📄 ৫. ডাকাতির হদ
ডাকাতি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অস্ত্র বা শক্তি দেখিয়ে কারও সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে ডাকাতির চারটি প্রকার রয়েছে। প্রত্যেক প্রকারের জন্য আলাদা আলাদা বিধান। এক : ডাকাতি করতে এসে শুধু সম্পদ লুট করবে, কিন্তু কাউকে হত্যা করবে না। দুই: সম্পদ নেবে না, কিন্তু কাউকে হত্যা করবে। তিন: সম্পদও নিয়ে যাবে এবং কাউকে হত্যাও করবে। চার: সম্পদ ছিনতাই বা হত্যা কোনোটিই করবে না; বরং শুধু ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করবে। সুতরাং প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীর হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ ডান হাত ও বাম পা কিংবা বাম হাত ও ডান পা কেটে ফেলা হবে। দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীকে অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া ছাড়া সরাসরি হত্যা করা হবে। তৃতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে অপরাধীর হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে তারপর তাকে শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করবে। চতুর্থ প্রকারের ক্ষেত্রে তাকে দেশান্তর করবে। ৫২১
আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।”
আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'উকল গোত্রের কিছু লোক মদিনায় আসল। (কিন্তু মদিনার আলো-বাতাস তাদের অনুকূলে ছিল না। তাই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল।) তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের উটের দুধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা যখন তা পান করল, তখন সুস্থ হয়ে গেল। এরপর তারা উটের রাখালদের হত্যা করে জন্তুগুলো ছিনতাই করে নিয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট সকাল বেলা এই সংবাদ পৌঁছল। তখনই তিনি তাদের ধাওয়া করে ধরার জন্য একদল লোক পাঠালেন। দুপরের আগেই তাদের ধরে নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি তাদের হাত পা কাটার এবং চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাদের উত্তপ্ত রোদের মধ্যে ফেলে রাখা হলো, এমনকি তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের পানি পর্যন্ত দেওয়া হলো না। আর এভাবেই তাদের মৃত্যু হলো।'
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে যুদ্ধ করে' এ কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যারা ডাকাতি করে মানুষের ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এর জন্য প্রয়োজনে মানুষও হত্যা করে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ফলে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, নিজেদের জানমালের ব্যাপারে তারা সর্বদা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
সুতরাং এই নির্দয় বিপথগামী লোকদের ব্যাপারে কোনো ধরনের দয়া, সহানুভূতি ও নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তারা দয়া ও কোমল আচরণ পাওয়ার উপযুক্ত নয়; বরং তারা কঠিন শাস্তির উপযুক্ত। যাতে এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর দেহ থেকে এই পচা দূষিত অংশটুকু বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহ আতঙ্কমুক্ত নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে। তাদের জন্য ইসলামের নির্ধারিত হদ বা শাস্তি হলো, উল্লিখিত কুরআনের আয়াতে যা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মালামাল লুটের ক্ষেত্রে বিপরীত দিক থেকে তার হাত-পা কেটে দেওয়া হবে। আর শুধু হত্যার ক্ষেত্রে তাকেও হত্যা করা হবে। আর যদি সে লুট ও হত্যা উভয়টি করে তাহলে বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে তারপর শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করা হবে। যেন এ ভয়ংকর শাস্তি দেখে জীবনে আর কেউ ডাকাতির সাহস না করে। এটাই ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে, সে কোনো ধরনের অপরাধকে সামান্য পরিমাণ প্রশ্রয় না দিয়ে গোড়া থেকে সেটাকে উপড়ে ফেলে। আর লুট বা হত্যা কোনোটিই না করলে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধে তাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
