📄 পাঁচ. মুদারাবা
(المضارية) আল-মুদারাবা শব্দটি الضَّরْبُ থেকে নির্গত। এর অর্থ হলো, ভ্রমণ করা, সফর করা। ৭৫৭ এ পারিভাষিক অর্থ সম্পর্কে হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, 'দুপক্ষের কোনো এক পক্ষের সম্পদ এবং অপরপক্ষের শ্রমে যৌথ কারবার করাই মুদারাবা।' ৭৫৮
বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, এখানে দুটি পক্ষ থাকে। একজন মূলধনের মালিক আর অন্যজন ব্যবসায়ী বা শ্রমদাতা। মূলধনের মালিক অর্থ ও সামগ্রী জোগান করে দেবে এবং শ্রমদাতা ব্যবসায়ী নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে তার সম্পদ নিয়ে ব্যবসা করবে। আর লাভের মধ্যে তাদের উভয়ের জন্য পার্সেন্টাকারে যেমন এক-তৃতীয়াংশ, এক-চতুর্থাংশ বা অর্ধেক এরকম নির্দিষ্ট হারে একটি অংশ থাকবে। এটিকেই মুদারাবা বলে। মুদারাবার বৈধতা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।
কুরআন থেকে দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
{ وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِن فَضْلِ اللَّهِ }
'কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ-বিদেশে যাবে।' ৭৫৯
হাদিস থেকে দলিল
রাসুলুল্লাহ যখন নবুয়ত পেলেন, তখন মানুষ মুদারাবা চুক্তিতে ব্যবসা করত। তিনি কাউকে নিষেধ করেননি। এ দ্বারা রাসুলুল্লাহ-এর মৌন সম্মতি বোঝা যায়। আর এটি হাদিসের একটি প্রকারও বটে। কোনো বিষয়ে রাসুলুল্লাহ জেনেও নীরব থাকলে তা থেকে বৈধতা প্রমাণিত হয়।
ইজমা থেকে দলিল
কতক সাহাবি থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা এতিমের সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মুদারাবা চুক্তিতে তা অন্যকে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন, উমর, উসমান, আলি, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আব্দুল্লাহ বিন উমর, উম্মুল মুমিনিন আয়িশা সিদ্দিকা প্রমুখ। সাহাবাযুগের এমন কোনো সাহাবি পাওয়া যায়নি, যিনি এ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বা এটিকে অবৈধ বলেছেন। আর এটি একটি স্বীকৃত ইজমা, যাকে পরিভাষায় ইজমায়ে সুকুতি বলা হয়।
মুদারাবার রুকন হলো, ইজাব ও কবুল। তা হতে হবে স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে। আর চুক্তির বক্তব্যটা হবে এমন যে, মূলধনের মালিক মুদারিবকে বলবে, 'আমি তোমাকে এই সম্পদ দিলাম। তুমি তা দিয়ে ব্যবসা করবে। আর লাভ আমাদের দুজনের জন্য সমান সমান কিংবা এক-তৃতীয়াংশ অথবা এক-চতুর্থাংশ ইত্যাদি ভাগে বণ্টন হবে।' অতঃপর মুদারিব ব্যক্তি বলবে, 'আমি তা গ্রহণ করলাম।' ৭৬০
শরিয়াসম্মত হালাল উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম এটি। এর ভিত্তি হলো শ্রম ব্যয় করা এবং বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে বেচাকেনা করার চেষ্টা করা। উপার্জনের প্রতি উৎসাহী করার জন্য ইসলামের সাথে এ বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও তাতে মুদারিবের জন্য অনেক কষ্ট ও সফরের ঝুঁকি রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ }
'তোমরা পৃথিবীর দিদিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক হতে আহার করো।' ৭৬১
{ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ }
'তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো।' ৭৬২
টিকাঃ
৭৫৭. লিসানুল আরব: ১/৫৪৪ (দারু সাদির, বৈরুত)
৭৫৮. হিদায়া: ৩/২০০ (দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
৭৫৯. সূরা আল-মুজ্জাম্মিল: ২০
৭৬০. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৭৯ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৬১. সুরা আল-মুলক : ১৫
৭৬২. সুরা আল-জুমআ : ১০
📄 ছয়. চাকরি
