📄 দেশপ্রেম
ইসলাম হলো মানুষের স্বভাবধর্ম। কারও স্বভাবে দেশপ্রেম থাকা কোনো সমস্যার নয়। কেননা, যে ব্যক্তিই সুস্থ-স্বাভাবিক হবে, তার ভেতরে দেশের জন্য স্বভাবগতভাবেই প্রেম-ভালোবাসা থাকবেই। যখন দেশ থেকে দূরে কোথাও সে যায়, তখন তার মন দেশের জন্য কাঁদবেই। এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ জন্মভূমি থেকে অনেক দূরে মদিনায় তাঁর সাহাবি ও পরিবারের মাঝে ছিলেন। তা সত্ত্বেও নিজ জন্মভূমির জন্য তাঁর মনের টান ও ভালোবাসা মুছে যায়নি। একবার জনৈক মুহাজির সাহাবি মক্কাসংক্রান্ত একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবিতায় মক্কার আলোচনা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজ জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার টান বোঝা যায় হাদিসের আরেকটি বর্ণনায়। মক্কার অত্যাচারী কাফিরদের কারণে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কা থেকে বের হয়ে এলেন। হিজরত করে ইয়াসরিব অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছিলেন। বিদায় বেলায় তিনি প্রিয় শহর মক্কার প্রতি সম্বোধন করে বললেন :
وَاللَّهِ إِنَّكِ، لَخَيْرُ أَرْضِ اللَّهِ، وَأَحَبُّ أَرْضِ اللَّهِ إِلَيَّ، وَاللَّهِ لَوْلَا أَنِّي أُخْرِجْتُ مِنْكِ، مَا خَرَجْتُ
'আল্লাহর শপথ! তুমিই হলে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ ভূমি। আমার নিকট আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। আল্লাহর শপথ! যদি আমাকে বের করে দেওয়া না হতো, তবে আমি কখনো তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হতাম না।' ৯১২
দেশের প্রতি ভালোবাসা স্বভাবজাত অনুভূতি, যা মানুষের হৃদয়ে তৎপ্রতি টান সৃষ্টি করে। কিন্তু দেশাত্মবোধ থেকে উৎসারিত মূল্যবোধ যখন দ্বীনের স্থান দখল করে নেয়, তখন ইসলাম এমন দেশপ্রেমকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া গণ্য করে। এটি আল্লাহর নির্ধারিত নীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার নামান্তর। যদি বিষয়টি এরকমই হয়ে থাকে, তবে ইসলামি শরিয়া আপনাকে বলবে—থামো, এ দেশপ্রেম নয়; বরং এ হলো দেশপূজা।
মূলত দেশপ্রেম কোনো নীতি নয়, কোনো দর্শন বা কোনো জীবনব্যবস্থা নয়; বরং তা একটা অনুভূতি মাত্র, যা অন্তর থেকে নির্গত হয়, যার ভিত্তি হলো স্বভাবজাত ভালোবাসা। আর ভালোবাসা এমন এক আবেগ, যার ওপর ভিত্তি করে দেশপ্রেম কোনো জীবনব্যবস্থা বা আদর্শ হতে পারে না।
যদি দেশপ্রেমকে কোনো আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কেউ ইচ্ছাও করে, তবে তা কীভাবে আকিদা, সভ্যতা, মানহাজ; সর্বোপরি একটি জীবনব্যবস্থা হবে? কীভাবে জীবনের প্রতিটি স্তরের সকল সমস্যার সমাধান করবে? কীভাবে আত্মিক ও শারীরিক সমস্যার সমাধান দেবে? কীভাবে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদির ক্ষেত্রে সমাধান পেশ করবে? কীভাবে মুআমালার বিষয়াবলি, যথা : বেচাকেনা, ঋণ দেওয়া-নেওয়াসহ বিভিন্ন অধিকার সুনিশ্চিত করবে? কীভাবে দণ্ডবিধি, যথা : হদ, কিসাস, তাজিরের ব্যাখ্যা করবে? কীভাবে ব্যষ্টিক বিষয়াবলি, যথা : বিয়ে, তালাক, ইদ্দত, উত্তরাধিকার আইনের সমাধান করবে? কীভাবে বিচার ও শাসনবিষয়ক, যথা : বাইআত, আনুগত্য, শুরা, যুদ্ধ, বিচার, সাক্ষ্য, শপথসহ মানুষের জীবনের নানা দিকের নানা বিষয়ের ব্যাখ্যা দেবে? মূলত দেশাত্মবোধের মাঝে এর কোনো সমাধান নেই। কেননা, তা শুধু কিছু আবেগ ও ভালোবাসার নাম, কোনো আদর্শের নাম নয়।
