📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 দ্বীনের ব্যাপারে ঠাট্রা বিদ্রুপ

📄 দ্বীনের ব্যাপারে ঠাট্রা বিদ্রুপ


কমিউনিজম সম্পূর্ণ একটি বস্তুবাদী ও নাস্তিকতামনা মতাদর্শ, যা আল্লাহ, নবি-রাসুল ও দ্বীন-ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা করে। মার্ক্সবাদের দর্শনতত্ত্ব বিষয়ে কার্ল মার্ক্স নিজেও বলত যে, এটি একটি বিতর্কিত, বস্তুবাদী, নাস্তিক্যমনা এবং ধর্মের প্রতি বিরূপভাবাপন্ন মতবাদ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের ইতিহাস যার উজ্জ্বল প্রমাণ বহন করে। ৯৩১

মার্ক্সবাদের নীতির ব্যাপারে লেনিন বলেছে, এই মতাদর্শের পক্ষে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। অবশ্যই এটা সকল জড়বাদী মতাদর্শের প্রাথমিক নীতি। কিন্তু মার্ক্সবাদ এখানেই ক্ষান্ত থাকেনি; বরং তারা আরও অগ্রসর হয়ে বলে যে, আমরা ধর্মের জন্য কীভাবে যুদ্ধ করব, তা জানা আবশ্যক। ৯৩২

আর মার্ক্সবাদ এমন একটি জড়বাদী ও অবিশ্বাসী মতাদর্শ, যা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বকে পরিপূর্ণরূপে অস্বীকার করে। এই বিশ্ব জগতের সৃষ্টি ও পরিচালনার ব্যাপারে তারা আল্লাহ তাআলার পূর্ণতাকে গ্রহণ না করে বস্তুবাদী ধারণা লালন করে। তাদের এমন চিন্তা-চেতনার পক্ষে প্রবৃত্তিপূজা ছাড়া কোনো প্রামাণ্য বা যুক্তিগত সনদ-সূত্র নেই। কোনো সুস্থ বিবেকেবান ব্যক্তি এমনটি মেনে নেবে না। মার্ক্সের এমন অস্বীকৃতি ও ঔদ্ধত্য শুধু চেতনাহীন গির্জার মধ্য থেকে উৎপাদিত ঘৃণিত কর্মের ফসল বৈ কিছু নয়। যে গির্জাগুলো ইহুদিদের বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন রকম শাস্তিতে ভুগিয়েছে। যেমন: হত্যা, লুণ্ঠন, ধ্বংস-বিনাশ, বিচ্ছেদ-বিভক্তি ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের কষ্টদান। ইসলাম ও আল্লাহ তাআলার প্রতি কার্ল মার্ক্সের অবজ্ঞার পেছনে গির্জার এ সমস্ত অমানবিক নির্যাতনের প্রভাব রয়েছে।

আর নিঃসন্দেহে দ্বীনে ইসলাম ও আল্লাহ তাআলার প্রতি এমন অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতি মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবের বিপরীত। এটা অবশ্যই মানবজাতির আত্মিক ও মানসিক স্বভাবের সাথে এক নির্লজ্জ শত্রুতা। মানুষ অন্তরের অন্তস্থল থেকে স্বীকার করে যে, তাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা এবং দ্বীনে ইসলামের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর তারা জন্মগ্রহণ করেছে। এটা তাদের আকিদা-বিশ্বাস, মন-মস্তিস্ক ও ধ্যান-ধারণার সাথে মিশে আছে।

শুধু তাই নয়; বরং সত্য হলো, মানুষ সুখে-দুঃখে, আশায়-শঙ্কায়, সঙ্গতায়-নিঃসঙ্গতায়; এমনকি মৃত্যুর সময়েও এ কথা স্বীকার করে যে, আল্লাহর অস্তিত্ব সত্য, তিনি বিপদে রক্ষাকারী এবং তিনি সকল কিছুর চেয়ে বড়। ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম হওয়ার সবচেয়ে সঠিক প্রমাণ হলো, সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষ যেকোনো বিপদে আল্লাহ অভিমুখী হয়। সুতরাং যদি মানুষ আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পৃক্তি মেনে নাও নেয়, তবুও সে প্রয়োজনের সময় প্রভুত্ব দাবিদারদের মোকাবেলায় তাঁকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। কার্ল মার্ক্সের মন্তব্য হলো, 'ধর্ম মানুষের জন্য আফিমস্বরূপ।' তার এমন মন্তব্যের কারণ হলো, দেশ ও জাতির প্রতি; বিশেষ করে ইহুদিদের প্রতি গির্জার জুলুম-নির্যাতন।

