📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 সব উন্নতির মাধ্যম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

📄 সব উন্নতির মাধ্যম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি


সাম্যবাদীদের দৃষ্টিতে অর্থনীতিই হচ্ছে একমাত্র ভিত্তি, যার ওপর ভর করেই মানুষের জীবন ও সমাজ গড়ে ওঠে। সুতরাং যেকোনো ধরনের উন্নতি, অগ্রগতি, প্রভাব ও পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে, উৎপাদনের উপকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

তাদের এমন চিন্তাধারা নিরর্থক প্রলাপ বৈ কিছু নয়। যার সামান্যতম চেতনা ও অনুভূতি আছে, সেও এমন চিন্তাধারা গ্রহণ করবে না। তাই এ ধরনের বাস্তবতাবিবর্জিত নীতি নবি-রাসুল ও সালাফে সালিহিনের দিকে সম্বোধিত করা বস্তুত তাঁদের মান ক্ষুণ্ণ করারই নামান্তর। যাঁদের কথা ও চিন্তা-গবেষণায় মানুষের কর্ম ও বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন ও উন্নতি আসে, যাঁদের আদর্শ বাস্তবায়নে ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় এবং যাঁদের অনুসরণে সমাজের পাপ-পঙ্কিলতা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাদের থেকে কখনো এমন অজ্ঞতাপূর্ণ বাণী বা নীতি প্রকাশের কল্পনাও করা যায় না।

অতএব, কমিউনিজমভিত্তিক অর্থনীতিকে নবি-রাসুল, সালাফে সালিহিন ও উম্মাহর বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের সাথে সম্পৃক্ত করার অর্থ হচ্ছে তাঁদের অপমান করা এবং ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে তুচ্ছ করা। তা ছাড়াও তাদের এটি মারাত্মক একটি ভুল চিন্তা যে, অর্থনীতিই মানুষের অগ্রগতি, উন্নতি ও পরিবর্তনের মূলভিত্তি ও উপাদান। বস্তুত বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস ও সঠিক চিন্তা-চেতনার মাধ্যমেই মানুষের জীবনে পরিবর্তন, উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়ে থাকে।

মানুষের মন ও মস্তিষ্কের গভীর থেকেই আকিদা বা বিশ্বাসের উৎপত্তি। আর মানুষ তার ভেতরে বদ্ধমূল আকিদা-বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েই কোনো কিছুর প্রতি ধাবিত হয়। অন্তরে থাকা সে আকিদাই মানুষকে কোনো কাজ করা বা না করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অতএব, মানবজীবনে অর্থের ভূমিকা শুধু এতটুকুই যে, মানুষ এর দ্বারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু এটা কখনোই একজন মানুষের উন্নতি, অগ্রগতি বা আমূল পরিবর্তনের মূলভিত্তি হতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত নিরক্ষর এক জাতির মাঝে। অতঃপর অর্থের বিশেষ কোনো ভূমিকা ছাড়াই তা পৃথিবীর আনাচে-ানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলাম স্বমহিমায় নিজ গতিতেই বিস্তৃতি লাভ করেছে। কখনো অর্থনীতির উন্নতির ওপর নির্ভর করেনি; বরং ইসলামের যত উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা কেবল ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস হৃদয়ে গেঁথে নেওয়ার কারণেই হয়েছে। ফলে ইসলামই মুসলমানদের যেকোনো কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধকারীর ভূমিকা পালন করেছে। সুতরাং বুঝা গেল, মানুষের যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা কোনো কিছুর প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়া অর্থনীতির প্রভাবে হয় না; বরং তা কেবল তাদের আকিদা বা বিশ্বাসের কারণেই হয়ে থাকে।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ব্যক্তি মালিকানা বলতে কিছুই নেই

