📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 সুদের পরিচয় ও প্রকারভেদ

📄 সুদের পরিচয় ও প্রকারভেদ


(الربا) আর-রিবা এর শাব্দিক অর্থ হলো, বৃদ্ধি পাওয়া। ৭৮৬ পরিভাষায় রিবা দুধরনের : ১. রিবা আল-ফদল - বৃদ্ধিমূলক সুদ। ২. রিবা আন-নাসিয়া - বাকিজনিত সুদ।

১. রিবা আল-ফদল - বৃদ্ধিমূলক সুদ
বিক্রির সময় একই জাতীয় জিনিসে বেশি গ্রহণ করা। যেমন এক দিনারের বিনিময়ে দুই দিনার, এক দিরহামের বিনিময়ে দুই দিরহাম, এক টাকার বিনিময়ে দুই টাকা, এক কেজির বিনিময়ে দুই কেজি। এমন লেনদেন করা হারাম। আবু সাইদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'আজ্জাহাবু বিজজাহাবি ওয়াল ফিজ্জাতু বিল ফিজ্জাতি ওয়াল বুররু বিল বুররি ওয়াশ শাঈরু বিশ শাঈরি ওয়াততামরু বিততামরি ওয়াল মিলহু বিল মিলহি মিছলান বিমিছলিন ইয়াদান বিইয়াদিন ফামান জাদা আও ইস্তাজাদা ফাক্বাদ আরবা আলআখিজু ওয়াল মু'তি ফীহি সাওয়াউ' (সোনার বিনিময়ে সোনা, রুপার বিনিময়ে রুপা, গমের বিনিময়ে গম, জবের বিনিময়ে জব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ—সব এক বরাবর ও নগদে হতে হবে। সুতরাং যে বেশি দেবে বা চাইবে, সে সুদে জড়িয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ে সমান অপরাধী।) ৭৮৭

২. রিবা আন-নাসিয়া বা আন-নিসা
ভিন্ন জাতীয় জিনিস বাকি বিক্রি করে অতিরিক্ত গ্রহণ করা। তবে ভিন্ন জাতীয় জিনিসের মধ্যে অতিরিক্ত গ্রহণ করা জায়িজ আছে। শর্ত হচ্ছে তা বাকিতে হতে পারবে না, নগদে হতে হবে। উবাদা বিন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'আজ্জাহাবু বিজজাহাবি ওয়াল ফিজ্জাতু বিল ফিজ্জাতি ওয়াল বুররু বিল বুররি ওয়াশ শাঈরু বিশ শাঈরি ওয়াততামরু বিততামরি ওয়াল মিলহু বিল মিলহি মিছলান বিমিছলিন সাওয়াআন বিসাওয়া ইন ইয়াদান বিইয়াদিন ফাইজা ইখতালাফাত হাজিহিল আসনাফু ফাবিউ কাইফা শিতুম ইজা কানা ইয়াদান বিইয়াদিন' (সোনার বিনিময়ে সোনা, রুপার বিনিময়ে রুপা, গমের বিনিময়ে গম, জবের বিনিময়ে জব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ—পরিমাণে সমান ও নগদে বিক্রি হবে। তবে যদি এগুলো ভিন্ন জাতীয় হয়, তখন নগদে হওয়ার শর্তে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে (কমবেশ করে) বিক্রি করো।) ৭৮৮

এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। মতানৈক্যের স্বরূপটি হলো, শুধু হাদিসে উল্লেখিত এই ছয়টি জিনিসের মধ্যেই অতিরিক্ত গ্রহণ করা হারাম নাকি এই ছয়টিসহ সকল কিছুর ক্ষেত্রেই এই বিধান প্রযোজ্য?

আহলে জাওয়াহিরের মতে, সুদি লেনদেন শুধু এই ছয় প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছয় প্রকারের বাইরে অন্যান্য সকল বস্তুতে কমবেশ করে লেনদেন করা যাবে। ৭৮৯

কিন্তু জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, হাদিসের মধ্যে যদিও ছয়টি বস্তুর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এতে শুধু এ ছয়টিই উদ্দেশ্য নয়; বরং এ থেকে ব্যাপক অর্থ উদ্দেশ্য। সুতরাং এই ছয় জিনিস ছাড়া আরও অন্যান্য বস্তুতেও এই হুকুম প্রযোজ্য হবে। অতএব, ক্রয়-বিক্রয়ের সময় পণ্য ও মূল্য এক জাতীয় জিনিস হলে তাতে কমবেশ করে বা বাকিতে লেনদেন করা হারাম বলে বিবেচিত হবে। ৭৯০

মূলকথা হচ্ছে, সুদ ইসলাম কর্তৃক ঘোষিত সেসব কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো থেকে ইসলাম কঠিনভাবে নিষেধ ও সতর্ক করেছে। এটি সম্পদ উপার্জনের একটি অবৈধ মাধ্যম। লোভী ও জালিম প্রকৃতির মানুষের এমন অবৈধ উপার্জন আল্লাহ তাআলার নিকট ঘৃণিত বলে বিবেচিত হয়।

