📄 দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ
সমাজতান্ত্রিক জীবন দর্শনের মূলভিত্তি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ নিছক কোনো দর্শন নয়; বরং তথাকথিত বিজ্ঞানের সমগোত্রীয়। যেহেতু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিজ্ঞান থেকে শক্তি আহরণ করেছে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জগৎ ও জীবনের সার্বিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা দান করে থাকে, তাই একে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও বলা হয়। জার্মান দার্শনিক হেগেলের তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—থিসিস, এন্টিথিসিস ও সিনথিসিস। আজকের বাস্তবতাই থিসিসের ফল। এই থিসিসের বিরুদ্ধে তৈরি হয় এন্টিথিসিস। দুয়ের সংঘর্ষে উদ্ভব হয় সিনথিসিসের। এই সিনথিসিসই পরবর্তীতে পুনরায় থিসিস হয়ে দাঁড়ায়। বিরোধমূলক বিকাশের ধারণার দ্বারা মার্ক্স বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। মার্ক্স ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে তার তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়াস পায়। সেই প্রয়াসে বারবার শ্রেণি সংগ্রাম প্রসঙ্গকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তার মতে পৃথিবীর বিকাশ হয়েছে বিবর্তনবাদ ও শক্তিবাদের মধ্য দিয়ে। চার্লস ডারউইনের (১৮০৯-১৮৮২) বিবর্তনবাদ (Theory of Evolution) ও প্রকৃতির নির্বাচন (Natural Selection) বা যোগ্যতমেরই বেঁচে থাকার অধিকার তত্ত্ব (Survival of the Fittest) মার্ক্সকে তার মতবাদে আস্থাশীল হতে বিপুলভাবে সহায়তা করেছিল। ফলে তারা জোরেশোরেই প্রচার করতে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাসে শক্তিমানরাই শুধু টিকে থাকবে, অন্যরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাদের মতে পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হয়েছে।
এখন আমরা মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ দর্শনকে মার্ক্সের প্রস্তাবিত কমিউনিজম বা শ্রেণিহীন সমাজ দ্বারা বোঝার চেষ্টা করি। আমরা জানি, পুঁজিবাদের বিকাশের একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে মার্ক্স কমিউনিজমের প্রস্তাব দেয়। অর্থাৎ পুঁজিবাদ ওই সময়ে বিরাজমান ছিল থিসিস হিসাবে। মার্ক্স পুঁজিবাদের বিপরীত এ্যান্টিথিসিস বা প্রতিপ্রস্তাব হিসাবে কমিউনিজমের প্রস্তাব দেয়। এই থিসিস (পুঁজিবাদ) এবং এ্যান্টিথিসিসের (কমিউনিজম) মিথস্ক্রিয়ায় সভ্যতা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী হিসাবে নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে। আর এই নতুন বিকাশটা একটা প্রস্তাব হিসাবে দেখা দিয়েছে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের অর্থব্যবস্থার দ্বান্দ্বিকতার সংশ্লেষণে তৃতীয় এক অর্থব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। আর সেটা হলো মিশ্র-অর্থব্যবস্থা। এখানে এসে মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন দ্বান্দ্বিক উপায়ে নিজের প্রস্তাবকে নাকচ করে নতুন রিলেশন অব প্রডাকশন তৈরি করে।
এখন কথা হলো, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যেহেতু বৈজ্ঞানিক আর এদিকে মানব সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব যেহেতু চিরন্তন, তাই সভ্যতা বিকাশের এক পর্যায়ে মানুষের আচরণগত মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রেণিহীন সমাজ বিকাশ লাভ করতে পারে বস্তবাদের দ্বান্দ্বিক নিয়মে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মার্ক্স প্রস্তাবিত কমিউনিজম বা শ্রেণিহীন সমাজে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শন কাজ করবে কিনা? মানবসমাজ যেহেতু গতিশীল, তাই বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ শ্রেণিহীন সমাজেও একইভাবে কাজ করবে। একটা বিশেষ পর্যায়ে শ্রেণিহীন সমাজে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে এবং নতুনভাবে ইতিহাস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী উপায়ে বিকাশ লাভ করবে। এই জায়গায় এসে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তার আবিষ্কারককেও অস্বীকার করে, তাকে টেক্কা দিয়ে নতুন রূপ লাভ করে।
📄 ধর্মের উৎখাত
সমাজতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হলো নাস্তিক্যবাদ (Atheism)। মার্ক্স-এঙ্গেলস গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে, ধর্মই সব অনর্থের মূল। ধর্মের কারণে সমাজে শোষণ দৃঢ়মূল হয়ে রয়েছে। তাই এর বিনাশ ও উচ্ছেদ অপরিহার্য।
📄 ব্যক্তি স্বাধীনতার উচ্ছেদ
এ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পদ ও মুনাফা অর্জন নিষিদ্ধ। এ মতবাদে সম্পদ ও উৎপাদনের উপকরণের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে বলে বিশ্বাস করা হয়। ফলে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য ও শ্রেণিশোষণ বিলুপ্ত হবে। ব্যক্তিগত সম্পদ রাষ্ট্রীয় সম্পদরূপে পরিগণিত হবে।
📄 নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, কলকারখানা, জমি, সম্পদ ও উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা স্বীকৃত থাকবে। এই অর্থব্যবস্থায় জাতীয় আয় বণ্টনের মূলনীতি হলো, প্রত্যেকে তার নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করবে এবং কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। এভাবে আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।