📄 ব্যক্তি মালিকানা বলতে কিছুই নেই


ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা। ব্যক্তি মালিকানার ব্যাপারে কার্ল মার্ক্সের ধারণা ছিল নিতান্তই ভুল। তার ধারণামতে, এটি হচ্ছে অন্যায় হস্তক্ষেপ, ছিনতাই-লুণ্ঠন ও জুলুম-নির্যাতনের প্রাথমিক স্তর। তাই ব্যক্তি মালিকানার পরিধি যত বড় বা ছোটই হোক না কেন, সাম্যবাদী দৃষ্টিতে তা নিন্দনীয়। তারা মনে করে যে, মানুষকে যেই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ও পোশাকাদি রাষ্ট্র জোগান দিয়ে থাকে, তাদের সেই পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয় না। অতএব, জনগণের পরিবর্তে সকল সম্পত্তির অধিকারী হবে একমাত্র রাষ্ট্র। তাতে কারও সামান্যতম মালিকানাও থাকবে না। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাদের এমন মতবাদ মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা ও আগ্রহের পরিপন্থী; অথচ মানুষ সৃষ্টিগত ও বস্তুগতভাবেই ব্যক্তি মালিকানার প্রতি আগ্রহী হয়। প্রত্যেকেই স্ত্রী, ছেলে-সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করে। তাই সকলেই চায় প্রয়োজন পূরণের জন্য তার কিছু সম্পত্তি থাকুক। কমিউনিজমের এমন অযৌক্তিক নীতি মানুষকে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তি মালিকানা থেকে জোরপূর্বক বঞ্চিত করেছে। আর মানুষের সাথে এমন অসংগতিপূর্ণ আচরণ স্বয়ং মানুষ ও দেশের জন্য তাদের অবদানের ওপর অশুভ পরিণতি বয়ে আনবে এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের নীতি মানুষের উদ্যমতাকে নষ্ট করে দেয়, ইচ্ছাশক্তিকে নির্বাপিত করে দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভক্তির সময় পরিলক্ষিত হয়েছে, যার মালিকানায় ৩০% ভূমি ছিল, তাকে ৭০% ভূমির মালিকের মতোই ফসলের কর দিতে হতো। মূলত এই জমিগুলোর মালিক ছিল রাষ্ট্র। জনগণকে তা চাষাবাদ করার জন্য দেওয়া হতো। এর পতনের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ কারণ এটিও। যেমনিভাবে এর প্রথম কারণ ছিল ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা।

মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সম্পত্তির মালিক হবে—এটিই হলো বাস্তবতা এবং মানুষের অপরিবর্তনীয় ফিতরাত বা স্বভাবজাত চাহিদা, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। একমাত্র অজ্ঞ ও অত্যাচারীরাই এটিকে অস্বীকার করতে পারে। অতএব, মানুষের ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা শেষ পর্যন্ত দেশ ও জাতিকে দেউলিয়া করে ছাড়ে। ফলে অন্যান্য দেশের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরপাক খেতে হয়; যেমনটা করছে বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথচ এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এক সময়ের সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধশালী, উৎপাদনশীল, বিস্তৃত ও পানিসমৃদ্ধ দেশ। সমাজতন্ত্রের আগমনের পূর্বে এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র। কিন্তু আজ তা সমাজতন্ত্রের প্রভাবে ভিক্ষুকপ্রায় এবং আমেরিকা কানাডাসহ আরও বহু দেশ থেকে তারা এখন পণ্য আমদানি করে; অথচ তারা ছিল একসময়ের রপ্তানিকারক।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 শ্রেণি বিভাজনের মূলোৎপাটন

📄 শ্রেণি বিভাজনের মূলোৎপাটন


শ্রেণি সংগ্রাম। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে এই প্রজ্বলিত দ্বন্দ্বের পদ্ধতি কার্ল মার্ক্সের দেওয়া নোংরা ধারণাপ্রসূত। খেয়াল-খুশিপূর্ণ মতবাদ ও বাস্তবিক কার্যকরী মতবাদের মাঝে অনেক পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশের দিকে লক্ষ করলেও কার্ল মার্ক্সের এমন নিরর্থক নিয়মনীতি চোখে পড়বে না। মার্ক্স ও তার অনুসারীদের নিকট মানুষ শৃঙ্খলিত ও বশীভূত কর্মী মাত্র, যাকে প্রয়োজন হলে নির্যাতন বা বঞ্চিত করা যায় এবং তার ওপর আক্রমণ করার জন্য এবং তাকে ধ্বংস ও নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যেকোনো সুযোগই গ্রহণ করা যায়।

অপরদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের লক্ষ্যে, তাকে খুশি ও নিশ্চিন্ত করার জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগ কাজ করে থাকে। যদিও পুঁজিপতি সমাজব্যবস্থার ভিত্তি হলো, অন্যান্য জনগোষ্ঠির কাছ থেকে সুবিধা ভোগ করা, বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করা এবং আমাদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ লালন করা। অর্থাৎ পুঁজিপতি সমাজব্যবস্থার সাথে ইসলামের এত অমিল থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকের অধিকারের বিষয়ে তাদের চিন্তাধারা কিছুটা উন্নত। অথচ একই বিষয়ে কমিউনিস্টদের বাস্তব কর্ম তুলনামূলক অনেক ভয়ংকর।

পুজিবাদীরা গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলিকে আশ্রয় করে শাসন চালায়। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রে গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলিরও নাম-নিশানা থাকে না; বরং সেখানে চালু হয় একনায়কতন্ত্র, যা আরও ভয়ংকর, আরও বিভীষিকাময়। সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজমের ধ্বজাধারীরা গণতন্ত্র উচ্ছেদের ডাক দিয়ে 'জালিমশাহি নিপাত যাক' স্লোগান দিয়ে, 'দুনিয়ার মজদুর এক হও' আওয়াজ তুলে রক্তপাত, শঠতা ও ধূর্ততার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েই তাদের বোল পাল্টে ফেলে। সর্বহারাদের নামে দখল করা ক্ষমতায় আর কেউ যেন ভাগ না বসাতে পারে সে জন্য একদিকে যেমন চালু হয় একদলীয় শাসনব্যবস্থা, তেমনই অন্যদিকে বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য চালানো হয় সাঁড়াশি অভিযান। এখানে শ্রমিকদের রক্তের ওপর গড়া শাসনব্যবস্থা কুক্ষিগত থাকে কতিপয় বুর্জোয়া ব্যক্তিদের হাতে। পৃথিবীর কোনো সোস্যালিস্ট ও কম্যুনিস্ট দেশে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। শ্রেণিহীন এক স্বপ্নরাজ্যের স্থলে গড়ে ওঠে শ্রেণি বৈষম্যপূর্ণ এক নির্যাতন ও অত্যাচারের রাজত্ব।

মার্ক্স শ্রমিকদের ওপর সবচেয়ে বেশি অবিচার করেছে। তারা পোল্যান্ডে স্বয়ং সমাজতন্ত্রের ওপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল। যদি তাদের ও সন্ত্রাসীদের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করা হতো, তাহলে তারা সম্পূর্ণরূপে তাদের নীতিকে পরিবর্তন করে দিত এবং তাদের সেসব নেতাদের নির্মূল করে ছাড়ত, যারা দীর্ঘদিন যাবৎ শক্তিমত্তা ও অস্ত্রবলে তাদের ভয় দেখাত। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা এবং মার্ক্সবাদী শাসক-বিচারকদের মিথ্যা ও ভ্রান্তির একটি উত্তম নমুনা এটি। যারা জনগণের উপেক্ষার স্বীকার হয়েছে এবং তাদের বিরক্তি ও অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছে।

তবুও এই সমাজতন্ত্রের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণের জন্য শ্রমিকরা এই পর্যন্ত বহুবার আন্দোলন করেছে। ১৯৫৬ ও ১৯৬৮ সালে হাঙেরি ও চেকোশ্লোভাকিয়াতে যেমনটি ঘটেছিল। কিন্তু শাসকদের নির্দয়-নিষ্ঠুর আচরণ এবং হত্যা ও নির্যাতনের মুখে সেই আন্দোলনগুলো বারবারই সফলতার মুখ দেখতে পায়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px