এমন অন্যায় নীতির ক্ষেত্রে কার্ল মার্ক্সের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই এবং খ্রিষ্টবাদের সাথেও আমাদের আকিদা-দর্শনের কোনো যোগসূত্র নেই। তবে খ্রিষ্টবাদের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হলো, 'ঈসা (আ) প্রচারিত প্রকৃত খ্রিষ্টধর্ম একটি প্রাক্তন আসমানি ধর্ম, যা মানুষের ওপর জুলুম করে না; বরং মানুষকে শান্তি, কল্যাণ, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের প্রতি আহ্বান করে।' পক্ষান্তরে যদি কোনো জবরদখলকারী স্বৈরাচার পূর্বের সেই খ্রিষ্টধর্মের নামে মানুষের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করে, তাহলে প্রকৃত আসমানি খ্রিষ্টধর্মের ওপর দোষ চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা, প্রাক্তন হোক বা চলমান, কোনো আসমানি ধর্মেই অন্যায়-অবিচারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবশ্য বর্তমানে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আসমানি ধর্ম অবিকৃতভাবে বিদ্যমানও নেই।

ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ইসলাম মানুষকে উদ্যমতা, চেষ্টা-প্রচেষ্টা, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, দান-দক্ষিণার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং সকল অন্যায়-অত্যাচার, মিথ্যা-ভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও মূর্খতাকে প্রতিহত করার জন্য আহ্বান করে। পৃথিবীর বুকে একমাত্র ইসলামই সকল মিথ্যা, অবিচার, জুলুম-নির্যাতন প্রতিহত করার সঠিক কর্মপদ্ধতি ঘোষণা করেছে। পক্ষান্তরে দুনিয়ার অপরাপর সকল ধর্ম-দর্শন, তন্ত্র-মন্ত্র, নিয়ম-নীতির ব্যাপারে এমনটি ধারণা করা নিতান্তই ভ্রান্তি। এর পক্ষে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও পূর্বসূরি মুসলিমদের ইতিহাসে অগণিত প্রমাণ রয়েছে। প্রথমে পবিত্র কুরআনে কারিমের চিরসত্য সেই প্রমাণ পেশ করা হলো, যাতে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ }
'তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো। আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দেবেন, তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন।' ৯৩৩

ইসলাম সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেছে। ইসলাম লাঞ্ছনা-অপদস্থতা থেকে উত্তরণের তরে আমরণ চেষ্টা-প্রচেষ্টার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ জালিম-অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্যের বাণী উচ্চকিত করাকে সর্বোকৃষ্ট জিহাদ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আবু সাইদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন :
'আফদ্বালুল জিহাদি কালিমাতু আদলিন ইনদা সুলতানিন জায়িরিন' (সর্বোৎকৃষ্ট জিহাদ হলো, স্বৈরাচারী শাসকের সামনে সত্যের বাণী উচ্চকিত করা।) ৯৩৪

তারিক বিন শিহাব বর্ণনা করেন:
'আইয়ুল জিহাদি আফদ্বালু? ক্বলা : কালিমাতু হাক্কিন ইনদা সুলতানিন জায়িরিন' (সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কোন জিহাদ অধিক উত্তম? তিনি উত্তরে বললেন, স্বৈরাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।) ৯৩৫

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'সাইয়্যিদুশ শুহাদায়ি ইয়াওমাল ক্বিয়ামাতিল হামজাতু ইবনু আবদিল মুত্তালিব...' (কিয়ামতের দিন শহিদগণের সরদার হবেন হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা), এবং সেই ব্যক্তি, যে কোনো স্বৈরাচার শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে (শরিয়তের) কোনো বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করেছে যদ্দরুন শাসক তাকে হত্যা করেছে।) ৯৩৬

