📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 তিন. ওশর

📄 তিন. ওশর


ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সীমান্ত পার হওয়া ব্যবসায়ীদের থেকে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ আদায় করে থাকেন, তাকে ওশর বলা হয়। তা কখনো পণ্যের দশ ভাগের একভাগ, কখনো বিশ ভাগের একভাগ এবং কখনো চল্লিশ ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে। উমর (রা)-এর সিদ্ধান্ত থেকে এরকমই প্রমাণিত।

ইমাম আবু হানিফা (রহ) বলেন, দারুল ইসলাম থেকে মুসলিম ব্যবসায়ী দারুল হারবে গেলে যদি তারা শুল্ক নেয় তাহলে তাদের দেশ থেকে কোনো ব্যবসায়ী আমাদের দেশে এলে আমরাও তাদের থেকে ওশর বা শুল্ক নেব। একবার আবু মুসা আশআরি (রা) উমর (রা)-এর নিকট লিখে পাঠালেন, আমাদের মুসলিম ব্যবসায়ী ভাইয়েরা যখন দারুল হারবে যায়, তখন তারা মালের এক-দশমাংশ শুল্ক হিসাবে নিয়ে নেয়। উত্তরে উমর (রা) লিখে পাঠান, তারা যেরকম মুসলিম ব্যবসায়ীদের থেকে নিয়ে থাকে আপনিও তাদের কাছ থেকে সেরূপ (এক-দশমাংশ) নিন। জিম্মিদের থেকে বিশ ভাগের এক ভাগ আর মুসলিমদের থেকে (যাকাত হিসাবে) চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম নিন।

আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে: 'ইন্নামাল উশুরু আলাল ইয়াহুদি ওয়ান নাসারা, ওয়ালাইসা আলাল মুসলিমিনা উশুরুন' (ওশর ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ওপর ধার্যকৃত। মুসলিমদের ওপর ওশর প্রযোজ্য নয়।)

ইমাম কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ওশর আদায়কারী ব্যবসায়ীদের সীমান্ত পার হওয়ার সময় এ ওশর উত্তোলন করবে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বছরে একবারের বেশি উত্তোলন করবে না। বর্ণিত আছে যে, একবার এক বৃদ্ধ খ্রিষ্টান থেকে একই বছর দুবার ওশর নেওয়া হয়। তখন খ্রিষ্টানটি উমর বিন খাত্তাব-এর নিকট এসে অভিযোগ করলে উমর বললেন, 'তার এমন করা উচিত হয়নি; বরং তা বছরে একবারই দিতে হয়।'

টিকাঃ
৮৬২. আওনুল মাবুদ : ৮/২০৮ (দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্যা, বৈরুত)
৮৬৩. আল-খারাজ, ইমাম আবু ইউসুফ: পৃ. নং ১৪৮-১৪৯ (আল-মাকতাবুল আজহারিয়‍্যা)
৮৬৪. আল-আমওয়াল, আবু উবাইদা: পৃ. নং ৬৪০ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৮৬৫. সুনানু আবি দাউদ: ৩/১৬৯, হা. নং ৩০৪৬ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
৮৬৬. আল-আমওয়াল, আবু উবাইদা: পৃ. নং ৬৪৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 চার. ফাই

📄 চার. ফাই


(الفيء) আল-ফাই এর অর্থ হলো এমন ছায়া যা সূর্যের কিরণকে দূর করে দেয়। শরিয়তের পরিভাষায় ফাই বলা হয়, যে সম্পদ দ্বীনের শত্রুদের সাথে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা ব্যতীতই তাদের উচ্ছেদ বা তাদের ওপর জিজিয়া আরোপের মাধ্যমে আল্লাহ দান করেন।

এ সম্পদ রাসুলুল্লাহ ﷺ ও মুসলমানদের জন্য। জাকাতের সম্পদে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো অংশ ছিল না। তাঁর জীবদ্দশায় ফাইয়ের অর্থ থেকে তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন। ফাইয়ের অর্থ থেকে যা কিছু উদ্বৃত্ত থাকত, তা মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় হতো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন :
{ وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ... }
'আল্লাহ ইহুদিদের কাছ থেকে রাসুলকে যে ফাই দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করোনি...।'

আল্লাহ তাআলা সে সকল সম্পদের ক্ষেত্রে সর্বকালে ও সর্বস্থানে এ হুকুম আরোপিত হওয়ার ব্যাপারে বলেন :
{ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ... }
'আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসুলের, রাসুলের স্বজনদের, এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের; যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত না হয়...।'

সুতরাং বলা যায়, যুদ্ধ ও লড়াই ব্যতীত কাফিরদের থেকে পাওয়া সম্পদকে ফাই বলা হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সকল মুসলমানের জন্য তা বৈধ। তা মুসলিমদের বিপদাপদে ও তাদের কল্যাণে ব্যয় হবে। যেমন: ফকির, মিসকিন, এতিম ও মুসাফিরদের সাহায্যে এবং রাস্তা, সেতু, বাঁধ, মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণে ব্যয় করা হবে।

টিকাঃ
৮৬৭. আল-কামুসুল মুহিত: পৃ. নং ৪৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
৮৬৮. আত-তারিফাত, জুরজানি: পৃ. নং ১৭০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৮৬৯. সুরা আল-হাশর: ৬
৮৭০. সুরা আল-হাশর: ৭
৮৭১. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১১ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়‍্যা, কায়রো)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 পাঁচ. গনিমতরে এক-পঞ্চমাংশ

📄 পাঁচ. গনিমতরে এক-পঞ্চমাংশ


শরিয়তের পরিভাষায় মুসলমানগণ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় লাভ করে যে সম্পদ হস্তগত করে তাকে গনিমত বলে। যুদ্ধের ময়দানে গনিমতের মালকে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের অধিকার বানিয়ে দিয়েছেন। গনিমত মুসলিমদের জন্য হালাল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{ فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ }
'সুতরাং গনিমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ, তা থেকে ভক্ষণ করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।'

