📄 জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ
জাকাত ফরজ হওয়ার চারটি শর্ত রয়েছে : ১. মুসলিম হওয়া। ২. স্বাধীন হওয়া। ৩. নিসাবের মালিক হওয়া। ৪. এক চান্দ্র বছর অতিক্রান্ত হওয়া।
জাকাত ফরজ হওয়ার প্রথম শর্ত হলো, মুসলিম হতে হবে। জাকাতের সাথে অমুসলিমদের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা, জাকাত হলো একটি ইবাদত, যা শুধু আল্লাহর খাঁটি দাসত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং যারা তাওহিদ ও রিসালত অস্বীকার করে তাদের নিকট থেকে জাকাত নেওয়ার না কোনো প্রয়োজন আছে, আর না কোনো অবকাশ আছে।
জাকাত ফরজ হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত হলো, তাকে স্বাধীন হতে হবে। কেননা, দাস-দাসীরা তো কোনো সম্পদের মালিকই হয় না। অথচ জাকাতের ভিত্তিমূলই হলো অর্থসম্পদ। দাস যত অর্থই উপার্জন করুক না কেন, তা সব তার মনিবের। তাই তার ওপর ভিন্নভাবে কোনো জাকাত আবশ্যক হবে না।
জাকাত ফরজ হওয়ার তৃতীয় শর্ত হলো, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। অর্থাৎ যেকোনো সম্পদের মালিক হলেই জাকাত ফরজ হয়ে যায় না; বরং শরিয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি পরিমাণের মালিক হলে তবেই জাকাত আবশ্যক হবে। নিসাবের বিশদ আলোচনা শীঘ্রই আসছে।
জাকাত ফরজ হওয়ার চতুর্থ শর্ত হলো, সেই সম্পদের ওপর এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হবে। এর আগ পর্যন্ত তার জন্য জাকাত আদায় করা ফরজ নয়। তবে ফসল ও ফল-ফলাদির ওশরের জন্য এক বছর হওয়ার কোনো শর্ত নেই। এ ক্ষেত্রে বরং যেদিন ফসল বা ফল কাটা হবে, সেদিনই তার ওশর আদায় আবশ্যক হয়ে যাবে।
📄 জাকাতের নিসাব
মালিকাধীন সম্পদের মধ্য থেকে নিজ প্রয়োজন বাদে অতিরিক্ত সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তবেই জাকাত আবশ্যক হয়। প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ বলতে শরিয়তে তিন ধরনের সম্পদকে অন্তর্ভুক্ত করে। এক. সোনা-রুপা বা নগদ অর্থ। দুই. ব্যবসায়িক সম্পদ। তিন. গবাদি পশু। প্রত্যেক প্রকারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত ও বিধান রয়েছে।
📄 জাকাত আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি
ইসলামি রাষ্ট্র জাকাত আদায়ের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত। ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি গিয়ে নিসাবের মালিকদের কাছ থেকে জাকাত আদায় করবে, চাই তা স্বেচ্ছায় হোক কিংবা জোর করে হোক। এ প্রসঙ্গে হাদিসের ভাষ্য অত্যন্ত কঠোর।
বাহাজ বিন হাকিম তার পিতা সূত্রে তার দাদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
'মান আ'তয়াহা মুতাজিরান... ফালাহু আজরুহা, ওয়ামান মানায়াহা ফাইন্না আখিজুহা ওয়া শাতরা মালিহি...'
(যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিদানের আশায় তা স্বেচ্ছায় দেবে, তার জন্য প্রতিদান রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তা দিতে অস্বীকার করবে, আমি তার সম্পদের ভালো অংশ নিয়ে নেব; আমাদের প্রভুর অধিকারসমূহের একটি অধিকার হিসাবে। এ থেকে সামান্য পরিমাণও মুহাম্মাদ ﷺ-এর পরিবারের জন্য হালাল নয়।)
হাদিসে বর্ণিত 'ওয়া শাতরা মালিহি' শব্দটির ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে এদ্বারা সম্পদের একটি অংশ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ জাকাত দিতে অস্বীকার করায় জরিমানাস্বরূপ তার থেকে কিছু সম্পদ নেওয়া হবে। কারও মতে এর ব্যাখ্যা হলো, তার জাকাতযোগ্য সম্পদকে দুভাগে ভাগ করা হবে। তারপর সদকা উত্তোলনকারী তা থেকে উত্তম ভাগটি বেছে নিয়ে আসবে।
টিকাঃ
৮৪৪. সুনানু আবি দাউদ: ২/১০১, হা. নং. ১৫৭৫ (মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব) - হাদিসটি হাসান।
৮৪৫. আওনুল মাবুদ : ৪/৩১৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
📄 জাকাতের খাতসমূহ
জাকাতের অর্থ যাকে তাকে দিলে হবে না; বরং এর জন্য শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কিছু খাত আছে। এ নির্দিষ্ট খাতগুলো ছাড়া অন্য কোথাও জাকাতের অর্থ দান করলে জাকাত আদায় হবে না। এ খাত মোট আটটি শ্রেণিতে বিভক্ত।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে :
{ إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ }
'জাকাত কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথের মুজাহিদদের জন্য ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।'
১. ফকির: যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। শরিয়তের পরিভাষায় নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে তাকে ফকির বলা হয়।
২. মিসকিন: মিসকিন ফকিরের মতোই নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়। ফকির মানুষের নিকট ভিক্ষা ও সাহায্য চায়, কিন্তু মিসকিন বেচারা কষ্টে থাকলেও আত্মমর্যাদাবোধের কারণে মানুষের নিকট হাত পাতে না। এ জন্য তুলনামূলকভাবে ফকিরদের চেয়ে মিসকিনরা অধিক কষ্ট ভোগ করে থাকে। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন :
'লাইসাল মিসকিনু বিহাজাত তাওয়াাফিল্লাজি ইয়াতুফু আলান নাস...'
(মিসকিন সে নয়, যে মানুষের নিকট ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চায়, যাকে এক বা দু'লোকমা খাবার কিংবা একটি বা দুটি খেজুর দিয়ে দেওয়া হয়। সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তাহলে মিসকিন কে? রাসুলুল্লাহ বললেন, মিসকিন হলো, যে অর্জনের উপায় করতে পারে না, তাদের দারিদ্র্য বুঝতেও দেয় না, যদ্দরুন তাদের কিছু সদকা করা হবে।)
৩. জাকাতের কর্মচারী: এ খাতের আওতায় পড়বেন জাকাত উত্তোলনকারী, জাকাত বণ্টনকারী, এ কাজে নিয়োজিত লেখক ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীগণ।
৪. ইসলামের প্রতি অনুরাগী অমুসলিম: ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য লোকদের জাকাতের অংশ থেকে প্রদান করা যাবে। হতে পারে এমন কাফির, যার ইসলাম গ্রহণের আশা করা যায়, অথবা দুর্বল ইমানদার, যাকে অর্থ-সম্পদ দিলে তার ইমান শক্তিশালী হবে।
৫. গোলাম আজাদকরণ: মুকাতিব গোলাম, সাধারণ গোলাম এবং মুসলিম বন্দীদের মুক্তকরণে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: মীমাংসাকারী ব্যক্তি যিনি দুপক্ষের বিরোধ মিটাতে ঋণ করেছেন অথবা এমন সাধারণ ঋণকারী যে নিজের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে ঋণ করেছে কিন্তু পরিশোধের সামর্থ্য নেই।
৭. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা: এখানে 'ফী সাবীলিল্লাহ' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত মুজাহিদগণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো কোন জিহাদ সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যে আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করে।
৮. মুসাফির: এমন মুসাফিরকেও এ অর্থ দেওয়া যাবে, সফররত অবস্থায় যার রসদ ফুরিয়ে গেছে, যদিও সে নিজ শহরে ধনী।
টিকাঃ
৮৪৬. সুরা আত-তাওবা: ৬০
৮৪৭. সুনানু আবি দাউদ: ২/১১৭, হা. নং, ১৬৩০ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি জইফ।
৮৪৮. সহিহু মুসলিম: ২/৭১৯, হা. নং ১০৩৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৮৫০. মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনি উসাইমিন: ১৮/৩৩২ (দারুল ওয়াতন)
৮৫৪. সহিহু মুসলিম: ৩/১৫১৩, হা. নং ১৯০৪ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)