এটি হলো এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা যে, ইসলাম কোনো অন্যায়-অত্যাচার, লাঞ্ছনা-অপদস্থতা বা দুর্বলের ওপর সবলের জুলুম-নির্যাতন সর্মথন করেনি; বরং সেগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য উৎসাহ প্রদান করেছে। ইসলাম এসব কিছু থেকে মানুষকে মুক্ত রেখেছে এবং অন্যদের মুক্ত করার সুন্দরতম নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অতএব, ধর্মকে আফিম বা নেশা বলে আখ্যায়িত করার কোনোই যৌক্তিকতা নেই। আফিম, ইয়াবা, গাজা প্রভৃতির নেশা এমনই এক মহামারি, যাতে কেবল মার্ক্সবাদীরাই টিকে থাকতে পারে। হিংসা, ধোঁকা, প্রতারণা ও অন্ধবিশ্বাস এদের অন্তরে স্থান করে নিয়েছে এবং হৃদয়াত্মার শুষ্কতা, মনুষ্যত্বশূন্যতা ও চরিত্রহীনতা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে।

টিকাঃ
৯৩১. মুহাম্মাদ কিব্বা অনূদিত এবং আফিফ আখদার সম্পাদিত আল-মাওকিফ মিনাদ দ্বীন লি লেনিন: পৃ. নং ২৫
৯৩২. প্রাগুক্ত
৯৩৩. সুরা আত-তাওবা: ১৪
৯৩৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪/১২৪, হা. নং ৪৩৪৪ (আল-মাকাতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৯৩৫. মুসনাদু আহমাদ: ৩১/১২৬, হা. নং ১৮৮৩০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৯৩৬. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৪/২৩৮, হা. নং ৪০৭৯ (দারুল হারামাইন, কায়রো) - ইমাম আবু হানিফা সূত্রে হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 সব উন্নতির মাধ্যম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

📄 সব উন্নতির মাধ্যম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি


সাম্যবাদীদের দৃষ্টিতে অর্থনীতিই হচ্ছে একমাত্র ভিত্তি, যার ওপর ভর করেই মানুষের জীবন ও সমাজ গড়ে ওঠে। সুতরাং যেকোনো ধরনের উন্নতি, অগ্রগতি, প্রভাব ও পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে, উৎপাদনের উপকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

তাদের এমন চিন্তাধারা নিরর্থক প্রলাপ বৈ কিছু নয়। যার সামান্যতম চেতনা ও অনুভূতি আছে, সেও এমন চিন্তাধারা গ্রহণ করবে না। তাই এ ধরনের বাস্তবতাবিবর্জিত নীতি নবি-রাসুল ও সালাফে সালিহিনের দিকে সম্বোধিত করা বস্তুত তাঁদের মান ক্ষুণ্ণ করারই নামান্তর। যাঁদের কথা ও চিন্তা-গবেষণায় মানুষের কর্ম ও বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন ও উন্নতি আসে, যাঁদের আদর্শ বাস্তবায়নে ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় এবং যাঁদের অনুসরণে সমাজের পাপ-পঙ্কিলতা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাদের থেকে কখনো এমন অজ্ঞতাপূর্ণ বাণী বা নীতি প্রকাশের কল্পনাও করা যায় না।

অতএব, কমিউনিজমভিত্তিক অর্থনীতিকে নবি-রাসুল, সালাফে সালিহিন ও উম্মাহর বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের সাথে সম্পৃক্ত করার অর্থ হচ্ছে তাঁদের অপমান করা এবং ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে তুচ্ছ করা। তা ছাড়াও তাদের এটি মারাত্মক একটি ভুল চিন্তা যে, অর্থনীতিই মানুষের অগ্রগতি, উন্নতি ও পরিবর্তনের মূলভিত্তি ও উপাদান। বস্তুত বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস ও সঠিক চিন্তা-চেতনার মাধ্যমেই মানুষের জীবনে পরিবর্তন, উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়ে থাকে।

মানুষের মন ও মস্তিষ্কের গভীর থেকেই আকিদা বা বিশ্বাসের উৎপত্তি। আর মানুষ তার ভেতরে বদ্ধমূল আকিদা-বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েই কোনো কিছুর প্রতি ধাবিত হয়। অন্তরে থাকা সে আকিদাই মানুষকে কোনো কাজ করা বা না করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। অতএব, মানবজীবনে অর্থের ভূমিকা শুধু এতটুকুই যে, মানুষ এর দ্বারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু এটা কখনোই একজন মানুষের উন্নতি, অগ্রগতি বা আমূল পরিবর্তনের মূলভিত্তি হতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত নিরক্ষর এক জাতির মাঝে। অতঃপর অর্থের বিশেষ কোনো ভূমিকা ছাড়াই তা পৃথিবীর আনাচে-ানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলাম স্বমহিমায় নিজ গতিতেই বিস্তৃতি লাভ করেছে। কখনো অর্থনীতির উন্নতির ওপর নির্ভর করেনি; বরং ইসলামের যত উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা কেবল ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস হৃদয়ে গেঁথে নেওয়ার কারণেই হয়েছে। ফলে ইসলামই মুসলমানদের যেকোনো কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধকারীর ভূমিকা পালন করেছে। সুতরাং বুঝা গেল, মানুষের যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা কোনো কিছুর প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়া অর্থনীতির প্রভাবে হয় না; বরং তা কেবল তাদের আকিদা বা বিশ্বাসের কারণেই হয়ে থাকে।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ব্যক্তি মালিকানা বলতে কিছুই নেই