বণ্টন পদ্ধতি
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন :
{ ۞ وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُم مِّن شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ }
'আর জেনে রাখো যে, বস্তুসামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনিমত হিসাবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসুলের জন্য, তাঁর নিকটাত্মীয়দের জন্য এবং এতিম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য।'

মুসলিমগণ যে গনিমত লাভ করে, তা পাঁচ ভাগ করে চার-পঞ্চমাংশ যোদ্ধাদের দেওয়া হবে। এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে। কিন্তু বাকি এক পঞ্চমাংশের বণ্টন নিয়ে ফুকাহা ও উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে এক-পঞ্চমাংশকে এতিম, মিসকিন ও মুসাফির এ তিনটি অংশে ভাগ করে দেওয়া হবে। হানাফিগণ বলেন, এক-পঞ্চমাংশের বণ্টন সেতু সংস্কার, মসজিদ নির্মাণ, কাজি ও সৈনিকদের বেতন থেকে শুরু করতে হবে। ইমাম মালিক-এর মতে এক-পঞ্চমাংশের বিধান ফাইয়ের মতোই। ইমাম শাফিয়ি-এর মতে, এক-পঞ্চমাংশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হবে। এক ভাগ হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। আর বাকি চার ভাগ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।

উমর বিন আনবাসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি উটের লোম তুলে নিয়ে বললেন :
'ওয়ালা ইয়াহিল্লু লী মিন গানাইমিকুম মিছলু হাজা ইল্লাল খুমুসু ওয়াল খুমুসু মারদুদুন ফিকুম'
(এক-পঞ্চমাংশ ব্যতীত তোমাদের গনিমত থেকে আমার জন্য এ লোম পরিমাণও হারাম। আর এক-পঞ্চমাংশ তোমাদের কল্যাণেই ব্যয় হবে।)

টিকাঃ
৮৭২. সুরা আল-আনফাল : ৬৯
৮৭৩. সুরা আল-আনফাল: ৪১
৮৭৪. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১১ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়‍্যা, কায়রো)
৮৭৫. প্রাগুক্ত
৮৭৬. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৮২, হা. নং ২৭৫৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ছয়. জিজিয়া

📄 ছয়. জিজিয়া


আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানরা দারুল ইসলামে বসবাস করার সুবাদে ইসলামি রাষ্ট্রকে প্রতি বছর যে অর্থ দিয়ে থাকে তাকে জিজিয়া বলে। জিজিয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ... حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ }
'যে সমস্ত আহলে কিতাব আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ইমান রাখে না... তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো; যতক্ষণ না তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে।'

এ আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের ওপর সকল কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরজ করা হয়েছে। আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে হলে তাকে দুটি পন্থার যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে: ১. ইসলাম কবুল করা। ২. জিজিয়া প্রদান করা। আয়াতে 'আন ইয়াদিন' এর ব্যাখ্যা হলো, তারা ধনী ও সচ্ছল হলে জিজিয়া দেবে। আর 'সাগিরুন' এর ব্যাখ্যা হলো, তাদের ওপর মুসলিমদের বিজয়ী হওয়ার কারণে মুসলিম শাসকের প্রতি তাদের নতি স্বীকার ও আনুগত্য।

জিজিয়ার পরিমাণ
জিজিয়া কী পরিমাণ হবে, এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম শাফিয়ি-এর মতে সর্বনিম্ন জিজিয়া বছরে এক দিনার। ইমাম আহমাদ-এর মতে জিজিয়ার সর্বোচ্চ পরিমাণটি ইজতিহাদমূলক। ইমাম মালিক-এর মতে জিজিয়ার ওয়াজিব পরিমাণ হলো উমর বিন খাত্তাব কর্তৃক নির্ধারিত চার দিনার অথবা চল্লিশ দিরহাম। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে জিজিয়ার ক্ষেত্রে আহলে কিতাবগণ তিনটি স্তরে বিভক্ত: উচ্চবিত্ত (৪৮ দিরহাম), মধ্যবিত্ত (২৪ দিরহাম) ও নিম্নবিত্ত (১২ দিরহাম)।

কাদের ওপর জিজিয়া দেওয়া বাধ্যতামূলক
জিজিয়া শুধু স্বাধীন বিবেকসম্পন্ন সাবালক পুরুষদের ওপরই ওয়াজিব; নারী, শিশু, পাগল ও দাসের ওপর কোনো জিজিয়ার বিধান নেই। জিজিয়া আদায় অমুসলিমদের ওপর জুলুম নয়, বরং এটি তাদের নিরাপত্তা দানের বিনিময়ে গৃহীত একটি কর যা জাকাতের তুলনায় অনেক সহজ ও নগণ্য।

টিকাঃ
৮৭৭. তাজুল আরুস : ৩৭/৫৩ (দারুল হিদায়া, বারিদা)
৮৭৮. সুরা আত-তাওবা: ২৯
৮৭৯. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: পৃ. নং ২২৩ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৮০. প্রাগুক্ত
৮৮১. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: ১৯/৩৯১ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৮৮২. আল-মুগনি, ইবনু কুদামা : ৯/৩৩৪ (মাকতাবাতুল কাহিরা, মিশর)
৮৮৩. বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৬৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৮৮৪. আল-মাবসুত, সারাখসি: ১০/৭৮ (দারুল মারিফা, বৈরুত)
৮৮৫. আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: পৃ. নং ২২৩ (দারুল হাদিস, কায়রো)

ফন্ট সাইজ
15px
17px