📄 দুই. মজুতদারি ও গুদামজাতকরণ
অধিক লাভে বিক্রি করার আশায় পণ্য মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করাকে الاحْتِكَارُ বা গুদামজাত বলে। ৭৯২ এটি একটি ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট উপার্জনের পন্থা, যা আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির মধ্য হতে কিছু লোভী প্রকৃতির মানুষ করে থাকে। তাদের অন্তরে ভালোবাসা ও মমত্ববোধ বলতে কিছু নেই। মমতা যেন পরিপূর্ণভাবে তাদের অন্তর থেকে বেরিয়ে গেছে। ইসলাম যে সকল অপরাধ থেকে সতর্ক করেছে, সেগুলোর অন্যতম হলো মজুতদারি। কেউ এমন জঘন্য কাজে লিপ্ত হলে, তার জন্য অভিশাপ ও শাস্তি অবধারিত।
উমাইর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
'মানিহুতাকারা ফাহুওয়া খাতিউন' (যে ব্যক্তি গুদামজাত করল, সে একজন পাপী।) ৭৯৩
অন্য বর্ণনায় এসেছে :
'লা ইয়াহতাাকিরু ইল্লা খাতিউন' (একমাত্র পাপীরাই গুদামজাত করে রাখে।) ৭৯৪
ইবনে মাজাহর অন্য এক বর্ণনায় আছে:
'মানিহুতাকারা আলাল মুসলিমিনা তয়া-মাহুম দরাবাহুল্লাহু বিল জুজাম ওয়াল ইফলাস' (যে মুসলমানদের খাদ্য জমা করে রাখবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দারিদ্র্য ও কুষ্ঠরোগের মাধ্যমে শাস্তি দেবেন।) ৭৯৫
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
'মানিহুতাকারা তয়া-মান আরবাঈনা লাইলাতান ফাক্বাদ বারিআ মিনাল্লাহি তাআলা ওয়াবারিয়াল্লাহু তাআলা মিনহু' (যে ব্যক্তি চল্লিশদিন পর্যন্ত খাদ্য গুদামজাত করে রাখে, সে আল্লাহর জিম্মা থেকে মুক্ত, আল্লাহও তার জিম্মাদারি থেকে মুক্ত।) ৭৯৬
টিকাঃ
৭৯২. আল-কামুসুল মুহিত: পৃ. নং ৩৭৮ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
৭৯৩. সহিহ মুসলিম: ৩/১২২৭, হা. নং ১৬০৫ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৭৯৪. সহিহ মুসলিম: ৩/১২২৮, হা. নং ১৬০৫ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৭৯৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২/৭২৯, হা. নং ২১৫৫ (দারু ইহয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যি, কায়রো) - হাদিসটি জইফ।
৭৯৬. মুসনাদু আহমাদ : ৬/৪৮২, হা. নং ৪৮৮০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
📄 তিন. জুয়া ও বাজি ধরা
অবৈধ উপার্জনের আরও একটি মাধ্যম হলো জুয়া খেলা ও বাজি ধরা। (الميسر) আল-মাইসির এর শাব্দিক অর্থ হলো (القداح) আল-কিদাহ বা অগ্নিকাঠি, যা দ্বারা তৎকালে আরবরা বাজি ধরে জুয়া খেলত। ৭৯৭ শরিয়তের পরিভাষায় এমন সকল প্রকার কার্যকলাপ, যার ভেতর হার-জিতের আশঙ্কা আছে, যার একপক্ষ সম্পূর্ণ হেরে যাবে ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অপরপক্ষের সম্পূর্ণ জিত ও লাভ হবে—এমন কর্মকে জুয়া বা কিমার বলে।
জুয়া উপার্জনের নিকৃষ্ট পন্থা। যারা এমন পন্থা অবলম্বন করে, তারা মূলত তাদের পেটে আগুন ভর্তি করে। এমন লোকদের সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ হয় অবৈধ পন্থায়। এমন নিকৃষ্ট পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ - إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ }
‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। তোমরা কি এখনো নিবৃত্ত হবে না?’ ৭৯৮
জুয়া ও বাজি ধরার বস্তুসমূহ দিয়ে খেলাধুলা করা হাদিসে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এরই একটি প্রকার হলো, পাশা খেলা। আবু মুসা আশআরি (রা) থেকে ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেন :
'মাল লািইবা বিননারদি ফাক্বাদ আসাল্লাহা ওয়ারা সূলাহু' (যে পাশা খেলল, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করল।) ৭৯৯
বুরাইদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
'মাল লািইবা বিননারদাশি রি ফাকাআন্নামা সাবাগা ইয়াদাহু ফি লাহমি খিনজিরিন ওয়াদামিহি' (যে পাশা দ্বারা খেলল, তার হাত যেন শুকরের গোশত ও রক্তে চুবে গেল।) ৮০০
শাহ অলিউল্লাহ দেহলবি বলেন : ‘জুয়া একেবারেই হারাম ও বাতিল। এটির প্রচলনে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক—উভয় দিকই একেবারে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। এরই মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রে প্রসার লাভ করে। মোটকথা, জুয়া যত প্রকারের আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এর যত প্রকার উদ্ভাবিত হওয়া সম্ভব—সবগুলো হারাম।’
টিকাঃ
৭৯৭. তাজুল আরুস : ১৪/৪৬১-৪৬৩ (দারুল হিদায়া, বারিদা)
৭৯৮. সুরা আল-মায়িদা: ৯০-৯১
৭৯৯. মুসনাদু আহমাদ : ৩২/২৮৭, হা. নং ১৯৫২১ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
৮০০. সহিহু মুসলিম : ৪/১৭৭০, হা. নং ২২৬০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
📄 চার. ঘুষ
(رشوة) রিশওয়াত শব্দটি একবচন। বহুবচনে রুশান। এটিও উপার্জনের নোংরা একটি পদ্ধতি। সমাজের নিকৃষ্ট ও পাপিষ্ঠ শ্রেণিরাই কেবল এ পথ অবলম্বন করে থাকে। এ ধরনের পাপিষ্ঠদের মধ্যে অনুভূতি ও আল্লাহভীতি লোপ পেয়ে যায়। এরা দুনিয়ার সস্তা জীবনকে উপভোগ করে। এরা দুঃখী-দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সম্পদ হাতিয়ে নেয়। মূলত তারা টাকা-পয়সা নয়; বরং আগুনের কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার ভক্ষণ করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّن أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ }
'তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দাংশ জেনেশুনে অবৈধ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।' ৮০২
ঘুষগ্রহীতা ও ঘুষদাতা উভয়েই নিন্দিত। আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'লাআনা রাসূলাল্লাহি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আররাশিয়া ওয়াল মুরতাশিয়া' (রাসুলুল্লাহ ঘুষগ্রহীতা ও ঘুষদাতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।) ৮০৩
টিকাঃ
৮০১. মুখতারুস সিহাহ : পৃ. নং ১২৩ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত)
৮০২. সুরা আল-বাকারা: ১৮৮
৮০৩. সুনানু আবি দাউদ: ৩/৩০০, হা. নং ৩৫৮০ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
📄 পাঁচ. সম্পদ মজুদ করা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ }
'আর যারা সোনা ও রুপা জমা করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের কঠোর আজাবের সুসংবাদ দিন।' ৮০৪
ইসলামে যদিও সম্পদ মজুদ করা থেকে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু কেউ মজুদ করলে তা এমনিতে হারাম কিছু হবে না। সম্পদ মজুদ করা দু'অবস্থায় হারাম। এক. জাকাত না দিয়ে সম্পদ মজুদ করা। দুই. মুসলমানদের দারিদ্র্য ও কঠিন মুহূর্তে সম্পদ জমা করা। ৮০৫
টিকাঃ
৮০৪. সুরা আত-তাওবা: ৩৪
৮০৫. তাফসিরুল কুরতুবি: ৮/১২৫ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)