📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 পুঁজিবাদের ফলাফল

📄 পুঁজিবাদের ফলাফল


এ মতবাদে দান-দক্ষিণা, লজ্জা-ভদ্রতা, প্রতিবেশী ও মেহমানের আপ্যায়ন, দুর্বলের ওপর দয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করার মতো দ্বীনি বা মানবিক মূল্যবোধ থাকার ধারণা পর্যন্ত করা দুষ্কর। পুঁজিবাদে ধর্মের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকৃত। তবে এতটুকু ছাড় দেওয়া হয় যে, চরম হীনতার সাথে ধর্ম পালন করা যায়। ধর্ম এতটুকু গুরুত্বহীনতায় পৌঁছে যে, ঘরের কোণে বা ইবাদতখানায় কিছুটা আশ্রয় পায়।

মোটকথা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানবজীবনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ব্যষ্টিক, চৈন্তিক দিকসহ সকল ক্ষেত্র ধর্মের নিয়ন্ত্রণহীন। কেননা, পুঁজিবাদ ভিত্তিগতভাবে পুরোপুরি ধর্মকে মানুষের বাস্তবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে জীবন এক জিনিস, ধর্ম অন্য জিনিস। ধর্মের সাথে জীবনের কোনো সম্পর্কই নেই। যদি সত্য, কল্যাণ, গুণগতমান বিবেচনার ক্ষেত্রে ধর্ম সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে যায়, তবে অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে? নিঃসন্দেহে তখন অবস্থা এমন বেগতিক রূপ ধারণ করবে যে, আসমানি শিক্ষা থেকে মানবজীবন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে জীবন দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যে পূর্ণ হয়ে যাবে, জীবন ভরে যাবে দুর্দশায়। এ সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত হচ্ছে :
{ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا }
‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে।’

যখন সমাজ থেকে দ্বীনের সূর্য অস্তমিত হবে, কল্যাণের ঐশী আহ্বান বন্ধ হয়ে যাবে, এমনকি মানুষের মন-মানসিকতা থেকে আল্লাহভীতি লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন কিসের সম্ভাবনার ঘনঘটা দেখা দেবে? হীনতা, নীচতা, ঔদ্ধত্য, পতনের আর কোন স্তরটি বাকি থাকবে?

টিকাঃ
৯২৭. সুরা তহা: ১২৪

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 পুঁজিবাদে কল্যাণ আছে কি?

📄 পুঁজিবাদে কল্যাণ আছে কি?


যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ও অবাধ মুনাফা নিষিদ্ধ নয়; বরং এর ওপর ভিত্তি করেই এ ব্যবস্থার ভিত্তি, তাই যে কেউ যেকোনো পণ্য হারাম হোক বা হালাল, ক্ষতিকর হোক বা উপকারী, মোটকথা অর্থ উপার্জিত হয়, এমন সকল দিকই পুঁজিবাদে বৈধ।

নিঃসন্দেহে মানুষ এমন অবাধ সুবিধার ফলে বিকৃতমনা হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হবে। পুঁজিবাদের মাঝে বাহ্যত যে কল্যাণ আছে, তা খুবই সংকুচিত। এ কল্যাণ স্বার্থবাজ দাম্ভিকদের জন্যই সংরক্ষিত। নির্দয় জালিমরাই সে কল্যাণের অধিকারী হতে পারে। যাদের কোনো কিছুই তৃপ্ত করতে পারে না, এমন লালসাকামীদের জন্যই এ অধিকার প্রযোজ্য।

অন্যদিকে পুঁজিবাদ ব্যবস্থায় যে পরিবার থেকে দ্বীনের আলো অদৃশ্য হয়ে যায়, সে পরিবার বিভিন্ন ফাসাদ ও ফাটলের কবলে পড়ে পদে পদে হোঁচট খায়। পরিশেষে পরিবারটি ভেঙে খান খান হয়ে যায়। যেমনটা আমরা পশ্চিমা বিশ্বের পরিবারসমূহে দেখি যে, তাদের প্রায় প্রতিটি পরিবারই আমিত্ববোধ, কলহ ও বিশৃঙ্খলালায় পূর্ণ। পরিশেষে তালাক ও অশান্তিই তাদের শেষ পরিণতি।