সুদখোর ও পুঁজিবাদীরা একটি ভ্রান্ত আপত্তি করে থাকে। তারা সুদি কারবারকে অপরাধ মনে করে না। মনে করে, সুদ হলো ক্রয়-বিক্রয়ের একটি প্রক্রিয়া। ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে যেমন টাকার বিনিময়ে মাল আদান-প্রদান করা হয়, এখানেও মালের বিনিময়ে মালের আদান-প্রদান করা হয়। এমনিভাবে যদি অতিরিক্ত নেওয়ার চুক্তিতে বাকিতে মালের বিনিময়ে মাল বিক্রি করা হয়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই; বরং তা লাভের একটি মাধ্যম মাত্র—যেমনটি প্রচলিত বেচাকেনার মধ্যে হয়ে থাকে। এমনিভাবে সুদের ওপর ঋণ দেওয়াকে তারা এমন মনে করে যে, ঋণদাতা ঋণ দেওয়ার কারণে তার যে আর্থিক ক্ষতি হয়, ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত গ্রহণ করাটা তার সেই আর্থিক ক্ষতিপূরণ। সুদি কারবারকে নির্দোষ বা নিরপরাধ মনে করা ইসলাম সমর্থন করে না। এটি তাদের একটি ভ্রান্ত ধারণা। যা দুধরনের :

প্রথমত, সুদের ভিত্তিমূল হলো অত্যাচার ও ঋণগ্রহীতার ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ। সুদদাতা ব্যক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণের বিনিময়ে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নিয়ে থাকে। এদিকে ঋণী ব্যক্তির অবস্থা যেমনই হোক না কেন; চাই সে ক্ষতির মধ্যে থাকুক অথবা লাভ-ক্ষতির মাঝামাঝি থাকুক, তাকে এ অর্থ অবশ্যই দিতে হবে। অথচ ইসলাম সামঞ্জস্যতার ভিত্তিতে লেনদেনের মধ্যে লাভ-ক্ষতিকে মূল্যায়ন করে। ফিকহি মূলনীতি অনুসারে মুনাফা ভোগ ঝুঁকি ও দায়বহনের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং বোঝা গেল, চুক্তি সম্পাদনকারী উভয়েরই যেহেতু লাভ-ক্ষতিতে সমান ঝুঁকি, বিধায় এখন যদি শুধু একজন লাভের দাবিদার হয় এবং অপরজন লাভ-ক্ষতি উভয়টির জিম্মাদার হয়, তাহলে তা হবে স্পষ্ট জুলুম ও অসামঞ্জস্যশীল একটি বিষয়।

দ্বিতীয়ত, ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হলো স্বার্থপরতা। ঋণগ্রহীতা ও বিপদগ্রস্তের কাছ থেকে কলঙ্কজনক ও অন্যায় সুবিধাভোগ। এতে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার লেশমাত্র নেই। অথচ ইসলাম মানুষকে পারস্পরিক ভালোবাসা, নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দান ও সাহায্য-সহযোগিতার দিকে আহ্বান করে। কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই বিপদগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করে। এ ভিত্তিতেই ইসলাম মানুষকে প্রয়োজনের সময় ঋণদানের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আবার তার বিনিময়ে কোনো অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ থেকে বারণ করেছে। কেননা, ইসলাম মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের নির্দেশ দেয়। আর মুসলিমরা এমনই হয়। প্রকৃত মুসলিম তো তারা, যারা ইসলামের বিধানুযায়ী জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছে। যারা পারস্পরিক ঐক্য ও বন্ধুত্ব রক্ষায় অটল। তারা শুধু লেনদেন নয়; বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও মমত্ববোধ বজায় রেখে চলে। যেখানে কোনো অহংকার ও আমিত্ববোধ নেই।

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদিস হচ্ছে :
'মান নাফফাসা আন মুমিনিন কুরবাতাম মিন কুরাবিদ দুনিয়া নাফফাসাল্লাহু আনহু কুরবাতাম মিন কুরাবি ইয়াওমিল ক্বিয়ামাত ওয়ামান ইয়াসসারা আলা মু'সিরিন ইয়াসসারাল্লাহু আলাইহি ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়ামান সাতারা মুসলিমান সাতারাহুল্লাহু ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়াল্লাহু ফী আওনিল আবদি মা কানাল আবদু ফী আওনি আখীহি' (যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের একটি জাগতিক বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের বিপদগুলো থেকে একটি বিপদ দূর করে দেবেন। আর যে কোনো অভাবী ব্যক্তির অভাব দূর করবে, আল্লাহ তাআলা তার দুনিয়া ও আখিরাতের অভাব দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষগুলো গোপন করবেন। আর বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্য করে, ততক্ষণ আল্লাহ তাআলাও তাকে সাহায্য করেন।) ৭৯১

টিকাঃ
৭৮৬. আল-মিসবাহুল মুনির: পৃ. নং ২১৭ (আল-মাকতাবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৮৭. সহিহু মুসলিম : ৩/১২১১, হা. নং ১৫৮৪ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৭৮৮. সহিহু মুসলিম: ৩/১২১১, হা. নং ১৫৮৭ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৭৮৯. আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম: ৭/৪০৩ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৭৯০. বাদায়িউস সানায়ি: ৫/১৮৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৯১. সহিহ মুসলিম : ৪/২০৭৪, হা. নং ২৬৯৯ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)

ফন্ট সাইজ
15px
17px