বর্তমান সময়ে জীবিকা অর্জনের জন্য চাকরি একটি বিশেষ মাধ্যম। এর বিশেষ একটি সামাজিক অবস্থানও রয়েছে। একজন চাকরিজীবী প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতার বিনিময়ে ধারাবাহিকভাবে যে শ্রম ব্যয় করে, তাই চাকরি। যেমন কেউ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন; চাই তা মাদরাসা শিক্ষা হোক বা জেনারেল শিক্ষা হোক।
চাকরি এমন একটি দায়িত্ব, যেখানে একজন চাকরিজীবীর ওপর তার মানসিক ও দৈহিক যথেষ্ট শ্রম দিতে হয়। তার শ্রম যেন সার্থক হয়, দায়িত্ব পালন যেন যথাযথ হয় এবং কোনো ধরনের ত্রুটি বা কমতি যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মাস শেষে বা চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ে বেতন পাওয়া পর্যন্ত একজন চাকরিজীবীকে তার ওপর অর্পিত কাজের আমানত নিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। তাকে অবশ্যই উত্তমভাবে ও পরিপূর্ণরূপে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অন্যথায় অবস্থাটা এমন দাঁড়াবে যে, সে প্রতারণা, আমানতের খিয়ানত ও মানুষের অধিকারে শিথিলতা করে মাস শেষে অবৈধভাবে বেতন গ্রহণ করছে।
মূলকথা হচ্ছে, চাকরি হালাল উপার্জনের একটি বৈধ পদ্ধতি, যা চাকরিজীবীর জন্য আরাম আয়েশে সুন্দর জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে থাকে। তবে শর্ত হলো, চাকরিজীবীকে অবশ্যই তার যথাসাধ্য শ্রম ব্যয় করতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রতারণা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করতে পারবে না। যদি কোনোভাবে এমনটি ঘটে যায়, তাহলে তার বেতন গ্রহণ হারাম হবে।
📄 সাত. মিরাসি সম্পত্তি
হালাল সম্পদ অর্জনের সবচেয়ে নিরেট ও বিশুদ্ধ মাধ্যম হলো, মিরাসি বা উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। নিজের পিতা, মাতা, বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা অন্য আত্মীয়দের মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে শরিয়ত নির্ধারিত যে অংশে মালিকানা সাব্যস্ত হয়, সেটাই মূলত মিরাসি সম্পত্তি। ইসলামি শরিয়তে মিরাসি সম্পত্তির ব্যাপারে খুবই সতর্ক, সূক্ষ্ম, ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়সংগত ও চমকপ্রদ বণ্টননীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এ বিধান ওয়ারিসদের ক্ষেত্রে যেমন উপযোগী, তেমনই মানুষের ফিতরি বা সৃষ্টগত চাহিদার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামের এমন সূক্ষ্ম বণ্টননীতি পরিবারের সদস্যদের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের যথাযথ হকপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে।
উত্তরাধিকার সম্পদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
যদি কেউ তার সম্পদ ও উত্তরাধিকারী রেখে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শরিয়ার নীতি হলো :
* পুরুষ নারীর দ্বিগুণ পাবে। কারণ, একজন পুরুষের ওপর পরিবারের সকল ধরনের খরচ নির্ভর করে। উদাহরণত ভরণপোষণ, ওষুধ-পত্র, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি সকল খরচ পুরুষকেই বহন করতে হয়। অপরদিকে এসব জিনিসের কোনোটি নারীদের দায়িত্ব নয়; বরং এ দৃষ্টিকোণ থেকে নারী হচ্ছে সচ্ছল এবং তার অভিভাবক বা স্বামী হচ্ছে অসচ্ছল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ }
'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন যে, পুরুষের জন্য দুজন নারীর অংশ রয়েছে।' ৭৬৩
* এমনিভাবে কেউ যদি একটি কন্যা সন্তান রেখে মারা যায় বা একাধিক কন্যা রেখে মারা যায় এবং তার কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে এক মেয়ের জন্য সমুদয় সম্পত্তির অর্ধেক। আর মেয়ে দুই বা ততোধিক হলে তারা সবাই মিলে সমুদয় সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ۖ وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ }
'অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দুয়ের অধিক, তবে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পদের তিন ভাগের দুভাগ এবং যদি একজন হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক।' ৭৬৪
* যদি কেউ ছেলে বা মেয়ে রেখে মারা যায়, তাহলে তার পিতা-মাতা জীবিত থাকলে প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ করে পাবে। আর যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে-মেয়ে না থাকে, তাহলে তার সম্পদ আসাবা হিসাবে পিতা-মাতাই পাবে। মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ এবং পিতা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। শর্ত হলো, মৃত ব্যক্তির দুই বা ততোধিক ভাই থাকতে পারবে না। যদি তার একাধিক ভাই থাকে, তাহলে তাদের মা তার নির্ধারিত এক-ষষ্ঠাংশ পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ পাওয়া থেকে মাহজুব তথা বঞ্চিত হবে। তিনি শুধু এক ষষ্ঠাংশেরই মালিক হবেন, বাকি অংশ আসাবা হিসাবে পিতা পেয়ে যাবে। মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের আগে তার কৃত অসিয়ত পূরণ করতে হবে এবং তার ঋণ আদায় করতে হবে। তারপর সম্পদ বণ্টন করা হবে। আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত এই বণ্টননীতির ব্যতিক্রম করার কারও সুযোগ নেই। এই পদ্ধতিতে মিরাসের সম্পদ বণ্টন করা ফরজ। কেউ যেন তার পিতা বা সন্তানসন্ততির পক্ষাবলম্বন করে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ না করে।
মিরাসের সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার ঘোষণা:
{ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ ۚ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ ۚ فَإِن كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۗ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا ۚ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا }
'মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্য ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের পুত্র থাকে। যদি পুত্র না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ মৃত ব্যক্তির কৃত অসিয়ত পূরণ কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী তোমরা জানো না। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' ৭৬৫
* যদি কোনো মহিলা তার স্বামী ও সম্পদ রেখে মারা যায় এবং তার কোনো ছেলে-মেয়ে না থাকে, তাহলে তার স্বামী অর্ধেক পাবে। আর যদি তার কোনো সন্তান থাকে, তাহলে তার স্বামী এক-চতুর্থাংশ পাবে। তবে তার আগে অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধ করতে হবে। যদি পুরুষ তার স্ত্রী রেখে মারা যায় এবং তার কোনো সন্তান না থাকে, তাহলে তার স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ পাবে। আর যদি তার সন্তান থাকে, তাহলে তার স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ পাবে। তার পূর্বে ব্যক্তির অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۚ وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُم ۚ مِّن بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوصُونَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ }
'আর তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা; যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে ওই সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ তোমাদের হবে, যা তারা ছেড়ে যায়; তারা যে অসিয়ত করে যায় তা পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্য এক-চতুর্থাংশ হবে ওই সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও, যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্য হবে ওই সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যে অসিয়ত করে যাও, তা পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর।' ৭৬৬
