📄 ছয়. বিচারকার্য পরিচালনা
রাষ্ট্রের এমন আরেকটি মহান দায়িত্ব হলো বিচারকার্য পরিচালনা করা। আল্লাহর শরিয়া অনুযায়ী ন্যায়সংগতভাবে মানুষের যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়ার ব্যাপারে অনেক নস বর্ণিত হয়েছে। মানুষের যেকোনো ধরনের সমস্যার ন্যায়সংগত ও সত্যনিষ্ঠ সমাধানকেই বিচারকার্য বলা হয়। এটি ইসলামি রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর অন্যতম অংশ। ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়া এই কাজ অন্য কারও করার ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন :
'আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ করো, তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক।'৫৪৯
'নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান।'৫৫০
টিকাঃ
৫৪৯. সুরা আন-নিসা: ৫৮
৫৫০. সুরা আন-নিসা: ১০৫
📄 সাত. বিবিধ দায়িত্ব
এমনিভাবে ইসলামি শরিয়া কর্তৃক নিষিদ্ধ এমন কিছু কঠিন বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক করা, ভীতি প্রদর্শন করা এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সক্ষমতা শুধু ইসলামি রাষ্ট্রেরই আছে। যেমন: সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, মজুদকরণ, সিন্ডিকেটসহ সকল অবৈধ বিষয় থেকে সতর্ক করা, বারণ করা এবং শাস্তি প্রয়োগ করা একমাত্র রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব। কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে সতর্ক করা ও বারণ করা সম্ভব হলেও শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব নয় এবং তাদের সে অধিকারও নেই।
অজ্ঞতা, অসুস্থতা, দারিদ্র্যের ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া এবং শিক্ষা, সুস্থতা, প্রাচুর্যতা, শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যায়, অনিষ্ট, জুলুম বন্ধ করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করা রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। রাষ্ট্র প্রয়োজনে জেল, জরিমানা, প্রহার, দেশান্তরসহ বিভিন্ন শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে। রাষ্ট্র ছাড়া কার ক্ষমতা আছে, এই কঠিন কাজগুলো আনজাম দেওয়ার?
এমনিভাবে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়া, এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষেই কেবল সম্ভব। রেডিও, টেলিফোন, পত্রিকা, পুস্তক প্রকাশনা, বিভিন্ন ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে লেখালেখি ইত্যাদি কর্ম সুচারুভাবে পরিচালনা করা ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আকর্ষণীয়ভাবে দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে প্রচার করাও ইসলামি রাষ্ট্রের কর্তব্য। যাতে মানুষ এই দ্বীনকে আগ্রহ সহকারে সানন্দে গ্রহণ করে এবং তারা দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়ানীড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।'৫৫১
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের এসব নস দ্বারা এই দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি শরিয়ায় রাষ্ট্রের গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থাৎ একটি শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান রাষ্ট্র ছাড়া ইসলামের ভিত মজবুত হয় না। রাষ্ট্র থাকলেই তথায় পূর্ণাঙ্গভাবে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর আইন বাস্তবায়িত করা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
'আর আমি আদেশ করছি, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। আর তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যেন তারা আপনাকে এমন কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাজিল করেছেন।'৫৫২
শরিয়া অনুযায়ী বিচার করা, ইসলামি রাষ্ট্রের কাছে বিচার প্রার্থনা করা কাফির মুশরিকদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
'যেসব লোক আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।'৫৫৩
যদি ইসলামের এমন কোনো ভূখণ্ড না থাকে, যা আল্লাহর শরিয়া অনুযায়ী সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহলে এই দ্বীন মানুষের মস্তিষ্কে, বই-পুস্তকেই শুধু আবদ্ধ থেকে যাবে। দ্বীন কেবল তাত্ত্বিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়ে যাবে। মানুষ শুধু এতটুকু জানবে যে, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। কিন্তু জীবনে এর কার্যকারিতা কী, উপকারিতা কী—এগুলো কিছুই জানার সুযোগ পাবে না। বই-পুস্তকে শুধু ‘ইসলাম শিক্ষা’ শিরোনামে কয়েক লাইন লেখা-ই থাকবে, কিন্তু ইসলামের বাস্তবতা কেউ জানবে না। আবার অনেকাংশে ওই সামান্য লেখাটুকুও বিকৃত হতে থাকবে।
একশ্রেণির কুচক্রি মহল ইসলামের যতটুকু তাদের জন্য ফায়দাজনক মনে করে, ততটুকুই কেবল তাদের মতো করে ব্যাখ্যা করে বিকৃতাকারে উল্লেখ করে। তাদের হীন পরিকল্পনা হলো, ইসলাম শুধু মানুষের মুখে থাকবে, কিন্তু তাদের জীবনে ইসলামের ওপর কোনো আমল থাকবে না। ঘরের কোণে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকেই মনে করা হবে ইসলাম, জীবনের আর সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে অচল মনে করা হবে। যদি ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশ ও জাতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করার সুযোগ না পায়, তাহলে ইসলাম অচল-অবশ, পরিত্যক্ত অবস্থায় নির্জনে-গহীনে কিংবা মসজিদের কোণে আবদ্ধ একটি চেতনাহীন নিষ্প্রাণ ধর্মে পরিণত হবে। অথবা ইসলাম বিভিন্ন অংশে বিভক্ত, নিষ্প্রভ ও বিকৃত একটি ধর্মে রূপান্তরিত হবে, যাকে তখন আর মুহাম্মাদে আরাবি-এর আনীত ইসলাম বলা যাবে না।
বস্তুত ইসলাম ঘরের কোণে সীমাবদ্ধ কোনো ধর্মের নাম নয়। ইসলাম পালন শুধু ঘরে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসলাম কেবল একটি ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং রাষ্ট্রসহ পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনব্যবস্থার নাম ইসলাম। ইসলাম একটি ক্ষমতা ও শক্তির নাম। অতএব, এই জাতিকে জাগতে হবে। ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
টিকাঃ
৫৫১. সুরা আলি ইমরান: ১০৪
৫৫২. সুরা আল-মায়িদা: ৪৯
৫৫৩. সুরা আল-মায়িদা: ৪৪