📄 ব্যক্তি মালিকানা বলতে কিছুই নেই


ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা। ব্যক্তি মালিকানার ব্যাপারে কার্ল মার্ক্সের ধারণা ছিল নিতান্তই ভুল। তার ধারণামতে, এটি হচ্ছে অন্যায় হস্তক্ষেপ, ছিনতাই-লুণ্ঠন ও জুলুম-নির্যাতনের প্রাথমিক স্তর। তাই ব্যক্তি মালিকানার পরিধি যত বড় বা ছোটই হোক না কেন, সাম্যবাদী দৃষ্টিতে তা নিন্দনীয়। তারা মনে করে যে, মানুষকে যেই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ও পোশাকাদি রাষ্ট্র জোগান দিয়ে থাকে, তাদের সেই পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয় না। অতএব, জনগণের পরিবর্তে সকল সম্পত্তির অধিকারী হবে একমাত্র রাষ্ট্র। তাতে কারও সামান্যতম মালিকানাও থাকবে না। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাদের এমন মতবাদ মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা ও আগ্রহের পরিপন্থী; অথচ মানুষ সৃষ্টিগত ও বস্তুগতভাবেই ব্যক্তি মালিকানার প্রতি আগ্রহী হয়। প্রত্যেকেই স্ত্রী, ছেলে-সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করে। তাই সকলেই চায় প্রয়োজন পূরণের জন্য তার কিছু সম্পত্তি থাকুক। কমিউনিজমের এমন অযৌক্তিক নীতি মানুষকে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তি মালিকানা থেকে জোরপূর্বক বঞ্চিত করেছে। আর মানুষের সাথে এমন অসংগতিপূর্ণ আচরণ স্বয়ং মানুষ ও দেশের জন্য তাদের অবদানের ওপর অশুভ পরিণতি বয়ে আনবে এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের নীতি মানুষের উদ্যমতাকে নষ্ট করে দেয়, ইচ্ছাশক্তিকে নির্বাপিত করে দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভক্তির সময় পরিলক্ষিত হয়েছে, যার মালিকানায় ৩০% ভূমি ছিল, তাকে ৭০% ভূমির মালিকের মতোই ফসলের কর দিতে হতো। মূলত এই জমিগুলোর মালিক ছিল রাষ্ট্র। জনগণকে তা চাষাবাদ করার জন্য দেওয়া হতো। এর পতনের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ কারণ এটিও। যেমনিভাবে এর প্রথম কারণ ছিল ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা।

মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সম্পত্তির মালিক হবে—এটিই হলো বাস্তবতা এবং মানুষের অপরিবর্তনীয় ফিতরাত বা স্বভাবজাত চাহিদা, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। একমাত্র অজ্ঞ ও অত্যাচারীরাই এটিকে অস্বীকার করতে পারে। অতএব, মানুষের ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করা শেষ পর্যন্ত দেশ ও জাতিকে দেউলিয়া করে ছাড়ে। ফলে অন্যান্য দেশের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরপাক খেতে হয়; যেমনটা করছে বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথচ এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এক সময়ের সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধশালী, উৎপাদনশীল, বিস্তৃত ও পানিসমৃদ্ধ দেশ। সমাজতন্ত্রের আগমনের পূর্বে এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র। কিন্তু আজ তা সমাজতন্ত্রের প্রভাবে ভিক্ষুকপ্রায় এবং আমেরিকা কানাডাসহ আরও বহু দেশ থেকে তারা এখন পণ্য আমদানি করে; অথচ তারা ছিল একসময়ের রপ্তানিকারক।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 শ্রেণি বিভাজনের মূলোৎপাটন

