📄 সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি হকের মানদণ্ড?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা-ই হচ্ছে সকল সিদ্ধান্তের মানদণ্ড। এ ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই সকল জনগণের মত হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, আইন প্রণয়ন করা, প্রতিনিধি নির্বাচন করা, সরকারের অবস্থা যাচাই করাসহ সকল ক্ষেত্রেই যেদিকে বেশি ভোট পড়ে, সেটিই সঠিক বলে বিবেচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে জ্ঞানী ও অশিক্ষিত লোকদের মতামত সব এক পাল্লায় মাপা হয়। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই আল্লাহ তাআলার হালাল বিধানকে হারাম আর হারাম বিধানকে হালাল করা হয়। পক্ষান্তরে ইসলামের দৃষ্টিতে যদি দুনিয়ার সকল মানুষও একত্রিত হয়ে কোনো হারাম কাজের পক্ষে মতামত দেয়, তাহলেও তা গ্রহণ করা যাবে না।
📄 গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীনতার অপব্যবহার
পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন ধর্ম থেকে তাদের জীবনকে আলাদা করে ফেলল, তখন সে তার নিজের সিদ্ধান্তকে আল্লাহর হুকুমের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল। তাদের সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি হয়ে গেল লাভ-লোকসান। তারা ভালো-মন্দ, পছন্দ-অপছন্দ কোনো কিছু করা বা না করা, সকল কিছু নির্ধারণ করতে লাগল লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে। এভাবে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে নিম্নোক্ত চারটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।
ক. বিশ্বাসের স্বাধীনতা
খ. মত প্রকাশের স্বাধীনতা
গ. মালিকানার স্বাধীনতা
ঘ. ব্যক্তি স্বাধীনতা
📄 ফেরাউনি ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ
এ বিষয়টি আজ উপলদ্ধি করা বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে যে, ফিরাউন একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিল। সে নিজেও সৃষ্টিকর্তা হিসাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করত। কিন্তু সে নিজের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দাবি করার ফলে রব সেজে বসল। কুরআনের মাধ্যমে ফিরাউনের কাহিনী আমাদের নিকট পেশ করার কারণ হলো, আমরা যেন এমন কোনো রাজা-বাদশাকে বা এমন কোনো ব্যবস্থাপনাকে না মানি, যারা সার্বভৌমত্বের দাবি করে বসে। আমরা যেন ফিরাউনের মতো কোনো শাসককে মেনে শিরকে নিপতিত না হয়ে যাই। কারণ, আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে অন্য কারও সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার মানেই হচ্ছে, তাকে রব বলে স্বীকার করে নেওয়া। যদি ফিরাউনকে মানলে শিরক হয়, তাহলে এ গণতন্ত্র মানলেও শিরক হবে। মুসলমানেরা এসব নব্য ফিরাউনদের অনুসরণ করে যাতে আবার শিরকের মধ্যে হাবুডুবু না খায়, তা থেকে সর্তক করার জন্যই আল্লাহ তাআলা ফিরাউনের কাহিনী আমাদের কাছে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আজ গণতন্ত্ররূপী নব্য ফিরাউনরা জনগণকে আল্লাহর মুখামুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল করলে অনেকখানিই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
১. ইসলাম আল্লাহর দেওয়া পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনব্যবস্থা। পক্ষান্তরে গণতন্ত্র হচ্ছে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًا }
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতের পূর্ণতা দান করেছি এবং ধর্ম হিসাবে তোমাদের জন্য ইসলামকে মনোনীত করেছি।' ৯৪৮
২. ইসলামি শরিয়তে সর্ব বিষয়ে যাবতীয় ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই হলো সকল ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ }
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।' ৯৪৯
৩. ইসলামে আইনের উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। পক্ষান্তরে গণতন্ত্রে আইনের উৎস হলো অধিকাংশ মানুষের বিবেকপ্রসূত রায় ও মতামত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
{ إِنِ ٱلْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ }
'বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।' ৯৫০
৪. ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানানুসারে যারা বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই কাফির, তারাই জালিম, তারাই ফাসিক। পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলছে, কোর্ট-কাচারিতে দেশের সাংবিধানিক আইন চলে, আল্লাহর বিচারব্যবস্থা চলতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
{ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَٰفِرُونَ }
'যেসব লোক আল্লাহর অবতীর্ণ আইনানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।' ৯৫১
৫. ইসলামের শিক্ষা নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। আর গণতন্ত্রের শিক্ষা ব্যক্তিস্বার্থ ভোগবাদ। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে। আনাস থেকে বর্ণিত, নবিজি ﷺ বলেছেন :
'লা ইউমিনু আহাদুকুম, হাত্তা ইউহিব্বা লিআখিহি মা ইউহিব্বু লিনাফসিহি' (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।) ৯৫২
৬. ইসলামে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস এবং আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করা অপরিহার্য। পক্ষান্তরে গণতন্ত্রে আল্লাহর অস্তিত্ব উপেক্ষিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
{ وَمَآ أُمِرُوٓا۟ إِلَّا لِيَعْبُدُوٓا۟ إِلَٰهًا وَٰحِدًا ۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشْرِكُونَ }
‘আর তাদের কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। কাফিররা যেসব অংশীদার সাব্যস্ত করে, তিনি তা থেকে পূত-পবিত্র।’ ৯৫৩
টিকাঃ
৯৪৮. সুরা আল-মায়িদা : ৩
৯৪৯. সুরা আল-বাকারা: ১৪৮
৯৫০. সুরা ইউসুফ: ৪০
৯৫১. সুরা আল-মায়িদা: ৪৪
৯৫২. সহিহুল বুখারি: ১/১২, হা. নং ১৩ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৯৫৩. সুরা আত-তাওবা: ৩১