📄 ধর্মনিরপেক্ষতা কী?
ছোট্ট একটি প্রশ্ন, কিন্তু তার জবাব অনেক দীর্ঘ। ইংরেজিতে একে Secularism, আরবিতে علماني এবং বাংলায় 'ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ' বলা হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা কী বা কাকে বলে? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের বেশি কষ্ট করতে হবে না। কারণ, 'ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ' মতবাদের জন্মস্থান পাশ্চাত্যের দেশসমূহের লিখিত অভিধানগুলো আমাদের সে অর্থ অনুসন্ধানের কষ্টকে লাঘব করে দিয়েছে অনেকটাই। ইংরেজি অভিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ' শব্দের নিম্নরূপ অর্থ এসেছে :
১. পার্থিববাদী অথবা বস্তুবাদী।
২. ধর্মভিত্তিক বা আধ্যাত্মিক নয় এমন।
৩. দুনিয়াবিরাগী নয়, সংসারবিরাগী নয়। ৯২০
একই অভিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় এসেছে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এমন একটি দর্শন, যা চরিত্র, নীতি, নৈতিকতা ও শিক্ষা প্রভৃতি ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে ধর্মহীনতার ওপর গড়ে উঠবে।
Encyclopædia Britannica-তে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি সামাজিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য হলো, মানুষদের আখিরাত থেকে ফিরিয়ে এনে দুনিয়ামুখী করা। Encyclopædia Britannica-তে ধর্মনিরপেক্ষতার আলোচনার অধীনে الإلحاد তথা নাস্তিকতার আলোচনা এসেছে। তাতে নাস্তিকতাকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে :
১. তাত্ত্বিক নাস্তিকতা (إلحاد نظري)
২. ব্যবহারিক নাস্তিকতা (إلحاد عملي)
এখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ব্যবহারিক নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৯২১
উক্ত বর্ণনা দুটি বিষয়কে স্পষ্ট করে :
প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি কুফরি মতবাদ, যার লক্ষ্য হলো, দুনিয়াকে দ্বীনি প্রভাব থেকে মুক্ত করা। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূল কাজ হচ্ছে, পার্থিব জগতের সকল বিষয়কে দ্বীনি বিধি-নিষেধ থেকে দূরে রেখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও চারিত্রিকসহ সকল ক্ষেত্রে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
দ্বিতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে জ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন কতক কুচক্রী মানুষদেরকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য বলে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্দেশ্য হলো, 'পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের ওপর উৎসাহিত করা ও তার প্রতি গুরুত্বারোপ করা'। এ দাবির অসারতা উল্লিখিত অর্থ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে, যে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে 'ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ' এর উৎপত্তি স্থল থেকে, যে পরিবেশে তার উৎপত্তি ও বেড়ে উঠা হয়েছে— তার থেকে।
তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সম্পর্কে যদি বলা হয়, এটি হলো ধর্মহীনতা, তাহলেই কেবল তার প্রকৃত অর্থ ও সঠিক ব্যাখ্যা প্রকাশ পাবে। ৯২২
টিকাঃ
৯২০. দুনিয়াবিমুখিতা বা সংসারবিরাগিতা খ্রিষ্টানদের নিকট একটি ইবাদত, যা তাদেরই আবিষ্কৃত একটি পন্থা। সুতরাং যখন তারা বলে, 'সে সংসারবিরাগী নয়'-এর দ্বারা বোঝাতে চায় যে, সে ইবাদতকারী নয়। এটি প্রথম ও দ্বিতীয় সংজ্ঞার কাছাকাছি। যেমন মুসলিমরা মনে করে যে, সংসারবিরাগিতা হলো বিদআত, এ ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের মত ভিন্ন। তারা এটাকে বিদআত মনে করে না; বরং তারা এটাকে মনে করে সত্যিকার দ্বীন। তাই যখন তাদের কেউ বলবে যে, 'অমুক লোক সংসারবিরাগী নয়' তখন সে এর দ্বারা এ উদ্দেশ্য নেয়নি যে, সে বিদআত করে না; বরং তার উদ্দেশ্য থাকে, লোকটি ইবাদতের ধারে কাছেও নেই।
৯২১. নাস্তিকতার ওপর ইংরেজি অভিধান ও বিশ্বকোষের যে বিশ্লেষণ আমরা উল্লেখ করলাম, তা ড. মুহাম্মাদ জাইন আল-হাদি রচিত نشأة العلمانية বা 'সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি' নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
৯২২. মুহাম্মাদ বিন শাকির শরিফ কৃত আল-আলমানিয়্যাতু ও সামারাতুহাল খাবিসা: পৃষ্ঠা নং ৪-৫
📄 ধর্মনিরপেক্ষতার রূপসমূহ
ধর্মনিরপেক্ষতার দুটি রূপ রয়েছে, যার একটি অপরটি থেকে নিকৃষ্টতর। ৯২৩
টিকাঃ
৯২৩. ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরাসরি নাস্তিকতা ও পরোক্ষ নাস্তিকতা দুভাগে বিভক্ত করা হলেও উভয়টির একই বিধান। অর্থাৎ উভয় প্রকারই কুফরি।
📄 সারকথা
নিঃসন্দেহে উভয় প্রকার ধর্মনিরপেক্ষতাই সুস্পষ্ট কুফরি। যদি কেউ উল্লেখিত কোনো প্রকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়, তবে সে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত ও মুরতাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন।
ইসলামই হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট বিধান রয়েছে; চাই তা আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চারিত্রিক, সামাজিক বা যেকোনো শাখা হোক। ইসলাম কখনো কোনো মতবাদকে তার বিধানে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেয় না। ইসলামের প্রমাণিত কোনো বিষয় যে প্রত্যাখ্যান করল, সে কাফির ও পথভ্রষ্ট; যদিও তা পরিমাণে সামান্যই হোক না কেন।
ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের অনুসারীদের মাঝে ইমান ভঙ্গের অনেক কারণ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে, তারা বিশ্বাস করে যে, নবিজি ﷺ-এর আদর্শ থেকে অন্য কারও আদর্শ উত্তম, তাঁর ফয়সালার চেয়ে অন্য কারও ফয়সালা উত্তম। আর এটি যে ইমান ভঙ্গের কারণ, তাতে কারও মতানৈক্য নেই।
📄 ধর্মনিরপেক্ষ মতাবলম্বীদের শ্রেণিভাগ
ইসলামি বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ মতালম্বীরা সংখ্যায় অগণিত। তাদের অনেকে লেখক, সাহিত্যিক বা সাংবাদিক, কেউ ইসলামি চিন্তাবিদ, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরূপে অবস্থান করছে। তাদের বিরাট একটি অংশ বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে কর্মরত ও কর্তৃত্বকারী। এ ছাড়া অন্যান্য পেশায়ও তাদের সংখ্যা কম নয়।