📄 চার. ফাই
(الفيء) আল-ফাই এর অর্থ হলো এমন ছায়া যা সূর্যের কিরণকে দূর করে দেয়। শরিয়তের পরিভাষায় ফাই বলা হয়, যে সম্পদ দ্বীনের শত্রুদের সাথে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা ব্যতীতই তাদের উচ্ছেদ বা তাদের ওপর জিজিয়া আরোপের মাধ্যমে আল্লাহ দান করেন।
এ সম্পদ রাসুলুল্লাহ ﷺ ও মুসলমানদের জন্য। জাকাতের সম্পদে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো অংশ ছিল না। তাঁর জীবদ্দশায় ফাইয়ের অর্থ থেকে তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন। ফাইয়ের অর্থ থেকে যা কিছু উদ্বৃত্ত থাকত, তা মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় হতো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন :
{ وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ... }
'আল্লাহ ইহুদিদের কাছ থেকে রাসুলকে যে ফাই দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করোনি...।'
আল্লাহ তাআলা সে সকল সম্পদের ক্ষেত্রে সর্বকালে ও সর্বস্থানে এ হুকুম আরোপিত হওয়ার ব্যাপারে বলেন :
{ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ... }
'আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসুলের, রাসুলের স্বজনদের, এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের; যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত না হয়...।'
সুতরাং বলা যায়, যুদ্ধ ও লড়াই ব্যতীত কাফিরদের থেকে পাওয়া সম্পদকে ফাই বলা হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সকল মুসলমানের জন্য তা বৈধ। তা মুসলিমদের বিপদাপদে ও তাদের কল্যাণে ব্যয় হবে। যেমন: ফকির, মিসকিন, এতিম ও মুসাফিরদের সাহায্যে এবং রাস্তা, সেতু, বাঁধ, মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণে ব্যয় করা হবে।
টিকাঃ
৮৬৭. আল-কামুসুল মুহিত: পৃ. নং ৪৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
৮৬৮. আত-তারিফাত, জুরজানি: পৃ. নং ১৭০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৮৬৯. সুরা আল-হাশর: ৬
৮৭০. সুরা আল-হাশর: ৭
৮৭১. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১১ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
📄 পাঁচ. গনিমতরে এক-পঞ্চমাংশ
শরিয়তের পরিভাষায় মুসলমানগণ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় লাভ করে যে সম্পদ হস্তগত করে তাকে গনিমত বলে। যুদ্ধের ময়দানে গনিমতের মালকে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের অধিকার বানিয়ে দিয়েছেন। গনিমত মুসলিমদের জন্য হালাল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{ فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ }
'সুতরাং গনিমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ, তা থেকে ভক্ষণ করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।'
বণ্টন পদ্ধতি
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন :
{ ۞ وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُم مِّن شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ }
'আর জেনে রাখো যে, বস্তুসামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনিমত হিসাবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসুলের জন্য, তাঁর নিকটাত্মীয়দের জন্য এবং এতিম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য।'
মুসলিমগণ যে গনিমত লাভ করে, তা পাঁচ ভাগ করে চার-পঞ্চমাংশ যোদ্ধাদের দেওয়া হবে। এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে। কিন্তু বাকি এক পঞ্চমাংশের বণ্টন নিয়ে ফুকাহা ও উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে এক-পঞ্চমাংশকে এতিম, মিসকিন ও মুসাফির এ তিনটি অংশে ভাগ করে দেওয়া হবে। হানাফিগণ বলেন, এক-পঞ্চমাংশের বণ্টন সেতু সংস্কার, মসজিদ নির্মাণ, কাজি ও সৈনিকদের বেতন থেকে শুরু করতে হবে। ইমাম মালিক-এর মতে এক-পঞ্চমাংশের বিধান ফাইয়ের মতোই। ইমাম শাফিয়ি-এর মতে, এক-পঞ্চমাংশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হবে। এক ভাগ হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। আর বাকি চার ভাগ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।
উমর বিন আনবাসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি উটের লোম তুলে নিয়ে বললেন :
'ওয়ালা ইয়াহিল্লু লী মিন গানাইমিকুম মিছলু হাজা ইল্লাল খুমুসু ওয়াল খুমুসু মারদুদুন ফিকুম'
(এক-পঞ্চমাংশ ব্যতীত তোমাদের গনিমত থেকে আমার জন্য এ লোম পরিমাণও হারাম। আর এক-পঞ্চমাংশ তোমাদের কল্যাণেই ব্যয় হবে।)
টিকাঃ
৮৭২. সুরা আল-আনফাল : ৬৯
৮৭৩. সুরা আল-আনফাল: ৪১
৮৭৪. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১১ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
৮৭৫. প্রাগুক্ত
৮৭৬. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৮২, হা. নং ২৭৫৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ছয়. জিজিয়া
আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানরা দারুল ইসলামে বসবাস করার সুবাদে ইসলামি রাষ্ট্রকে প্রতি বছর যে অর্থ দিয়ে থাকে তাকে জিজিয়া বলে। জিজিয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ... حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ }
'যে সমস্ত আহলে কিতাব আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ইমান রাখে না... তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো; যতক্ষণ না তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে।'
এ আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের ওপর সকল কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ করা হয়েছে। আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে হলে তাকে দুটি পন্থার যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে: ১. ইসলাম কবুল করা। ২. জিজিয়া প্রদান করা। আয়াতে 'আন ইয়াদিন' এর ব্যাখ্যা হলো, তারা ধনী ও সচ্ছল হলে জিজিয়া দেবে। আর 'সাগিরুন' এর ব্যাখ্যা হলো, তাদের ওপর মুসলিমদের বিজয়ী হওয়ার কারণে মুসলিম শাসকের প্রতি তাদের নতি স্বীকার ও আনুগত্য।
জিজিয়ার পরিমাণ
জিজিয়া কী পরিমাণ হবে, এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম শাফিয়ি-এর মতে সর্বনিম্ন জিজিয়া বছরে এক দিনার। ইমাম আহমাদ-এর মতে জিজিয়ার সর্বোচ্চ পরিমাণটি ইজতিহাদমূলক। ইমাম মালিক-এর মতে জিজিয়ার ওয়াজিব পরিমাণ হলো উমর বিন খাত্তাব কর্তৃক নির্ধারিত চার দিনার অথবা চল্লিশ দিরহাম। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে জিজিয়ার ক্ষেত্রে আহলে কিতাবগণ তিনটি স্তরে বিভক্ত: উচ্চবিত্ত (৪৮ দিরহাম), মধ্যবিত্ত (২৪ দিরহাম) ও নিম্নবিত্ত (১২ দিরহাম)।
কাদের ওপর জিজিয়া দেওয়া বাধ্যতামূলক
জিজিয়া শুধু স্বাধীন বিবেকসম্পন্ন সাবালক পুরুষদের ওপরই ওয়াজিব; নারী, শিশু, পাগল ও দাসের ওপর কোনো জিজিয়ার বিধান নেই। জিজিয়া আদায় অমুসলিমদের ওপর জুলুম নয়, বরং এটি তাদের নিরাপত্তা দানের বিনিময়ে গৃহীত একটি কর যা জাকাতের তুলনায় অনেক সহজ ও নগণ্য।
টিকাঃ
৮৭৭. তাজুল আরুস : ৩৭/৫৩ (দারুল হিদায়া, বারিদা)
৮৭৮. সুরা আত-তাওবা: ২৯
৮৭৯. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: পৃ. নং ২২৩ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৮০. প্রাগুক্ত
৮৮১. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: ১৯/৩৯১ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৮৮২. আল-মুগনি, ইবনু কুদামা : ৯/৩৩৪ (মাকতাবাতুল কাহিরা, মিশর)
৮৮৩. বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৬৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৮৪. আল-মাবসুত, সারাখসি: ১০/৭৮ (দারুল মারিফা, বৈরুত)
৮৮৫. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: পৃ. নং ২২৩ (দারুল হাদিস, কায়রো)
📄 সাত. খনিজ পদার্থ
খনিজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলা ভূমধ্যে যে সকল উপকারী ও মূল্যবান ধাতু সৃষ্টি করেছেন সেসব সম্পদ। যেমন: তামা, সীসা, লোহা, ফসফেট, সোনা, রুপা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ} 'হে ইমানদারগণ, তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো।'
খনিজের প্রকারভেদ
ইমাম মাওয়ারদি খনিজ পদার্থকে দুভাগে ভাগ করেছেন: ১. প্রকাশ্য খনিজ পদার্থ: যা সহজে পাওয়া যায়, যেমন লবণ, খনিজ তেল ইত্যাদি। এতে সকল মানুষের অধিকার রয়েছে। ২. অপ্রকাশ্য খনিজ পদার্থ: যা পরিশ্রম ছাড়া পাওয়া যায় না, যেমন সোনা, লোহা ইত্যাদি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন : 'আল মুসলিমুনা শুরাকাউ ফী ছালাছিন: ফিল কালা-ই ওয়াল মা-ই ওয়ান নারি' (তিনটি জিনিসে সকল মুসলিমের অধিকার সমান। যথা: ঘাস, পানি ও আগুন।)
খনিজ-সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় হলো রিকাজ। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে খনিজ সম্পদকেই রিকাজ বলা হয়। আর ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম মালিক-এর মতে পুঁতে রাখা সম্পদকে রিকাজ বলে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: '...ওয়াফীর রিকাজি আল-খুমুসু' (এবং রিকাজে এক-পঞ্চমাংশ দেওয়া আবশ্যক।)
টিকাঃ
৮৮৬. আল-মুজামুল অসিত: ২/৫৮৮ (দারুদ দাওয়াহ, ইসকানদারিয়া)
৮৮৭. সুরা আল-বাকারা : ২৬৭
৮৮৮. সুরা আল-হজ : ৬৫
৮৮৯. সুরা আল-জাসিয়া : ১৩
৮৯০. আল-আহকামুস সুলতানিয়া: ২৯৪-২৯৫ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৯১. সুনানু আবি দাউদ: ৩/২৭৮, হা. নং ৩৪৭৭ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৮৯২. নাইলুল আওতার: ৫/৩৬৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৯৩. নাইলুল আওতার: ৪/১৭৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৯৪. সহিহুল বুখারি: ২/১৩০, হা. নং ১৪৯৯ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৮৯৫. মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার ৬/১৬৪, হা. নং ৮৩৬১ (জামিআতুদ দিরাসাতিল আরাবিয়্য, করাচি) - হাদিসটি জইফ।