নিঃসন্দেহে একজন প্রকৃত মুসলিম তার দেশকে অন্যদের চাইতে উন্নতভাবে দেখে, দেশের সেবা করে এবং দেশের প্রতিরক্ষা করে। কিন্তু কোনো মুসলিমের জন্য মোটেও উচিত নয় যে, দেশপ্রেমকে ইসলামের মর্যাদায় সমুন্নত করা। কেননা, দেশপ্রেম না কোনো আদর্শ হতে পারে আর না হতে পারে কোনো জীবনব্যবস্থা। অন্যদিকে ইসলাম হলো মহান প্রভুর দানকৃত এমন একটি নির্দেশিকা, যা সকল যুগের, সকল স্থানের, সকল মানুষের জন্য একমাত্র আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা।
তাই দেশাত্মবোধ থেকে উৎসারিত কোনো মূল্যবোধকে আঁকড়ে থাকা, তা ধরে রাখা এবং ইসলামের স্থানে তাকে সমাসীন করাকে আমরা দেশপূজা ব্যতীত অন্য কোনো নাম দিতে পারি না। একজন মুসলিমের কাছে দেশের আগে ইমান, দেশপ্রেমের পূর্বে ইসলামের স্বার্থ অগ্রগণ্য। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে স্বভাবজাত দেশপ্রেমে ইসলামের কোনো বাধা নেই। কিন্তু যদি কোথাও ইসলামের স্বার্থের সাথে দেশের স্বার্থের সংঘাত হয়, তাহলে একজন মুমিন অবশ্যই ইসলামের স্বার্থকে অগ্রগণ্য রাখবে, দেশের স্বার্থকে পিছে রাখবে। মোটকথা, নিজ জন্মভূমি বা দেশের প্রতি টান-ভালোবাসা সত্তাগতভাবে জায়িজ, কিন্তু যখন তা শরিয়তের গণ্ডির বাইরে চলে যাবে, ইসলামের সাথে কোথাও সাংঘর্ষিক হবে, তখন জন্মভূমি বা দেশকে প্রাধান্য দিলে তা আর দেশপ্রেম বলে বিবেচিত হয় না; বরং তার নাম হয়ে যায় দেশপূজা। আমাদের দেশের অনেক মুসলিম এ দেশপ্রেমের নামে মূলত দেশপূজা করে যাচ্ছে; অথচ তাদের এ বিষয়ে কোনো উপলব্ধিও নেই।
টিকাঃ
৯১২. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২/১০৩৭, হা. নং ৩১০৮ (দারু ইহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ভাষাপ্রীতি
ভাষাপ্রীতিকে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে না। যেমনটি আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, প্রত্যেক মানুষেরই জন্মভূমির প্রতি স্বভাবজাত ভালোবাসা থাকে, দেশের প্রতি থাকে আলাদা এক ধরনের টান। তেমনই ভাষা হলো বিভিন্ন সমাজের মাঝে জন্মগত সূত্রে প্রাপ্ত একটি বিষয়। এটি মানুষের অভ্যাসের সাথে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সমাজে যার রূপ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। এ ভাষা তাদের মনের অনুভূতি প্রকাশের একটি মাধ্যম। তাই নিজ মাতৃভাষার প্রতি টান থাকাটা কিছুতেই দোষণীয় কিছু নয়।
এ ক্ষেত্রে আরবি ভাষা কিছুটা ভিন্ন। কারণ, আরবি ভাষা সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি ভাষা। ইসলাম আরবি ভাষা শিখতে, এ ভাষার শব্দাবলি আয়ত্তে আনতে ও এর মিষ্টতা অনুভব করতে উৎসাহিত করে। কেননা, আরবি ভাষা কুরআন ও সুন্নাহ বুঝার মাধ্যম। সম্মানিত এ কিতাবের মর্যাদা, গুরুত্ব ও অলৌকিকত্ব বোঝার সরাসরি পথ। তা ছাড়া আরবি ভাষা মুসলমানদের ভালোবাসার ভাষা ও ধর্মীয় একটি প্রতীক। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:
فإنَّ اللسان العربي شعار الإسلام ও أههলে
'নিশ্চয়ই আরবি ভাষা হলো ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহ্য।' ৯১৩
তবে কোনো ভাষার প্রেম যদি মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরায়, ইসলামের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে—সর্বোপরি ভাষার জন্য রক্তপাত হয়, তাহলে তা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। নিজ ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা সবারই আছে, কিন্তু কারও ওপর নিজের ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া বা ভাষার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে পড়া সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি। ইসলামি শরিয়ত এমন ভাষাপ্রেমকে কখনো সমর্থন করে না।
টিকাঃ
৯১৩. ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম: ১/৫১৯ (দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)।