সমাজ ও জাতির শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য ইসলাম এই পাঁচ ধরনের হদ বা শাস্তি নির্ধারণ করেছে। এই হদগুলো এমন যে, এগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো যাবে না। আর ক্ষমা করার তো প্রশ্নই আসে না। এ ক্ষেত্রে কারও থেকে কোনো ধরনের সুপারিশও গ্রহণীয় হবে না। কারণ, এ ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ নমনীয়তা উম্মাহকে কঠিন ঝুঁকি ও বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে।
বি.দ্র.: আমরা যে সকল কিসাস ও হুদুদের কথা উল্লেখ করলাম, ইসলামি রাষ্ট্রই কেবল এগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। আর এ সকল বিধান বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও ইসলামি রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্র তার শক্তি ও প্রভাব দিয়ে অপরাধ দমনের জন্য এ সকল কিসাস, হুদুদ ও তাজিরসহ ইসলামের প্রতিটি বিধানই বাস্তবায়ন করবে। রাষ্ট্র ব্যতীত অন্য কেউ এ সকল বিধান বাস্তবায়ন করতে সক্ষম নয়। কারণ, একমাত্র রাষ্ট্রেরই হুদুদ ও কিসাসগুলো বাস্তবায়ন করা ও তার পরবর্তী বিশৃঙ্খলা কঠিন হাতে দমন করার শক্তি আছে।
টিকাঃ
৫২১. বাদায়িউস সানায়ি: ৭/৯৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৫২২. সুরা আল-মায়িদা : ৩৩
৫২৩. সহিহুল বুখারি: ৮/১৬৩, হা. নং ৬৮০৫ (দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
📄 ৬. জাদুর হদ
জাদু করা হারাম বা কুফর। অর্থাৎ কিছু জাদু আছে কুফর, যেমন: কুরআনের অবমাননা করা, তারকারাজি বা শয়তানের উপাসনা করা, কুফরি কালাম বা কাজ করা; আর কিছু আছে হারাম, যা কুফরি বা শিরকি কাজ না করে পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদির মাধ্যমে করা হয়।
জাদুকরের শাস্তি নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ-সহ অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরামের মতে জাদুকরের শাস্তি হলো হত্যা।
জুনদুব থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
'জাদুকরের হদ বা শাস্তি হলো তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া।'
উমর তার মৃত্যুর এক মাস পূর্বে এক চিঠিতে লিখেছিলেন :
'তোমরা প্রত্যেক পুরুষ ও মহিলা জাদুকরকে হত্যা করো।'
জাদুকরকে হত্যার বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে কিছু শর্ত থাকা ও না থাকা নিয়ে ইখতিলাফ আছে। হানাফি মাজহাবমতে জাদু যদি কুফরি হয় কিংবা কুফরি না হলেও এর কারণে জমিনে ফাসাদ ও কারও ক্ষতি হয়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। মালিকি মাজহাবমতে যদি তার কুফরি ইসলামি আদালতে সাব্যস্ত হয় কিংবা সে প্রকাশ্যে কুফরিমূলক জাদু করে বেড়ায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। শাফিয়ি মাজহাব মতে জাদুর মাধ্যমে কাউকে হত্যা করা হলে তবেই তাকে হত্যা করা হবে। আর হাম্বলি মাজহাব অনুসারে জাদুকর কুফরি কাজের মাধ্যমে জাদু করলে তখন তাকে হত্যা করা হবে; যদিও তার জাদু দ্বারা কাউকে হত্যা করা না হোক।
টিকাঃ
৫২৪. রদ্দুল মুহতার: ১/৪৫ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৫২৫. ফাতহুল কাদির: ৬/৯৯ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৫২৬. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪/৪০১, হা. নং ৮০৭৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি হাসান।
৫২৭. মুসনাদুল বাজ্জার: ৩/২৬৮, হা. নং ১০৬০ (মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, মদিনা) - হাদিসটি সহিহ।
