📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 সারকথা

📄 সারকথা


নিঃসন্দেহে উভয় প্রকার ধর্মনিরপেক্ষতাই সুস্পষ্ট কুফরি। যদি কেউ উল্লেখিত কোনো প্রকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়, তবে সে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত ও মুরতাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন।

ইসলামই হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট বিধান রয়েছে; চাই তা আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চারিত্রিক, সামাজিক বা যেকোনো শাখা হোক। ইসলাম কখনো কোনো মতবাদকে তার বিধানে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেয় না। ইসলামের প্রমাণিত কোনো বিষয় যে প্রত্যাখ্যান করল, সে কাফির ও পথভ্রষ্ট; যদিও তা পরিমাণে সামান্যই হোক না কেন।

ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অনুসারীদের মাঝে ইমান ভঙ্গের অনেক কারণ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে, তারা বিশ্বাস করে যে, নবিজি ﷺ-এর আদর্শ থেকে অন্য কারও আদর্শ উত্তম, তাঁর ফয়সালার চেয়ে অন্য কারও ফয়সালা উত্তম। আর এটি যে ইমান ভঙ্গের কারণ, তাতে কারও মতানৈক্য নেই।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ধর্মনিরপেক্ষ মতাবলম্বীদের শ্রেণিভাগ

📄 ধর্মনিরপেক্ষ মতাবলম্বীদের শ্রেণিভাগ


ইসলামি বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ মতালম্বীরা সংখ্যায় অগণিত। তাদের অনেকে লেখক, সাহিত্যিক বা সাংবাদিক, কেউ ইসলামি চিন্তাবিদ, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরূপে অবস্থান করছে। তাদের বিরাট একটি অংশ বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে কর্মরত ও কর্তৃত্বকারী। এ ছাড়া অন্যান্য পেশায়ও তাদের সংখ্যা কম নয়।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবতা

📄 ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবতা


ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি পরিভাষা, যা দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পরিপূর্ণ পৃথক করাকে বুঝিয়ে থাকে। বস্তুবাদের সাথে আধ্যাত্মিকতার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাকে বোঝায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একপ্রকার নাস্তিকতার অর্থ ও সংজ্ঞার সমার্থক। ৯২৪

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো এমন এক মতবাদ, যার অধীনে সকল ধর্ম ও জড়বাদী আদর্শ স্থান পায়। যে জড়বাদ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা থেকে সম্পূর্ণরূপে খালি। তাই বলতে গেলে এখানে সকল ধর্ম ও আদর্শ; চাই তা বাতিল হোক বা সঠিক হোক—সকলের সমঅধিকার রয়েছে। ফলে এখানে কুফর ও নাস্তিকতার সকল প্রকার, যেমন: ফ্রীম্যাসনারি, অস্তিত্ববাদী, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রী ও পূজনবাদের সকল প্রকার, তা চাই পাথরপূজা, গোত্রপ্রীতি, বর্ণবাদ যাই হোক—সকল প্রকার কুফর এখানে সমান। এগুলোর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

যে মৌলিক বিষয়টির ওপর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত, তা হলো ধর্ম ও জীবনের মধ্যকার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা। যেন ধর্মের সাথে বাস্তব জীবনের সামান্য পরিমাণও সম্পর্ক না থাকে। জীবনের প্রতিটি দিক—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক, চারিত্রিক; মোটকথা জীবনের সকল দিকের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এটাই ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কথা।

ধর্মনিরপেক্ষতার রূপটি এমন নয় যে, জীবনের সাথে ধর্মের কিছু হলেও সম্পর্ক থাকবে অথবা ধর্মের কিছু নিয়ম-রীতি হলেও মানুষের বাস্তবিক জীবনে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মানুষ সহজে এ ব্যাপারটি বুঝতে পারে না। কারণ, মানবরচিত সংবিধান এ বাস্তবতাকে গোপন রাখে।

বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র যে অবস্থার মাঝে বিরাজ করছে, তা হলো কুফরি ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থা। যেখানে ধর্মকে এক ঘরে করে রাখা হয়। ধর্মের যাবতীয় অনুষঙ্গ নিয়ে এবং জমিনের সাথে আসমানি সম্পর্ককে বিচ্ছিরি রকমের উপহাস করা হয়। ধর্মের এ নিক্ষেপণ এবং ধর্মের প্রতি এরূপ উপহাসকরণ একরকম প্রকাশ্যই চলছে, যা বিভিন্ন কুফরি ও নাস্তিক্যবাদী রাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো ফলাও করে প্রচার করেছে। যেমন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ও তার শীর্ণকায় আবর্জনাতুল্য অনুসারী রাষ্ট্রগুলো অথবা স্বল্পসংখ্যক লোকবলবিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সে অনুসারী দলগুলো, যারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাস্তিকতার প্রতি আহ্বান করে, বা বাস্তব জীবন থেকে ধর্মকে পৃথক করে দেয়।

টিকাঃ
৯২৪. ড. আলি জারিশাহ কৃত আসালিবুল গাজওয়ায়িল ফিকরি: পৃ. নং ৫৯, উস্তাজ মুহাম্মাদ কুতুব কৃত মাজাহিবু ফিকরিয়্যাতিম মুআসিরা: পৃ. নং ৪৪৫

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষতিকর দিকগুলো

📄 ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষতিকর দিকগুলো


পৃথিবীতে আল্লাহর অবাধ্য, নির্লজ্জ, ঔদ্ধত্য মানব শয়তানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য শয়তানদের একটার নাম হলো কামাল আতাতুর্ক। যে ব্যক্তি তুরস্কের মসনদে বসে, নাস্তিকতাপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতো একটি ঔদ্ধত্যপূর্ণ পাপের দিকে আহ্বান করেছিল। সে ইসলামি খিলাফতকে বাতিল ঘোষণা ও আরবদের ভ্রাতৃত্বকে ছিন্ন করেছিল এবং পুঁজিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।

তার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর হলো, যখন কিছু আরব নেতা এ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নিজেদের স্বর উঁচু করল। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টানরা যেন একই সাথে এর অধীনে বসবাস করে!

নিশ্চয়ই এ আহ্বান ক্ষতির শেষ সীমায় নিয়ে ফেলেছে। এটি তো ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য চূড়ান্ত ক্ষতিকর। কেননা, যদি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে আরব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যবিধান করা হয়, তবে ইহুদি বা নাসারাদের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং ক্ষতি হবে ইসলামের, অতঃপর মুসলিমদের।

ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ভাবধারাকে তাদের কিছু বাতিল গ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত করে, যার মধ্যে বিকৃতি ও সংমিশ্রণের বেষ্টন রয়েছে। যেমন : তাওরাত, তালমুদ, মাশনা। প্রত্যেক বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একমত হবেন যে, এগুলো তার বাস্তবিকতা হারিয়ে ফেলেছে। কারণ, ইহুদিদের বিকৃতিকরণ ও সীমালঙ্ঘনেনর ফলে এ সকল গ্রন্থে মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে পারে, এমন কোনো কথা বা জ্ঞান আর অবশিষ্ট নেই।

স্পষ্টত তাদের দ্বীনদারি থেকে বিচ্যুতির ফলে যেকোনো শাসক বা ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের অধীনে জীবনযাপন করলেও তাদের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কারণ, তাদের হারানোর মতো তো কিছুই নেই। চাই তা যে সময় বা যে স্থানেই হোক না কেন। আপনি কি লক্ষ করেছেন যে, কমিউনিজম আন্দোলনের প্রতি সর্বাপেক্ষা আহ্বানকারী হলো ইহুদিরা? এর প্রথম চিন্তাবিদ কার্ল মার্ক্স ছিল ইহুদি। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবকে বেগবানকারী লেনিন ছিল অধিকাংশের মতে এক ইহুদি। এ বিপ্লব প্রতিষ্ঠার সময় ও পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সুপ্রিম কাউন্সিলের বেশির ভাগ সদস্য ছিল ইহুদি। আরব বিশ্বে কমিউনিজম পার্টিগুলোর প্রতিষ্ঠারা ইহুদি। এভাবে অন্যান্য অঞ্চলের কমিউনিজম কর্তাদের সকলে বা অধিকাংশই ছিল ইহুদি। কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তবায়নে ইহুদিদের কোনো ক্ষতি নেই; বরং এতে তারাই অধিক লাভবান হবে। তারাই এ ধর্মনিরপেক্ষতার আবহাওয়ায় অধিক সম্মানিত, অধিক লাভবান ও সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