* আর মৃত ব্যক্তির যদি পিতা-মাতা ও সন্তানসন্ততি না থাকে। কিন্তু তার একজন ভাই অথবা বোন থাকে, তাহলে তারা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। আর যদি একাধিক ভাই-বোন থাকে, তাহলে তারা সকলে মিলে এক তৃতীয়াংশের অংশীদার হবে। তবে তার আগে মৃত ব্যক্তির অসিয়ত ও ঋণ আদায় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
{ وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَالَةً أَوِ امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ ۚ فَإِن كَانُوا أَكْثَرَ مِن ذَٰلِكَ فَهُمْ شُرَكَاءُ فِي الثُّلُثِ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ ۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ }
'আর যদি কোনো পুরুষ বা নারীকে নিঃসন্তানভাবে উত্তরাধিকার করতে হয় এবং তার এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক-তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে মৃত ব্যক্তির কৃত অসিয়ত বা তার ঋণ পরিশোধের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহপ্রদত্ত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।' ৭৬৭
উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র কুরআনে মৃত ব্যক্তির সম্পদের বণ্টনপদ্ধতি ছয়টি। যথা: নিসফ (অর্ধেক), রুবু' (এক-চতুর্থাংশ), ছুমুন (এক-অষ্টমাংশ), ছুলুছান (দুই-তৃতীয়াংশ), ছুলুছ (এক-তৃতীয়াংশ) এবং সুদুস (এক-ষষ্ঠাংশ)। আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি একটি ন্যায়সংগত ও যথোপযুক্ত বণ্টননীতি। এ বণ্টননীতির অন্যথা করা কখনোই বৈধ নয়। এটি আল্লাহপ্রদত্ত ইনসাফপূর্ণ একটি বিধান। এর বদৌলতে প্রত্যেকেই স্বীয় অধিকার পরিপূর্ণরূপে পাবে।
পবিত্র কুরআনে মিরাসের সম্পদ বণ্টননীতি বর্ণনার পাশাপাশি অসিয়ত পূরণের বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুকালে নিজ সম্পদের কিছু অংশ কাউকে দেওয়ার কথা বলাকে অসিয়ত বলে। এর মাধ্যমে অসিয়তকারী ব্যক্তি অনেক সাওয়াবের অধিকারী হয়। অসিয়তের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে রাসুলুল্লাহ থেকে আব্দুল্লাহ বিন উমর বর্ণনা করেন:
'মা হাক্কুম ইমরায়িন মুসলিমিন লাহু শাইয়ুন ইয়ুসি ফিহি ইয়াবিতু লাইলাতাইনি ইল্লা ওয়া ওয়াসিয়্যাতুহু ইনদাহু মাকতুবাতুন' (কোনো মুসলমান যদি তার নিজের হকের কিছু অংশ অসিয়ত করে যায়, তাহলে দু'রাত অতিবাহিত হতে না হতেই আল্লাহ তাআলার নিকট তা লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।) ৭৬৮
অসিয়ত পূরণের জন্য শর্ত হলো, অসিয়ত যেন সম্পদের এক তৃতীয়াংশের অধিক না হয়। অধিক হলে এক তৃতীয়াংশের মাধ্যমে অসিয়ত পূর্ণ করা হবে, অবশিষ্ট অংশ ওয়ারিসদের মাঝে বণ্টিত হবে। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'জ্বায়ান নাবিয়্যু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইয়াউদুনি ওয়আনা বিমাক্কাতা... ক্বুলতু ইয়া রাসূলাল্লাহি উসি বিমালি কুল্লিহি? ক্বলা লা, ক্বুলতু ফাশশাতরু? ক্বলা লা, ক্বুলতু আছছুলুছু? ক্বলা ফাৎ ছুলুছু ওয়াছছুলুছু কাছিরুন...' (মক্কায় নবিজি আমাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে আসলেন। তিনি চাইতেন না, যে ভূমি থেকে হিজরত করেছে, সে ভূমিতে কারও মৃত্যু হোক। তিনি আমার কাছে এসে বললেন, আল্লাহ ইবনে আফরার ওপর রহম করুন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি আমার পুরো সম্পদ দান করার অসিয়ত করব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তবে অর্ধেক। তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ? এবার বললেন, হ্যাঁ। তবে এক-তৃতীয়াংশও অনেক। তোমার পরিবার মানুষের কাছে হাত পাতবে—তাদের এমন অবস্থায় রেখে যাওয়ার চাইতে তাদের স্বাবলম্বী অবস্থায় রেখে যাওয়া তোমার জন্য উত্তম।) ৭৬৯
ওয়ারিসদের মধ্য থেকে কারও জন্য অসিয়ত করা জায়িজ নয়। কেননা, এর ফলে বাকি ওয়ারিসদের মাঝে শত্রুতা ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। দুনিয়ার কোনো লালসায় পড়ে প্রবৃত্তির চাহিদায় স্বজনপ্রীতি করে ওয়ারিসদের মাঝে যেন অসন্তুষ্টি ছড়ানো না হয়। আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
'ইন্নাল্লাহা ক্বাদ আ'তা কুল্লা জি হাক্বিন হাক্কাহু ফালা ওয়াসিয়্যাতা লিওয়ারিছিন' (আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক প্রাপককে তার অধিকার দিয়ে দিয়েছেন। অতএব ওয়ারিসের জন্য কোনো অসিয়ত নেই।) ৭৭০
তবে যদি ওয়ারিশগণ দয়াবশত তাদের কারও জন্য অসিয়ত করার অনুমতি দেয়, তাহলে সেটা বৈধ। ইবনে আব্বাস সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন :
'লা ওয়াসিয়্যাতা লিওয়ারিছিন ইল্লা আইঁ ইয়াশাআল ওয়ারছাাহ' (ওয়ারিসের কোনো অসিয়ত নেই, তবে যদি সকল ওয়ারিস অনুমোদন দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।) ৭৭১
এই হলো অসিয়তের বর্ণনা। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পাপমোচন, গুনাহমুক্তি, পরকালের উত্তম পাথেয় এবং আমলনামায় সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়। অসিয়তের বড় একটি দিক হলো, এর মাধ্যমে সে কার্পণ্যের নোংরামি থেকে পবিত্র হতে পারে।
টিকাঃ
৭৬৩. সুরা আন-নিসা : ১১
৭৬৪. সুরা আন-নিসা: ১১
৭৬৫. সুরা আন-নিসা: ১১
৭৬৬. সুরা আন-নিসা: ১২
৭৬৭. সুরা আন-নিসা: ১২
৭৬৮. মুসনাদু আহমাদ: ৯/৩৬৫, হা. নং ৫৫১২ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৭৬৯. সহিহুল বুখারি: ৪/৩, হা. নং ২৭৪২ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
৭৭০. সুনানু আবি দাউদ: ৩/১১৪, হা. নং ২৮৭০ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৭৭১. মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ৩/৩২৫-৩২৬, হা. নং ২৪১০ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
📄 আট. উপটৌকন ও দান
(الهبة) আল-হিবা হলো দু'ব্যক্তির মাঝে শরিয়াসম্মত কোনো উপকারী বস্তু প্রদানের চুক্তি। যে বস্তু একজন অপরজনকে কোনো বিনিময় ছাড়া দিয়ে থাকে। ফলে যাকে দান করা হয়েছে, সে দানকৃত বস্তুর মালিক হয়ে যায়। হিবা উপার্জনের শরিয়াসম্মত একটি পন্থা। যার মাধ্যমে আত্মা পবিত্র হয়, পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয় এবং মানুষের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়।
হিবা করলে তা আবশ্যক হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম শাফিয়ি-এর মতে, হিবা করলে তা আবশ্যক হয়ে যায়; ফেরত নেওয়ার বৈধতা রহিত হয়ে যায়। যাকে দান করা হয়েছে, তার কাছে ওই জিনিস আর চাওয়া যাবে না। তবে শুধু পিতার বিষয়টি ব্যতিক্রম। সুতরাং পিতা নিজ সন্তানকে কোনো কিছু দেওয়ার পর তা ফেরত নিতে পারবে। আর ইমাম আবু হানিফা-এর মতে, সাধারণভাবে হিবা আবশ্যক হয় না। দাতা কোনো কিছু দান করার পর পুনরায় তা ফিরিয়ে নিতে পারবে। যাকে দান করা হয়েছে, তার কাছে উক্ত জিনিস চাইতে পারবে। ৭৭২
অবশ্য বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে তা আর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না। যেমন আত্মীয়স্বজনকে হিবা করলে, অনুরূপ হিবাকৃত বস্তু আর বিদ্যমান না থাকলে কিংবা থাকলেও তাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে থাকলে, তখন আর তা ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ৭৭৩
টিকাঃ
৭৭২. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/১২৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৭৩. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/১৩২ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)