বলে এ যুদ্ধ ইতিহাসে ক্রুসেড নামে পরিচিত।
📄 ক্রুসেডের কারণ বিবৃতি
মূলত ক্রুসেড হলো, মুসলিমদের কাছে হেরে যাওয়ার ফলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসাপরায়ণতা, খ্রিষ্টানদের ভ্রান্ত ও উগ্র মন-মানসিকতার ফলাফল। সচেতন পর্যবেক্ষক ও অনুসন্ধানকারী মাত্রই অবগত যে, খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা লালন করে আসছে ইসলামের উত্থানের দিন থেকেই। ক্রুসেডের মূলভিত্তি হলো, ইসলামের বিজয়ের সূচনাকাল থেকে লালন করা সে মনোভাব। বাইতুল মুকাদ্দাস দখলে নেওয়া নিয়ে একাদশ শতকে তৈরি হওয়া কোনো বাস্তব সংঘাতের নাম মূল ক্রুসেড নয়; বরং ইসলামের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই চলে আসছে এ ক্রুসেডের ধারাবাহিকতা। ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদের মাঝে চলমান সামরিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্বই একসময় সর্বগ্রাসী যুদ্ধের রূপ ধারণ করে। ইতিহাসের প্রসিদ্ধ ক্রুসেড সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মৌলিকভাবে কাজ করেছে নিম্নে সংক্ষেপে তাদের বিভিন্ন কালের কর্মপ্রক্রিয়া উল্লেখ করা হলো :
ক. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সময়কালে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান শক্তি, যা দেখে খ্রিষ্টানরা চাইছিল, মুসলিমদের সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। আর এর ফলেই সংঘটিত হয় তাবুক যুদ্ধ।
খ. ইউরোপীয়দের মনে প্রতিশোধের আগুন ও ক্রুসেডীয় মনোভাব চাড়া দিয়ে উঠেছে, যখন রোমান খ্রিষ্টানরা ইয়ারমুকের যুদ্ধে চরমভাবে পরাজয় বরণ করেছিল। যে যুদ্ধের ফলে রোমান শাসন শাম ও এতদঅঞ্চল থেকে পুরোপুরি ধুয়ে মুছে যায়।
গ. ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টানদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলিমদের হাতে চলে আসে। এটিও খ্রিষ্টানদের উগ্রপন্থাকে উসকে দেওয়ার অন্যতম কারণ। মূলত এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ও এটাকে পুঁজি বানিয়ে পোপ ও খ্রিষ্টান রাজারা সাধারণ খ্রিষ্টান জনগণকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকে দিতে থাকে।
ঘ. খ্রিষ্টবাদের এ গোঁড়ামির আগুন ফের প্রবল হয়ে ওঠে যখন সমগ্র ইউরোপ জোট ফিলিস্তিন ও শাম দেশে পরাজয় বরণ করে। যেদিন ইসলামের মহান সেনানায়ক সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (র.)-এর হাতে লজ্জাজনকভাবে পরাজয় বরণ করে। যে হারের ফলে শাম ও বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে খ্রিষ্টানদের কর্তৃত্ব দূর হয়ে যায়। মুসলমানগণ পুনরায় শ্রদ্ধা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির আসনে সমাসীন হন।
ঙ. পরবর্তী সময় দীর্ঘকাল যাবৎ বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের দখলমুক্ত থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে আরব জোটের সাথে ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরাইল জয়ী হওয়ার পর ইসলামি ওয়াকফ ট্রাস্টের হাতে মসজিদের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। কাগজে-কলমে তা মুসলিমদের অধিকারে দেওয়া হলেও মূল কর্তৃত্ব ইহুদিদের হাতেই বহাল থাকে।
📄 একাদশ শতকে ক্রুসেড সংঘটিত হওয়ার কারণসমূহ
ক. ধর্মীয় কারণ
ফিলিস্তিন ইসা (আ.)-এর জন্মস্থান। ফলে খ্রিষ্টানদের জন্য তা পবিত্র ও বরকতময় একটি স্থান। তাদের জন্য এটি ছিল পর্যটনের স্থান। উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে ফিলিস্তিন ভূমি ও বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। তখন থেকেই খ্রিষ্টানরা তা পুনর্দখল করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।
খ. অমুসলিম দর্শনার্থীদের কটু আচরণ
যেহেতু মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান—তিন ধর্মের লোকদের জন্যই এ স্থানটি পবিত্র, তাই অমুসলিমরা যখন বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শনের উদ্দেশ্যে এখানে আসত, তখন মুসলমান প্রশাসন তাদের সুযোগ করে দিত। অমুসলিমদের গির্জা ও খানকাগুলো তাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। প্রশাসন তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইসলামি খিলাফতের দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলার যুগে এসব পর্যটক স্বাধীনতার এ সুযোগকে নিয়ে অপচেষ্টা চালায়। তাদের উদ্দেশ্যমূলক আচরণের কারণে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ছোটখাট দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কিন্তু এই ফিতনাকারীরা দেশে ফিরে মুসলমানদের দুর্ব্যবহারের বানোয়াট কাহিনী প্রচার করে ইউরোপবাসীকে উসকে দিতে শুরু করে।
