📄 সোনা, রুপা ও অর্থের জাকাত
কারও কাছে যদি বিশ দিনার পরিমাণ সোনা থাকে, তাহলে এক দিনারের অর্ধেক জাকাত দিতে হবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ সম্পদের চল্লিশ ভাগের একভাগ। আর রুপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো দুইশ দিরহাম। কারও কাছে দুইশ দিরহাম থাকলে, তাকে পাঁচ দিরহাম জাকাত দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'ফাইজা কানাত লাকা মিয়াতা দিরহামিন, ওয়াহালা আলাইহিল হাওলু, ফাফিহা খামসাতু দারাাহিমা, ওয়ালাইসা আলাইকা শাইয়ুন -ইয়ানি- ফিজ জাহাবি হাত্তা ইয়াকুনা লাকা ইশরুনা দিনারান, ফাইজা কানা লাকা ইশরুনা দিনারান, ওয়াহালা আলাইহিল হাওলু, ফাফিহা নিসফু দিনারিন, ফামা জাদা, ফাবিহিসাবি যালিকা... ওয়ালাইসা ফী মালিন জাকাতুন হাত্তা ইয়াহুলা আলাইহিল হাওলু'
(যদি কারও দুইশ দিরহাম থাকে এবং এর ওপর এক বছর অতিক্রম হয়, তাহলে তাতে পাঁচ দিরহাম দিতে হবে। আর সোনার ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো কিছু দেওয়া আবশ্যক নয়, তবে যখন তোমার বিশ দিনার হয়ে তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হবে, তখন তাতে এক দিনারের অর্ধেক জাকাত দিতে হবে। আর সম্পদ যদি এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে এই হিসাব অনুযায়ীই জাকাত দিতে হবে। এক বছর অতিবাহিত হওয়া ছাড়া সম্পদের কোনো জাকাত দেওয়া লাগে না।)
উল্লেখ্য যে, দুইশ দিরহাম বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ৫৯৫ গ্রাম বা সাড়ে বায়ান্নো ভরি রুপা হয়। আর বিশ দিনারে হয় প্রায় ৮৫ গ্রাম বা সাড়ে সাত ভরি সোনা।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সোনা ও রুপা, এই দুধরনের মুদ্রার মধ্যে জাকাত ওয়াজিব হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে যেসব মুদ্রা চালু আছে, তা সব সোনা-রুপার হিসাবে পরিমাপ করতে হবে। সুতরাং প্রচলিত মুদ্রা যদি সোনা বা রুপার কোনো একটির নিসাবের সমপরিমাণ মূল্যের হয়, তাহলে তাতে এক-চল্লিশাংশ হিসাবে জাকাত আবশ্যক হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের টাকা-পয়সাগুলো সোনা-রূপার স্থলাভিষিক্ত হবে।
বর্তমানের প্রচলিত মুদ্রার মূল্য সোনা বা রুপার যেকোনো একটি নিসাবের সমমূল্যের পরিমাণ হলেই জাকাত আবশ্যক হয়ে যাবে। উভয়টির মধ্যে যেটি আগে মিলবে, সেটির সাথে মূল্য হিসাব করবে। বর্তমান সময়ে যেহেতু সাড়ে বায়ান্নো ভরি রুপার চেয়ে সাড়ে সাত ভরি সোনার দাম বেশি, তাই মুদ্রার হিসাব রুপার নিসাবের সাথে করতে হবে, সোনার নিসাবের মূল্যের নয়। সুতরাং কারও কাছে যদি সাড়ে বায়ান্নো ভরি রুপার বাজারমূল্য পরিমাণ নগদ ক্যাশ থাকে, তাহলে বলা হবে, তার ওপর জাকাত আবশ্যক হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৮৩২. সুনানু আবি দাউদ: ২/১০০-১০১, হা. নং ১৫৭৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 ব্যবসার জাকাত
ব্যবসায়িক সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হয়। অর্থাৎ যেসব পণ্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা হয়, সেগুলোর জাকাত দিতে হবে। তবে শর্ত হলো, এক বছর পূর্ণ হতে হবে এবং নিসাব পরিমাণ হতে হবে। ব্যবসা যদি সোনার হয়ে থাকে, তাহলে সোনার নিসাব তথা সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ সোনা থাকলে জাকাত আবশ্যক হবে, এর কম থাকলে নয়। আর যদি রুপার ব্যবসা হয়, তাহলে রুপার নিসাব তথা সাড়ে বায়ান্নো ভরি রুপা থাকলে জাকাত আবশ্যক হবে, এর কম থাকলে নয়। আর ব্যবসায়িক পণ্য যদি সোনা-রুপা ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী হয়, তাহলে সেগুলো মূল্য হিসাব করে সোনা বা রুপার মধ্যে কোনো একটি নিসাবের মূল্যের সমপরিমাণ হলে তার জাকাত দিতে হবে, অন্যথায় নয়। আর পূর্বে গত হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে রুপার নিসাবের মূল্য হিসাব করবে, সোনার নিসাবের মূল্যের নয়। সুতরাং সোনা-রুপা ছাড়া অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্নো ভরি রুপার সমমূল্যের হয়, তাহলেই তার ওপর জাকাত আবশ্যক হয়ে যাবে।
ব্যবসার সম্পদ স্থাবর, অস্থাবর যে ধরনেরই হোক না কেন, তাতে গরিব ও অসহায়দের একটি অংশ নির্ধারিত হয়ে যায়। সামুরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'ফাইন্না রাসুলাল্লাহি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা কান ইয়ামুরুনা আন তুখরিজাস সাদাকাতা মিনাল্লাজি নুয়িদ্দু লিল বায়ি'
(রাসুলুল্লাহ আমাদের বিক্রির জন্য রাখা পণ্যের জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিতেন।)
টিকাঃ
৮৩৩. সুনানু আবি দাউদ : ২/৯৫, হা. নং ১৫৬২ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
📄 নিসাব পরিপূর্ণ হওয়ার সময়
বছরের শুরু ও শেষ সময় নিসাব পূর্ণ থাকলেই যথেষ্ট। বছরের মাঝামাঝি সময়ে নিসাব অসম্পূর্ণ থাকলে সমস্যা নেই। মোটকথা, নিসাবের মালিক হওয়ার দিন থেকে বছরের শেষদিন পর্যন্ত সারাবছর নিসাব পূর্ণ থাকা আবশ্যক নয়। বছরের মাঝ দিয়ে লস বা বিভিন্ন কারণে নিসাব কমে গেলেও বছরের শেষ দিন যদি আবার নিসাব পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে শেষদিন যে পরিমাণ অর্থ বা পণ্য হাতে থাকবে, সে পরিমাণেরই জাকাত দিতে হবে। তা বছরের শুরু সময়ের অর্থ বা পণ্যের চেয়ে কমও হতে পারে, বেশিও হতে পারে আবার সমান সমানও হতে পারে।
📄 গবাদি পশুর জাকাত
গবাদি পশু দ্বারা এখানে শুধু তিন ধরনের পশু উদ্দেশ্য। যথা: উট, গরু ও ছাগল। এ তিন ধরনের পশু ছাড়া অন্য কোনো পশুর ওপর কোনো জাকাত নেই। হ্যাঁ, যদি সেগুলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তাহলে সেগুলোর ওপর ব্যবসায়িক পণ্য হিসাবে জাকাত আসবে। সেগুলোর জন্য গবাদি পশুর নিসাব বা শর্ত প্রযোজ্য নয়।
গবাদি পশুর জাকাত আবশ্যক হওয়ার জন্য আলাদা শর্ত, আলাদা নিসাব। শর্ত হলো পশু সায়িমা হতে হবে। সায়িমা না হলে যত পশুই থাকুক না কেন, তাতে জাকাত ওয়াজিব হবে না। শরিয়তের পরিভাষায় যেসব পশু বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘুরে ঘুরে ঘাস খায়, বছরের বেশিরভাগ সময় যার আলাদা করে খাওয়ার খরচ বহন করতে হয় না, তাকে সায়িমা পশু বলে। সাধারণত সায়িমা পশু দুধ খাওয়ার জন্য এবং তাদের বাচ্চা হওয়ার জন্য পালা হয়। সুতরাং যেসব পশুকে বছরের অধিকাংশ সময় নিজের খরচে ঘাস-পানি খাওয়াতে হয় কিংবা সেগুলোকে কাজকর্ম ও বহনের জন্য খাটানো হয়, সেগুলোর ওপর জাকাত আসবে না।
আলি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'ওয়ালাইসা আলাল আওয়ামিলি শাইয়ুন'
(যে পশুকে কাজে-কর্মে খাটানো হয়, তাতে কোনো কিছু অর্থাৎ জাকাত দেওয়া লাগবে না।)
টিকাঃ
৮৩৪. আল-জাওহারাতুন নাইয়ারা: ১/২১২ (আল মাতবাআতুল খাইরিয়্যা)
৮৩৫. সুনানু আবি দাউদ: ২/১০০, হা. নং ১৫৭২ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।