৫২৮. আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা: ২৪/২৬৬-২৬৭ (অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, কুয়েত)
📄 ৭. সমকামিতার হদ
ইসলামে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও জঘন্য পাপগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সমকামিতা। এটা এমন পাপ, যা সুস্থ রুচি পরিপূর্ণভাবে ঘৃণা করে এবং স্বাভাবিক বিবেক এটাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। এ অপরাধের জন্য আল্লাহ তাআলা লুত আ.-এর জাতিকে এমন ভয়ংকর আজাব দিয়েছিলেন, যা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিকে দেননি। এটা হারাম ও নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ হওয়ার ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। তবে এর শাস্তি বা হদ নিয়ে মতানৈক্য পাওয়া যায়।
আল্লামা ইবনে কাইয়িম জাওজিয়া বলেন, 'ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ-এর মাজহাবে সমকামিতার শাস্তি হত্যা করা; চাই সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক। আবু বকর, আলি, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, খালিদ বিন জাইদ, আব্দুল্লাহ বিন মামার, জুহরি, রবিআ বিন আব্দুর রহমান রহ, ইসহাক বিন রাহুয়া-সহ প্রমুখ এমনই বলেছেন। আর ইমাম শাফিয়ি-এর মাজহাবমতে সমকামিতার শাস্তি হুবহু জিনার শাস্তির মতোই। বিবাহিত হলে পাথর নিক্ষেপে হত্যা এবং অবিবাহিত হলে একশ বেত্রাঘাত। আতা বিন আবু রাবাহ, হাসান বসরি, সাইদ বিন মুসাইয়িব, ইবরাহিম নাখয়ি, কাতাদা, আওজায়ি, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ-সহ অনেকে এমন মতই পোষণ করেন। আর ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম হাকিম-এর মতে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি নেই; বরং তাকে তাজির করা হবে।'
অনেক ফকিহ এ মাসআলায় সমকামীকে হত্যার ব্যাপারে সাহাবিদের ইজমার কথা বর্ণনা করেছেন। হাদিস থেকেও এ মতটি শক্তিশালী বলে সাব্যস্ত হয়। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
'তোমরা কাউকে লুত আ.-এর জাতির মতো কুকর্মে লিপ্ত হতে দেখলে কর্তা ও যার সাথে করা হয়েছে, উভয়কে হত্যা করো।'
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'সমকামিতার ব্যাপারে একদল উলামায়ে কিরাম বলেন, এর শাস্তি জিনার শাস্তির মতোই। আর কারও মতে এর চেয়েও নিম্ন শাস্তি (তথা তাজির) হবে। তবে বিশুদ্ধ মত সেটাই, যেটার ওপর সাহাবায়ে কিরাম-এর ইজমা হয়েছে যে, সমকামিতায় লিপ্ত উভয় ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে; চাই তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক।'
এ মাসআলায় দলিল-প্রমাণাদির দিকে তাকালে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ-এর মতই শক্তিশালী বুঝা যায়। তাছাড়া এ মতের ওপর সাহাবায়ে কিরামের ইজমাও রয়েছে। তাই বিচারকের উচিত এক্ষেত্রে কোনো নমনীয়তা না দেখিয়ে তাদের কঠিনভাবে হত্যা করা। হত্যা কীভাবে করবে, সে ব্যাপারে কয়েকটি পন্থা রয়েছে। কারও মতে আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে। কারও মতে পাহাড় বা উঁচু কোনো স্থান থেকে ফেলে দিয়ে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করে মারা হবে। আর কারও মতে প্রচণ্ড দুর্গন্ধময় জায়গায় তাকে কোনোরূপ খাবার-দাবার না দিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখবে। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার কথা বলেছেন। মোটকথা, ভয়ংকর শাস্তি দিয়ে তাকে মারার ব্যাপারে সবাই একমত।
টিকাঃ
৫২৯. আল-জাওয়াবুল কাফি : পৃ. নং ১৬৮ (দারুল মারিফা, মাগরিব)
৫৩০. মুসতাদরাকুল হাকিম : ৪/৩৯৫, হা. নং ৮০৪৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৫৩১. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ২৮/৩৩৪ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা)