📄 পুঁজিবাদের প্রকৃত রূপ
পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা, যা সম্পদ উৎপাদন ও উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা প্রতিষ্ঠা করে থাকে। এ থেকে বুঝা যায় যে, পুঁজিবাদের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো সম্পদ। এটি এমন এক সংগঠন, যাতে পণ্য সম্পর্ক থাকে মুখ্য, ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্ক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার ক্রমাগত ক্ষুদ্র নিঃসঙ্গ পর্যায়ে নিছক বাণিজ্যিক বোঝাপড়ার জায়গায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র এখানে শাসন ও শোষণে হাত পাকিয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় সেবা ক্রয়-বিক্রয়ের দালালিতে গিয়ে ঠেকে।
এ থেকে বুঝে আসে যে, পুঁজিবাদ এমন ব্যবস্থার নাম, যাতে সম্পদই হলো সকল সমস্যার সমাধান ও যৌক্তিকতার ভিত্তি। এটি সকল পরিমাপকের ঊর্ধ্বে, চাই তা ধর্মীয় বা প্রচলিত নিয়ম হোক, কিংবা মূল্যবোধ ও চারিত্রিক দিক হোক। তাই রাজনৈতিক সমস্যা, ব্যষ্টিক ও সামাজিক আচার-আচরণের সকল দিক ও গুরুত্ব বিবেচনায় কল্যাণের পরিমাপক হলো সম্পদ। ফলে প্রমাণ উপস্থাপন বা দাবি পেশ করার জন্য কারও কাছে চারিত্রিক, দ্বীনি বা আসমানি শিক্ষার কোনো মূল্য থাকে না।
📄 পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ :
📄 সংক্ষেপে পুঁজিবাদের বর্তমান চরিত্র
১. একক পরাশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ।
২. অর্থনৈতিক বৈষম্যের চরম অবস্থা। ১৯৯৬ সালের রিপোর্ট মতে ধনী-দরিদ্রের জীবনযাপনের ব্যয়সূচক বিগত দুই দশকে ১০ : ১ হতে ৭০ : ১ এ উন্নীত হয়েছে।
৩. বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের ছলে বিশ্বকে শোষণের কৌশল গ্রহণ।
৪. যুগপৎ চরম দারিদ্র্য ও ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবনযাপনের নিত্যকার দৃশ্য।
৫. স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রবাহ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের স্লো পয়জনিং।
৬. এনজিও কালচার পত্তনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে শোষণের বিস্তৃতি।
৭. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মোড়লগিরি গ্রহণ।
৮. ইসলামের মোকাবেলায় সমাজতন্ত্রের সাথে অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ।
টিকাঃ
৯২৬. শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান কৃত, ইসলামি অর্থনীতি : পৃ. ২৯১ (দি রাজশাহী স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, রাজশাহী- ৪র্থ সংস্করণ ২০০৫)
📄 পুঁজিবাদের ফলাফল
এ মতবাদে দান-দক্ষিণা, লজ্জা-ভদ্রতা, প্রতিবেশী ও মেহমানের আপ্যায়ন, দুর্বলের ওপর দয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করার মতো দ্বীনি বা মানবিক মূল্যবোধ থাকার ধারণা পর্যন্ত করা দুষ্কর। পুঁজিবাদে ধর্মের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকৃত। তবে এতটুকু ছাড় দেওয়া হয় যে, চরম হীনতার সাথে ধর্ম পালন করা যায়। ধর্ম এতটুকু গুরুত্বহীনতায় পৌঁছে যে, ঘরের কোণে বা ইবাদতখানায় কিছুটা আশ্রয় পায়।
মোটকথা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানবজীবনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ব্যষ্টিক, চৈন্তিক দিকসহ সকল ক্ষেত্র ধর্মের নিয়ন্ত্রণহীন। কেননা, পুঁজিবাদ ভিত্তিগতভাবে পুরোপুরি ধর্মকে মানুষের বাস্তবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে জীবন এক জিনিস, ধর্ম অন্য জিনিস। ধর্মের সাথে জীবনের কোনো সম্পর্কই নেই। যদি সত্য, কল্যাণ, গুণগতমান বিবেচনার ক্ষেত্রে ধর্ম সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে যায়, তবে অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে? নিঃসন্দেহে তখন অবস্থা এমন বেগতিক রূপ ধারণ করবে যে, আসমানি শিক্ষা থেকে মানবজীবন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে জীবন দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যে পূর্ণ হয়ে যাবে, জীবন ভরে যাবে দুর্দশায়। এ সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত হচ্ছে :
{ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا }
‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে।’
যখন সমাজ থেকে দ্বীনের সূর্য অস্তমিত হবে, কল্যাণের ঐশী আহ্বান বন্ধ হয়ে যাবে, এমনকি মানুষের মন-মানসিকতা থেকে আল্লাহভীতি লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন কিসের সম্ভাবনার ঘনঘটা দেখা দেবে? হীনতা, নীচতা, ঔদ্ধত্য, পতনের আর কোন স্তরটি বাকি থাকবে?
টিকাঃ
৯২৭. সুরা তহা: ১২৪