অন্যদিকে খ্রিষ্টানরাও ধর্মনিরপেক্ষতার ফলে, এ ধরনের রাষ্ট্রে বসবাসের কারণে তাদের দ্বীনদারি বা মূল্যবোধের কোনো কিছু হারাবে না। তাদের সামান্য পরিমাণও ক্ষতি হবে না। কারণ স্পষ্ট যে, খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠার কিছু পর থেকে এর অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এটি কিছু আচারের সমষ্টিরূপ বৈ কিছু নয়। এর মাঝে আধ্যাত্মিক কোনো আলোর বিকিরণ নেই, যা আত্মা ও মনে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে। এ মতবাদের সাথে বাস্তবিক প্রয়োগের কোনোই মিল নেই। কেননা, খ্রিষ্টবাদ কোনো নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে না। এটা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি জীবনবিধান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। খ্রিষ্টবাদ শুধু গির্জার কিছু আচারের সাথেই সম্পৃক্ত। তাই কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বা অন্য কোনো মতবাদের অধীনে বসবাসে তাদের কোনো সমস্যা নেই। এ ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ থাকা না থাকা উভয়টিই তাদের জন্য সমান।

অপরপক্ষে, ইসলাম ও মুসলিমগণ ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। যার মানে হলো, ইসলামের কর্তৃত্ব, শাসন ও তত্ত্বাবধান মানবতার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক ও প্রতিটি সমস্যার সমাধান রয়েছে ইসলামে। আর এ সত্য সকল গবেষক ও জ্ঞানবান মাত্রই জানেন। এটি একটি স্পষ্ট বাস্তবতা যে, ইসলাম মানবজীবনের দীর্ঘ সময়ের প্রতিটি অবস্থার নিয়মনীতি বর্ণনা করেছে। এমনকি মানুষ যখন জন্ম নেয়নি, এখনও সে ভ্রুণ অবস্থায় মায়ের পেটে, তখনও তার জন্য নিয়মনীতি ও গুরুত্বের কথা ইসলাম বর্ণনা করেছে।

যদি আমরা ধরে নিই যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাহলে ইসলাম তার প্রতিটি অনুষঙ্গে গুটিয়ে যাওয়া ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার শিকার হবে। যার সারকথা হলো, ইসলামের অস্তগমন ও পৃথিবী থেকে বিদায়গ্রহণ। কেননা, ইসলামের স্থানে এসে যাবে নাস্তিকতাপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, যা খ্রিষ্টবাদ বা পূজনবান কিংবা ইহুদিবাদের মতো প্রভৃতি মতবাদের জন্য ক্ষতিকারক না হলেও মুসলিমগণ এতে নিঃসন্দেহে বিপদে পড়বে। যখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চালু হবে, তখন একমাত্র মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতি তাদের সম্পর্কের অর্থই হবে—দ্বীন থেকে বিচ্যুতি, চিন্তা, বিশ্বাস ও আচারের মধ্যে আপসকামিতা।

যখন মুসলিমগণ দ্বীনের খুঁটি ও প্রতিরক্ষা থেকে চিন্তাগত, বিশ্বাসগত, চরিত্রগতভাবে বিচ্যুত হবে, তখন তাদের আর কীই-বা বাকি থাকবে? যখন তারা এসব থেকে বিচ্যুত হবে, তখন তারা কুৎসিত বিকৃত প্রেতাত্মায় পরিণত হবে। তারা সে অপরিচিত বহিরাগত মানুষের ন্যায় হয়ে পড়বে, যাদের প্রতিরোধ শক্তি, দৃঢ় বলবান বৈশিষ্ট্য উবে গেছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px