📄 শ্রেণি বিভাজনের মূলোৎপাটন


শ্রেণি সংগ্রাম। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে এই প্রজ্বলিত দ্বন্দ্বের পদ্ধতি কার্ল মার্ক্সের দেওয়া নোংরা ধারণাপ্রসূত। খেয়াল-খুশিপূর্ণ মতবাদ ও বাস্তবিক কার্যকরী মতবাদের মাঝে অনেক পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশের দিকে লক্ষ করলেও কার্ল মার্ক্সের এমন নিরর্থক নিয়মনীতি চোখে পড়বে না। মার্ক্স ও তার অনুসারীদের নিকট মানুষ শৃঙ্খলিত ও বশীভূত কর্মী মাত্র, যাকে প্রয়োজন হলে নির্যাতন বা বঞ্চিত করা যায় এবং তার ওপর আক্রমণ করার জন্য এবং তাকে ধ্বংস ও নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য যেকোনো সুযোগই গ্রহণ করা যায়।

অপরদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের লক্ষ্যে, তাকে খুশি ও নিশ্চিন্ত করার জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগ কাজ করে থাকে। যদিও পুঁজিপতি সমাজব্যবস্থার ভিত্তি হলো, অন্যান্য জনগোষ্ঠির কাছ থেকে সুবিধা ভোগ করা, বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করা এবং আমাদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ লালন করা। অর্থাৎ পুঁজিপতি সমাজব্যবস্থার সাথে ইসলামের এত অমিল থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকের অধিকারের বিষয়ে তাদের চিন্তাধারা কিছুটা উন্নত। অথচ একই বিষয়ে কমিউনিস্টদের বাস্তব কর্ম তুলনামূলক অনেক ভয়ংকর।

পুজিবাদীরা গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলিকে আশ্রয় করে শাসন চালায়। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রে গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলিরও নাম-নিশানা থাকে না; বরং সেখানে চালু হয় একনায়কতন্ত্র, যা আরও ভয়ংকর, আরও বিভীষিকাময়। সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজমের ধ্বজাধারীরা গণতন্ত্র উচ্ছেদের ডাক দিয়ে 'জালিমশাহি নিপাত যাক' স্লোগান দিয়ে, 'দুনিয়ার মজদুর এক হও' আওয়াজ তুলে রক্তপাত, শঠতা ও ধূর্ততার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েই তাদের বোল পাল্টে ফেলে। সর্বহারাদের নামে দখল করা ক্ষমতায় আর কেউ যেন ভাগ না বসাতে পারে সে জন্য একদিকে যেমন চালু হয় একদলীয় শাসনব্যবস্থা, তেমনই অন্যদিকে বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য চালানো হয় সাঁড়াশি অভিযান। এখানে শ্রমিকদের রক্তের ওপর গড়া শাসনব্যবস্থা কুক্ষিগত থাকে কতিপয় বুর্জোয়া ব্যক্তিদের হাতে। পৃথিবীর কোনো সোস্যালিস্ট ও কম্যুনিস্ট দেশে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। শ্রেণিহীন এক স্বপ্নরাজ্যের স্থলে গড়ে ওঠে শ্রেণি বৈষম্যপূর্ণ এক নির্যাতন ও অত্যাচারের রাজত্ব।

মার্ক্স শ্রমিকদের ওপর সবচেয়ে বেশি অবিচার করেছে। তারা পোল্যান্ডে স্বয়ং সমাজতন্ত্রের ওপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল। যদি তাদের ও সন্ত্রাসীদের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করা হতো, তাহলে তারা সম্পূর্ণরূপে তাদের নীতিকে পরিবর্তন করে দিত এবং তাদের সেসব নেতাদের নির্মূল করে ছাড়ত, যারা দীর্ঘদিন যাবৎ শক্তিমত্তা ও অস্ত্রবলে তাদের ভয় দেখাত। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা এবং মার্ক্সবাদী শাসক-বিচারকদের মিথ্যা ও ভ্রান্তির একটি উত্তম নমুনা এটি। যারা জনগণের উপেক্ষার স্বীকার হয়েছে এবং তাদের বিরক্তি ও অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছে।

তবুও এই সমাজতন্ত্রের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণের জন্য শ্রমিকরা এই পর্যন্ত বহুবার আন্দোলন করেছে। ১৯৫৬ ও ১৯৬৮ সালে হাঙেরি ও চেকোশ্লোভাকিয়াতে যেমনটি ঘটেছিল। কিন্তু শাসকদের নির্দয়-নিষ্ঠুর আচরণ এবং হত্যা ও নির্যাতনের মুখে সেই আন্দোলনগুলো বারবারই সফলতার মুখ দেখতে পায়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px