গ. ইসা (আ.)-কে নিয়ে গুজব রটনা
এ সময় গোটা ইউরোপে একটি সংবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসা (আ.) আবার নেমে এসে খ্রিষ্টানদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। কিন্তু তাঁর অবতরণ হবে তখন, যখন জেরুজালেমের পবিত্র শহর মুসলমানদের হাত থেকে স্বাধীন করা হবে। ৯৫৪ এই সংবাদ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উত্তেজনা অত্যন্ত বাড়িয়ে দেয় এবং ক্রুসেড যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।
ঘ. পোপদের কুপ্রচারণা
খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে যে, যদি কোনো চোর, দুষ্কৃতি ও পাপীও বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শন করে আসে, তাহলে পরকালে সে জান্নাতের উপযুক্ত হয়ে যাবে। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বড় বড় দুষ্কৃতিকারীও পর্যটক হিসাবে বাইতুল মুকাদ্দাস আসতে শুরু করে। এরা শহরে প্রবেশের সময় নাচ-গান ও শোরগোল করত এবং প্রকাশ্যে শরাব পান করত। তাদের এসব অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও অশোভনীয় আচরণের কারণে তাদের প্রতি কিছু নৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ঙ. পোপের লিপ্সা
খ্রিষ্টানজাতি তখন দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একভাগের সম্পর্ক ছিল পশ্চিম ইউরোপের গির্জার সাথে। তাদের কেন্দ্র ছিল রোম। আর দ্বিতীয় ভাগের সম্পর্ক ছিল কনস্টান্টিনোপল বা বর্তমানের ইস্তাম্বুলের সাথে। পশ্চিম ইউরোপের পোপের কামনা ছিল, পূর্ব ইউরোপের গির্জার কর্তৃত্বও যদি পাওয়া যেত, তাহলে পুরো বিশ্বের খ্রিষ্টান জাতির আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব তার হাতে চলে আসত। সে অনুসারে সে ঘোষণা করল, সারা দুনিয়ার খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।
চ. রাজনৈতিক কারণ
বাইজেন্টাইন শাসক মাইকেল ডোকাস ১০৯০ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর কাছে তুর্কিদের অগ্রগতির কথা বলে সাহায্য চায়। সারা খ্রিষ্টান বিশ্ব তার আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দেয়। নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের গির্জার মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায় এবং উভয় গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধে অংশ নেয়।
ছ. সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ
ইউরোপের সরকারব্যবস্থায় সামন্তপ্রথা ছিল মৌলিক বিষয়। অভাবী ও দরিদ্র লোকেরা বিভিন্ন ধরনের বিধি-নিষেধের জালে আবদ্ধ ছিল। সামন্ত প্রভুরা দরিদ্র জনসাধারণের রক্ত চুষে নিত। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামন্তপ্রথার অনিষ্টতা ও কুপ্রভাব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অর্থের সমস্ত উৎস মহাজন ও যাজকদের আয়ত্তে ছিল। ইতালির বাসিন্দারা চাইছিল ফিলিস্তিন ও সিরিয়া দখল করে আগের মতো নিজেদের ব্যবসায়িক উন্নতি সাধন করতে।
জ. তাৎক্ষণিক কারণ
তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পোপ দ্বিতীয় আরবানের ধর্মযুদ্ধের ফতোয়া। ফ্রান্সের পিটার বাইতুল মুকাদ্দাস দর্শনে গিয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্ব দেখে মনে প্রবল আঘাত পায়। ইউরোপে ফিরে গিয়ে সে খ্রিষ্টানদের দুরবস্থার মিথ্যাকাহিনী বর্ণনা করল এবং এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সে গোটা ইউরোপ সফর করল। পোপ পশ্চিমা গির্জার আধ্যাত্মিক নেতা হিসাবে একটি সম্মেলন ডাকল এবং সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।
টিকাঃ
৯৫৪. মূলত, ইসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি এসে দাজ্জালকে খতম করবেন। আর তার এ আগমন খ্রিষ্টানদের জন্য নয়; বরং মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্যের কারণ হবে। এ সংক্রান্ত অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
📄 ক্রুসেড যুদ্ধসমূহ
ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের কর্তৃত্ব বহাল করার জন্য ইউরোপের খ্রিষ্টানরা যে সকল যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল, ইতিহাসে সেগুলোই ক্রুসেড যুদ্ধ নামে পরিচিত। নিজেদের দীর্ঘ যুদ্ধের ধারা শেষ হয় এবং খ্রিষ্টানরা ধ্বংস ও পরাজয় ছাড়া আর কিছু অর্জন করতে না পারায় তাদের যুদ্ধের উন্মাদনা থিতিয়ে যায়। একপর্যায়ে ধারাবাহিক ক্রুসেড যুদ্ধসমূহের অবসান ঘটে।