📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 প্রাককথন

📄 প্রাককথন


'দুনিয়ার সমস্ত মানুষ একই বংশোদ্ভূত' এ মতের ওপরই ইসলামি সমাজব্যবস্থার বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছে। ইসলামে এ শিক্ষা খুব জোরালোভাবে দেওয়া হয়েছে যে, গোত্র, বর্ণ, বংশ, দেশ, ভাষা ইত্যাদি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের মাপকাঠি নয়। পার্থিব এসব গুণাগুণ দিয়ে কোনো মানুষের মর্যাদা ও মান ঠিক করা ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। বরং এসব ক্ষেত্রে সকলের এক অধিকার ও সমান মর্যাদা প্রদান করে। হ্যাঁ, একটি মৌলিক জায়গায় এসে ইসলাম পার্থক্য নির্ণয় করে দেয়। আর তা হলো আকিদা-বিশ্বাস। ইসলাম এ কথা বলে যে, যারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী, যারা কিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী, যারা শেষ নবির নবুওয়াতে বিশ্বাসী তারা সবাই এক সমাজ, তারা সবাই এক জাতি। এ বিশ্বাসের গণ্ডিতে প্রবেশের পর মর্যাদার মাপকাঠি হবে শুধু তাকওয়া দিয়ে। যার তাকওয়া বেশি সে-ই অধিক মর্যাদাবান; যদিও সে কালো, হাবশি ও কুৎসিত চেহারার কেউ হোক। এভাবেই বিশ্বাসী মুমিনদেরকে ইসলাম এক সমাজ ও এক জাতি বলে অভিহিত করেছে। এখানে সাদা-কালো, আরব-অনারব, ধনী- গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই।

সমাজব্যবস্থা উন্নত করতে এবং সুন্দর করতে ইসলাম অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন ব্যক্তিক জীবনে তার আচার-আচরণ কেমন হবে, পারিবারিক জীবনে তার চলাফেরা কেমন হবে, পড়শীদের সাথে তার উঠাবসা কেমন হবে; ইত্যাকার সব বিষয়েই তার জন্য ইসলাম সুনিপুণ নির্দেশনা দিয়েছে। আফসোস যে, আজ মুসলিমদের মধ্যে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও কালচার প্রবেশ করে আমাদের মুসলিম সমাজব্যবষ্ঠাকে ভেঙে দিচ্ছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ববোধ, দয়া, ইনসাফ, সাম্য সব ধীরে ধীরে আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছে। আমরা আজ সমাজকে পরিশুদ্ধ করার জন্য কত পদক্ষেপই না গ্রহণ করে থাকি, তবুও সমাজের অধঃপতন দমাতে পারছি না। এজন্য সমাজের নীতিনির্ধারকরা চিন্তিত ও পেরেশান। অথচ তারা একটু কষ্ট করে ইসলামের দিকে নজর দেওয়ার ফুরসতও খুঁজে পায় না। একমাত্র ইসলামেই রয়েছে সমাজব্যবস্থা সংশোধনের শ্রেষ্ঠ উপায়, কেবল এতেই রয়েছে সমাজের সকল অনাচার দূর করার সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি; তথাপি আমরা এ শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা পেছনে ফেলে মানবরচিত ব্যবস্থা নিয়ে পড়ে থাকি।

তাই মুসলিমদের জন্য অবশ্যকর্তব্য হলো, আমাদের সমাজব্যবস্থায় গেড়ে বসা বিজাতীয় সব সংস্কৃতি ছুড়ে ফেলে পুরোপুরিভাবে ইসলামপ্রদত্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমরা যদি আজ সবাই মানবরচিত সমাজনীতি বর্জন করে ইসলাম নির্দেশিত নীতি গ্রহণ করে চলি, তাহলে সমাজের এ দুরবস্থা দূর হতে খুব বেশি সময় লাগবে না, সে কথা গ্যারান্টি দিয়েই বলা যায়।

আকাইদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো আকিদা। আকিদা শব্দের অর্থ অন্তরে বিরাজমান ধর্মীয় বিশ্বাস। ১৬ মানুষের অন্তর, অনুভূতি, অস্তিত্বসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে হৃদয়ে বদ্ধমূল এমন বাস্তবিক বিশ্বাসকে আকিদা বলে। আকিদা বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। যেমন: ইসলামি আকিদা, বৈজ্ঞানিক আকিদা, রাষ্ট্রীয় আকিদা, সামাজিক আকিদা ইত্যাদি। প্রত্যেকটি আকিদার সংজ্ঞা, ধরন ও প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন। আমরা এখানে শুধু ইসলামি আকিদা নিয়ে আলোচনা করব।

ইসলামের আবশ্যকীয় মৌলিক বিষয়াদির প্রতি ইমান আনয়ন করার নামই হলো ইসলামি আকিদা। অন্তর, জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা সর্বোপরি মানুষের স্বভাবজাত ফিতরাত ও সুস্থ চিন্তাশক্তির সাথে এ সকল বিশ্বাস সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আকিদাই একটি জাতির চালিকাশক্তি। সুস্থ ও সঠিক আকিদা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। আর ভুল ও ভ্রান্ত আকিদা মানুষকে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়।

সন্দেহ নেই যে, সমগ্র ইতিহাসের মধ্যে ইসলামি আকিদাই হলো শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে নির্ভুল। এর মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য ও উন্নত সমাজব্যবস্থা। এর ভিত্তিতেই মানুষ মুক্তি পেয়েছে সকল প্রকার জুলুম ও কষ্ট থেকে। কেননা, এ বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো ওহি, যা আল্লাহ তাআলা জিবরাইল -এর মাধ্যমে নবি মুহাম্মাদ -কে জানিয়েছেন। তাই এর আকিদা-বিশ্বাস সব নির্ভুল ও পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ।

আকিদার অধ্যায়ে বিভিন্ন রকমের ভাগ রয়েছে। যেমন মৌলিক ও শাখাগত আলোচনা, তাওহিদের পরিচিতি ও প্রকারভেদ, তাওহিদ বা ইমান ভঙ্গের কারণসমূহ, আলা-ওয়ালা ওয়াল-বারাসহ বিভিন্ন আলোচনা। আমরা এ অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় এ বিষয়গুলো নিয়ে সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১৬. আল-মিসবাহুল মুনির : ২/৪২১ (আল-মাকতাবুল ইলমিয়্যা, বৈরুত)

📘 ইসলামি জীবনব্যবস্থা 📄 ব্যক্তির সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক

📄 ব্যক্তির সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক


সত্যিকার মুমিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হবে। অন্য সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে মনোযোগী হবে আল্লাহর প্রতি। রবের সাথে তার এরকম সম্পর্ক আল্লাহকে এক বলে মানা এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার সাক্ষ্য দেয়। মুমিন ব্যক্তির মন-মস্তিস্কে থাকবে তাওহিদের কথা, মুমিনের অস্তিত্বই হবে আল্লাহর একত্ববাদ জানা ও মানার মাধ্যমে। মুমিন ব্যক্তির বিশ্বাস হবে যে, আল্লাহ স্রষ্টা, তিনি রূপদাতা, তিনি সৃজনকারী, তিনি রক্ষাকর্তা। তিনি সবকিছুকে বেষ্টন করে আছেন। কোনো কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। পৃথিবীর কোনো শস্যদানা, পানির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফোঁটা, গাছ থেকে ঝরে পড়া কোনো পাতা—কোনোটির এমন কোনো অংশ, পরিমাণ বা অবস্থা নেই, যা তাঁর অগোচরে রয়েছে। মুমিন ব্যক্তি মাত্রই এসবে বিশ্বাস করবে এবং তার কর্মে এর প্রতিফলন ঘটবে। তিনটি কাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর ও গাঢ় করতে পারি। যথা : আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশে মুমিন ব্যক্তির পূর্ণতা থাকা। আল্লাহকে বন্ধু ও অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করা। একনিষ্ঠ হয়ে একমাত্র রবের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। এখানে প্রত্যেকটির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরছি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px