এমনিভাবে ব্যক্তি ও পরিবার নিয়ে গঠিত একটি সমাজ যখন পুঁজিবাদ ব্যবস্থার অধীনে আসে, তখন তাতে কেবল বিরোধিতা ও বিশৃঙ্খলাই বিরাজ করে। বিভিন্ন ফাসাদ, অপরাধ ও নিকৃষ্ট কার্যকলাপে উত্তাল হয়ে ওঠে। সামাজিক রোগব্যাধির অন্ত থাকে না। এ সমাজে দুঃখ, হতাশা থেকে জন্ম নেয় আত্মহত্যার মতো ঘটনা। অতঃপর বিভিন্ন নেশার প্রতি আসক্তি। যেমন: মদ, আফিম, ড্রাগ, ভেলিয়াম। যৌনাঙ্গসমূহে আক্রান্তকারী সংক্রামক যন্ত্রণাদায়ক রোগ। যেমন: হারপেস, সিফিলিস, গনোরিয়া। অতঃপর আসে শরিয়ত বহির্ভূত পন্থায় আসা সন্তানের কথা, যা হারাম পন্থায় ব্যভিচারের মাধ্যমে এসেছে। অতঃপর তালাকের পরিমাণ, যা বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। দিনদিন বৈবাহিক জীবন নিয়ে মানুষের মাঝে তাচ্ছিল্যতা বাড়ছে। দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন দায়িত্ব থেকে নিজেদের নিষ্কৃতি দিতে আগ্রহী হচ্ছে। যতদিন বাজারে বাজারে নারী, মদ্যশালা ও পতিতালয় সহজলভ্য হবে, ততদিনই এ অবস্থা বিরাজ করবে।

সারকথা, বহু পর্যবেক্ষণ ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সাব্যস্ত হয়েছে যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষকে ব্যাপক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, যা ধ্বংস, বিনাশ ও বিপথগামিতার দিকে নিয়ে যায়। তারপর আসে বিভিন্ন স্বার্থপরতা ও আত্মিক রোগ। পরিবারের মধ্যে দেখা দেয় বিভেদ। ফলে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে আদালতের কক্ষে এনে দাঁড় করায়। পরস্পরের মাঝে মামলার ঠুকাঠুকি চলে। তালাক, ঝগড়া-বিবাদ ও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাসঘাতকতা চলতে থাকে। এমনি করে একটি সমাজকে অধোমুখী করে ধ্বংস করে ফেলে। বিভিন্ন অশ্লীলতা, পাপাচারিতা সমাজকে নষ্ট করে ফেলে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এমন সব মাধ্যমকেই আশ্রয় করে চলে, যা সম্পদ অর্জনে তার প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে। পুঁজিবাদ কর্তৃক গৃহীত এ সকল মাধ্যম দ্বীন ও তার প্রত্যাশার প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। আসমানি কিতাবে নাজিল হওয়া হালাল-হারাম বিধানের ব্যাপারে মোটেও চিন্তা করে না; বরং হালাল-হারামের এ চিন্তার ব্যাপারে পুঁজিবাদের রায় হচ্ছে, এটি কেবলই পশ্চাদগামিতা, যাকে মোটেও তোয়াক্কা করা উচিত নয়।

এ ব্যবস্থায় সম্পদ উপার্জনের যে প্রধান মাধ্যমগুলো রয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো সুদ। এ বিষয়ে পূর্বে আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে আমরা এ আলোচনা করেছিলাম যে, ইসলাম বীভৎসতা ও ন্যাক্কারজনক অপরাধগুলোর মাঝে সুদকে জঘন্যতম বলে থাকে। কিন্তু সুদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ অর্জনের একটি অভিজাত পন্থা বলে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমেই সম্পদ অর্জন ও তার প্রবৃদ্ধি ঘটানো হয়। এ সুদি ব্যবস্থার ফলে সুদগ্রহীতার অন্তরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যা তাকে ঘৃণ্য স্বার্থবাজে পরিণত করে। যার ফলে তার অভ্যাসে পরিণত হয় যে, সে ঋণগ্রহীতাদের নিকট থেকে একে একে তাদের সবকিছু কেড়ে নেয়। তাদের অভাবকে সম্পদ উপার্জনের সুযোগ হিসাবে কাজে লাগায়। সুদি ঋণ দেওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট হারে তার সুদকে বাড়াতে থাকে, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের রেট বসাতে থাকে। এ ঘৃণ্য সুযোগ গ্রহণকে ইসলাম হারাম করেছে আর পুঁজিবাদ তাকে বৈধতার মান দিয়েছে। এ ধরনের সুযোগ হরেক রকমের, যার মাঝে কয়েকটি হলো—বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য, ইন্স্যুরেন্স, জোরপূর্বক সম্পদ কেড়ে নেওয়া, ঘুষ গ্রহণ ও অন্যায়ভাবে সম্পদ হস্তগত করা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px